বইমাত্রিকে রাহুল গাঙ্গুলি

দীপঙ্কর দত্ত’র কবিতা
(পাওয়ার পোয়েট্রি ~ ১টি নতুন জঁর)

বই : ব্রেইলবর্ণ বিষহরি
কবি : দীপঙ্কর দত্ত
প্রকাশনা : শহর, ২০১৭

কখনোকখনো কবিতা এমন এক চূড়ান্ত স্তরে ভাবনাকে নিয়ে যায়; যা অতি-অনুরণনের ফলস্বরূপ ভাবনার নিজস্ব গতিবেগকে নির্দিধায় নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতাযুক্ত হয়ে ওঠে।হয়তো আমরা কখনোসখনো বলে উঠি ~ আহা কি রোমান্টিকতা।আবার কখনোকখনো আমাদের অভ্যস্ত চেতনা-জগৎ আশা করে না, তীব্র শকধর্মী আঘাত।আসলে রোমান্টিকতা বিষয়টি এতোটাই বিস্তৃত যে, ভালোলাগা দিয়ে একে সীমাবদ্ধ করে রাখা যায় না।য্যামোন : বিস্ময় / ভয় / ঘৃণা / অসহায়তা / রেগে যাওয়া / ইত্যাদি।মোটকথা হরমোনাল ক্ষরণ হলেই রোমান্টিকতা, নিজস্ব স্বাদ পাল্টে স্বতন্ত্র ব্যাকরণ।এ এক অতি-অদ্ভুত চেতনা-জগৎ; যেখানে ঢোকা সহজ কিন্তু বেরনো অতোটা সরলরৈখিক নয়।অর্থাৎ, আমরা চাই বা না-চাই; পরিত্রাণ পাবার কোনো উপায় আমাদের জানা নেই।চিকিৎসাবিজ্ঞান যাকে বলে ~ নিউরোলজিক্যাল ট্রমা।হ্যাঁ দীপঙ্কর দত্তর কবিতাগুলিতে শব্দপ্রয়োগ এতোটাই শক্তিশালী।প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাহলে ধারপ্রবণ ছুরি নিয়ে নাড়াঘাঁটা করতে গিয়ে হাত কেটে রক্তারক্তি ঘটিয়ে লাভ? উত্তরে এটাই বলা যায় ~ চারপাশের সাপেক্ষে ঘটা দৈনন্দিন গোপন ও নিষ্ঠুর লড়াইয়ের ফলে, নিজেকে কতোটা দেখি আয়নায়? আর দেখে থাকা সেই পচাগলা অশরীরকে দেখে যদি শক্প্রাপ্ত হয়ে ভয়ে শিউরে ওঠি; দায়ভার কে নেবে?হ্যাঁ, দীপঙ্কর দত্তর কবিতা পড়তে গেলে সেই নিউরো-শক্ আগে আমাদের গ্রহণ করতে হবে; তারপর না হয় বিচারের পর্ব ~ সেই টক্সিন-এফেক্ট কতোটা টক্সিসিটি বাড়ালো না আদৌ কিছুটা ব্যথার উপশম ঘটিয়ে টক্সিসিটি কমালো।না, শব্দ ও শব্দার্থের এই ব্যবহারিক প্রয়োগ ~ একে হাংরি’র তুলনীয় যাপনকথার এক্সট্রিম্ বা চূড়ান্ত বিক্ষোভ বলতে পারি না; একে পোস্ট-হাংরি যৌনতাড়না বা অবদমিতো যৌন-ক্ষুৎকার সূচিতো যৌনলিপ্সার হাইড-আউট্ বলতে পারি না; না একে মস্তিষ্কের প্রতিটা কোষের আচ্ছন্নতা আক্রান্ত জাদু-বাস্তবতা বা স্যুরিয়াল্ ট্রান্সফর্মেশন্ হিসেবে বলতে পারি।বরং এইরকমটাই হলো পাওয়ার-পোয়েট্রি জঁর; চারপাশের কঠোর বাস্তবে শব্দপ্রয়োগ হলো হাতিয়ার বা ভাবনাগুলো একেকটা ধারালো অস্ত্র ~ এমনটাই ভাবা সহজ।প্রসঙ্গতো আরো দুটি বিষয় ভূমিকা’র শেষ পর্বে তুলে ধরতে চাই।প্রথমতো : বইটি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন দিল্লী নিবাসী আমার অগ্রজ কবি শ্রী পীযূষকান্তি বিশ্বাস; যিনি দীপঙ্কর দত্ত’র ঘনিষ্ঠ ছিলেন তো বটেই, এমনকি দীপঙ্কর দত্ত সম্পাদিতো অনলাইন পত্রিকা “শূন্যকাল”এর প্রযুক্তিগতো বিষয়টি দেখতেন।এমনকি কবির মৃত্যুর পর, তিনটি সংখ্যার সম্পাদনাও করেছিলেন।বলেছিলেন, বইটা নিয়ে লিখতে।এর আগে, খুব ছোট্ট করে “দীপঙ্কর দত্তের শ্রেষ্ঠ কবিতা” নিয়ে লিখেছিলাম অনলাইন ‘শূন্যতাপাঙ্ক’ পত্রিকায় (গুগুলে কেউ শূন্যতাপাঙ্ক সার্চ করলে, তার বই আলোচনায় সেই লেখাটি পেতে পারেন)।কিন্তু, কবির মৃত্যুর পর তাঁর এই সর্বশেষ বইটি বারংবার পাঠের পরও, নিজেকে অসহায় মনে হয়েছে কিছু লিখতে গিয়ে।আজও সন্দিহান, কারণ এই ধরনের বই নিয়ে নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও আত্তীকরণটুকু দেওয়া ছাড়া, আর কিছু দেবার নেই : সেটুকুও করতে হচ্ছে, নিজের স্বেচ্ছা নিয়ন্ত্রণটিকে ক্ষয় করে।দ্বিতীয়ত যেটি বলার, শহর প্রকাশনা এবং পত্রিকার কর্ণধার, শ্রী অজিত রায় ~ যিনি নিজে একজন তুমুল গদ্যকার এবং পাওয়ার রাইটিং জঁরের অন্যতমো কান্ডারীদের বিশেষ একজন; কখনোই অন্য কোনো কবির বই শহর থেকে প্রকাশ করেন নি।ব্যক্তিগতো স্তরে কথাবার্তায় যতোই তিনি নানাভাবে বিষয়টি এড়িয়ে গ্যাছেন, ততোই মনে হয়েছে সাইকোডলিক্ ও থিয়েট্রিকাল্ রক ব্যান্ডের জনক ‘পিঙ্ক ফ্লয়েডের’ প্রতিটা অ্যালবামের কভার ডিজাইনার ‘স্টর্ম থরজারসন’এর একটি ইন্টার্ভিউতে বলেছিলেন; পিঙ্ক ফ্লয়েডের পর, আর কোনো ব্যান্ডের কভার ডিজাইন তিনি করেন নি, কারণ সৃজনশীল সেই চেতনা-জগতের অভাববোধ।
বইটির প্রচ্ছদটি যেখানে বাদামী সাপের খোলোশের গায়ে বাদামী কাঠের ছাল তুলে ফেলে একটি মুখোশের অবয়ব ~ একথা ভাবতেই হয়, শিরোনাম “ব্রেইলবর্ণ বিষহরি” একথাই বলতে অভ্যস্ত বর্ণদৃশ্যকে ছেড়ে (যা একেকটি ভাব ও অভিজ্ঞতার বিশেষ প্রতীক), সেই বর্ণহীন ব্রেইলকে অনুসরণ করতে হবে (ব্রেইলবর্ণ : যার সাহায্যে দৃষ্টিহীন কেউ লেখাপড়া করেন) এবং তা করার ফলে, আমাদের সেই নিউরোটক্সিন ভাবনার স্তরে যাওয়া একপ্রকার নিশ্চিত।শব্দ / শব্দার্থ / দিল্লীজ্ বাংলা-ডায়াস্পোরা সমন্বিতো এই নতুন ভাষায় মোট তিরিশটি কবিতা রয়েছে।তবে কোনোটাই আকারে দীর্ঘ নয়।সবকটি কবিতা নিয়েই যদিও বক্তব্য রাখা যায়, তবুও রাখছি না ~ পাঠকের ভাবনাস্তরের স্ব-অনুশীলন পর্বটিকে মাথায় রেখে।যদিও কয়েকটি জায়গার উল্লেখ করতেই হয়।য্যামোন ধরা যাক প্রথম কবিতা “ইচ্ছামতী” ~
[যথেষ্ট বর্গী বাৎসন্যায়ের পরও আলিয়ার ঠিক মোচন হয়না ফলে এমন চেঁচায় যে / স্টীমার-এর যে কেবিনেই ছালায় শুয়ে পরছি আইদার দরজায় নক পরে নয় / জানলার নীচ দিয়ে খেউড় পাড়তে পাড়তে একটা বোঝাই বজরা যায় / কত্তা ইট্টু আইস্তে গো কুমীরগুলান ঘুমাইছে!] / [ঢেউয়েরা কাজলা সোফোক্লিশে / আন্তি গোনে চিলানীর ছোঁ ছায়ার বিয়োগান্ত ডবল ডিপ দফনানা / গুঁড়ো ইলশে বৃষ্টির পর রোদ চকমকি ঝিকিয়ে উঠছেে নুড়ির সোঁদাল নুর-এ-দোজখ / আর দূরে দূরে মানুষের জিরজিরে বোর্ন ভিটামাটি / লাউডগার হিসিং সারাউন্ড সাউন্ড রুটির কুটির শিল্প আর / গাছে গাছে আমের হাইনরিশ বোল হরি হামিং হোমিং মলিকা-এ-তরন্নুম পাখি —] / [খাতুনের লাশটা আট ইঞ্চি ব্যাসের পোর্টহোল গলিয়ে জলে ফেলে দেওয়ার / চেষ্টা করে দেখলাম সব বৃথা / কুপিয়ে কাটার কুড়োল জাতীয় কোনো অওজারও নেই / গলায় নাইলন ফাঁসের লিনিয়ার একচাইমোসিস / ল্যারিনজিয়াল রাপচারের পর দড়ি দড়ি গ্যাঁজলা আলকাতরা / আমি ডেক স্টেওয়ার্ডদের বোঝাতে পারবো না / এটা ওরকমই আকছার একটা ইসাডোরা ডানকান সিন্ড্রোম —] / [উজান এলো উত্তল কবোত্তল এনেছ হুলু হুলু অনর্গল স্বন ইচ্ছামতী / মোচোখোলাদের লায়লা টিমটিম করছে / হাট্টিমার ফোঁপরা ইষল্লাল লেবিয়ার চেরি কুঁড়ির গার্নিশে / আমি কি ঝাঁপ দেবো, সাঁতরে উঠবো যোগিনীঘাট? / প্রবল হাওয়ায় বিষের মতো টলটল করছে ছাঁদনাতলা / মৃন্ময়ী কি পিঁড়েয় ঘুমিয়ে পড়েছে? / মুন্সিগঞ্জ পুলিস শুঁকতে শুঁকতে ঘিরে ফেলছে গোটা তল্লাট —]
“হ্রেসা” কবিতার শেষটুকু দ্যাখা যাক এবার ~ [ফ্লোরিডা, হ্যালান্ডেল বীচ / সময়টা উনিশশো তিরাশি / স্যার ভিভ তখন যেখানে সেখানে স্ট্রোক খেলছেন / নীনার বেবী বাম্প দৃশ্যমান / চার্চিল ডাউন্স ব্রীডার্স কাপ জুভেনাইল জিতে / টাটকা টকটকে একটা সূর্য উঠে আসছে / আর সেই আলোয় অহল্যাকে মেটিং করাচ্ছে ট্রেনার রুস্তম / ফাক্ বডি গ্যালান্ট ফক্স / আর আজ যখন তাদের অষ্টম প্রজন্ম ট্যারেন্টুলা / হোক্কাইডোর ক্রোশ কে ক্রোশ আভাতি বালুকাবেলা গ্যালপ গ্যালপ / ঝড়েরা কেতাবী স্রেফ ওঠে, কিন্তুটা পাতাটি নড়ে না / জলথলের ফাটলগলে করাল জলেরা জল ছেড়ে দেবী সিক্তা বিকাটনয়না / ঘোড়া যেখানে থামে সেটাই মিয়াগী, এপিসেন্টার – / ট্র্যাক, গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড প্লাবনে জ্যাকপট ভাসিয়ে নিয়ে যাও / আঁতুরেদের বিচালির কানপট্টি থলিতে মেশাবো হাক্কা য়ুরেনিয়াম রডস্ নুডলস্ – ]

বইটি থেকে আরেকটি প্রিয় কবিতা “সওদাগর” ~
[বীজের উচ্ছ্বাস আসার ঠিক আগের মুহূর্তে বের করে আনি / প্রবিষ্ট হয় আরেকটি উদ্ধত / সাবিত্রী দেবী বোঝেন অন্ধকারে খঞ্জর পাল্টালো, ইনি কোটালের ছা / আর আমি শানপট্টি সইয়ে সইয়ে সটকে তফাত গেছি / তবু বু্ঁদ চোখ মুদে থাকেন –/ দন্ডমুন্ডে চক্রাকার দদ্রু অরুণিমা, কাবিলা ছেড়ে উড্ডীন / রৌদ্র-মওতাজ সিরাজির পঙ্খ ছিঁড়ে পড়ে / রাজার কুমার উঠে এলে চিতল খানকির রওশন দিল / মন্ত্রীপুত্র নামে অথৈ দলদলে —-]
ওপরের আড়াইখানি কবিতা পড়লেই বোঝা যাচ্ছে, চেতনার অঔকাৎ এবং আচ্ছন্নতার শিরশিরানি।যা মুহূর্তের ভিতর প্রাতিষ্ঠানিক ট্যাবুকে নাস্তানাবুদ করে ফ্যালে অনায়াসে।কারণ, বেপরোয়া ধ্বক্ ছাড়া এই ভাষার সামনে দাঁড়ানোর কার কতোবড়ো তাবড়িয়ানা’র ক্ষমতা।আসলে, শুধু সমকালীন নয় বরং ভবিষ্যৎ সময় ও যাপন-চারপাশ সংলগ্ন বলয়ের বন্ধ্যাত্ব; দৈনন্দিন কামারশালায় ব্যর্থ হাতিয়ার আবিষ্কার করার চেষ্টা; যুদ্ধের আগে প্রতিটা রাতের দায়িত্ব নিয়ে নিদ্রাহীন ~ গোটাটাকেই ফুঁ করতে পারে, কেবলমাত্র কিছুটা বুনোটহীন বারুদ।অতএব স্রেফ ঘুরে দাঁড়ানোর এই ভাষা-বিন্যাসের কাছে অবাক বিস্ময় : হারমোনিয়ামের মেলোডি থেকে ছিটকে গিয়ে প্যান্ডামোনিয়ামের আওয়াজে পরিণত করার দায়িত্ব নিয়ে দীপঙ্কর দত্ত’র এই বই।য্যানো মস্তিষ্কজাত চেতনা একটা অভেদ্য মেটালিক্ পর্দা / তার; যে বাইরের আঘাতে ঝঙ্কার তোলে, অনুরণন দ্বারা তরঙ্গ ছড়িয়ে দ্যায়।বইটি নিয়ে য্যামোন যতোবার পেরেছি : ব্যক্তিগত সূত্রে, যাকে পেরেছি পড়িয়েছি; আবার এরকমও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছি ~ যখোন একজনকে বইটি দেখতে বলেছি, চেনা আরেকজন এসে সোজাসুজি তাঁকে বলেছেন “দীপঙ্কর দত্তর কবিতা, বাপরে এতো পড়তেও সাহস লাগবে, বুঝতে চাওয়া তো দূরের কথা”।
সর্বশেষে এটুকুই বলার যে, চারদিকে এতো লাইভ্ এতো কিছু ~ আমরা সকলেই ব্যস্ত হয়ে থাকি; তবু এরই মাঝে মনে হয় খানিকক্ষণের জন্য হলেও কবি ও চিন্তাবিদ দীপঙ্কর দত্ত এবং তাঁর পাওয়ার পোয়েট্রিকে আবিষ্কার বা এক্সপ্লোর করা প্রয়োজন।না হলে, দেরী হবার দূরত্ব-দৈর্ঘ্য অন্যান্য অনেক কিছুর মতোনই বেড়ে উঠবে।আর যাঁরা শব্দ-ব্রহ্ম নিয়ে নিয়ম করে দৈনন্দিন চর্চায়; তাঁদের তো সুকুমার রায়’ থেকে দীপঙ্কর ~ সম্পূর্ণ ইতিহাসটিকে জেনে নেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ।বইটির বিক্রয়মূল্য মাত্র ৫০টাকা ভারতীয় টাকায়

আলোচনা : রাহুল গাঙ্গুলী

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।