গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্তী

বাবা মন্দির
বহুদিনের একটা সুপ্ত ইচ্ছে আজ পূর্ণ হতে চলেছে। আজ আমরা পূর্ব সিকিমের বাবা মন্দির দেখতে যাবো। সিকিমের এক অদ্ভুত আকর্ষণ হল বাবা হরভজন সিংয়ের উদ্দেশ্যে নির্মিত এই মন্দির। দিল্লি ক্যান্টনমেন্টে থাকতেই আমি শুনেছিলাম যে নাথুলা পাসে কোনো এক জওয়ান ‘মরনোপরান্ত’ ডিউটি করতে আসে। তাঁর এই সার্ভিসের ফলে ইন্দোচীন বর্ডারের সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় যে সব ছোট ছোট জনবসতি রয়েছে সেখানে মানুষ শান্তিতে থাকতে পারছে। সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং হিংসাত্মক কার্যকলাপ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। তাঁর সহযোগিতায় সেনাবাহিনীর জওয়ানদের পক্ষে অনেক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। সীমান্তের চীনা ফৌজও তাঁকে সমীহ করে চলে। তারাও হরভজন সিংয়ের ছায়াকায়ার সাথে পরিচিত। সেনা আধিকারিকরাও সিপাহী হরভজন সিংয়ের অশরীরী উপস্থিতিকে মেনে নিয়েছেন।
মরণোত্তর একজন সিপাহীর সদা সতর্ক প্রহরা এবং অনন্ত দেশপ্রেমকে সম্মান জানিয়ে তাঁকে honorary Captain হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। তাই তাঁকে ক্যাপ্টেন হরভজন সিং বলা হয়। সার্ভিসে থাকা একজন সেনা জওয়ানের সব সুযোগ সুবিধা, ক্যাজুয়াল লিভ, এনুয়াল লিভ – সব কিছুই সে পায়। তাঁর বেতন নির্দিষ্ট সময়ে তাঁর বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়। বর্ডারে তাঁর থাকার জন্য আলাদা ব্যাবস্থা করা হয়েছে। এতদিনের এতসব শোনা কথা, আজ দেখতে পাব ভাবলেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে।
আমরা এখানে পৌঁছেছি সকাল এগারোটা নাগাদ। আমরা আজ অত্যধিক উচ্চতায় এসেছি বলে গাড়িতেই শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। কর্পূর সঙ্গে এনেছি বলে সবাই একটা করে হাতে নিয়ে নাকের সামনে ধরছি। যথেষ্ট চকলেট রয়েছে সঙ্গে। তাই মুখে দিচ্ছি একটু পর পর।
এরমধ্যে আবার লোকাল বিডিও ম্যাডাম সিডিউল ডিউটিতে এসে রাস্তার মোড়ে মোড়ে কনভয় নিয়ে দাঁড়িয়ে মিটিং সেরে নিচ্ছেন। তিনি না যাওয়া পর্যন্ত ট্যুরিস্ট গাড়ি পর পর লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মোটামুটি এক একটা জায়গায় দশ মিনিট করে দাঁড়াতে হচ্ছিল বলে আমরা গাড়ি থেকে নেমে রাস্তায় পায়চারী করছিলাম। দোকান থেকে চিপস, জলের বোতল নেয়া হয়েছে। তিনটে জায়গায় এরকম খানিকটা সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে।
ড্রাইভার অর্জুন জানাল যে, প্রতি সপ্তাহে একদিন করে বিডিও অফিস থেকে
Ground inspection হয়। অফিসিয়ালসরা
সবাই তখন বিডিওর সাথে থাকেন।
পুলিশ প্রশাসন এই কাজে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করে।
under construction এই পথের
একদিকে ন্যাড়া পাহাড় অন্যদিকে ঢালু সবুজ উপত্যকার মূল আকর্ষণ হল বরফাচ্ছন্ন পাহাড়ের কোলে সারি সারি ইয়াকের দল। পাহাড়ের গায়ে গায়ে দলবেঁধে
চড়ে বেড়াচ্ছে। মাঝে দুটো লেক রয়েছে। প্রথমটা ছাংগু লেক। এই লেকের ওপর মেঘের রাজত্ব। অদ্ভুত সুন্দর লাগে দেখতে। নীল আকাশে সাদা মেঘের দল যখন ভেসে যাচ্ছে তখন জলের মধ্যে একই দৃশ্য দেখা যায়। অসাধারণ মুহূর্ত তৈরি হয় তখন। আর একটা লেক রয়েছে একটু দূরে যেখানে বোটিংয়ের ব্যবস্থা আছে।
নাথুলা এবং বাবা মন্দিরে আসতে হলে আগে থেকে ফটো আইডেন্টিটি দিয়ে পারমিশন করাতে হয়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক গাড়ি এখানে আসে। ভারত-চীন বর্ডারের দুর্গম পাহাড়ী পথ, ল্যান্ড স্লাইড হয়। তাই যাত্রীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর থেকে এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাবা হরভজনের জন্য তৈরি এই ভবনকে মন্দির বলা হলেও এটা কোনো প্রথাগত মন্দির নয়। একজন সেনা জওয়ানের থাকার মতো রুম যেমন সেনা ছাউনির ব্যারাকে দেখা যায়, এর গঠনশৈলী সেরকমই। তবে বৈশিষ্ট্য হল এই মন্দিরের লাগোয়া একটা উঁচু ফ্ল্যাগপোলে ভারতীয় পতাকা সব সময়ই উড়ছে। আর এই অঞ্চলে ভারতীয় সেনাবাহিনীর যত জওয়ান আছে তারা ডিউটি আওয়ার্সে যখন নাথুলা থেকে জেলেপলার এই রাস্তা দিয়ে পার হয় তখন সকলেই গাড়ি থেকে নেমে হাত মুখ ধুয়ে বাবা হরভজন সিং -এর ছবিতে আরতি করে, মাথা নত করে আশীর্বাদ নেয়, প্রসাদ নেয়, তিরঙ্গাকে স্যালুট করে। তারপর নিজেদের কাজে যায়। ভারতীয় সেনা জওয়ানরা তাঁকে “হিরো অব নাথুলা” বলে সম্মান জানায়।
ক্রমশ….