সম্পাদকীয়

শান্তনিকেতনে এসে, রবীন্দ্রনাথ ও খ্রীষ্ট কোথাও এক হয়ে গেছে

তাই এই সম্পাদকীয়

রবীন্দ্রনাথ যীশু খ্রিস্টকে আবিষ্কার করেছেন মানবপুত্র হিসেবে। ঈশ্বরপুত্র হিসেবে তার আবির্ভাব কোনো তর্কের বিষয় নয় বরং মানুষকে ঈশ্বরের যোগ্য উত্তরাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে প্রেমকে বড় করে তুলে ধরেছেন তিনি। এভাবে যিশুখ্রিস্ট ঈশ্বরপুত্র হিসেবে, সন্ন্যাসী রাজা হিসেবে, প্রেমের রাজা হিসেবে,সত্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে রবীন্দ্রনাথের মনোভূমিকে সহজ করেছেন। দুঃখকে স্বীকার করে তিনি হয়েছেন দুঃখী জনের মানুষ, মহাসাধক, মহাপুরুষ।
রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘তিনি পরম আনন্দ পরমাগতি: এই কথা উপলব্ধি করবার জন্য যে ত্যাগের দরকার যারা তা শেখেনি…এই মহাপুরুষ তাই আপনার জীবনে ত্যাগের দ্বারা, মৃত্যুর দ্বারে উপস্থিত হযে মানুষের কাছে এই বাণী এনে দিয়েছিলেন।’ (খৃস্ট/খৃস্টাৎসব)
রবীন্দ্রনাথের এই স্বীকারোক্তিতেই নয় খ্রিস্টাদর্শ বা খ্রিস্টদর্শনের মূল সুর ছড়িয়ে যেতে দেখি সবখানেই। রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন, ‘হে রাজা, তুমি আমাদের দুঃখের রাজা, হঠাৎ যখন অর্ধরাত্রে তোমার রথচক্রের বজ্রগর্জনে মেদিনী বলির পশুর হৃৎপিন্ডের মতো কাঁপিয়া ওঠে তখন জীবনে তোমার সেই প্রচণ্ড আবির্ভাবের মহাক্ষণে যেন তোমার জয়ধ্বনি করিতে পারি…সেদিন যেন দ্বার ভাঙিয়া ফেলিয়া তোমাকে ঘরে প্রবেশ করিতে না হয়, যে সম্পূর্ণ জাগ্রত হইয়া সিংহদ্বার খুলিয়া দিয়া তোমার উদ্দীপ্ত ললাটের দিকে দুইচক্ষু তুলিয়া বলিতে পারি: হে দারুণ, তুমি-ই আমার প্রিয়।’
এখানে এসেও আমরা যিশুর সতর্ক বাণীর কথা মনে করতে পারি। খ্রিস্টদর্শনের মূল বক্তব্য হৃদয়ে ধারণ করে রবীন্দ্রনাথও হয়ে ওঠেন খ্রিস্টের প্রতিনিধি। চেতনে অবচেতনে সর্বত্রই তো খ্রিস্টের ছায়া দেখতে পাই তার রচনায়।
রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন, ‘আমাদের বেশভূষা দীন হউক, আমাদের উপকরণ সামগ্রী বিরল হউক, তাহাতে যেন লজ্জার লেশমাত্র না পাই, কিন্তু চিত্তে যেন ভয় না থাকে, ক্ষুদ্রতা না থাকে, বন্ধন না থাকে, আত্মার মর্যাদা সকল মর্যাদার ঊর্দ্ধে থাকে।’ এই যে, দীনতার কথা মেনে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ আত্মার মর্যাদার কথা স্বীকার করলেন,
খ্রিস্ট যখন আমাদের প্রার্থনা করতে শেখান, তখনও কি আমরা একই উক্তির প্রচ্ছায়া অনুভব করিনা? হে পিতা তোমার রাজ্য আইসুক, তোমার ইচ্ছা যেমন স্বর্গে তেমনি মর্ত্যে পূর্ণ হউক। এই যে তিনি ঈশ্বরের ইচ্ছা পূর্ণ হওয়ার কথা বলেছেন। একি কোনো জেহাদ ঘোষণা করে সম্ভব? ঈশ্বরের ইচ্ছা কী? ব্রহ্মের ইচ্ছা কী? তাঁর ইচ্ছা মানুষ তাঁর কাছে আসুক, মানুষ তাঁর অন্বেষণ করুক। ঈশ্বর যেমন দয়াশীল-মানুষ তেমনি দয়াশীল হোক, ঈশ্বর যেমনি ক্ষমাশীল মানুষ তেমনি ক্ষমাশীল হোক। ঈশ্বর যেমন ভক্তের হৃদয় অধিষ্ঠান করতে ভালোবাসেন তেমনি মানুষও যেন ভক্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে ঈশ্বরের অন্তরে নিগুঢ় সত্য অন্বেষণ করে। তাহলে আমাদের প্রার্থনা কী? আমাদের প্রার্থনা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘আমি এখন তোমার নিকট শক্তি প্রার্থনা করি না, আমাকে প্রেম দাও, আমি সংসারে জয়ী হইতে চাহি না, তোমার নিকট প্রণত হইতে চাই, আমি সুখ-দুঃখকে অবজ্ঞা করিতে চাহি না, সুখ-দুঃখকে তোমার মঙ্গল হস্তের দান বলিয়া বিনয়ে গ্রহণ করিতে চাই।…ইহা যেন মনে রাখি, জীবনকে তুমিই আমার প্রিয় করিয়াছিলে, মরণকে তুমিই প্রিয় করিবে; তোমার দক্ষিণ হস্তে তুমি আমাকে সংসারে প্রেরণ করিয়াছিলে,তোমার বাম হস্তে তুমি আমাকে ক্রোড়ে আর্কষণ করিয়া লইবে। তোমার আলোক আমাকে শক্তি দিয়াছিল তোমার অন্ধকার আমাকে শান্তি দিব।’
রবীন্দ্রনাথ বুঝেছিলেন ধর্ম নয় আত্মার মর্যাদা খর্ব করে অভ্যাসগত সংস্কার। এই সংস্কারের বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি। তাই বুদ্ধ তার কাছে যেমন মহামানব খ্রিস্টও তাই।উভয়-ই চেয়েছেন মানুষ মোক্ষ লাভ করুক। এটাই হলো অনন্ত জীবনপ্রেমে, সত্যে, ত্যাগে এবং দুঃখে নিজের আত্মাকে উন্নত করা।এই রবীন্দ্রনাথ কোন ধর্মের প্রভাবে এই সত্যের সন্ধান পেলেন, সেই বিতর্কে না গিয়ে বরং একথা বলতে চাই যে, ভারতবর্ষের নিজস্ব সংস্কৃতির মধ্যে যে বুদ্ধের আবির্ভাব, সেই বুদ্ধের আদর্শের সঙ্গে যখন প্রাচ্যের খ্রিস্টের সঙ্গে আদর্শের বৈরিতা নেই, তখন বুদ্ধকে সমীহ করলে রবীন্দ্রনাথের মহত্ত যেমন কলুষিত হয় না, তেমনি খ্রিস্টও তুচ্ছ হয়ে যান না। এরপরেও খ্রিস্ট কি প্রভাবিত করেননি রবীন্দ্রনাথ কে? একটি ‘শিশুতীর্থ’ নামক কবিতা কিংবা নৃত্যনাট্য না রচনা করলেও কি রবীন্দ্র মনে খ্রিস্টাদর্শের উপস্থিতি লক্ষ করা যেত না? যে অর্থে বৌদ্ধ ভারতীয়দের অবতার, সেই অর্থে খ্রিস্ট নন। তিনি বিদেশির মতোই। তবু ভারতীয় বোদ্ধা ব্যক্তিদের কাছে তিনি অবতার রূপেই শ্রদ্ধেয়। যেভাবে খ্রিস্ট স্বামী বিবেকানন্দের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছেন, সেই একই কারণে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও তাঁকে নিজের লোক বলে গ্রহণ করেছেন।আর স্বামী বিবেকানন্দ যে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা যে খ্রিস্টীয় মিশনের ভাবধারায় প্রতিষ্ঠিত, তা সবাই মানেন। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক তরুণ স্যানাল বলেন, ‘স্বামী বিবেকানন্দ যে রামকৃষ্ণ মিশন গড়েছিলেন সেখানেও ছিল খ্রিস্টীয় মিশনের আদর্শ। শ্রীমা রচিত কথামৃত যেন খ্রিস্টীয় সুসমাচার, ঠাকুর রামকৃষ্ণ যেন খ্রিস্টাবতার এবং কথামৃতের কথনে যেন নিউটেস্টমেন্ট, স্বামী বিবেকানন্দ যেন সন্তপল।’ (অরুণ সন্যাল: সহস্রাব্দের সমীক্ষা-১ম খণ্ড পৃ:৯) ।
কেবল তাই নয় মহাত্মা গান্ধী যে আদর্শের পতাকা তুলে ধরেছিলেন, তার পেছনেও রয়েছে খ্রিস্টধর্মের প্রভাব। রবীন্দ্রনাথ কি এ প্রভাবকে অস্বীকার করতে পারতেন? না কি পেরেছেন? সম্ভব?
রবীন্দ্রনাথের যে অসাধারণ গুণ ছিল, তা হলো আত্মস্থ এবং পর্যবেক্ষণ করার শক্তি। যে শক্তিতে স্বামী বিবেকানন্দ তৈরি করেছিলেন নিজস্ব ভাবমূর্তি, যে শক্তিতে রামকৃষ্ণ আত্মস্থ করেছিলেন খ্রিস্টকে এবং সৃষ্টি করলেননিজস্ব ঠিকানা, সেই একই শক্তিতে তিনি বুদ্ধ ও খ্রিস্টকে আত্মস্থ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ যে ব্রাহ্মধর্মের উপাসনা করতেন, তার কাঠামো বিন্যাসও তো ছিল খ্রিস্টীয় ভাবধারায়। এ জন্য তিনি বলেন…”সাম্প্রদায়িক খৃস্টানের হাত থেকে খৃস্টকে সাম্প্রদায়িক বৈষ্ণবের হাত থেকে বিষ্ণুকে, সাম্প্রদায়িক ব্রাহ্মের হাত থেকে ব্রহ্মকে উদ্ধার করে নেওয়ার জন্যে বিশেষ ভাবে সাধনা করতে হয়।আমাদের আশ্রমে আমরা সাম্প্রদায়ের ওপর রাগ করে সত্যের সঙ্গে বিরোধ করব না। আমরা খৃস্টধর্মের মর্মকথা গ্রহণ করবার চেষ্টা করব। খৃস্টানের জিনিস বলে নয়, মানবের জিনিস বলে।’ এভাবেই রবীন্দ্রনাথ বুদ্ধ, খ্রিস্ট ও ব্রাহ্ম থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলেন আর তাঁর দর্শনও আলাদাভাবেই হয়ে ওঠে রাবীন্দ্রিক।
বড়দিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা ভালোবাস সক্কলকে৷

রাজশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।