গল্পসল্পে পদ্মাবতী রায় চৌধুরী

মুক্তিলতা

-তুমি আজও যাবে?রাস্তাঘাট আর কিছু বাকি নেই মনে হয়…কারেন্টও কতদিনে আসে দেখো !
অঞ্জন জলের বালতি হাতে নিচে নামতে নামতে বললো ৷
গতকালের ঝড়বৃষ্টির পর এখন সবে ভোর ছটা ৷ উম্পুন ঝড়ে উলটেপালটে গেছে শহরটা ৷ পায়ে দ্রুত চটিটা গলাতে গলাতে ব্যস্তভাবে অনীতা বললো,
-না গেলে হয়!একবার দেখে আসব না ওরা কেমন আছে ! আদৌ আর আছে কিনা!তার গলা কেঁপে যায় ৷ তাড়াতাড়ি চলে আসব,বাচ্চাটা বিছানায় একা ঘুমাচ্ছে,গড়িয়ে আবার পড়ে না যায় দেখো!
রাস্তায় নেমে সে স্তম্ভিত হয়ে গেলো ৷ সাড়ে ছটার কাছাকাছি বাজে ৷ দ্রুত পা চালালে তাদের পুরোনো বাড়ি এখান থেকে মিনিট পনেরো-কুড়ি ৷ আরোগ্য সেতুর অ্যাপ দেখাচ্ছে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে নাকি বারোজন করোনা আক্রান্ত রয়েছে ৷ সারারাস্তা কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়ায় মিলেমিশে গতকাল রাতের তান্ডবে যেন লালহলুদ আবির খেলেছে ৷ গাছের ডাল,ছেঁড়া ইলেকট্রিকের তার টপকাতে টপকাতে তার মনে হলো,সারা পথজুড়ে যেন গাছ নয়,মৃতদেহ ছড়িয়ে আছে ৷ তাও সে ছুটছে প্রাণপণে পুরোনো বাড়ির দিকে ৷
বাড়িটা বেশ পুরোনো ৷ বর্ষায় বৃষ্টি ভিজে শ্যাওলা জমে যায় ৷ এবাড়িতেই সে বড়ো হয়েছে ৷ গেটের তালায় চাপ দিতেই ক্যাঁচক্যাঁচ করে উঠলো মরচে লোহার শরীর ৷ অভ্যস্ত পায়ে বসার ঘর পার করে বাথরুমে ছুটেছে ৷ বালতি দুয়েক জল তুলে ঈশ্বরকে মনে করতে করতে ছাদের দরজা খুললো ৷ ওরা বেঁচে আছে তো!হতভাগা ঝড়ঝাপটায় ওদের উড়িয়েই না নিয়ে যায় ! নাহ্ ! ওই তো দক্ষিণের দিকে ছিটকে পড়ে আছে,তুলসী,ঝুমকোজবা,আর টগরখানা…কিন্তু একি!তার সাধের লকলকিয়ে যৌবন আসা কুন্দকুসুমের চারাখানা বেঁকেচুরে ভেঙে পড়ে আছে ৷ অনীতার চোখে জল আসে,সে এই ভয়টাই পাচ্ছিলো ৷ বড্ড আদুরে,যত্ন করে করে কুন্দগাছটাকে বড়ো করেছিল সে ৷ সারাশরীরজুড়ে সাদা খাঁজকাটা ফুলে রাতের বাতাস ভরিয়ে রাখত গাছটা ৷ মরে গেল ৷ সে আবার কাঁদে ৷ ভেঙে যাওয়া ডালে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে কাঁদে ৷ সবাই তাকে ছেড়ে এভাবেই চলে যায় ৷ কেউ থাকে না ৷ একসময়ে আবার উঠে দাঁড়ায় ৷
তারপর ঘণ্টাখানেক ধরে চললো,ছাদ সাফাই অভিযান ৷ নিচ থেকে বাতিল বালতি,মাটির কলসী এনে এনে মাটি জড়ো করে সবকটা গাছকে নতুন করে পুঁতে ফেলেছে ৷ এবার কুন্দকুসুমের ভাঙা ডালগুলিকে কাটিং করে গোবরসারের মাটিতে নতুন করে গাঁথতে আরম্ভ করলো ৷
-জানিস,এটা আমার বাড়ি ৷ বাবা মা অফিস যেত ৷ আমি একলা ঘুরতাম…এই বাগানে ছাদে…আমগাছের ডালে মায়ের শাড়ি বেঁধে দোলনা ঝুলতাম ৷ কতদিন পড়ে গেছি,কেটে গেছে…কত রক্ত…অনীতা হাসে,আমিই ওষুধ লাগাতাম…দুপুরবেলা একা একা ভাত বেড়ে খেতাম ৷ সন্ধ্যা নামত,রাত হত…ওরা ফিরত…ক্লান্ত থাকত…আদর করত না আমাকে ৷ কিন্তু আমি তো তোদের আদর দিই,সন্তান কী জিনিস আমি জানি তো ৷ এই যে পুঁতে দিচ্ছি,তুই আবার বেঁচে উঠবি দেখিস ৷ অনীতা জল ঢালে গাছের গোড়ায় গোড়ায়…গতকালের ঝড়ের সাথে যুদ্ধ করতে করতেও তিনটে ফুল ফুটেছে ৷ সে কুন্দকুসুমের গায়ে হাত বোলায় আর আপনমনে বিড়বিড় করে চলে,
-জীবন তো এটা!কঠিন খেলা…শূন্য থেকে শুরু করতে হয় বারবার ৷ এই যে মা গান গাইত,অফিস যেত,উল বুনত…তারপর প্যারালিসিস হয়ে গেল একদিন ভোরে,এই সিঁড়ি দিয়ে পড়ে গিয়ে ৷ পাঁচবছর শুয়ে ছিল ৷ আমাকে চিনতে পারত না ৷ আচ্ছা ওই দেখ,ওই যে জাফরিকাটা একতলার বারান্দা…ওখানে সজলদা আসত…একদিন দুপুরে ঘরে ঢুকেছিল…আমি তো চাইতাম সজলদা ওইদিনের মতই আমাকে খুব ভালোবাসুক আজীবন…অনীতা হাসে…আজীবন বলে কি কিছু হয় রে ! প্রয়োজন ফুরালেই সবাই চলে যায়…সজলদা এখন বউদিকে নিয়ে অনেকদূরে কোথাও একটা থাকে…আমি আরও আরও গাছ পুঁতি…একটা আমাকে চিনতে না পারা মায়ের নামে,একটা সজলদার নামে,একটা আমার চরিত্র নিয়ে সবসময় বলে যাওয়া বাবার নামে…”মেয়েদের অত ধিঙ্গিপনা করতে নেই…অলক্ষ্মী…অলক্ষ্মী…তোকে কেউ ভালোবাসবে না…সব চলে যাবে…”হি হি ! হি হি ! আমি নাকি অলক্ষ্মী…আবার ঝরঝরিয়ে দুফোঁটা জল পড়ে কুন্দগাছের গোড়ায় ৷ একটু চুপচাপ হাওয়া বয়ে যায় ৷ আবার সে গাছের কানেকানে বলে,
-আরেকটা গাছ আমার সম্মন্ধ করে পাওয়া বরের নামে…সবাই বলে আমি বেশ সুখি…কিন্তু আমার কোনও শান্তিবোধ হয় না কেন?ওর মধ্যে একটা দাবির মেশিন আছে,সজলদাকে কত খুঁজি,পাই না কেন? তোদের শরীরে হাত না দিলে,তোদের না দেখলে আমি কেন শান্তি পাই না এখনও ৷ আমার তো তোরা ছাড়া কথা বলারই কেউ নেই…তার চোখে জল আসে,ফেলে আসা সবকটা সম্পর্ক…মমি করিনি…গাছে প্রাণ দিতে বলেছি ঈশ্বরকে ৷ আমি কি খুব অন্যায় করেছি ?
কুন্দকুসুমের নতুন হয়ে ওঠা চারা দুলতে থাকে হাওয়ায়…বৃষ্টিতে ৷ ছাদের দরজা বন্ধ করতে করতে অনীতা বলছে,তোকে এবার লাগালাম আমার মেয়ের জন্য ৷ ও আসবে,তোকে ছুঁয়ে বুঝবে…মানুষ কথা দিয়ে কথা রাখে না…কিন্তু গাছ সত্যিই কথা বলে…কান পেতে থাকতে হয়…গাছ উত্তর দেয়…অন্য একটা ভাষায়…তারাদের ভাষায়…চাঁদের ভাষায়…ঈশ্বরের মত ভালোবাসে…কোনদিন ছেড়ে যায় না ৷
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!