সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সাহানা ভট্টাচার্য্য (পর্ব – ১)

অস্ত্রদান – একটি কাল্পনিক কথা

পর্ব ১ – বজ্র

“এই এত্ত এত্ত শাড়ি-গয়না আমার জন্য এয়েচে?”
“হ্যাঁ রে লা তোর জন্য, কি ভাগ্যি তোর! অত্ত বড়মাপের মানুষটা বে করে তোরে নে যাবে!”
“ও ঠান্দি, এই লালকাপড়টা তো এত্ত বড়, এটার কোল থে’ কেটে আমার মেয়ের এট্টা জামা করে দাও না”
“ধিঙ্গি মেয়ে, যত অলুক্ষণে কতা! বিয়ের তত্ত্ব কেটে উনি পুতুলের জামা চান! সোহাগী এলেন আমার।”
বকুনি খেয়ে চুপ করে গেলো কালী। এত্ত জামাকাপড়, এত্ত গয়না, এত্ত মিষ্টি-মাছ সব পাঠিয়েছে কিনা তার হবু শ্বশুরবাড়ি থেকে? লোকগুলো ভালোই তাহলে, নইলে এতকিছু পাঠায়? সেদিন যে ঘটকজেঠুর সাথে ঘটা করে দেখতে এলো একজন খুব বুড়ো, বরের দাদু হবে বুঝি, আর তিনজন জোয়ান লোক – কোনটা বর কে জানে! ঘোমটার ভেতর ভালো বুঝতেও পারেনি কালী। বয়স পাঁচ ছুঁইছুঁই, অত্তবড় বেনারসী আর গয়নাগাটি পরিয়ে তাকে পুঁটুলি পাকিয়ে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাড়ির মেয়েরা পইপই করে বলে দিয়েছিলো কারোর মুখের দিকে না চাইতে! তাতে কি? তাকে যখন মুখ তুলতে বলা হলো, তখন ঘোমটার আড়াল থেকে এক ঝলক ঠিক দেখে নিয়েছে। কৌতূহল যাবে কোথায়?
“অ কালী, কোথায় গেলি মা?”
ভাবনায় ছেদ, রান্নাঘর থেকে জেঠাইমার ডাক। বিয়ের প্রস্তুতি বলে কথা, ছোট্ট কালী ছুটলো রান্নাঘরের দিকে। আজ সে প্রথমবার ভাতের ফ্যান ফেলা শিখবে!
কৈলাস থেকে মর্ত্য দেখার জন্য বিশ্বকর্মা অনেকদিন হলো টিভি বানিয়ে দিয়েছেন। মর্ত্যে এতো দেশে এতো মানুষ, তাদের এত্ত এত্ত না পাওয়া! মা দুর্গা দশহাতে সামাল দেন সব। ছোট্ট মেয়ে কালীমতী মায়ের বড় প্রিয়! কেমন তুরুক তুরুক করে সারা বাড়ি লাফিয়ে বেড়ায়! ওকে দেখে মা দুর্গার বড্ড আনন্দ আজ। ছোট্ট মেয়েটা এত্ত শাড়ি-গয়না দেখে এত খুশি! গৌরীদান হোকগে, বর ভালো হলে সব ঠিক। আহা, বাছা সুখে থাক!
***
শুভদৃষ্টিতে টোপরের মধ্যে পাকা চুল ঢাকা পড়লেও বরের মুখটা দেখে কান্না পেয়ে গেলো কালীর! ওই দাদুটার সাথে তার বিয়ে দিচ্ছে বাবা? বাপসোহাগী বলে সারাদিন গালি খায় সবার কাছে, সেই বাপ এমন করবে! ভিড়ের মধ্যে চোখ চালিয়ে বাপকেই খোঁজার চেষ্টা করতে যেতেই চারিপাশে লোকজন হৈচৈ করে উঠলো। শুভদৃষ্টির লগ্নে অন্যদিকে তাকালে নাকি অমঙ্গল হয়! জলভরা চোখে সে বুড়ো বরের দিকে তাকালো। বাড়ির দুর্গামন্দিরের দিকে না তাকিয়েই ভাবলো – বুড়ো বর নিয়ে কেমন করে ঘর করে দুর্গা মা?
কৈলাসে বসে হতবাক মা দুর্গা নিজেও! মেয়েটার বাপ এ কি করলো? ঐটুকু মেয়ের এই বুড়ো বর? এর চেয়ে হাতপা বেঁধে জলে ফেললেই বেশ হতো! মনেমনে ভাবলেন মা ‘নাঃ, চিত্রগুপ্তকে কাল ফোনে একবার ধরতে হচ্ছে! বুড়ো আর ক’বছর, তা জানতেই হবে! সর্বনাশ আটকাতেই হবে!’
***
“খেলি তো বরটাকে?”
সাদা থানপরা ছোট্ট মেয়েটা অবাক হয়ে তাকালো জেঠাইমার দিকে! গত দুবছরে যদিও সে অবাক হতে ভুলে গেছে! অষ্টমঙ্গলার আগেই কালী অনেকগুলো তথ্য পেলো। যেমন, পাঁচ ছুঁইছুঁই কালীর তিনজন পুত্র-পুত্রবধু ও দুই নাতি-নাতনী নিয়ে ভরা সংসার, যারা সবাই তার চেয়ে বয়সে বড়। সিঁদুরপরা-সংসার করার মানে জানতো না ছোট্ট মেয়েটা, বিধবা হওয়ার মানেও বোঝে না। আচার-বিচার-রীতি-রেওয়াজ-বারণে-বারণে জেরবার ছোট্ট মেয়েটা কেঁদে পড়লো ঈশ্বরের কাছে।
কৈলাসে মা দুর্গা শয্যা নিলেন আজ! ঐটুকু মেয়েকে দিয়ে বিধবার আচার করাচ্ছে সবাই? ঘষেঘষে সিঁদুর মুছিয়ে চুল ছাঁটিয়ে অম্বুবাচী করাচ্ছে? ধিক হিন্দুসমাজ!
***
জীবনে দ্বিতীয়বার শুভদৃষ্টির পানপাতা সরিয়ে সুপুরুষ বিদ্বান যুবাপুরুষটিকে দেখে মন ভরে গেলো কালীর। বয়সে সে নয়বছরের বালিকা, কিন্তু ঘাতপ্রতিঘাতে অভিজ্ঞতায় অনেক অনেক বড় হয়ে গেছে কালী। দ্বিতীয় বিয়ের পর, বাড়ির বড়দের উপেক্ষা করে বাড়ির দুর্গামন্দিরের বিগ্রহের আগে ছোট্ট কালীমতী এসে পায়ে পায়ে একজন মানুষের সামনে এসে তাঁকে আগে প্রণাম করলো। ঈশ্বর নাকি চোখে দেখা যায়না! তাহলে ওই মানুষটি কে? এই মানুষটি না থাকলে তার বাকি জীবন সাদা থান আর আলোচালেই কেটে যেত! সেদিন কালীমতী ও শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্নের মাধ্যমে সফল হয়েছিল বিধবাবিবাহ আইন। সেই মহাযজ্ঞের পুরোহিত ঈশ্বরচন্দ্রের হাত ধরে হিন্দু মহিলারা নতুন জীবন পেয়েছিলো।
কৈলাসে বসে দেবী দুর্গা স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। হিন্দু দেবী তিনি, হিন্দুদের ঘরের কচি বিধবারা পুজোআচ্চার দিন উপোস করে মঙ্গলকাজ না করে এত কষ্ট পায়, তিনি মা হয়ে মর্ত্যে এসে সহ্য করতে পারেন না! কিন্তু তাঁর তো হাজার কাজ, তাই দিকেদিকে অস্ত্র পাঠিয়ে তিনি অসুরনিধন করেন। বজ্রকে পাঠিয়েছিলেন তিনি – নমনীয় কিন্তু কঠোর-উজ্জ্বল মানুষটির আত্মায়! সার্থকনামা মানুষ – নামেও ঈশ্বর, কাজেও ঈশ্বর।
যাক, একটা অসুর তো নিকেশ হলো!

ক্রমশ…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!