গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্তী (পর্ব – ৩০)

নীল সবুজের লুকোচুরি
স্থানীয় মানুষজন এই সুযোগে ডাক্তার দেখাতে পারছেন বলে খুব খুশি। এটা তাদের কাছে যেন একটা আশীর্বাদ। তাই আশেপাশের এলাকা থেকে সকাল সকাল লোকজন এসে হাজির হচ্ছেন। যত দিন পার হচ্ছে ভিড় তত বাড়ছে। আজ আবার সকাল থেকে আকাশ গোমরামুখো হয়ে রয়েছে।এই কনকনে শীতের হাওয়ায় সাথে যদি বৃষ্টি হয় তবে এই এত লোকের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হবে।
——–
শীতকালে সাধারণত বৃষ্টি তো হয়না। তাই বৃষ্টি বাদলের দিনে যেমন মাথার ওপরে একটু আচ্ছাদন দেবার ব্যবস্থা করা হয় এখন তেমন কিছু করা হয়নি। কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হয় আজ সূর্য দেব আড়ি করেছেন।
আজকাল বোধহয় প্রকৃতিও নিজের চলার নিয়ম বদলে ফেলেছে। বৈশাখে কালবৈশাখী নেই, ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসের বাদল কালো মেঘের’ কথাতো মানুষ ভুলেই গেছে, শ্রাবণেও মেঘবালিকার দেখা নেই। অথচ শীতের সময়ে এমন মেঘের ঘনঘটা দেখে বুকে কাঁপন লাগে। আজ ডাক্তার দেশিকানের নির্দেশ মতো ‘সেবাসদন’ একটু বিশেষ ব্যস্ত। ওনার এক ডাক্তারবন্ধু আজ আসছেন বিদেশ থেকে দেশিকানের এই আনন্দ যজ্ঞের সাক্ষী হতে। তাকে সম্পূর্ণ দেশী রীতিতে বরণ করা হবে বলে ওদিকের আয়োজন এখন তুঙ্গে। ডাক্তার আনসারি মাস তিনেক আগে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজে বাইরে গেছেন। তবে জানিয়েছেন অবশ্যই দু এক দিনের মধ্যে পৌঁছে যাবেন। মিঠি এখানে এসেই খুব ব্যস্ত হয়ে পরেছে। নিজের ছোটবেলাটা যেন ফিরে এসেছে এতদিন পরে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে হারানো দিনের কথাগুলো মাঝে মাঝেই মনে পড়ে যাচ্ছে। আশ্রমে এসে বন্ধুদের সবাইকে কাছে পেয়ে কাজের আনন্দও দ্বিগুন হয়ে গেছে। দেশিকান স্যারের কাজের ধরনটা মিঠির খুবই ভালো লেগেছে। এমনিতেই উনি এই আশ্রমের প্রাক্তনী, সিনিয়র ব্যাচ।তার ওপর এইসবে এসেছেন প্রবাসী জীবনের অধ্যায় শেষ করে। ওর নলেজ এন্ড এক্সপেরিয়েন্সের তো একটা মর্যাদা আছে। তাই কাজ সম্পর্কে ওর এডভাইসগুলো সিরিয়াসলি ফলো করা উচিত বলে মনে করে মিঠি। আর এই সাতদিনের “ফ্রি হেলথ ক্যাম্প ” তো মনের আনন্দে কাজে মেতে ওঠার দিন। যদিও কাজের চাপ আছে যথেষ্ট তবুও প্রতিদিনের একঘেয়ে ঘ্যানঘ্যানানি থেকে মুক্ত এই কাজ। এখানে কাজ করে আনন্দ আছে।
এখানকার সাধারণ মানুষগুলো ডাক্তারদের ভগবান বলে মনে করে। একটু যত্ন নিয়ে রুগী দেখা আর তার সারাদিনের করণীয় কাজগুলো বুঝিয়ে দেয়া, এতেই তারা খুশি। মিঠির মনে হয় এই চাওয়াটুকুতো কোনো অন্যায় নেই। ওদের সাথে একটু নরম করে কথা বললে ওরা সহজেই নিজেদের অসুবিধেগুলো গুছিয়ে বলতে পারে। তাতে ডাক্তারদের কাজ করতে সুবিধা হয়। ওরাও খুব খুশি হয়ে যায়। এতে অনেক কঠিন কাজ সহজ হয়ে যায়।
মিঠির ভালো লাগার আর একটা কারণ হল ওর মা। তিনিও আছেন ওদের সাথে মানবসেবার এই মহান যজ্ঞে। দু’ এক দিনের মধ্যে ওর “সুপার” স্যারও চলে আসবেন। যদিও মিঠি এখন জানে উনি ওর বাবা কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেই কাঙ্খিত শব্দটা স্বরে – সুরে বাতাসে ভাসাতে পারেনি। তবুও উনি কাছে থাকলে তো একটা ভালো লাগা থেকেই যায়। তখন কিন্তু বেশ একটা অন্যরকম ভালোলাগা মিশে থাকে মিঠির কাজের মধ্যে।
আসছি পরের পর্বে