।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় রিয়া ভট্টাচার্য

অন্ধকারের যন্ত্রণা

” আমি যে আর পারছিনা রোহিণী!
আজকাল বড্ড যন্ত্রণা হয় আমার। মুক্তি কোথায়! কিভাবে পাবো তাকে!
তুমি জানো অন্ধকার কতটা বিভৎস! কতটা বিভৎস তোমার পৈশাচিক পিছুটান!
আমি আর পারছি না জানো! দশফুট বাই দশফুটের কবরটার অন্দরে বড্ড অসহায় লাগে আমার। বুকে চেপে বসে তীব্র ভয়! আচ্ছা, অশরীরীদের কি তবে দমবন্ধ হয় রোহিণী!
তুমি কি আমায় এখান থেকে মুক্ত করতে পারোনা! পারোনা নিজের কাছে নিয়ে যেতে! জীবিত অবস্থায় তো এত ভালোবাসতে আমায়… মৃত্যুর পরে কি ভালোবাসাও মরে যায় রোহিণী!
নিয়ে যাও, মুক্ত করো আমায়। তোমায় ছাড়া যে আমার মরেও মুক্তি নেই!”
প্রতিরাতে দেখা স্বপ্নটা এভাবেই সারাদিন আর্তনাদ করে রোহিণীর কানের কাছে। চিনতে পারে না তাকে সে, চেহারাটাও কেমন যেন ধোঁয়াশাঘেরা… কিন্তু আওয়াজ! আওয়াজটা যেন তার মর্মে আঘাত করে। ঝড় ওঠে বুকের ভেতরটায়। কিচ্ছু বুঝতে পারে না রোহিণী। বাবা – মাকে একবার জানিয়েছিল বিষয়টা। তাঁরা সাইকিয়াট্রিস্ট কনসাল্ট করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে কুরুক্ষেত্র বাধিয়েছিলেন। লকডাউনে গৃহবন্দী থেকে নাকি মাথার সমস্যা দেখা দিয়েছে তার। ডাক্তারও কিসব বুঝিয়ে একগাদা ওষুধ খেতে দিয়েছিলেন তাকে৷ ভাগ্যিস খায়নি, জানলা গলিয়ে ছুঁড়ে দিয়েছে বাইরে রোজ। প্রতিরাতে দেখা স্বপ্ন কিকরে মানসিক সমস্যা হতে পারে মাথায় ঢোকেনা তার। সেই ব্যথাভরা আওয়াজ! কতটা অসহায়তা লুকিয়ে আছে সেই আওয়াজে। কিন্তু রোহিণী কিভাবে মুক্ত করবে তাকে! সেতো চেনেই না তাকে। কোথায় আছে সে! কোন কবরে! তাছাড়া মৃত্যুর পরে সে আবার ফিরে আসতে চায়ই বা কেন!
বড্ড ভয় করে রোহিণীর। চাইলেও কাউকে এসব কথা বলতে পারে না সে। বাবা মায়ের সেদিনের আচরণের পরে তাঁদেরকেও কিচ্ছু বলা হয়নি। এক অদ্ভুত নিরাপত্তাহীনতা ঘিরে ধরে তাকে।
* * *
–” মেয়েটা কিছু বুঝতে পারেনি তো! ঠিকভাবে জানো তুমি! “
–” হ্যাঁ জানি। সন্দেহ করার আর কোনো রাস্তাই রাখিনি আমরা। মেয়েটা ভেবেই নিয়েছে যে তার কোনো মানসিক সমস্যা হয়েছে। রোজ রাতে ওকে ঘুমের ওষুধ দিই আমি। আশাকরি আর কোনো স্বপ্নটপ্ন দেখেনা। দেখলে অন্তত আমায় নিশ্চয় বলতো!”
–” জানো বানী, নিজের সন্তানের সঙ্গে এমনটা করতে ইচ্ছে করেনা আমার। কিন্তু আর যে কোনো উপায় নেই। দেখেছিলে তো, রায়ানের চলে যাওয়ার পর কেমন হয়ে গিয়েছিল আমাদের মেয়েটা! ভাগ্যিস ডক্টর গোমস ছিলেন৷ অতীতের স্মৃতি ভুলে যাওয়া যদি আগামীর জন্যে ভালো হয়… তবে তাকে ভুলে যাওয়াই উচিত। রোহিণীর মস্তিষ্কে মাইনর সার্জারিটা সবে একমাস হলো হয়েছে। তাই হয়ত সে অদ্ভুত কিছু স্বপ্ন দেখছে। সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে আশা রাখি। “
–” অবশ্যই। আর তুমি এতো অপরাধবোধে ভুগোনা প্রতীম। তুমি যা করেছো নিজের মেয়েকে বাঁচানোর জন্য করেছো। আমি জন্ম দিয়েছি রোহিণীকে। আমার চেয়ে বেশি তো ওকে কেউ ভালোবাসতে পারবেনা বলো! আমি তো বলছি, আমরা যা করছি মেয়ের ভালোর জন্যই। লকডাউন মিটলেই ইউকে থেকে অর্ণব ফিরে আসবে। বিয়েটা এবার ভালোয় ভালোয় সেরে ফেললেই হয়। একবার বিয়েটা হয়ে গেলেই আর কোনো সমস্যা হবে না দেখো। “
–” তুমি যা বলছো তাই যেন হয়। আমার রোহিণী যেন সবসময় ভালো থাকে। ঈশ্বরের কাছে আর কিছুই চাইবার নেই আমার। “
শ্রাবণী সন্ধ্যা। ঝুপঝুপিয়ে বৃষ্টি ঝাপসা করেছে ব্যস্ত শহরের চালচিত্র। সোঁদা মাটির গন্ধ শোষণ করে খুলে গিয়েছে অতীত স্মৃতির পাতা। আর, অন্ধকার ঘরে অপত্যস্নেহের অন্তরালে বিপন্ন অপরাধবোধ ঢাকার প্রাণপণ চেষ্টা করে চলেছে এক দম্পতি।
অন্যদিকে, একলা ঘরে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের সংযোগ সাধনের অক্লান্ত চেষ্টা করে চলেছে তাদের একমাত্র সন্তান।
* * *
গতরাতে আবার সেই স্বপ্নটা দেখেছে রোহিণী। এবার তা আরো স্পষ্ট। কবরের অন্ধকার নয়, তার চারপাশের প্রকৃতিও আবছা নজরে পড়েছে তার। কেমন যেন জায়গাটা বড্ড চেনা চেনা। কোনো পুরানো গোরস্থান, যার একপাশে প্রহরীর মত দাঁড়িয়ে সুউচ্চ গীর্জা, অন্যপাশে বহুপুরাতন ভদ্রকালী মন্দির। কোথাও যেন দেখেছে সে এই অঞ্চলকে, আবছা ডানা মেলে উড়ে বেড়াচ্ছে তার স্মৃতির আঙিনায়।
কি মনে হতে গুগল খুলে সার্চ দেয় সে। পুরাতন গোরস্থান, গীর্জা ও মন্দির এক লোকেশনে সর্বদা মেলে না, হয়ত গুগল কিছু সাহায্য করলেও করতে পারে।
সার্চ দিতে স্মার্টফোনের পর্দায় ভেসে ওঠে একটি ছবি। এইতো! এই সেই জায়গা। চোখ চিকচিক করে ওঠে রোহিণীর। এখানেই আছে তার সব প্রশ্নের উত্তর। যেভাবেই হোক যেতেই হবে তাকে। বাড়ি থেকে বেশি দূরেও না অঞ্চলটা। মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার। তার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে এখানেই।
* * *
পুরানো গোরস্থানটার গেটে জংধরা তালা ঝুলছে৷ আশেপাশে কারো দেখা নেই। এখন দুপুরবেলা, আকাশে মেঘ জমে যেন সায়ংকাল বোধ হচ্ছে। টুপটাপ বৃষ্টিতে অবাধ্য রহস্যের পরশ, সারা অঞ্চলটা যেন স্তব্ধ হয়ে আছে অজানা আশঙ্কায়।
বড় শহর থেকে চল্লিশ কিলোমিটারের ভেতরে এমন গ্রাম পরিবেশ থাকতে পারে ভাবতেই পারেনি রোহিণী। চারিদিক যেন সবুজবীথি, কিন্তু একটি পাখির ডাকও শোনা যায় না সেখানে। কেমন যেন গা ছমছমে পরিবেশ।
তালা না খুললে তো কোনোমতেই ভেতরে প্রবেশ সম্ভব নয়, চারিদিকে উঁচু কাঁটাতারের বেড়া পার হওয়া অসম্ভব। ইতিউতি তাকায় রোহিণী, এক অতিবৃদ্ধ মানুষকে লাঠি ভর দিয়ে টুকটুক করে এগিয়ে আসতে দেখা যায়।
–” তুই এসে গেছিস মা! আমি জানতাম তুই আসবি! ” বৃদ্ধের ফোকলা গালে স্বস্তির হাসি খেলে যায়।
-” আজ দুইবছর সে এখানে বন্দী আছে রে মা। বড্ড কষ্ট পাচ্ছে। নিয়ে যা তাকে। জীবন মৃত্যুর মাঝে ঝুলতে থাকা যে বড় বেদনার!” তালা খুলতে খুলতে জবাব দেয় বৃদ্ধ।
তার পিছুপিছু ভেতরে প্রবেশ করে রোহিণী। গোরস্থানের শেষপ্রান্তে মাটির একটি উঁচু ঢিবি, তিনরঙা সুতোর বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে কেমন খাপছাড়া ভাবে থমকে আছে। রোহিণীর হাত ধরে সেখানে থামতে বলে বৃদ্ধ।
—” তোর মা বাবাকে দোষ দিতে পারিনা। তাঁরা তো তোর ভালোই চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাগ্য কে বদলাবে বল! ছয়মাস আগে যেদিন তোর বাবা এক গুণীণকে নিয়ে এসে কবরটা বন্ধন করিয়েছিলেন তখনই মানা করেছিলাম তাঁকে। শোনেননি তিনি। তারপর থেকেই তো স্বপ্নে তার ডাক শুনিস তুই! তাইনা!” বৃদ্ধ বলেন থেমে থেমে।
–” কিন্তু আপনি কে! কেমন করে জানলেন এসব!” বিস্ফারিত চোখে কাঁপা গলায় প্রশ্ন করে রোহিণী।
–” আমি যে তার হতভাগা বাপ রে! আমার তাজা ছেলেটা অ্যাক্সিডেন্টে যেদিন চোখ বুজলো সেদিন তোর কান্না গোটা গ্রাম শুনেছিল। তোর বাবা মা জোর করে নিয়ে গিয়েছিল তোকে। শুনেছি তোর মাথার সার্জারিও করায় তারা, যাতে তুই ভুলে যাস রায়ানকে। মৃত্যুর পরেও সে যে ছাড়তে পারেনি তোকে, তার তোর স্মৃতি থেকে তাকে মুছে দিতে চেয়েছিলেন তাঁরা। যাতে সে তোর কাছে যেতে না পারে তারজন্য বন্ধনও করিয়েছিলেন কবরটা… কিন্তু, পারলেন কি আটকাতে! বল পারলেন!” হা হা করে হেসে ওঠেন বৃদ্ধ।
–” কিন্তু, রায়ানকে কবর দেওয়া হলো কেন! মানে দাহ… ” অবাক হয়ে প্রশ্ন করে রোহিণী।
–” ইচ্ছে করে করিনি। দাহ করলে যে তাকে চলে যেতে হতোই তোকে ছেড়ে। তা সে চায়নি। আমায় জানিয়েছিল সেকথা। তাই এখানেই মাটির ঘরে শুইয়ে রেখে এতদিন পাহারা দিয়েছি তাকে। আজ আমার ছুটি। যা, নিয়ে যা তোর জিনিস। মুক্তি দে ছেলেটাকে। ” হাত দিয়ে মাছি তাড়াবার ভঙ্গিতে বলেন বৃদ্ধ।
কড়কড় শব্দে বাজ পড়ে। বৃদ্ধের চোখদুটো কেমন যেন অপ্রাকৃত উজ্জ্বল দেখায়। রোহিণী বড্ড ভারী বোধ হয় নিজের শরীর। সুতোর বাঁধন পটাপট ছিঁড়ে সে পাগলের মত মাটি খোঁড়ে। মাটির ভেতর থেকে অস্পষ্টভাবে জেগে ওঠে কঙ্কালশরীর…মুষলধারে বৃষ্টি নামে।
* * *
–” রোহিণী কোথায়? দেখছিনা তো তাকে। এত বৃষ্টিতে গেলো কই!” অফিস থেকে ফিরে প্রশ্ন করেন প্রতীমবাবু।
–” জানিনা, আমাকেও কিছু বলে যায়নি। হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গিয়েছে দুপুরে। ” চিন্তিতস্বরে উত্তর দেন বানী দেবী।
–” ওকে যেতে দেওয়া উচিত হয়নি বানী। জানো তো সবই, তারপরেও একলা ছাড়া! “
–” কি করবো বলো! তোমার মেয়ে কার কথা শোনে! “
দম্পতির কথা শেষ হয়না, সদর দরজা দিয়ে কাকভেজা হয়ে ভেতরে প্রবেশ করে রোহিণী। তার চোখদুটো আজ অসম্ভব ঘোলাটে, স্থির হয়ে চেয়ে আছে পিতামাতার দিকে।
কন্যার দিকে এগোতে গিয়েও থমকে যান দম্পতি। কি যেন একটা ধরা রয়েছে রোহিণীর হাতে, একটা কঙ্কালই তো! বজ্রাহতের মত থমকে যান তাঁরা। তাঁদের চোখের সামনেই শরীরটা বাঁকিয়ে চুরিয়ে ঘরময় ঘুরে বেড়ায় রোহিণী, খিলখিল হাসে৷ কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে লালা।
–” পারলেন! পারলেন না তো! পারবেন না জানি। রোহিণীকে আমি নিয়ে যাবোই। কেউ আলাদা করতে পারবে না তাকে আমার থেকে, আপনারাও না! ” হেঁড়ে পুরুষ গলায় অস্বাভাবিক স্বরে কথা বলে রোহিণী। কঙ্কালের একটা আঙুলের হাড় ছুঁড়ে মারে প্রতীমবাবুকে লক্ষ করে৷
–” রায়ান! তুমি আবার ফিরে এসেছো! “
–” হ্যাঁ আমি! আপনার গুণীণ আমায় রোহিণীর থেকে আলাদা করতে পারেনি। সে নিজেই নিয়ে এসেছে আমাকে!” একদলা থুতু সশব্দে মাটিতে ফেলে বলে রোহিণী।
–” রায়ান প্লিজ! প্লিজ রোহিণীকে মেরোনা। ও ছাড়া যে আমাদের কেউ নেই। ” হাহাকার করে কেঁদে ওঠেন বানী দেবী।
–” আর আমার! আমার কে আছে ও ছাড়া! মৃত্যুর পরেও জাগতিক মোহে আটকে থাকার যন্ত্রণা বোঝেন! দুটো বছর সে যন্ত্রণা সয়েছি আমি। আর না, রোহিণীকে এবার আমি নিয়ে যাবোই। তাকে ছাড়া মুক্তি নেই আমার। ” ফ্যাঁসফেঁসে স্বরে জবাব দেয় রোহিণী। শরীরটা বাঁকিয়ে দ করে বসে থাকে অন্ধকারে।
–” কিন্তু রায়ান, তুমি তো ওকে ভালোবাসো। তুমি কি চাওনা সে বেঁচে থাকুক, ভালো থাকুক! নিজের ভালোবাসার মানুষকে হত্যা করতে পারবে তুমি!” শেষচেষ্টা করেন প্রতীমবাবু।
–” আত্মা ভালোমন্দ বোঝে না। সে শুধু মুক্তি খোঁজে। রোহিণীকে না নিয়ে গেলে আমার মুক্তি নেই। অনেক আগেই নিয়ে যেতাম তাকে, আপনাদের জন্য পারিনি৷ তবে এবার আর না! আপনাদের সামনেই নিয়ে যাবো ওকে!”
রোহিণীর শরীরটা তীব্র ঝাঁকুনি খেয়ে মোচড় দেয় বারবার, চোখে ফুটে ওঠে অসহ্য যন্ত্রণা। একবার ঠোঁটদুটো ফাঁক হয়, ” বাব – বাব – বা”! মট করে শব্দ। রোহিণীর নিথর শরীর আছড়ে পড়ে মেঝেতে, মুখ দিয়ে গলগল করে বেরিয়ে আসে রক্ত।
প্রবল হাওয়ার তোড়ে ধুপধাপ শব্দ করে জানালা – দরজা, একমাত্র সন্তানের মৃতদেহের সামনে নির্বাক বসে থাকে হতভাগ্য দম্পতি। বাইরে বৃষ্টির মাঝে হাত ধরাধরি করে হাঁটে দুটো ছায়া অবয়ব।।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।