গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৫)

নর্মদার পথে পথে

পাহাড়ের গায়ে গায়ে রাস্তা ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি। মাঝে মাঝে এলাকার নাম লেখা
ছোট বড় হোর্ডিং চোখে পড়ছে। অবাক হয়ে দেখছি পাহাড়ের ধাপে ধাপে উঠে যাওয়া এই বনভূমি। এই পথ ধরে কত পূণ্যার্থী অমরকন্টকে পৌঁছেছে । লালমাটির এই পথের ধূলায় কত ঋষিমুনির পায়ের ধুলো রয়েছে! ভাবতেই রোমাঞ্চিত হয়ে উঠছি। বাস বেশ স্পিডে চলছে বলে কাছের দৃশ্য মুহূর্তেই বদলে যাচ্ছে কিন্তু দূরের সবুজ গাছগাছালির দৃশ্যপট মনের মধ্যে একটা অজানা আনন্দে ভরে দিচ্ছে।

পথের আড়ালে পাহাড়ের গায়ে গায়ে যেসব দৃশ্য অদেখা রয়ে গেল মনটা সেখানেই আটকে যেতে লাগলো। ভোটেঙ্গার এই পাহাড়ি পথে সন্ধ্যাবেলার ভূতুরে বাঁশি তো শোনা হলনা। কারন আমরা পায়ে হেঁটে না গিয়ে গাড়িতে চলছি। অবশ্য কিছু বছর আগেও স্টেশন থেকে দিনে মাত্র দুটো বাস চলত। প্যাসেঞ্জার ভর্তি না হলে বাস ছাড়ত না বলে একইদিনে পেন্ড্রারোড থেকে অমরকন্টক পৌঁছানোর কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। তখন অনেক পূণ্যার্থী পেন্ড্রারোড স্টেশন থেকে ঝাড়ি পথে এই ভোটেঙ্গার জঙ্গলের ভিতর দিয়ে পায়ে হেঁটে অমরকন্টকে যেতেন। আর তাঁরা জানতেন যে সন্ধ্যা হলেই এই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাবার সময় কখনো কখনো আগে আগে, কখনো বা পিছনে আবার কখনো বা ঘাড়ের ওপর কানের পাশে বাঁশির আওয়াজ শোনা যায়। এই বাঁশি কোথায় বাজে? কে বাজায়? কোথায় বসে বাজায়? কেন শুধু সন্ধ্যা
হলেই শোনা যায়? কেন ওই গভীর জঙ্গলে শুধু
পথিকের কানেই সে শব্দ পৌঁছায়? প্রশ্ন রয়েছে অনেক কিন্তু উত্তর হিসেবে বলা হয়
আজও তার কারণ অজানাই রয়ে গেছে। বর্তমানে পেন্ড্রারোড থেকে অমরকন্টক পর্যন্ত সরকারি উদ্যোগে পাকা রাস্তাঘাট হয়েছে। স্টেশন থেকে অমরকন্টকে যাবার জন্য এখন সরকারি বাস চলে। যথেষ্ট সময় থাকলে রিজার্ভ গাড়ির কোনো দরকার নেই। স্টেশনের বাইরে এসে বাসে উঠে বসলে কন্ডাক্টর দায়িত্ব নিয়ে নর্মদা মন্দিরের সামনে নামিয়ে দিয়ে পথ দেখিয়ে দেয়।
যাইহোক, আমাদের বাস অমরকন্টকে পৌঁছেছে যখন তখন সূর্যদেব পশ্চিমের যাত্রা শুরু করেছেন। আমরা নিজেদের নির্ধারিত রুমে লাগেজ রেখে চারজনে মিলে কোটিতীর্থের ঘাটে স্নানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছি। এখান বলে রাখি, এই শতাধিক মানুষের মধ্যে আমার সাথে রয়েছে আমার বোন আর ওর দুই ননদ।
নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ছায়ামাখা কোটিতীর্থের জলে প্রথম ডুব দিতে কাঁপুনি ধরে যাচ্ছিল। কিন্তু অবাক করার বিষয় হল একবার ডুব দেবার পর সব ঠান্ডালাগা কমে গেল। আমরা স্নান করে ঘাটের মন্দিরের মহাদেবের মাথায় জল ঢাললাম। মনের মধ্যে আনন্দ যেন উপচে পড়ছে। আর সেই অকারণের দোলার ফল হল প্রতিটা কথায় হা হা করে সবাই মিলে হাসি।
এই হাসির লহরীর ফেনায় ডুবতে ভাসতে যখন আমরা ফিরে এসেছি ততক্ষণে রান্না খাওয়া শেষের মুখে। কোনোরকমে রুমে গিয়ে নিজেদের বাসন এনে খাবারটা নিতে পেরেছিলাম নয়তো নির্ঘাৎ হরিমরট লেখা ছিল।…

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।