বর্ষায় প্রেম সংখ্যার গল্পে পাঞ্চালী ঘোষ

ছোটবেলার কয়েক বছর পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় কাটানো ছাড়া, বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা কলকাতাতেই। কলেজে পড়ার সময়ই বিবাহ। পড়াশোনা শেষে চাকরি। প্রায় তিরিশ বছরের চাকরি জীবনে বহুজাতিক এবং সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে লিপ্ত বিভিন্ন সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। বাংলা সাহিত্যে অনুরাগী হলেও কর্মজীবন শেষ করে সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ এবং লেখালেখির শুরু।

অলক্ষ্মীর রূপ

লকডাউনে সরকার থেকে রেশনের চালের বরাদ্দ বাড়িয়েছে, সকাল থেকে দু-ঘণ্টা লাইন দিয়ে তবে সেই চাল জুটেছে… রেশন দোকান থেকে এইমাত্র বাড়ি ফিরলো পারুল। …. কোথা থেকে একটা চাপা মেয়েলি কান্না কানে আসছে পারুলের, চারিদিকে কেমন একটা অশুভ ছায়া, কদিন ধরেই একটা মিশকালো বেড়াল বাড়ীর চারিদিকে ঘুরছে আর মনে কেমন যেনো একটা কু-ডাক দিচ্ছে। একটা শ্বাস বুকে চেপে পারুল তার স্বামী কমলকে জিজ্ঞাসা করে
— “হ্যাঁ গো এই বার ঘর এক উঠানের এই শরিক বাড়ির কার ঘরে ঝগড়া লাগলো গো”?
কমল ঠোঁটের কোণে ব্যাঙ্গের হাসি টেনে বলে
–“কি গো? ছেলে বউ এর গলা বুঝতে পারছ না?”
পারুল জোরে জোরে নিশ্বাস নিল, বুকের ওঠা নামা টের পাচ্ছে… চাপা গলায় কেমন ফ্যাসফ্যাসে শোনাচ্ছে ওর কথাগুলো… বুকের ভিতর থেকে উঠে আসছে …”অলক্ষ্মী… অলক্ষ্মী! শেষে কিনা দেখে শুনে একটা অলক্ষ্মী নিয়ে এলাম ঘরে!.. তো ওদের লাগলো কি নিয়ে?”
কমল বলে…”কালকেই তো কোম্পানি চিঠি দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে যে শঙ্করের চাকরিটা আর নেই! নতুন বউকে কাল বোধহয় জানায়নি। কবে বলেছিল ওকে একটা নতুন স্মার্ট ফোন কিনে দেবে… সেটা দিতে পারেনি তাই হয়তো বউ কিছু বলেছে তোমার ছেলেকে! ছেলে মাথা ঠিক রাখতে পারেনি, গালাগাল করেছে… অপয়া বলে….কি জানি দু’ঘা বসিয়েও দিয়েছে বোধ হয়।”
….”মরণ! মরণ! অপয়া মেয়েছেলে! স্বামীর ঘরে আসতে না আসতেই এমন দুর্দিন ঘনিয়ে এলো?”
নিজের মনেই গজগজ করতে থাকে পারুল… “লকডাউন, সেই কবে থেকে ছেলেটা বাড়ী বসা, রোজগারপাতি যাও এতোদিন একটু আধটু ছিলো তাও বন্ধ হল, চাকরিটাই আর নেই। এ আবাগীর মেয়ের কোনো চিন্তা আছে না বোধ বুদ্ধি আছে! না কি বুঝেও না বোঝার ভান করে? আব্দার দেখো! এটা কি মোবাইল চাইবার সময়?…. দোকানপাট ও তো খুলতে হবে কিনতে গেলে! কিছুই বোঝেনা, না কি? বেশ করেছে শংকর… দে দে একেবারে মুখ বন্ধ করে দে, যাতে আর কিছু চাইতে না পারে ওই অলক্ষ্মী!”
মনে মনে কি একটু আনন্দও হলো!… তাও ভালো, ছেলেটা তাহলে এখনও বউ এর পোষা ভেড়া হয়ে যায়নি।
পারুল ভাবে সবই তার পোড়া কপালের দোষ, জন্ম থেকেই অভাব আর অভাব। সব সময় চোখের সামনে অন্ধকার। এই অন্ধকার বোধহয় আর কোনোদিনও কাটবে না। গরীবের ঘরের মেয়ের আর কি সুখ হবে? জন্মের পরেই বাবা মরে গেলো। দাদারা দেখে শুনে বিয়ে দিলো পারুলের, ছেলের নাম কমল, সে নাকি শিক্ষিত, বি.এ পাস। কোন এক ফ্যান তৈরীর কারখানাতে কাজ করে। শ্বশুরের একটা ভিটে আছে! আর কি চাই। হা পোড়া কপাল! সে যে চিররুগ্ন সে খবর দাদারা নিলোনা? প্রায়ই ঘুসঘুসে জ্বর লেগে থাকে, বুকের ভিতর চাপা শ্বাসের কস্ট। যা সামান্য কাজ করে তাও রোজ দিন যেয়ে উঠতে পারেনা
শরীরের কারণে। তাও মালিকটা ভালো বলতে হবে, একেবারে বসিয়ে দেয়নি। যে মাসে যেমন পারে দুই হাজার/ তিন হাজার তাই ফেলে সংসারে, এদিকে সংসারে চারটে হা মুখ, ওরা দুজন আর দুই ছেলে, বড়ো শংকর আর তার তিন বছরের ছোট হরি। হরি আবার জন্মহাবা। মাথাটা বড়ো, বিশাল বড় চেহারা, ঘাড়ে গর্দানে এক, ড্যাবড্যাবে চোখে তাকিয়ে থাকে… ছোট থেকেই ধাক ধাক করে শুধু বেড়েই চলেছে। পারুল ভাবে এ তার গর্ভদোষ। বড়ো, শংকর আবার ঠিক উল্টো চালাক চতুর, বলিয়ে কইয়ে….ফর্সা, লম্বা যাকে বলে হ্যান্ডসাম, বাইক চালিয়ে যখন যায় মায়েরই নজর লেগে যায়… ওকে নিয়েই যতো স্বপ্ন পারুলের, পড়াশুনা শেখাবে, চাকরি করবে, লক্ষীমন্ত মেয়ে দেখে শঙ্করের বিয়ে দেবে।
সে সময় সংসারের নিত্য অভাব নিয়ে আর পারা যাচ্ছিলো না শেষে বাবুর বাড়ীর রান্নার কাজ নিল পারুল, সেও প্রায় বছর পনেরো ষোল হতে চললো। সারাদিন এবেলা ওবেলা মিলিয়ে পাঁচ বাড়ী রান্না করে সে। এদিকে ভাগ্যটা ভালো বলতে হবে, বাড়ীর বৌদি আর মাসিমাগুলো ভালো, পারুলকে পছন্দ করে, ভালোবাসে। সময়ে অসময়ে সুদ ছাড়া মাঝে মাঝে তারা পারুলকে টাকা ধারও দেয়, পারুল সময় মত শোধ করে। দাঁতে দাঁত চেপে যুদ্ধ, শংকর কে পড়াশুনা শেখাতেই হবে, ভগবান কথা শুনেছেন, বাপের বাড়ি থেকে দাদারাও সাহায্য করেছিল । শংকর আই টি আই থেকে ডিপ্লোমা পাস করেছে, হাতের কাজের ট্রেনিং নিয়ে একটা গাড়ির যন্ত্র তৈরির কারখানায় কাজ পেলো, মাইনে আর উপরি না কি! সব মিলিয়ে হাজার বার পাবে। ঠাকুর বোধ হয় এবার মুখ তুলে চাইলেন।
বুকের ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে এলো পারুলের। সবে গত মাঘ মাসে ছেলে শঙ্করের বিয়ে দিয়েছে পারুল। নিজে গিয়ে শ্যামাকে পছন্দ করেছে তার শঙ্করের জন্য। ঘটকালি করেছিল দুর সম্পর্কের এক মাসি। এক দেখাতেই পছন্দ হয়েছিল শ্যামাকে। গায়ের রং সামান্য চাপা ঠিকই, মুখের আর শরীরের গড়নে বেশ একটা ঢলঢলে ভাব আছে, চোখ দুটো ভারি টলটলে।চেহারার সঙ্গে ওর শ্যামলা গায়ের রং আর শ্যামা নামটা খুবই মানিয়েছে। উচ্চমাধ্যমিক পাস করে নার্সিং ট্রেনিং নিচ্ছে, শেষ পরীক্ষা দিতে আর মাস ছয়েক বাকি, পারুল শুনেছে নার্সদের নাকি এখন খুব চাহিদা, পাসটা করতে পারলেই কোনো না কোনো হাসপাতালে চাকরি পেয়ে যাবে। আমার শংকরও তো দামি পাত্র…ডিপ্লোমা পাস। বউ ছেলে দুজনই চাকরি করবে, ওরা সুখে থাকবে। শংকর আর শ্যামা যেনো রাজযোটক।
মাঘ মাসে বিয়ে, বৌভাত, দ্বিরাগমন শেষ করতে করতে ফাল্গুন মাস পড়ে গেলো। বেশ কাটছিল, দুটিকে দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। মেয়েটা বড়ো লক্ষ্মীমন্ত।
চৈত্র মাসের প্রথমে কি এক ভয়ের খবর ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে, করোনা নামের কি এক মারন ভাইরাস না.. কি এক জীবাণুর ছোঁয়াচ ছড়িয়ে পড়ছে, সারা পৃথিবী জুড়ে হাজারে হাজারে মানুষ মারা যাচ্ছে , সাংঘাতিক তাড়াতাড়ি ছড়াচ্ছে এই রোগ। সরকার থেকে প্রচার চালাচ্ছে …. সবাইকে মুখ নাক ঢেকে চলতে হবে, বারে বারে হাত ধুতে হবে। কি রোগ রে বাবা এটা?কোনদিনও শুনিনি, এ রোগের চিকিৎসার কোনো ওষুধ নাকি এখনো বেরোয়নি। …..কয়েক দিন কাটতে না কাটতেই সরকার ঘোষণা করলো একুশ দিন লকডাউন, নতুন কথা, কেউই নাকি এ কথাটা আগে শোনেনি। সবাইকে ঘরে নিজেকে বন্দী করে রাখতে হবে, ঘরের মধ্যেও একে অপরের থেকে দূরে দূরে থাকতে হবে, তবেই নাকি এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া রোখা যাবে। সমস্ত স্কুল, কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ,শ্যামার নার্সিং কলেজও বন্ধ । কমল আর শংকরের অফিস বন্ধ। বাবুর বাড়ী থেকে বললো কাজে না যেতে।… প্রথম প্রথম ঠিকই চলছিলো, বেশ ভালই তো, কত দিন এমন ছুটি পাইনি। ছেলে-বউ ও নিজেদের কাছে পেলো অনেক সময় ধরে। আজকালকার ছেলে… সেই কবে থেকেই ভেবে রেখেছিল, বিয়ের পরে নতুন বউ নিয়ে হনিমুনে দীঘা যাবে…. যেতে পারেনি তো কি? বাড়িতেই তো হলো হানিমুন।
এর মধ্যেই শংকর আর কমলের মাইনেও এসে গেলো ওদের ব্যাংক একাউন্টে, শুধুই মাইনে! উপরি কিছু পায় অন্য মাসে সেটা নেই। বাবুর বাড়ী থেকে ডেকে আমার মাইনটাও দিয়ে দিল। লকডাউন আরও বাড়ল…. এবার সকলের কপালে চিন্তার ভাঁজ…. মাইনে এলো অর্ধেক! সত্যিই তো, বাড়িতে বসিয়ে আর কত মাইনে দেবে মালিকপক্ষ? লকডাউন আরও বাড়ল, শঙ্করের অফিস থেকে ছাঁটাই এর খবর নিয়ে ইমেইল এলো।
পারুল ভাবে, এর পরে কি? তবেকি তার মনের আশঙ্কাই ঠিক নতুন বউই অপয়া? সত্যিই কি সংসারে ওই অলক্ষ্মীর দশা লাগলো!
…….
জানলা দিয়ে সকালের রোদ বিছানায় এসে পড়তেই শ্যামার ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। মাথা টন টন করছে, কাল রাতে অনেক কেঁদেছে, চোখটা আজও ভারী হয়ে আছে। মনের মধ্যে চাপা কষ্ট হচ্ছে…. কি এমন বলেছি? স্মার্ট ফোন কিনে দেবে তুমিই তো বলেছিলে… চাকরি চলে গেছে সে তো আমায় জানাও নি? জানলে ভারি আমি তোমার কাছে ওটা চাইতাম? এই কারণে তুমি আমাকে অপয়া বললে আমিই নাকি অলক্ষ্মী… আমি এ বাড়িতে পা রাখার পর থেকেই যতো অঘটন! গায়ে হাত তুললে? জানতে চাইলে না আমার মনের কথা? শ্বশুর শ্বাশুড়ি তারাও কি তবে আমাকে অলক্ষ্মীই ভাবছে? কত দিন ধরে দেখছি মা আমার সঙ্গে ভালো করে কথা বলছে না, কথা বলতে গেলেই বাঁকা সুরে উত্তর দিচ্ছে, সব সময় মুখ ভার করে রয়েছে। খাবার সময় ঠেস দিয়ে কথা বলছে, বাজারে সব নাকি আগুন দাম। কি ভাবে পাঁচটা মুখে খাবার জুটবে… শুনে খারাপ লাগে, চোখ ফেঁটে জল আসে, মুখ বুজে থাকি। আচ্ছা এটা তো আমারও বাড়ি! আমাকে তো কেউ জিজ্ঞাসা করেনা যে আমি কি ভাবছি এই দুঃসময় নিয়ে? আমার কষ্ট হচ্ছে কিনা? এখনও বিয়ের জল শুকায়নি এখনই সম্পর্ক এতো ঠান্ডা হয়ে গেলো? পাশে শুয়ে হাতটা ধরতে গেলাম, হাতটা সরিয়ে দিলো? কিছু নাকি ভালো লাগছেনা, আমাকেও ভালো লাগছে না? কান্না পাচ্ছে…. এই কটা দিনেই শংকর এমন পাল্টে গেলো…. নাকি এই দুঃসময় ওকে পাল্টে দিলো। সবাই আমার ওপর বিরক্ত একমাত্র হরি আগের মতোই আছে, কিছু বোঝেনা তাই, না হলে সেও কি ওদের মত হতো? …… আমার যে ভয় লাগছে, সত্যিই কি আমি অলক্ষ্মী? বাবা যে বলে আমি নাকি তার লক্ষ্মী ! দুই দিদির পরে আমি জন্মাবার পরেই নাকি বাড়ীর অভাব মিটেছে, বাবা স্থায়ী চাকরি পেয়েছিলো। মা যে বলতো আমি শ্বশুরবাড়ির লক্ষ্মী হবো!… মাথাটা কেমন ভার লাগছে, নাহ্ এক কাপ গরম চা খেলে তবে যদি মাথা ভারটা কমে। এবার উঠে পড়ি, চা বানিয়ে সবাইকে দিয়ে আসি যদি ওরা একটু খুশী হয়।
ইস্, আয়নায় চেহারাটা কেমন লাগছে? চোখের কোনা ফুলে গেছে, চুলগুলো এদিক ওদিক জট পাকিয়ে আছে। নাহ্ কাল আর একটু বুঝে কথা বলা উচিত ছিল। মেজাজ ওর খারাপ ছিল সেটা তো বোঝাই যাচ্ছিলো।
না না, মন ঠিক করতে হবে, নার্সিং কলেজ বন্ধ তো কি হয়েছে, পড়াশুনা চালাতে হবে, ভালো করে পাশ করে একটা চাকরি জোগাড় করতেই হবে। দুর্ভাগ্য আমার দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। পড়াশুনাই আমাকে এই অবস্থাতে একমাত্র ঠিক রাখতে পারবে।
পারুল ভাবে, আজ লকডাউনের পঞ্চান্ন দিন…. সকাল থেকেই ঝোড়ো হাওয়া বইছে, সরকার থেকে প্রচার চালাচ্ছে, সাবধান করছে আম্পান নামের কি এক ঘূর্ণিঝড় নাকি আছড়ে পড়বে আজ বিকেল থেকে। আগেও এরকম কিছু সাবধান বার্তা শুনেছি, ফনি, বুলবুল কতো নাম ঝড়ের, সেরকম বিপদের কিছুতো এদিকে হয়নি আগে। তাও সাবধানের মার নেই, রান্না যেটুকু করবার করে রাখি, শংকরকে বলতে হবে পুরনো লন্ঠন দুটো বার করে যেনো কেরোসিন ভরে রাখে, সেটাও বাড়ন্ত ঘরে, লিটার তিনেক আরো জোগাড় করে রাখতে হবে, কখন বিদ্যুতের আলো নিভে যায় কে জানে…. তখন ওই লন্ঠনের আলোই ভরসা। কলঘরে বড়ো ড্রামটাতে জল ভরে রাখতে হবে। আঁচল দিয়ে ঘাড় কপাল মুছলো ভালো করে, জ্যৈষ্ঠের গরম, একবারে গা হাত পা জ্বালিয়ে দিচ্ছে….. গ্যাস জ্বালালো পারুল, বাব্বা! এখন তো তাও গ্যাসের উনুন, রান্না করবার কষ্ট তবু কিছু কমেছে… চাল ধুয়ে ভাত বসালো পারুল। টগবগ করে ভাত ফুটছে, ফ্যান উথলে উঠছে, হাঁড়ির মুখের ঢাকনা টা নামিয়ে দেয় পারুল। কলমী শাক রাঁধবে… বেগুন দিয়ে… একটু কাসুন্দি মেখে গরম ভাতে কলমী শাক, আহা, কি স্বাদ! মাছের বড়ো দাম, এক আধদিন যদি জোটে সেদিন পাতে মাছ পড়ে, অন্যদিন হয় ডাল আর আলু সিদ্ধ নতুবা সয়াবিনের তরকারি। সয়াবিনে নাকি অনেক উপকার। আজ ওরই একটা ঝোল ঝোল তরকারি করবো না হলে এই পাঁচটা পাতে দিয়ে কুলাতে পারবো না।
দাওয়াত চিৎপাত হয়ে শুয়ে ঘুমাচ্ছে হরি, মুখের কস বেয়ে লালা গড়াচ্ছে, এতো বেলা হয়েছে হুঁশ নেই, এখনো ঘুমাচ্ছে। দাওয়াতে এসে হরিকে ঠেলে তুলতে চাইলে পারুল … “অ্যাই অ্যাই ওঠ। … এতো বেলা হলো, পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিস যে বড়ো! যা ওঠ, দেখ কেমন আঁধার হয়ে আসছে চারিদিক, ঝড় উঠছে, তাড়াতাড়ি মুখ হাত পা ধুয়ে আয়.. রুটি রাখা আছে খেয়ে নে গে যা”। হরির নড়ার লক্ষণ নেই। পারুল ঝাঁকিয়ে তুলল ছেলেকে….” যা বাপ, বেলা গড়িয়ে যায়, তাড়াতাড়ি উঠে পড়”।
শংকর বেরিয়েছিল হাতে একটা থলি নিয়ে… কটা সবজি আনতে হবে। ফিরে এসে দাওয়ার মেঝেতে থলি উপুড় করল। আলু, কাঁচা লঙ্কা, পটল, কুমড়ো আর কটা ছোট ছোট তেলাপিয়া। পারুলের চোখ খুশিতে চকচক । যাক ছেলে দুটো মাছ এনেছে। সর্ষেবাটা দিয়ে তেলাপিয়া …. আজ খাওয়াটা রসিয়ে করা যাবে।
শঙ্করের মুখ থমথমে যেনো। হবেই তো কত চিন্তা মনে। মা এর মন সব বুঝতে পারে।
দুপুর থেকেই হওয়ার গতি ঊর্ধ্বমুখী, কি জানি কি হয়, সকাল থেকে ডান চোখের পাতা কাঁপছে, কি জানি আরো কত খারাপ ঘটবে, মনে এক অজানা আশঙ্কার ছায়া। ঘড়িতে এখন চারটে বাজে, বিকেল মনে হচ্ছেনা, আকাশে ঘন কালো মেঘ চিরে বিদ্যুতের ঝলক, চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। কারেন্ট চলে গেল। বাইরে ঝড়ের গতি বাড়ছে… আছড়ে পড়ছে টিনের চালে, সঙ্গে হওয়ার দাপট আর বৃষ্টি, সব উড়িয়ে নিয়ে যাবে মনে হচ্ছে। একটা জালনার কাঁচ ভাঙার শব্দ। জালনা দিয়ে জল ঢুকছে, দরজা আটকে রাখা যাচ্ছেনা, ভয় হচ্ছে ইঁটের গাথনির দেওয়াল ভেঙ্গে পড়বে। সামনের সুপুরি গাছটা মড়মড় করে ভেঙ্গে পড়লো, মনে হচ্ছে চারিদিক ধ্বংস হবে।
“হরি…. হরি…. “! কই, এইতো ছিলো বসে দাওয়ায়… কোথায় গেলো এই ঝড় বৃষ্টিতে? মা এর বুক ধড়াস করে উঠলো… ছুটে বের হতে যাচ্ছিল হরির খোঁজে। কমল আটকালো
… “তুমি কি পাগল হলে? ঝড় না থামলে কিচ্ছু করা যাবেনা। ঝড় থামার অপেক্ষা করতে হবেই!”
ঝড় থামলো যেনো, একটু শান্ত হলো চারিদিক, ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকার, এক এক বার ইলেকট্রিক কারেন্ট আসছে বিদ্যুতের ঝলকানির মতো, আবার পরক্ষণেই চলে যাচ্ছে….. শংকর বেরোলো হরির খোঁজে, পথে দুলাল কাকার সঙ্গে দেখা, জানালো হরি নাকি কাছের পোষ্ট অফিসের বারান্দায় দাড়িয়ে ছিল, কেউ কেউ তাকে দেখেছে। তাহলে বেশি দূরে যায়নি, পোস্ট অফিস পর্য্যন্ত পৌঁছতে হবে। কি জানি কোথায় ইলেকট্রিক তার পড়ে আছে, সাবধানে পা ফেলতে হবে।
হরি ফিরলো, পারুলের প্রাণ শান্ত হলো.. শংকর কই?…. “হ্যারে হরি? তোর দাদা কই?তোকে খুঁজতে গেলো তো সে?”
হরি হওয়ায় হাত ঘুরিয়ে ড্যাবড্যাবে চোখ ঘুরিয়ে জানান দিল যে সে শংকরকে দেখেনি।
…. “তো এখন কাকে দেখতে পাঠাই?” পারুলের ডান চোখটা তিরতির করে কেঁপে চলেছে, কি জানি কি হয়!
সব বুঝলো শ্যামা, একটু থমকালো, বাইরের দিকে তাকিয়ে অন্ধকারটা ঠাওর করে নিল, একবার ঘাড় ঘুরিয়ে শ্বাশুড়ির দিকে তাকালো…পারুলের মুখে কালো মেঘের ছায়া। শ্যামার দিকে তাকিয়ে কি চোখ নামিয়ে নিলো? … শ্যামার বুকটা ধক্ করে উঠলো, ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। পাগলের মত ছুটছে পাগলিনী, কই শংকরকে তো দেখা যাচ্ছেনা কোথাও?…. ওই তো ওখানে অনেক মানুষের মাথা দেখা যাচ্ছে, জ্ঞানহারার মত ছুটছে শ্যামা সেদিকে, অন্ধকার ভুলে, বিপদ ভুলে, সব ভুলে ছুটছে অলক্ষ্মী….. চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে… একটা কথা কানে আসছে….একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, বিদ্যুৎপৃষ্ট হয়ে পড়ে আছে কেউ।
….. হঠাৎ কেউ যেনো টেনে ধরলো… চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসছে, আমি জ্ঞান হারাচ্ছি আর চোখের সামনে ভাসছে অলক্ষ্মীর মুখ, সেটা আর কারুর না, আমার…. আমার নিজের মুখ।
হাসপাতালে বসে আছি… নিশ্চল আমি। এ কি হলো? ওদিকে বসে আছে শঙ্করের বাবা আর পাড়ার ক্লাবের তিন চার জন। ডাক্তারবাবু বলে গেছেন, অল্পের জন্য বেঁচে গেছে শংকর, এক মুহূর্তের একটা ঝটকা লেগেছিলো, কিন্তু বিদ্যুৎতের তারে সেই মুহূর্তেই সংযোগ কেটে যায়, তাই প্রাণে বেঁচে গেছে। এই আঘাতের অভিঘাতে জ্ঞান হারিয়েছিল সে, আংশিক পক্ষাঘাতে শরীরের কোনো অংশ অচল হবার সম্ভাবনার কথাও শুনিয়েছেন ডাক্তারবাবু। শ্যামার মাথা কাজ করছেনা, অসাড় লাগছে হাত পা, তেষ্টায় গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। বাইরে এখনও ঝোড়ো হওয়া বইছে, বৃষ্টি ফোঁটা ফোঁটা পড়ছে, একটা দমকা বাতাস উড়ে এলো। চোখ বুজে এলো, চোখে ভাসছে একের পর এক দৃশ্য….বিয়ের মন্ত্র, মালা বদল, শুভ দৃষ্টি, ফুলশয্যা, আদর, খুনসুটি …. ঝগড়া… মন খারাপ… কষ্ট… লক্ষ্মী…. অলক্ষ্মী…. অপয়া…
সুন্দর একটা সংসারের স্বপ্ন নিয়েই তো এদের জীবনে আসতে চেয়েছিলাম তাহলে কেনো এমন সব ছারখার করে দিলে ঠাকুর!
— “শ্যামা, শ্যামা?”
–” হ্যাঁ”? চমকে তাকালো শ্যামা
…. “শঙ্করের জ্ঞান ফিরেছে” …কমলের ডাকে চিন্তার জাল ছিঁড়ে গেল, হুঁশ ফিরল শ্যামার
….. “আমি ওর কাছে যাবো”
….. “যাও, তবে এখন কথা বলতে পারবেনা মনে হয়, তুমিও কথা বোল না “
ছুটে পৌঁছল শ্যামা…এ কি! কি চেহারা হয়েছে শঙ্করের? মুখে আর শরীরে কেউ যেনো কালি ঢেলে দিয়েছে। কেমন নেতিয়ে পড়ে আছে। ক্ষীণ স্বরে শুধু বলতে পারলো “শ্যামা, আর কোন আশা নেই ,পঙ্গু হয়ে পড়ে থাকতে হবে, আমি মরে গেলাম না কেন?”
শ্যামা নিজেকে সামলে নিল, ভেঙ্গে পড়লে চলবে না, তাকে শক্ত হতেই হবে… শঙ্করের হাত দুটো নিজের হাতে ধরে বললো…. “আমি তো আছি… ভরসা রাখতে পারবে না আমার ওপর?”
শঙ্করের চোখের কোণে জল চিক চিক করছে…শ্যামার মুখটা কেমন যেন ঠাকুরের আসনে রাখা লক্ষ্মী প্রতিমার মত লাগছে।
সাতদিন পরে শংকরকে হাসপাতাল থেকে ছাড়লো। ডান দিকটা আংশিক পক্ষাঘাতগ্রস্ত। হাত নাড়াতে পারেনা, নিজে খেতে পারেনা, শ্যামা এখন সেবিকা। সুস্থ করে তুলতেই হবে শঙ্করকে। সেই সঙ্গে চলছে পড়াশুনা, ভালো করে পাস করতেই হবে, চাকরি পেতেই হবে… না হলে এ সংসার চলবে কি ভাবে?
শঙ্করের দুর্ঘটনার খবর পেয়ে শ্যামার বাবা এসেছিল ওকে নিয়ে যেতে…. শ্যামা যায়নি, চলে গেলে এদের কে দেখবে…. সে যে এ বাড়ীর গৃহলক্ষী, চলে গেলে এই বাড়ী যে লক্ষ্মীছাড়া হয়ে যাবে।
পারুল দেখছে….দেখছে শ্যামাকে…. কত রূপ তার…অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছে …একাধারে সেবিকা ..স্ত্রী…দায়িত্বশীলা এক পুত্রবধূ …সংসারের ভরসা, অতটুকু মেয়ের মনের জোর দেখছে, হারবে না…. এ মে‌য়ে হারতে জানেনা…. পারুল দেখতে পাচ্ছে অলক্ষীর মুখটা কেমন বদলে যাচ্ছে লক্ষ্মীতে….আর ওই ঝাপসা মুখটা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে…. দেখছে…সেটা যে শ্যামার মুখ। পারুল বুঝতে পারছেনা … নিজের পেটের মেয়ে হলে কি পারতো তাকে অলক্ষ্মী বলতে? এ কি তবে শুধুই মনের খেলা… স্বার্থের খেলা? কমল দেখছে তার শুকনো খটখটে মনের বউয়ের চোখে জলের ধারা…. একভাবে বলে চলেছে …”যত্ন করতে হবে…. চঞ্চলা লক্ষ্মীকে অচলা লক্ষ্মী করে ধরে রাখতে হবে এই বুকের মধ্যে”। কমল অবাক হয়ে দেখছে পারুলের মুখে অদ্ভুত একটা কোমলতা ফুটে উঠছে, কি সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে…… ওর মুখটা কেমন যেন পূজোর আসনে রাখা লক্ষ্মী ঠাকুরের মুখটার মতো লাগছে।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!