লেন্সের কালি-গ্রাফি – ৮

পাহাড় অরণ্য যুগল মিলনে পুরুলিয়া ভ্রমণে….

আমরা যখন হাওড়া গিয়ে পৌছালাম তখন সূর্য্যি মামা সবে আকাশ পানে চেয়েছে। কি অপূর্ব সেই ভোর। সূর্যের হালকা আভা গাড়ির কাঁচ ভেদ করে আমাদের স্পর্শ করে যাচ্ছিল। নিরিবিলি ভোরের যাত্রাপথ শেষ করে জনবহুল ও ব্যস্ততম স্টেশন হাওড়া গিয়ে পৌছালাম। নভেম্বরের ভোর মানেই হালকা হালকা শীতের পরশ। হালকা কুয়াশা ও হিমশীতল হওয়ার স্পর্শ। এরকম সুন্দর আবহাওয়ায় চা ছাড়া যেন ঠিক জমছিলো না। তাই স্টেশন এ পৌঁছেই প্রথম চুমুক দি চা-এ।
যথাসময়েই ট্রেন রওনা দেয় হাওড়া থেকে। মোটামুটি খুব একটা ভিড় ছিল না। মূলত এই সব ট্রেন এ টুরিস্ট টাইমেই বেশি ভিড় হয়। যেহেতু পুরুলিয়া ফেব্রুয়ারি টু মার্চ টুরিস্ট টাইম তাই সেরকম ভিড় ছিল না। তাই নিজেদের রিজার্ভ সিট তো বটেই তা ছাড়াও বেশ আরামদায়ক ভাবেই ট্রেনের যাত্রাপথ কেটেছিল।
হাওড়া ছাড়ার এক দের ঘন্টা পর থেকে শহরের কোলাহল থেমে গিয়ে শুরু হয় চোখ জোড়ানো সুবুজের বিস্তার। চারপাশ জুড়ে কেবলই ক্ষেত, চাষের জমি ও ধু ধু ফাঁকা প্রান্তর। যেহেতু শীতের শুরু শুরু তাই ট্রেনে সেরকম গরম অনুভব হয় নি। আরও প্রায় এক দু ঘন্টা ট্রেন অতিক্রান্ত করার পর পুরুলিয়া শুরুর কিছু আগে দর্শন পাই কিছু পাহাড়ের।
বেশ ট্রেন লাইনের পাশ বরাবর চলতে থাকে এই পাহাড়ের সারিরা। যেন তারাও আমাদের সাথে একই ভাবে দ্রুতমান। এখানে রাস্তায় দেখা পাই জয়চন্ডী পাহাড়ের। এটি মূলত সত্যজিৎ রায় এর হীরক রাজার দেশে সিনেমা শুটিং এর জন্য বিখ্যাত। ট্রেন লাইনের ওই প্রান্তে চক্ষু সার্থক জয়চন্ডীর শোভা নিয়ে এগিয়ে চললাম আরও পুরুলিয়ার গভীরে।
আমাদের পৌঁছানোর সময় ছিল দুপুর ২টো। কোনরকম লেট না করে ট্রেন ভাই আমাদের যথা সময়েই পুরুলিয়া পৌঁছে দিয়েছিল। মূলত সকালের এক কাপ চা আর ট্রেনে কিছু কেক, বিস্কুট ছাড়া কিছুই আর সেরম পেটে পরে নি। তাই স্টেশন এ নেমেই প্রথম চোখ পড়েছিল খাওয়ারের সন্ধানে।
পুরুলিয়া স্টেশন টি মোটামুটি ভালোই জমজমাট। স্টেশন এর পাশেই বেশ ভালো পরিস্কার ও পরিচ্ছন্ন ভাত বা যে কোন রকম ই খাওয়ার পাওয়া যায়। এছাড়াও রয়েছে বেশ কিছু হোটেল, চাইলে হতে পারে রাত্রিবাস ও।

 

 

 

পুরুলিয়া হলেও আমাদের মূল গন্ত্যব্য ছিল পুরুলিয়া হিলটপ। অর্থাৎ পাহাড়ের ওপরে। ফলত আমরা খাওয়া শেষ করে পুরুলিয়া থেকে ওপরে মানে হিলটপ এ ওঠার সূত্র খুঁজতে বেরোলাম। ওখানে স্থানীয় স্ট্যান্ড এ খোঁজ নিয়ে দেখা গেল ৪:৩০পর্যন্ত বাস পরিষেবা চালু থাকে। এছাড়াও রয়েছে প্রাইভেট গাড়ি। চাইলে নিজের সুবিধা মত বুক করে নেওয়া যাবে। যদিও বা প্রাইভেট গাড়ির কোন সময় সীমাবদ্ধতা নেই।
আমাদের প্রায় ৩:০০এর মধ্যে খাওয়া কমপ্লিট হয়ে যাওয়ার আমরা ৩:৩০ এর বাস টা ধরি। এখানে বলে রাখি, বাস পুরুলিয়া স্টেশন থেকে ১ঘন্টা পর পর ছাড়ে। তাই শেষ পরিষেবা ৪:৩০ এর আগের ৩:৩০এর বাস টা আমরা ধরে নি।
পুরুলিয়া মানেই বেশ পাহাড় এর সমাগম থাকলেও সবুজের সান্নিধ্য ও কিন্তু চোখে পড়ার মত। বাস তার গন্ত্যব্যের দিকে রওনা হওয়ার পর বেশ এক ঘন্টা মত আমরা সবুজের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। চারিদিকে বিস্তীর্ণ জমি, চাষের ক্ষেত, সবুজের সারি পর পর রাস্তার ধার ধরে, আর তাদের বুক চিরে মাঝখান দিয়ে এগিয়ে চলেছে আমাদের দুরন্ত বাস। এই রাস্তার ধারে মূলত ফাঁকা ধান জমি ই বেশি ছিল। জনবসতি প্রায় নেই বললেই চলে।
মাঝে মাঝে কিছু জায়গায় বাস স্টপেজ দিচ্ছিল, শুধু সেই টুকু জায়গাই বসতি আর ছোট বাজার। প্রায় এক ঘন্টা পর আসে ঘোরাটপ বলে একটি স্থানীয় এলাকা। জায়গা টার সেরকম কোন বিশেষত্ব নেই, তবে চমক হলো এই অঞ্চল টি ক্রস করার পর শুরু হয় পাহাড়ের সাম্রাজ্য। ফাঁকা সমতল ছাড়িয়ে একটু একটু করে উঠতে থাকি পুরুলিয়া হিলটপের দিকে।

লেন্সে – সুবীর মন্ডল
কলমে – ঋষি ভট্টাচার্য

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।