বইমাত্রিক রাহুল গাঙ্গুলি

তরী (লিটিল ম্যাগাজিন, বাংলাদেশ : ৪র্থ বর্ষ, ৫ম সংখ্যা)
বহতা স্রোতের ১ ধারাবাহিক কবিতাক্ষর

সময়টা ২০১৯, অক্টোবর।বন্ধু ফারুক সুমন, সার্ক সম্মেলন শেষ করে পা রেখেছিলো কলকাতায়।সে তার কিছু বন্ধুদের সাথে যেখানে উঠেছিলো, সেখানেই আমি পরিচিতো হই যাদের সাথে, তাদেরই ১জন সম্পাদক আশিক-বিন-রহিম।আর, সেখানেই তার হাত থেকে প্রাপ্তি : এই পত্রিকাটির।মনকাড়া প্রচ্ছদ (রাজীব দত্ত), প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে।সুন্দর ক্যালিগ্রাফিতে করা, মুখের সাথে ৩য় চোখ জানাতে চাই, আত্ম-অগোচরে থাকা কবিতাগুলিতে অনুভব এবং বোধের অভিজ্ঞান।আর, সেকথা আরো সরাসরি স্পষ্ট হয়, সম্পাদকীয়টি পড়লে।যেখানে, বন্ধু আশিক শুরুতেই লিখেছেন “শিল্পের নির্যাস ঢেলে শব্দ সাধনায় যারা মগ্ন, বাস্তবতার রূঢ় পথ আর কল্পনার সমুদ্র সেঁচে কবিতা নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা বয়ে যারা অবিরাম গেয়ে চলছে সত্য ও সুন্দরের জয়গান; ‘তরী’, স্বপ্ন দেখে তাদের সারথি হবার।” বর্তমান সংখ্যাটি সমকালীন ২৫ কবির গুচ্ছ কবিতার জারকে জারিত।যদিও, এই কবিদের মোট সংখ্যাটিতে কয়েকজন, খুবই পরিচিতো।কিন্তু সে সংখ্যাটিও বিরাট কিছু নয়।অতএব, ওয়াবেদ আকাশ / পাবলো শাহি / কচি রেজা / পীযূষ কান্তি বড়ুয়া / হাসান রোবায়েত / গিরীশ গৈরিক, বাদ দিয়ে বাকিদের কবিতা অপরিচিতোই বটে।আর, না পড়ার দায় নিজের ওপর নিয়েই, তাঁদের কয়েকটি কবিতা নিয়েই সংখ্যাটির আলোচনা করছি।প্রতি কবির, কবিতাগুচ্ছের সাথে তাঁদের ছোট্ট করে জীবনপঞ্জী, নিশ্চিতভাবে পাঠকের কাছে অতিরিক্ত পাওনা।
প্রথমেই ক্রমানুসারে যে নামটি আসে : মুজিব ইরম।যদিও, আবহমান ধারাকে প্রাক্তনের চলমানতা হিসেবে দেখতে রাজি নই ~ তবুও তাকে পাশে রেখেও দেখি কবি লিখছেন “শিমুল।মাসের কথা বলে।রক্তে ভেজা মাস।শিমুল।ভাষার কথা বলে।দুঃখী করুণ মাস।সে তো পথের ধারে ফোটে।শহীদ মিনার বেদির পাশে রাঙ্গা প্রভাত আনে।”

পরের যে নামটির সাথে, পরিচিতো হই : জুনান নাশিত (কুমিল্লা)।রচিতো ৪টি কবিতার ভিতর, সাংঘাতিকরকম চমৎকৃত হই ‘লক্ষণরেখা’ কবিতাটি পড়ে : “ছায়ার গভীরে ছায়াদের নাম নেই / মননের ধারা নেই বোধের চিবুকে / শরতের কাশভোরে শীতের সন্ন্যাস / বুক জুড়ে জিঘাংসার বিষ।”
শিবলী মোকতাদির (বগুড়া) রচিতো, ‘সীমান্ত এক্সপ্রেস’ বা ‘কাপঝাঁপ’ কবিতায়, “জানো তো নিশ্চয়, সংষ্কৃতির দর্শন থেকে এসেছে দেখা। তো – সে দেখছে আমাদের, আমরা দেখছি তাকে।এই দেখা প্রতিটি বিন্দু-বিসর্গ ভেদ করে; যোগীর যাতনাকে যোগ করে।” লাইনগুলি একাধিকবার পড়তেই হয়।যেরকম, ভাবার মতো পিয়াস মজিদ রচিতো ‘হেমন্তগুচ্ছ’ কবিতা সিরিজ : “হেমন্ত মূলত এক / সিরিয়াল কিলার / গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরৎ শেষে / এবার হনন হবো আমি।” বা শামীম হোসেন সৃষ্ট ‘একচোখা’ কবিতাটিতে : “মুড়ির টিনে জমিয়ে ছিলাম ধান / মাটির ব্যাংকে এগারোটি চোখ।” এবং ‘লুইপার চোখ পেলে’ কবিতা থেকে “আমার আঙুল কেটে তোমাকে দেবো / লুইপার চোখ জোড়া আমাকে দাও।”
শাহ বুলবুল (চাঁদপুর), ‘শোচনীয় ব্যর্থতার রিপোর্ট’ বা জাহিদ সোহাগ (মাদারিপুর) যখোন শিরোনামহীন কবিতাগুচ্ছ লেখেন : আলাদাভাবে পাঠ আবশ্যক হয়ে পড়ে।এক্ষেত্রে অবশ্য জুননু রাইন রচিতো ‘এয়া’ সিরিজটিরও নাম করতেই হয়।পরবর্তী অংশে রয়েছে অদিতি শিমুল রচিতো ৪টি টেক্সট কবিতা : ‘আমার প্রভু’ / ‘নীল রাজহাঁস’ / ‘আমাদের দোষলাগা বাড়ি এবং পোর্সেলিনের চাঁদ’ / ‘ক্লোরোফিল এবং আমার বাবা’, অবশ্যই পাঠকোত্তরনের গুরুত্বপূর্ণ স্তর।চাণক্য বাড়ৈ যখোন প্রকাশ করেন কবিতা ‘দীপ্র অক্ষরেরা’ : “কিছু আনকোরা, নতুন উচ্চারণ পাঠ করে যেতে যেতে ভাবি – এই তীব্র আর দীপ্র অক্ষরেরা তবে কবিতার নিমন্ত্রণে এসেছিল বুঝি!”, পাঠকের নতুন অভ্যাসের প্রবণতামুখী তো বটেই।এমনই যেনো ইকবাল পারভেজ (সিলেট) রচিতো ‘মৃত সংসার’ কবিতাটি : “জন্ম উপহারে বাবা হাসে / মৃত্যু উপহারে ঈশ্বর / ঈশ্বরের মৃত সংসার” অথবা রোমেনা আফরোজ (চট্টগ্রাম) রচিতো ‘নিষ্কৃতি’ সিরিজ : “ভ্যানগাড়ি চলতে শুরু করলে বাম হাত খামচে ধরে কাঁধ, বুক, পিঠ… / পোকা উড়ছে।লাল পতাকা।আমাকেও উড়িয়ে দাও। / শতখন্ড করে বিলিয়ে দাও শকুনদের ভোজসভায় / এই নারীজন্মের চেয়ে পাখিজন্ম ভাল।”

পাঠ সমান্তরালে পাতা ওল্টালে, পরবর্তী পর্যায়ে মাহি ফ্লোরা (নবাবগঞ্জ) রচিতো সিরিজটি (শিরোনাম নেই) অবশ্যই থমকিয়ে রাখবে বেশ কিছুটা সময় : “সে কেন ওভাবে হাঁটে পিচ্ছল দিঘীটার ঘাট।নড়ে যায় চড়ে যায় দুপাখার ঢেউ।ঢেউ যদি উঠে আসে ময়ূরের ঘুম ভাঙা রাতে।ময়ূরটা অবুঝ আর নীল রং পাখি।পাখিরা কাতরায়।একদিন সন্ধের আগে আগে ঝড় ওঠে মুখ কালো করে থাকা এ পাড়ার বেদেনীর মত।” এছাড়াও, সৌম্য সালেক (চাঁদপুর) রচিতো ‘কিছু ঘর বালিয়াড়ি’ : “বালুকার প্রেমে পড়ে গিয়ে / বালিয়াড়ি ঘর তোলে কেউ / ভীষণের বুকে ঝড় তোলে।” বা পলিয়ার ওয়াহিদ (যশোহর) রচিতো ‘খেজুর রসের শিল্পী’ কবিতায় “শীতের কুয়াশা মাখা ভোর / আব্বা খেজুর গাছের কান্না নামান / আর তিনি তার হারানো পিতার কথা ভাবেন।” বা মুহাম্মদ ফরিদ হাসান (চাঁদপুর) রচিতো ‘চুলের ভাঁজে মেঘ রেখে’ কবিতায় “ঠোঁটে তোমার পিপাসার সমুদ্র দেখে / তৃষ্ণার্ত আমি ঘুমঘুম, বিহ্বল ভীষণ / চুমুর প্রহরে;” প্রতিটি স্পর্শই আত্ম-নৈকট্যের।
রফিকুজ্জামান রণি (চাঁদপুর) সৃষ্ট ‘ময়নাদ্বীপের আধুনিক সংষ্করণ’ পদ্মানদীর প্রতিফলিত ভিন্ন ব্যপ্তি যেনো।বন্ধু ও সম্পাদক আশিক-বিন-রহিম, তাঁর কয়েকটি সুন্দর কবিতা রয়েছে প্রায় শেষপর্বে।’পদ্ম’ কবিতায় : “বিগত পুকুর ভরাট করে সেখানে সূর্যমুখীর চাষ করেছি। / সেদিন জলের টান ছিঁড়ে যে পদ্মফুল চুরিয়ে গেছে – স্বেচ্ছায় / আজ তার বছর পূর্ণ হলো।” আশ্চর্য কিছু লাইন।এছাড়াও, তাঁর ‘বাবার ছবি’ / ‘রাত কাব্য’ / ‘পরী’ / ‘দাওয়াই’ ~ প্রচেষ্টা সাধনায় প্রশংসনীয়।পত্রিকাটির, শেষ পর্বের কবি মাইনুল ইসলাম মাণিক (চাঁদপুর)।৬টি কবিতা নিয়ে তাঁর বর্তমান পর্বটি।’আধখাওয়া ফলের লোভে’ কবিতাটি : “মৃণ্ময়ী, এখন তোমাদের স্থানীয় সময় ভোর পাঁচটা।মধ্যরাতের পাতানো / রেসলিং শেষে পক্ষ-বিপক্ষ মিলে ঘুমাচ্ছো অঘোর।আমি এক অদৃশ্য / দর্শক” অতিআবশ্যিক্ চিন্তনস্তরে স্বয়ংক্রিয় তড়িৎ।
যদিও, এতোকিছুর ভিতরেও যে অভাবটির কারণে প্রত্যাশা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, তা হলো : কবিতার নয়া বিন্যাস বৈশিষ্ট্যের প্রতি অভিমুখটি সরাসরি ভয়ানক প্রত্যক্ষ।একথা বারবার বলেছি : প্রতিটি পত্রিকার উচিৎ এই বিষয়ে চূড়ান্ত চর্চার বা আরো পরিষ্কার করে বলতে চাওয়া বিষয় বৈচিত্র্যের প্রয়োগ নির্ভর গবেষণা।আর, এ বিষয়ে এগিয়ে আসার সাহস দেখাতে পারে একমাত্র তরুণতমো প্রজন্ম।তবে, সেসব না থাকলেও : চাঁদপুর থেকে প্রকাশিত এই পত্রিকা ভিন্ন কিছু কবিতার সম্মুখীন পাঠককে করাবেই।যে কারণে, পত্রিকাটি নিয়ে কয়েকটি কথা লিখতে গিয়ে সময় লাগলো : (৯ + ৩০ + ৩১ + ৩১ + ২৯ + ৩১ + ৩০ + ৩০ + ৫ = ২২৬ দিন)।অতএব, ভাজক / ভাজিত’র অনুমানফলটি, পাঠকের জন্য থাকলো
আলোচনা : রাহুল গাঙ্গুলী
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।