বইমাত্রিক রাহুল গাঙ্গুলি

ফারেনহাইট (২য় সংখ্যা।কবিতা বিষয়ক পত্রিকা, কলকাতা)

[কবিতা সম্পর্কিত রান্নাঘরের ১টি ম্যানুয়াল]

সময়টা বইমেলা ২০২০, শেষের দিক।নামটা সম্বন্ধিত বেশ কিছু পোস্ট, আগেই চোখে পড়েছিলো।তবে, শুধু নাম নয়।চাক্ষুষ হাতে নিয়ে দেখা গেলো : কভারপেজে পত্রিকার ১টি অদ্ভুত স্বীকারোক্তি “দেখিয়া বুঝিয়া দাম দিবেন”।অর্থমূল্যটিও আয়ত্তের ভিতর, আবার প্রিয় সজল দাসের কবিতাগুচ্ছের সাথে ২টি কবিতা বিষয়ক গদ্য : বিলম্ব করাটাই মূর্খামি।অতএব ___
সম্বিত বসুর করা নামাঙ্কন, যোগ্য সঙ্গত সন্তু দাসের করা প্রচ্ছদ, মহাযোগ্য সঙ্গত অগ্রজ সমীরণ ঘোষের করা বিভাগ নামাঙ্কন।যেনো সমস্ত উপকরণগুলি ও উপচারগতো প্রক্রিয়াগুলির মাধ্যমে, বিভিন্ন পর্যায় দশার যোগাযোগে সম্পাদক প্রস্তুত করতে চলেছেন ভাত।তবে এই ভাত, পেটের খাদ্য নয়, মস্তিষ্কের খাদ্য।প্রচ্ছদচিত্রটি নিয়ে অন্ততপক্ষে কিছু কথা না বললেই নয় : ফারেনহাইট স্কেলে থাকা তাপমাত্রার কম্পন, নীচে নেমে পরিবর্তিত হয়েছে গাঢ় অবয়বে।আরো নীচে সে বিভাজিত হয়েছে আরো ৩টি অবয়বের উপভাগে, তারা খানিকটা লঘু / খানিক গাঢ়।এই অংশটিকে নীচ থেকে ওপরের ভাগে, এরকম বিপরীত পর্যায়তেও প্রকাশ করা যেতে পারে।এখোন, তাপমাত্রার সাথে অবয়বের সম্পর্ক : কখনো ফলিত-বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত স্বীকার করে নি, তবে তা ভবিষ্যৎে করবে কী না আমাদের জানা নেই।এছাড়াও “ফারেনহাইট” ক্যালিগ্রাফিটি শুধুমাত্র তাপমাত্রা বিষয়ক নিশ্চয়তাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সে কিছু বিমূর্তের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী।গোটা পত্রিকাটি সর্বমোট ৫টি ভাগে বিভক্ত : ভিটেমাটি / রান্নাঘর / পাঠশালা / লাইব্রেরি / বারান্দা ~ কবিতার রান্নাঘরের উন্মুক্ত পরিবেশ+আবহ।

ভিটেমাটি বিভাগটিতে রয়েছে, প্রিয় সজল দাসের লেখা শিরোনামহীন ১২টি ছোটোছোটো কবিতাগুচ্ছ।স্যুরিয়াল বা ম্যাজিক রিয়েলিটির অনবদ্য মিথোষ্ক্রিয়ায় জারিত কবিতারা, সত্যিই আলাদারকম অনুভূতির প্রকাশ : “জলের দোষ নয়, বালিরও নয় / নৌকা এমনিই পড়ে আছে” বা “দরজা, যেভাবে আছড়ে পড়ে হাওয়ায় / সেটা হয়তো গাছের অভিমান”।এরকমভাবে প্রতিটা অংশেই, বোঝা বা না বোঝার মাঝখান থেকে উঠে আসে ভিন্ন অনুভাব।
রান্নাঘর বিভাগটিতে রয়েছে, হিন্দোল ভট্টাচার্যের লেখা গদ্য/প্রবন্ধ, শিরোনাম ‘কবিতা লিখিত হয়, লেখা যায় না’।সুন্দর ভাবনায় সজ্জিত লেখাটি কেবলমাত্র পাঠেই নয়, ভাবনাতেও সমসাময়িক প্রয়োজনীয় আলোচনার রসদ।যদিও, ব্যক্তিগত পর্যায়ে : কিছু বক্তব্যের সাথে ভীষণভাবে সহমত, আবার কিছু বক্তব্যের সাথে তীব্র বিরোধ।তবুও, ঠিক স্ববিরোধীতার ক্যাটাগরিতো , লেখাটিকে একদমই ফেলতে পারছি না, বরং সম্পূর্ণটি তুমুল আলোচনা সাপেক্ষ।যেমন “যুক্তি দিয়ে শিল্পের গোমুখ অনুসন্ধান প্রকৃতপক্ষে এক ইউরোপীয় আদি-আধূনিকতার কাজ” বা ” আকস্মিকতা বা অপ্রত্যাশিতকে, আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত হিসেবেই গ্রহণ করাতে আমাদের যথেষ্ট অসুবিধে” বা “ভাষা বা ব্যক্তিত্ব তৈরি করা কবির এক প্রাথমিক কাজ”, ইত্যাদির প্রতি অনায়াসে বিশ্বাস রাখা যায়।অপরদিকে “ভাবনা দিয়ে তো কবিতা লেখা হয় না, লেখা হয় শব্দ দিয়ে” বা “চিত্রকল্পকে যে দর্শন হয়ে উঠতে হয়, তা না হলে চিত্রকল্প চিত্র হয়ে থেকে যায়” আবার এই প্রেক্ষিতে, কবির সাথে ভাষার সম্পর্ক নিয়ে “ভাষা তাঁর কাছে সেই মাধ্যম যা অবলম্বন করে, তিনি যোগসাধনা করেন।” প্রভৃতির সাথে তীব্র বিরোধ পরিষ্কার।আসলে, আন্তর্জাতিক স্তরে কবিতার ক্রমবিবর্তন অনুযায়ী, ১টি বিন্দু তার স্ব-গতিশক্তির ভিন্নতা অনুযায়ী ~ পরিকল্পিত হবে, তার চিত্ররূপ অথবা চিত্রকল্পরূপে।বর্তমানে, গতিশক্তির পার্থক্য কমছে, নির্মিত হচ্ছে কবিতা-চিত্র-রূপ।একথা ‘ভিসপো’ বা ‘অ্যাসেমিক্ রাইটিং’ বিষয়গুলিকে দেখলেই বোঝা যায়।তবুও, এসব ছাড়াও যেভাবে গোটা লেখাটিতে : চেতনা থেকে ভাবনার অনুযোগ ঘটেছে, নিঃসন্দেহে দৈনন্দিন কবিতা চর্চায় আলোচ্য
পাঠশালা বিভাগটিতে, পৃথ্বী বসু আলোচনা করেছেন মণীন্দ্র গুপ্ত সম্পাদিত কবিতা বিষয়ক পত্রিকা ‘পরমা’ নিয়ে : শিরোনাম ‘পরমাত্মীয়’।তার প্রকাশ এবং বন্ধ হবার নেপথ্য কারণগুলি বিশ্লেষিতো হয়েছে, লেখক পরিচিতি নিয়েও রয়েছে ছোটো পরিসরের আলোচনা।পরমা ১০ম সংখ্যা (প্রকাশকাল বর্ষা ১৩৮২) থেকে, সম্পাদকীয়র কিছুটা আসুন দেখা যাক : “… মেকী কবিদের কাছ থেকে বাংলা কবিতার অভিভাবকত্ব কেড়ে নেওয়া হোক।কবিতা এমন শিশু নয় যে তার অভিভাবক দরকার।তরুণ কবিরা রেস্তোরাঁ ও কফিঘর, ঐ ফড়ে ও ব্যবসাদারদের ছেড়ে দিয়ে, দখল করুণ লাইব্রেরি।” সনামধন্যের পাশাপাশি বেশ কিছু বিস্মৃত কবিদের নাম পাই : চন্দন মুখোপাধ্যায় / শান্ত রায় / সলিল চক্রবর্তী / তীর্থঙ্কর কাঞ্জিলাল / রবীন্দু বিশ্বাস প্রমুখ।পত্রিকার মোট প্রকাশকাল পর্ব ১৩৭৬ বঙ্গাব্দ থেকে ১৩৮৮ বঙ্গাব্দ, বছরে ২টি : ‘আষাঢ় মাসের ১ম দিন’ এবং ‘জীবনানন্দের জন্মদিন’
লাইব্রেরি বিভাগটিতে, কমলকুমার দত্ত আলোচনা করেছেন “কবি গৌরাঙ্গ ভৌমিক’কে নিয়ে।স্বল্প পরিসরে আলোচিত হয়েছে কবির প্রকাশিত বইগুলি নিয়ে এবং কয়েকটি প্রকাশিতো কবিতা নিয়ে।জন্ম ১৯৩০, ১ম কবিতার বই ১৯৬৯ সালে, শিরোনাম “বৃষ্টিপাত'”।জাদু বাস্তবতার সাম্রাজ্যে বিচরণ করা এই কবির কিছু অংশ অবশ্যই মনে রাখার মতো : “শয্যার চারপাশে ফুলের ও ফলের গাছ।গাছের ডালে / জ্যান্ত আগ্নেয়গিরির একেকটা টুকরো যেন নানা রঙের ফুল / কিংবা ফল হয়ে নক্ষত্রের মতো ঝিকমিক করে।” (সাজসজ্জা ও অন্যান্য কবিতা) বা “তুমি কী আশ্চর্য মেয়ে! সম্মোহনে ধরা দিতে বড়ো দেরি কর।” (ম্যাজিক, অগ্রন্থিত কবিতা)
সর্বশেষ বিভাগ বারান্দা, রয়েছে ত্রিস্তান জারা’কে নিয়ে অর্ক চট্টোপাধ্যায়ের দারুণ ১টি টেক্সট্ আলোচনা।রোমানিয়ান আঁভা-গার্দ কবি জারা হলেন, ডাডাবাদী আন্দোলনের পুরোধা। ১জন প্রতীকবাদী এবং পরবর্তীকালে পরাবাস্তববাদী বা স্যুরিয়াল্ কবি হিসেবে আন্তর্জাতিক সাহিত্য আঙিনায় যথেষ্ট ছাপ রেখে গেছেন।’সিম্বুলুল’ ম্যাগাজিনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা এই কবির, বেশ কিছু কবিতা নিয়েও রয়েছে আলোচনা।তবে, আলোচনাটি এতোটাই গুরুত্বপূর্ণ এবং সমান্তরালভাবে এতোটাই স্বল্প পরিসরে, য্যানো মন ভরতে চায় না।
পত্রিকার শেষ পাতায় : সম্পাদকীয়তে রয়েছে দেবদাস আচার্য’র কয়েকটি কথা : “সম্পাদক কি গা এড়িয়ে কাজ করতে পারেন? তার কি নিজের কিছু কিছু ধ্যান-ধারনার প্রতিফলন কাগজে থাকে না? স্রেফ সম্পাদক হয়ে কিছু রেলা নেওয়ার উদ্দেশ্যই-বা কী, আর তার ফলই-বা কী হতে পারে?”
সম্পাদক সেলিম মন্ডল যদিও, ‘তবুও প্রয়াস’ নামের আরেকটি লিটিল ম্যাগাজিনের সম্পাদনায় যুক্ত, তবুও ‘ফারেনহাইট’ পত্রিকাটির প্রতি যত্ন, প্রতিটি পর্বে চোখে পড়ার মতো।প্রতিটি পাতার অ্যারেঞ্জমেন্ট, প্রতিটি স্পেসের উপযোগী ব্যবহার ~ কখনোই আশাহতো বা পাঠ-বিচ্ছিন্ন হবেন না পাঠক।তবে দেড়ফর্মার পত্রিকাটি থেকে আরো কিছু চাহিদার দাবি রাখা যেতেই পারে।সেটা, যেরকম যেকোনো লিটিল ম্যাগাজিন’কে নিয়ে বলে থাকি : নতুন ধারার কবিতা সম্পর্কে পাঠককে জানানো / তার প্রস্তুতির অভ্যাসের প্রতি দায়বদ্ধতা / নতুন অনুষঙ্গে লিখতে আসা কবিদের কিছুটা সুযোগ / পাঠক-কবি আন্তঃসম্পর্কের বিকাশ / ইত্যাদি।আর আশা করি, তারা নিশ্চয়ই আরো ভাবনা-চিন্তার সুপ্রসারিত আবহে ~ নিজেদের আরো গঠনমূলক রূপে নিজেদের উপস্থাপিত করবে।অতএব, পাঠক প্রস্তুতি নিন্ ‘উত্তাপ’ উপলব্ধিতে।সম্পাদক সেলিম মন্ডল এবং টিম ‘ফারেনহাইট’কে অনেক ভালোবাসা

আলোচনা : রাহুল গাঙ্গুলী

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!