সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে প্রদীপ গুপ্ত

বাউল রাজা


দ্বিতীয় খন্ড (পঞ্চপঞ্চাশৎ পর্ব)

পূবের আকাশে লজ্জারাঙা রঙ ধরেছে। তার প্রকাশে গাছের ডালে কোটরে বাসা বেঁধে থাকা পাখিদের সংসারে ব্যস্তবাগীশ পাখিদের ব্যস্ততার সাড়া পড়েছে।
ধ্রুবদার নাক ডাকার আওয়াজ এখনো এতোটুকুও কমেনি। দূরে কোথাও খঞ্জনির সঙ্গতের সাথে কোনো বোষ্টুমির রিনরিনে গলায় গানের আওয়াজ ভেসে আসছে।
–” ঠাকুর –“
–” উ –“
— ” এবেরে ওটো । তৈরি হয়ে নাও। “
এতোক্ষণে আবিষ্কার করলাম আমি বাউলনির কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছি, আর তার শালুকডাঁটির মতো নরম আঙুল বিলি কেটে যাচ্ছে আমার চুলের ভেতরে।
আমি উঠে বসলাম। যেটাকে রাতের বেলায় পর্ণপুট রচিত শয্যা বলে মনে করেছিলাম, ঊষাকালের লাজভাঙা আলোয় দেখি সেটা আসলে একটা হোগলাপাতার মাদুর।
আমি ধীরে ধীরে উঠে বসলাম। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখি জবা ফুলের মতো টকটকে রক্তবর্ণ হয়ে রয়েছে। আমি বুঝলাম যে এই রঙ শুধুমাত্র রাত জাগার ফলশ্রুতি নয়, অবিরাম ধারায় অশ্রু প্রস্রবণের ফল। হায় রে! এতক্ষণ ধরে এই মাতৃময়ী নারী কেঁদে ভাসিয়েছেন আর আমি তার কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়েছি!
–” বাউলদিদি, আমি কি তোমার মনে খুব ব্যথা দিয়েছি? “
কৃষ্ণভামা স্থির চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। তারপর ক্ষীণ কন্ঠে বলে উঠলো –” তোমার মনে আচে কিনা জানিনে গো ঠাকুর, গেলবারও তুমি আমায় যাওয়ার সুময়ে দিদি বইলে ডেকেচিলে। তারপর তোমার এবেরে আসা ইস্তক আমি তোমারে আমার সহোদর বইলেই ভেইবে এসেচি গো। কিন্তু এ যাত্তায় আমি পরিষ্কারভাবে বুজেচি, যে আমি আর যাই হই না কেন, তোমার দিদি হবার যোগ্যতা আমার নিই গো ঠাকুর। তুমি যেন দিদি বইলে ডেকে আমারে পাপের আঁধারে ফেলো না। আমি মরে গেলেও আর কোনোদিনও তোমার দিদির স্তানে আমায় বসাতে পারবুনি গো ঠাকুর। “
আমি চমকে উঠলাম। আমি কি তাহলে কানাইদার কাছে ঘোর অন্যায় করে ফেললাম? তাহলে যে ওই অন্ধ মানুষটার সাথে আমি..
–” সব ভালোবাসারে একই আসনে বসানো যায় না গো ঠাকুর। গোঁসাই যে আসন দকল কইরে বসে আচেন, সে আসনে কোনো সুয্যিতারারও জায়গা নিই গো, আবার তোমারে আমার মনে যে পিঁড়িতে আসন পেইতে দিয়েচি, সে আসনের দেবতা শুদু তুমিই গো। “
এ নারী বলে কী? এ কী তাহলে? কিন্তু বাউলনির মনে এ চিন্তার জন্ম নেওয়ার পেছনে যে আমার কোনো ভূমিকাই নেই সেটাই কি সত্য! আমিও কি কৃষ্ণভামার মনের দখল নেওয়ার কোনো চেষ্টাই করি নি? আমি যতই নিজেকে নিরপরাধ বলে মনে করি না কেন বাউলনির এই মনে হওয়ার জন্য আমার কি কোনো অপরাধই নেই?
কিছু বলতে যাবো, কৃষ্ণভামা উঠে দাঁড়ালো।
–” হাতমুখ ধুয়ে নাও ঠাকুর, একুনি গোঁসাই বিচানা ছাড়বেন। ধুবদাদাও উটে বসপেন। তোমার কাচে একটাই অনুরোদ, তুমি আর এদিকে এসো না গো ঠাকুর, এই মায়াবী কলায় পা দিও না। এ কলার খুব টান গো, সমস্ত জগৎসংসার ভুইলে দিয়ে মানুষরে বেঘর কইরে দেয়। আমি তোমারে হারাতে চাই না বলেই আর ককনও কাচে পেতেও চাই না গো। “

এ আবার কী ধরণের কথা! হারাতে চাই না বলে কাছেও পেতে চাই না! মনস্তত্ত্বের যে গভীর গহনে এ উপলব্ধির আস্তানা, সে গহনেও তাহলে এ কন্যার পা রাখা আছে! রবিঠাকুর এ কথাটাই কি একটু অন্যভাবে বলে গেছেন? চোখের আলোয় দেখা আর অন্তরের আলোয় দেখার মধ্যে প্রেমের যে আশ্চর্য অবস্থান, সে অবস্থানেই কি বাউলনি আমার আসন পেতে রেখেছে!
–” তাহলে কি তোমার দোরকপাট আমার জন্য চিরতরে বন্ধ করে দিলে কৃষ্ণভামা? তাহলে গুরুপদবাবা থেকে শুরু করে কানাইদা সবাই যে বলেছিলেন মায়ের পাদপদ্মে আমায় বারেবারে আসতে হবে, ওদের কথা কি মিথ্যা হয়ে যাবে? “
–” ঠাকুর, মায়ের পাদপদ্ম আর পিয়ার কোল, এ দুই কি একই কতা হলো গো! মায়ের অদিকার তোমার জন্মগত আর পিয়ার অদিকার তোমার অদিগত। তুমি আমার সাদনার ফল গো ঠাকুর। জানিনা, কোন জন্মের পুণ্যির ফলে আমার মনে তোমারে পেইচি। সে পাওয়ারে আমি কিচুতেই হারাতে পারবো না গো, কিন্তু… তুমি যাও, ধুবদাদা উটে গেলে বিপদ আরও বাড়বে। “

একরকম প্রায় দৌড়েই বাউলনি দাওয়ার ওপর উঠে ছুটকির শরীর ধরে ঝাঁকাতে লাগলো।
–” আরে উটবি তো লো মুকপুড়ি। কতো বেলা অয়ে গেচে দেক। বলি নারায়নসেবা দিতে হপে তো, না কি?”

কৃষ্ণভামার গলার আওয়াজে যে শুধু ছুটকিই ধড়মড় করে উঠে বসলো তাই নয়, কানাইদা, ধ্রুবদা সবাই বিছানা ছেড়ে উঠে বসলেন। আমি তখন বাড়ির বাইরের রাস্তার ধারে একটা শিশু নিমের ডাল ভেঙে দাঁতন করছি।

ক্রমশ

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!