গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্তী (পর্ব – ১৭)

নীল সবুজের লুকোচুরি

—- যে অদৃশ্য বাৎসল্যের জোয়ারে ভেসে যেত তার মন মিঠিকে দেখলে আজ সেই সূত্রটা খুঁজে পাওয়ার পর একটু ছুঁয়ে দেখার অদম্য ইচ্ছা পেয়ে বসল ষাটের ঘর পেরিয়ে যাওয়া এক ডাক্তারকে। ফুলের ওপর হাত রেখে যেভাবে স্পর্শসুখ অনুভব করা হয় ঠিক সেভাবেই মিঠির চিবুক স্পর্শ করে আদর করলেন তিনি।

অনুভূতির গভীর সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে কাতর স্বরে অনুরোধ করলেন,” একবার বাবা বলে ডাকবিনা!”
— মিঠি যেন এতক্ষণ ধরে কোনো স্বপ্ন দেখছিল। মায়ের জীবনের অতীতের গভীরে লুকিয়ে থাকা কষ্টগুলো যেন ওর আজকের পরিনত মনকে ছুঁয়ে যাচ্ছে বার বার।
ভালোবাসার আগুন কথাটা শুধু শুনেছে এতদিন। আজ তার তাপে ঝলসে যাওয়া নিজের মা’কে দেখে খুব কষ্ট হচ্ছে মনে মনে। তবে মায়ের মানসিক জোর ওকে আজ আবারও গর্বিত করে তুলেছে। ধর্মের নামে ভেঙে যাওয়া সমাজে ভালোবাসার কুসুমকলিকে বাঁচিয়ে রাখাটাই একটা চ্যালেঞ্জ। যে নারী সংসারের সব নিয়ম মেনে নিয়েও নিজের গর্ভের সন্তানের জন্য একা চলার সাহস করে সে যে এই পৃথিবীর সব থেকে শক্তিশালী সেটা নতুন করে বলার দরকার হয়না। আমাদের সমাজে সন্তানের সব দায় দায়িত্ব মায়ের ওপর থাকলেও তাকে সমাজের গ্রহণযোগ্য করতে হলে পিতৃপরিচয়ের দরকার হয়। সেখানে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের সন্তানকে জন্ম দেয়া, সমাজে তাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করা, তাকে অর্থনৈতিকভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের যোগ্য করে তোলার জন্য তার মা যেভাবে নিজেকে উৎসর্গ করেছে তা কেবল ভগবানই করতে পারে। মাতৃগর্বে গর্বিত মেয়ে জীবনে এই প্রথমবার মায়ের আঁচলটা নিজের হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সামনে দাঁড়ানো তার জন্মের কারণকে ভালো করে একবার দেখে নেয়।
ছোটবেলা থেকেই “বাবা” শব্দটা ওর মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরি করেছিল। কত রাত আপনমনে একা একা বাবা বলে ডেকেছে মনে মনে। অনেক অনেক রাতে বিছানায় শুয়ে একা একা ভেবেছে, “আমার বাবা দেখতে কেমন? আচ্ছা বাবা কি করেন? অন্য মেয়েদের মতো আমার মা-বাবা একসাথে থাকে না কেন? আজ যখন সব প্রশ্নের উত্তর চোখের সামনে খোলা বইয়ের পাতার মতো দেখতে পাচ্ছে তখন মন কেন আনন্দে ভাসছে না? কেন “বাবা” শব্দটা অনায়াসে বেরিয়ে আসছে না? কেন গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে? মুখে একটা আলতো হাসি টেনে এনে মিঠি প্রথমে মা’কে প্রণাম করে। তারপর ডাঃ আনসারির পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বলে আমাকে আশীর্বাদ করুন যাতে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি।
———–
আসছি পরের পর্বে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।