সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে প্রদীপ গুপ্ত

বাউল রাজা

দ্বিতীয় খন্ড (চতুঃচত্বারিংশ পর্ব)

এক চরম আত্ম মনস্তাপে মনটা ভরে উঠলো। তাহলে আমি যে ভেবেছিলাম যে মা তারা নন, বাউলনির অমোঘ আকর্ষণই আমাকে এখানে টেনে এনেছে, সেটা তাহলে সত্য নয়! সেটাই যদি সত্য হতো, তাহলে আমি কীভাবে তাকে এতোটাই বিস্মৃত হয়ে থাকতে পারলাম সারাটা দিন! অথচ সত্যি বলতে কি, সারাদিন ধরে আমি তো এমনকিছু করিনি, যেটা বাউলনির ভালোবাসার থেকে আমার মনকে অন্যদিকে সরিয়ে দিতে পারে। নাকি ধ্রুবদার কথা আমাকে এতোটাই লজ্জিত ও বিড়ম্বিত করেছিলো যে, আমার মনকে ওর থেকে দূরে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে! অনেক চিন্তা করেও কৃষ্ণভামার প্রতি আমার এই দূরে সরে থাকার কোনোরকম অজুহাত আমি নিজের মনের কাছেই দাঁড় করিয়ে উঠতে পারলাম না। অথচ এই সময়েই তো ওর কাছে গিয়ে আমার দাঁড়ানো উচিত ছিলো! ওকে আমার বোঝানো উচিত ছিলো যে, ধ্রুবদার এই অসম্মানজনক কথা আর কিছুই নয়, ভালোবাসায় অন্তরের সাথে অন্তরের যে অমোঘ টান তৈরি হয়, সে সম্পর্কে এক চূড়ান্ত অজ্ঞতার ফল। সমস্ত ভালোবাসাই যে মিলনপিয়াসী নয়, ভালোবাসার সমস্ত টানই যে শারীরিক অন্তরঙ্গতার ছোঁয়া পেতে উন্মুখ হয়ে থাকে না, সে সম্পর্কে অন্যান্য বহু সাধারণ মানুষের মতোই, ধ্রুবদারও চেতনাতীত। তাদের কাছে একজন পুরুষ আর একজন মহিলার আকর্ষণের কেন্দ্রভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে শরীর। এক অনাবিষ্কৃত উর্বর শস্যভাণ্ডার। যে শস্যভাণ্ডারে মজুত করে রাখা আছে এক আশ্চর্য অনুদ্ঘাটিত অপার রহস্য। যে রহস্যের সন্ধানে সেই অনালোকিত কাল থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত পৃথিবীর সমস্ত জীবকুল ছুটে চলেছে। অথচ সমস্ত নক্ষত্রমন্ডলীর মতো শারীরিক দূরত্বে থেকেও এক অপূর্ব সুন্দর টানেও যে পারস্পরিক টান অনুভব করা যায়, সে সম্পর্কে বেশীরভাগ বুদ্ধিবৃত্তিক স্থুলতা বুঝি এখনও সেই অমোঘতার সন্ধান পেলো না।
—” তুমি ঠিকই বলেছো নদী। বাউলনিকে আমি কখনও বোধহয় আমার আপন করে নিতে পারিনি। পারলে আজ সারাটাদিন… ”
—” এই দেকো দিকি, আমি তোমার মনরে পশ্ন করতে বলেচি, তাঁর কাচে উত্তর চাইতে বলেচি, সিদদান্ত নিতে বলিনি। তা তোমার মনের অতলে তইলে দেকেচো ঠাকুর? নাকি ওপরে ভেসে তেকে তলায় আলো ফেলে খুঁজেচো? সমুদ্দুরের তলায় যে মণিমাণিক্য আচে সেসবের সন্দান পেতে গেলে তো ডুবুরি অতে অপে গো ঠাকুর।”
মনের তলায় তলিয়ে মণিমাণিক্যর সন্ধানে ডুবুরি হওয়া কীভাবে সম্ভব? আর তাছাড়া আমি তো মনের ভেতরেই খুঁজে ফিরলাম।
–” ঠাকুর, মনের মাজে তো খুঁজেইচো। জলতলের ওপরে নৌকোয় বসেও তো জলের ভেতর চেয়ে দেকা যায়, আমার কতা শোনো, একবার ডুব দিয়ে দেকো দিকি, তালেই তুমি টিক খুঁজে পাবে তোমার মনের রত্নখনি। “
–” ডুব-ডুব- ডুব, ডুব সাগরে আমার মন
তলাতল পাতাল খুজলে, পাবি রে প্রেম রত্নধন
ডুব- ডুব-ডুব, ডুব সাগরে আমার মন।
খোঁজ খোঁজ খোঁজ, খুঁজলে পাবি হৃদয় মাঝে বৃন্দাবন
দীপ দীপ দীপ জ্ঞানের বাতি, হৃদে জ্বলবে অনুখন
ডুব ডুব ডুব, ডুব সাগরে আমার মন।
ড্যাং ড্যাং ড্যাং ডাঙায় ডিঙে
চালায় আবার কোন সে জন?
কবীর বলে শোন শোন শোন
ভাব গুরুর শ্রীচরণ।
ডুব ডুব ডুব ডুব সাগরে আমার মন।
তলাতল পাতাল খুঁজলে পাবি রে প্রেমরত্ন ধন
ডুব- ডুব- ডুব, ডুব সাগরে আমার মন।
ঠিক এই মুহূর্তেই এই গানটা শুনতে হবে? একজন বাউলনি খমক বাজাতে বাজাতে গানটা গাইতে গাইতে কোথায় যেন মিলিয়ে গেলেন। আমি আকস্মিকতার ঘোরে বসে পড়লাম নদীর কূলে। দেখি, মাথার ওপর সন্ধ্যার আবেশ ঘনিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই বৃক্ষ। যে বৃক্ষের তলায় বসে আমি আর বাউলনি মনের কথা বলেছিলাম একে অন্যকে।
কোত্থেকে একটা বেহালার সুর ভেসে আসছে। এসময়ে এই নির্জন নদীতটে কে বেহালা বাজাবেন? খুব মৃদু আওয়াজ। এমনটা নয় যে বহুদূর থেকে ভেসে আসছে বলে মৃদু, মনে হচ্ছে অত্যন্ত কাছেই কেউ একজন বসে আছেন বেহালা কাঁধে নিয়ে। কেউ একজন হয়তো একগোছা ধূপবাতি জ্বেলে দিয়ে গেছেন গাছের গোড়ায়, ধূপগন্ধী বাতাসে এক অপূর্ব সুগন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। সুর আর সুগন্ধে ভর করে কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে মন। সোনালি রঙে ভরে উঠছে চরাচর। নদীর জলে সে রঙ ঠিকরে পড়ে স্বর্ণাভ করে তুলেছে নদীর শরীর। সে শরীর বেয়ে এক অদ্ভুত সুন্দর সাপ, সোনালি বরণ, তাতে বহুরঙা ছোপ, উঠে আসছে। ধীরে ধীরে উঠে আসছে আমার পায়ের পাতা থেকে নিম্নাঙ্গে। ক্রমে সর্বাঙ্গ জড়িয়ে ধরে গলার কাছে উঠে এলো তার ফণা। সেই ফণায় ধরা রয়েছে অর্ধস্ফুট পারিজাত। সে পারিজাত আমার সারাটা মুখে বুলিয়ে দিচ্ছে সে অপূর্ব সরীসৃপ। মনে হচ্ছে তানপুরার সুর প্রকট হচ্ছে ক্রমশ। তীব্র হচ্ছে ধূপগন্ধ। হঠাৎ শরীর ছেড়ে হুড়মুড় করে খসে পড়লো সেই সরীসৃপের শরীর। আছাড় খেয়ে পড়লো পায়ের নীচের মাটিতে, তার শরীরে ফুটে উঠছে যেন নিবেদনের ভঙ্গি। আর সে অপরূপ ভঙ্গির সাথে ক্রমে উধাও হলো নিবেদিত শরীর, সেখানে ছড়িয়ে পড়লো একরাশ পদ্মফুলের পাপড়ি। ঘটনাটা এতো দ্রুত ঘটে গেলো যে আমি জ্ঞান অজ্ঞানের অনুভূতির বাইরে এক আশ্চর্য অর্ধ তন্দ্রাঘোরে শুধু অনুভব করে গেলাম। স্থিরচিত্রের মতো বসে আছি। অথচ মনে পড়ছে ঘোরের মধ্যে এইমাত্রই যেন আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম। অন্তত সেরকমই তো অনুভূত হয়েছিলো। যদিও বাস্তব অবাস্তবের গন্ডীকে চুরমার করে ভুমিতে তখনও পড়ে আছে অজস্র পদ্মপাপড়ি। হাল্কা বাতাসের কম্পন লেগেছে ওদের শরীরে। দু একটা উড়ে গিয়ে পড়েছে নদীর বুকে। নদী ফের ফিরে পেয়েছে তার পুরোনো চেহারা। এখন আর নদীর জল স্বর্ণাভ নয়। হাল্কা আঁধার এসে বাসা বাঁধছে ওর জলে। আমি পূর্ণ দৃষ্টিতে নদীর দিকে চাইলাম।
— ” সত্যি করে বলো নদী, তুমি কে? ”
–” কেনে গো, আমি তোমার সই গো ঠাকুর। ” বলেই খিলখিল করে হেসে উঠলো নদী।
–” তোমারও সই, আর তোমার ভালোবাসারও সই। ”
–” তুমি এটা কী দেখালে আমায়? ”
–” ওমা! আমি আবার কী দেকালুম গো? তুমি কি তাকে দেকলে ঠাকুর? কেমন আচে আমার সই?”
–” তোমার সইটি কে? ওই সাপটা না পদ্মের পাপড়িগুলো? সাপটা কেন তোমার বুকের থেকেই উঠে এলো? ”
–” আমি সত্যিই কিচু জানিনে গো, আমি তো শুদু দেকলুম যে, তুমি দু’চোক মুদে বসে আচো। ভাবলুম, তুমি বুজি ভাবসমাদিতে আচো। কিচু কি দেকলে গো ঠাকুর? ”
–” তাহলে বেহালার সুর কে ভাসালে বাতাসে? ”
–” ও, আচ্চা, তুমি তালে সে সুর শুনেচো? সে অনেকদিন আগের কতা গো, সেও এক আশ্চয্য পেমিক। কী সুন্দরই না চিলেন গো তিনি! ঝাঁকড়া চুল ঢেউএর মতো মাতা তেকে গড়িয়ে এসে পড়েচে পিটের ওপর। মুকের হাসি জোচনাকেও হার মানাতো। আর গায়ের রঙ যেন পাকা গমের মতো। সেও মজেচিলো গাঁয়ের এক কিশোরীর পেমে, কিন্তু…”
নদীর বুক থেকে দীর্ঘশ্বাসের মতো এক দমকা বাতাস বয়ে গেলো। আমি উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে।
–” কিন্তু… দুজনের বালোবাসাকে গাঁয়ের কেউ মেনে নিলো না। সেই মানুষটা এই গাচের তলাতেই বসে সেই বেহালায় সুর তুলতেন পতি সন্দ্যাবেলা। একদিন, এরকমই এক দিন সন্দ্যাবেলা গেরামের লোকেরা এসে দেকলেন তিনি তার বেহালা কোলে নিয়ে নিতর শরীরে বসে আচেন।
তারপর তেকে পতিদিন সন্দ্যাবেলা সেই বেহালার সুর ভেসে বেড়ায়। আর কে যেন এসে পতিদিন একগোচা দূপবাতি গুঁজে দিয়ে যান এই গাচের গোড়ায়। তুমি তালে সেই সুরই শুনেচো গো ঠাকুর। “
এক বিশ্বাস – অবিশ্বাস, সত্য — কল্পনা, আর চেতন– অচেতনের দোলায় দুলছি। এ কোন রাজ্যে নিয়ে এসেছে আমায় ধ্রুবদা ! যে অনুভূতির ছোঁয়া আমাকে দুলিয়ে দিয়ে গেলো সে অনুভূতির মানে কী? আমি যা প্রত্যক্ষ করলুম বা আমাকে করানো হ’লো সে কি কোনো অলৌকিক? না কি নেহাতই এক সাধারণ ঘটনা? ওই বহুবর্ণ সরীসৃপের ফনায় পারিজাত কেন? কেনই বা আমায় বেষ্টন করে ওঠা? এ কি সত্য না অবাস্তব দর্শন? তাহলে কি আমার ইন্দ্রিয়ের দুর্বলতায় এ ঘটনা প্রত্যক্ষ করলুম? যদি তাই হবে, তাহলে মাটিতে স্তুপ হয়ে থাকা পদ্মফুলের পাপড়িগুলো এলো কোথা থেকে?
আমি আর ভাবতে পারছি না। আমার মাথা ঘুরছে, আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি ধীরে ধীরে আমার চেতনা লুপ্ত হচ্ছে। আমার দু’টো পা কেমন অবশ হয়ে আসছে। আমি গাছের৷ গোড়া ধরে বসে পড়লুম।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।