।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় ঋত্বিক সেনগুপ্ত

রুমার ডায়েরি থেকে

রুমা দত্ত, তার ডায়েরির পাতা খোলা রেখেই উঠে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। বাইরে তখন ঝিঁ-ঝিঁ পোকার ডাক, চারিদিকের নৈঃশব্দ আরো গভীর করেছে। জানালার বাইরে, বাড়ির অদূরে হাসনাহানা গাছটার দিকে তাকিয়ে, বিড়বিড় করে বলে উঠল, “সব অন্ধকারের একটা আলো হয় সুমন – এই জলভেজা ঘন অন্ধকার শ্রাবণের রাতে, হাসনাহানার ফুলগুলো কেমন স্পষ্ট”!
খোলা ডায়েরির পাতায়, কিছু অসম্পূর্ণ বাক্যাংশ –
“আজ বৃষ্টিটা ওইরকম হঠাৎ থেমে না গেলে, এমন হতো কিনা জানিনা; মেঘ ছিঁড়ে বৃষ্টি-ধোয়া আকাশটা, যদি আমাকে এত সাহস দিল, আগে কোন মানুষ পারেনি তো! ওই ১৬ বছরে কাজের মেয়ে বাসন্তী, কোন গরজে আমাকে রেল লাইন অবধি পৌঁছে দিয়ে গেল? বাবা তো ছোট বয়সে অনেক বার বলেছেন, যে রেললাইন মানুষকে যে গতি দিয়েছে, তেমন সামগ্রিকভাবে হয়ত আর কোন আবিস্কার পারেনি! আমার মা-দূর্গা, এবছর রেল-লাইন ধরেই আগমন করলেন।।
আমার নবজন্মের সাক্ষী, সহায়িকা, বাসন্তী”
১৪ই আগস্ট, ১৯৮৮, রাত ১০:৩০।।”
* * *
আজ সকালেও, আর পাঁচটা দিনের মতো, সকালে চা খেয়ে নিজবাসায় ফিরে গেছেন রাজ শর্মা। রুমার স্বামী, রোহিত দত্তের পার্টনার, ল- ফার্মের। ব্যবসা টা আসলে দুজনেই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে – স্থাপন করেছিলেন তাদের বাবারা। রোহিত ও রাজ, দুজনেই আইনি মহলে সুপরিচিত, বিশেষ করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পলিসি ডিসপিউট সম্পর্কিত মামলায়। মা লক্ষ্মীর দাক্ষিন্যে, পসার রম-রমা, তাই উত্তরাধিকার সূত্রে সান্ধ্য তাসের অধিবেশন ও নিয়মিত মদ্যপান ও বজায় আছে। পারিবারিক কোন গুরুদেবের বিধানমত, মঙ্গল ও শনিবারটা, সাধারণত এই ঐতিহ্যের বিচ্যুতি ঘটে।
ফিজিক্স অনার্স নিয়ে পাশ করবার পর, রুমা সরকারের বিয়ে ঠিক হয়েছিল রোহিত দত্তর সাথে। রুমার বাবা চেয়েছিলেন বনেদি পরিবার, ও রোহিতের বাবা চেয়েছিলেন সুন্দরি ও সুশিক্ষিতা মেয়ে, যে একাধারে পার্টিতে রোহিতের সুসঙ্গীনি হবে, আবার সন্তানদের সুশিক্ষা প্রদান করতে পারবে। ১৯৮৪ সালের বঙ্গদেশের রিতি অনুযায়ী, গুরুজনেদের চাহিদা মিটিয়ে, রুমা-রোহিত দম্পতি হয়েছিল। বিয়ের দশদিন পর থেকে, আসানসোলের সুগম পার্ক হাউসিং ছাড়াও, শহরের আরো অনেক কোনে, বন্ধুমহলে, রোহিত তার সদ্যবিবাহিতা স্ত্রীকে, খানিকটা সদ্য লাভ করা ট্রফির মতোই দেখিয়ে আনন্দ পেয়েছে। প্রায় প্রতিবার সেই বন্ধুগৃহ ভ্রমণের পরিসমাপ্তি হতো, মদ্যপানসহ নৈশভোজ দিয়ে। কিছু ক্ষেত্রে, ভোজান্তে আরো কিছু আধিক্যেতাও থাকতো। সব মিলিয়ে, রুমা সরকার হাঁপিয়ে উঠছিল তার দত্ত পদবীলাভের নিহিতার্থে! এত হৈ-চৈ তার স্বভাব বা ধাত্ বিরুদ্ধ। তখন মাঝে মধ্যেই কলেজের নিকট বন্ধু পলাশকে সে ফোন করে জানিয়েছিল, তার দম বন্ধ হয়ে আসছে, সে নিরিবিলি চায়। বনেদিয়ানার অজস্রতা, তাকে নাক অবধি ডুবিয়ে রেখেছে। পলাশ জানতে চেয়েছে বারবার যে রোহিত তাকে উপেক্ষা করে কিনা, উত্তরে সে বারবার জানিয়েছে ‘সম্পর্কে রসদের অভাব নেই, সামান্যতার অভাব – আমি সুমনদার মতন সামান্য মানুষ পেলে বেঁচে যাই’!
সুমন রায়, আসানসোলের পাঁচগা অঞ্চল নিবাসি, ফিজিক্স অনার্সের ফাইনাল ইয়ারে পাঠরত ছাত্র ছিল, যে বছর রুমাদের ব্যাচ ফার্স্ট ইয়ারে প্রবেশ করল। জনসংযোগ, ফিজিক্স ও ছড়া-লেখায় একরকম অদ্বীতিয়। সেকেন্ড ও ফার্স্ট ইয়ার অনার্সের বহু ছাত্র-ছাত্রীই, বিশেষ করে পরীক্ষার সময়, সুমন রায়ের ‘গাইডেন্স’ প্রধান অবলম্বন করে, উতরে যেতো। রুমা সরকার, ঠিক তেমন ভাবেই তার সংস্পর্শে এসেছিল। পরবর্তী সময়ে, পরিচিতি, সান্নিধ্য ও ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। তারা, তাদের পারস্পরিক অনুরক্তি, বাড়িতে প্রকাশ করলেও, রুমা সরকারের বাবা, বিশেষভাবে আপত্তি প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর মতে, সুমন আদর্শ ছাত্র হলেও আদর্শ স্বামী হবার কোন উপসর্গ, তার মধ্যে তিনি লক্ষ্য করেননি। এরপর, রুমার জন্য উপযুক্ত পাত্র খোঁজবার তোড়জোড় বৃদ্ধি পেয়েছিল। রুমার বিয়ে, খানিকটা অদৃষ্টের ফের বলেই হজম করেছিল সুমন রায়।
* * *
রোহিত দত্তের পিতৃবিয়োগ হয় ১৯৮৬ সালের নভেম্বর মাসে। ১৯৮৭ সালের জুন মাসে, তার মা, সঙ্গে দুই পরিচারিকা ও একজন ড্রাইভার নিয়ে, তাদের রূপনারায়ণপুরের হলিডে হোমে চলে যান। যাওয়ার আগে বিশেষ করে যে দুটো কথা রুমাকে কাছে ডেকে বলে গিয়েছিলেন –
“এক, দোল আর দূর্গাপুজোয়, আমাকে আনতে লোক পাঠিও, আমি পাঁচদিন থেকে যাবো, তোমরা কিন্তু প্রতিবছর সংক্রান্তিতে ওখানে আসবে”।
“দুই, বাড়িটাকে ক্লাব হতে দিওনা, রোহিতের কোন খুড়তুতো/পিস্তূতো বোন বা তার পরিবার এলেও, যেন একতলার ডাইনিংরুমের লাগোয়া গেস্টরুমেই থাকে, উপরতলায় আসবার কোন দরকার নেই”।
এটা ঠিক যে, পরবর্তী উপদেশটা বড্ড ভাবিয়েছিল রুমাকে। ভাবনার যে কারণ ছিল, উত্তরকালীন কিছু ঘটনা তার সাক্ষী।
শ্বাশুড়ি ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যাওয়ার সময়, রুমা তার কাছে গিয়ে বলেছিল – “তোমার উপদেশ, যতদিন এই বাড়িতে আছি, মনে রাখবো”।
* * *
গত বছর দেড়েক বাড়িতে একা কাটানো সময়টা, অনেকটাই ব্যয় হয়েছে তার ক্লাসমেট, পলাশ গুহর মাধ্যমে সুমনের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টায়।
সুমন, রুমার বিয়ের পরের বজর থেকে, কালিয়াপাহাড়ে একটি আবাসনে থাকতে শুরু করে – হাওড়ামুখো লাইনে, আসানসোলের পরের স্টেশন। পলাশকে সুমন জানিয়েছে যে যদিও সে রুমাকে পায়নি বলে সে বিয়ে করেনি, কিন্তু রুমা এখন পরস্ত্রী, তাই সে ফোন করবেনা। তার বাড়িতে যাওয়াটাও অনুচিত হবে। তবে, রুমা তাকে চিঠি লিখতে পারে। আইনজীবির স্ত্রী বলেই হোক, বা লেখায় অনিচ্ছার কারণেই হোক, রুমা একটাও চিঠি লেখেনি গত একবছরে। পলাশকে বলেছে, বলে দিস ওইসব চিরকুট বা মেঘদূত থিওরি অবলম্বন করার বয়স চলে গেছে। যোগাযোগ, তাই পরোক্ষ ও নিয়মিত, পলাশ গুহ’র মাধ্যমে।
* * *
আজ সকালে, রোহিত দত্ত কাছাড়িমুখো হবার পর থেকেই, কেমন একটা অস্থিরতা চেপে বসেছে রুমার ভিতরে-ভিতরে। সচেতনভাবে সেটা এড়িয়ে চলছিল, মাঝখান থেকে বাসন্তী বাড়িতে ঢুকেই বলল, ‘ দিদি, তোমার কী কারো জন্যে মন খারাপ, তোমার চোখে-মুখে কেমন মলিন ভাব…..ঘুরে এসো না কোথাও ওই গাড়িটা নিয়ে….তোমাদের ড্রাইভার তো বসেই থাকে!’
রুমা না শোনার ভান করে, ছাতে চলে গেলো । আকাশের সেই গাঢ় ছাই রঙের মোড়া মেঘের কম্বলটা কে যেন মাঝখানে- মাঝখানে ছিঁড়ে দিয়েছে। কোথা থেকে অনেক উপরে পরিস্কার একটা নীল আকাশ বেড়িয়ে পড়েছে। পশ্চীমের আকাশটাতে কেমন কয়েক টুকরো সাদা মেঘ! বিশ্বকর্মা পুজো তো অনেক দেরী!? এই তো ক’দিন আগে টিভিতে বাইশে-শ্রাবণের অনুষ্ঠান হল! আজ এইরকম মন-ছুটি-চাওয়া আকাশ কেন? ঘরে গিয়ে বাসন্তীকে জিগেস করল, ‘তুই কালিয়াপাহাড়ি’র ওদিকটায় গিয়েছিস কখনো?’
“কি বলছ বৌদি, এর আগে চার বছর ওখানে ছিলাম তো, ওই দরজিপাড়ার পাশে যে শহীদস্মৃতি কলোনি, ওইখানে তো আমি একটা নার্সিং হোমে কাজ করতাম – ছুটি পেতাম না, তাই ছেড়ে তোমাদের এদিকে দুটো বাড়ি ধরেছি”।
‘ওখানে নয়াপাড়ায় আমার এক মাসতুতো দাদা এসে উঠেছে, জায়গাটা চিনিস?’
‘কেন চিনব না, একদম রেল-লাইনের কাছে, উত্তর দিকে, স্টেশন থেকে বেড়িয়েই হেম-কলোনির দুগ্গাপুজো, তারপর ছোট মাঠ তার পরেই, সুন্দর পাড়াটা, পরিস্কার রাস্তা, ছোট ছোট বাড়ি, একটা বড় মাঠ।ঘিরে সব বাড়ি, তারপর একটা বড় পুকুর – ঘুরে এসো না গাড়ি নিয়ে’।
রুমা ভিতরের ঘর থেকে বেশ-বদল করে হাতে ব্যাগ নিয়ে এসে বলল, ‘তুই দুপুরে খেয়ে দাদাভাইয়ের খাবারটা ঢেকে রেখে চলে যাস, আমি এই কাপড় গুলো ধোপার দোকানে দিয়ে একটু বেড়িয়ে ফিরব’, বশলে নীচে নেমে গাড়িতে উঠে ড্রাইভার কে বলল ‘ওই চটকল বাজারে ধোপার দোকানে চলো, তুমি বরং বাজারের সামনে গাড়ি রেখো, ভিতরে গেলে সময় বেশী লাগে গাড়িতে’।
বাজারে নেমে, ভিতর দিয়ে খানিক পথ গিয়ে, দূর্গামন্দির পাড় হয়ে, পিছনের রাস্তা দিয়ে সোজা উঠে পড়ল রেললাইনে। এই শ্রাবণ মাসে, অনেক মানুষ এই রেললাইন ধরে হেঁটে কালিয়াপাহাড়ের স্টেশন সংলগ্ন ১২ নং ব্লকের শিবমন্দিরে যায়। রুমা দত্ত, তাদের অনুসরণ করে হাঁটতে শুরু করল। ছোটবয়সের কথা মনে হল – অনেকবার রেল-সফরের সময় জানলায় থুতনি রেখে ভেবেছে ওই লাইনের স্লীপার-এর উপর দিয়ে ছুট দেবে – আজ যেন ইচ্ছাপূরণ হল। ঘড়িতে দুপুর দেড়টা। কাল টাইম-টেবলে দেখেছে, রেলপথে কালিয়াশহর সাড়ে-সাত কিলোমিটার, আসানসোল জংশন থেকে – দূর্গামন্দির আরো এক দেড় কিলোমিটার পুবদিকে। তাই, ছয় কিলোমিটার মতন হাঁটতে হবে – স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এ কোন দূরত্বই নয় – চার বছর পর, প্রতি পদক্ষেপে নিশ্বাস নিয়ে হালকা হচ্ছে। উৎসাহ অসীম, রোমাঞ্চ সামনে, একমনে হেঁটে চলেছে রুমা দত্ত।
সাড়ে চারটের সময় ৬৭ নং বাড়ির সামনে এসে বেল বাজালো, দরজা খুলো সুমন। খানিক চমকে উঠে বললো, তোমার কি জ্বর হয়েছে রুমা?
না, ভিতরে ঢুকে কথা বলি? বললো রুমা।
* * *
কি আশ্চর্য – রুমা দত্ত যে দুঃসাহসিক এক্সপ্লোরার, সেটাতো জানা ছিলনা! এখন বাড়ি ফিরবে কি করে? বললো সুমন। রাস্তায় কেউ কিচ্ছু জিগেস করল না?
রুমা বলল, “চিঠি লিখে রেখে এসেছি, কলকাতা যাচ্ছি কয়েকদিনের জন্য, সন্ধ্যাবেলা ফোন করে বলব কলকাতা পৌঁছেছি….আর ‘দত্ত’ নয়……এটাই আমার বাড়ি হবে….হ্যাঁঅনেকে জিগেস করেছে, বললাম মহাদেবের মন্দিরে যাচ্ছি!”
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!