১
-একটা সপ্তাহ সময় দিন, হয়ে যাবে স্যার।
-সাত দিন মানে কিন্তু সাত দিনই, সাত দিন এক ঘণ্টা দশ মিনিট নয়।
-হ্যাঁ ,অবশ্যই। আসলে মেয়েটা….
সন্দীপের কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোনের টিঁ…..টিঁ… আওয়াজ বুঝিয়ে দিল ওপ্রান্তের মানুষটা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে যোগাযোগ।
“ধুর! ফোনটা বন্ধ করে দিই, কিন্তু সৌপ্তিকা যদি ফোন করে ! তারচেয়ে বরং সাইলেন্ট করে দিই। খানিকক্ষণ নিশ্চুপ থাকুক”।
নীরবতা বড় ভালো লাগে সন্দীপের। আর এই লাইনে সাইলেন্স ইজ দ্য গড। তবে বাড়িতে শালা একটুও শান্তি নেই। বাড়ি গেলেই সারাদিনের ঝুট-ঝামেলার ফর্দ নিয়ে বসে পড়বে মা। বাবা সারাদিন কিভাবে মাকে সহ্যের চরম সীমায় নিয়ে গেছে তার ফিরিস্তি শুনতে হবে। বাবার জন্য আয়া রেখেও মুক্তি পাওয়া যায়নি মায়ের এই ঘ্যানঘ্যান থেকে।
ছাদে উঠলে একমাত্র এসব থেকে সাময়িক মুক্তি। “আকাশ ভরা সূর্য তারা”। সলিচিউড ইন দ্য ন্যাচারাল স্টেট । চিলেকোঠার ওই ঘরটা বড় প্রিয় ছিল সন্দীপের। তার অবকাশের সঙ্গী। অবসরের পৃথিবী।খেলনা-ডাক্তারি সরঞ্জাম গুলো এখনো সযত্নে রাখা আছে তোরঙ্গটাতে। হায়ার সেকেন্ডারি রেজাল্ট আর বাবার অ্যাক্সিডেন্ট একই দিনে। বাকিটা ভীষণ ক্লিশে। বাবা শয্যাশায়ী, ডাক্তারি পড়ায় জলাঞ্জলি। সব মিলিয়ে স্বপ্নগুলো কোন এক গোলক ধাঁধায় পড়ে পাক খেয়ে অবশেষে ছেঁড়া ঘুড়ির মতো ভোকাট্টা হয়ে গেল। এই চিলেকোঠার ঘরটাতে এলে ক্ষতবিক্ষত সন্দীপটাকে দেখতে পায়। ওই ঘরটাতে সন্দীপের সব অপূর্ণ ইচ্ছে গুলোর গন্ধ আছে। তীব্র গন্ধ। এড়াতে চায় ও। তাই আজকাল ঘরটা এড়িয়ে ছাদে খানিকক্ষণ পায়চারির পর কিছু জরুরী ফোন করেই নিচে নেমে যায়। সৌপ্তিকার ফোনটাও এখানেই সেরে নেয়। মা দেখলেই হাজারো প্রশ্ন। আসলে আগের মেয়েগুলো এত ফোন-টোন করত না। ওই সোশ্যাল মিডিয়াতে চ্যাটেই যা কথা হওয়ার হত। সামাজিক মাধ্যমের এটা একটা লাভজনক দিক। কোন উদ্দেশ্য নিয়ে মেলামেশা করলে অভিনয়টা বিশেষ করতে হয় না। আবেগের বেগ থাকুক না থাকুক কিছু শব্দ জুড়ে জুড়ে লিখে দিলেই হলো। তার জন্য শব্দভান্ডারে ইম্প্রেসিভ ক্যাটিগরির অন্তর্ভুক্ত কিছু শব্দ থাকলেই হল। সৌপ্তিকা আবার এসব পছন্দ করে না। কাছের মানুষের সঙ্গে বেঁধে বেঁধে থাকার মধ্যেই নাকি খুঁজে পাওয়া যায় ভালবাসার গন্ধ। এখন দেখা- সাক্ষাৎ সেভাবে সম্ভব হয় না বলে ফোনেই যত কথা। খুব বেশি দেখা-সাক্ষাৎ অ্যালাও থাকে না সন্দীপদের লাইনে। ওয়েব ডেভলপারের ভেকটা ভালোই কাজে আসে সন্দীপের। তবে চেহারাটাও আকর্ষণীয় করতে হয়েছে। শানিয়ে নিতে হয়েছে বাইরের রূপটা, ভিতরটাকে আড়াল করতে। শুধু সৌপ্তিকার ক্ষেত্রে হিসেব কিছুটা গোলমাল হয়ে গেছে। মেয়েটা সরল কিন্তু বুদ্ধিমতী। অন্যদের মতো নয়। ওর বিশ্বাস অর্জন করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে সন্দীপকে। তাই সময় বেশি লাগছে। ওদিকে বসও আর অপেক্ষা করতে চাইছে না। সন্দীপ রায় চৌধুরী একটা অ্যাসাইনমেন্ট এতটা সময় নেয় না।
২
-আচ্ছা! আকাশের কি কখনো ক্ষয় হয় বলো?
-আকাশ আর প্রেম এক?
-আমিতো তোমায় এক আকাশ জোড়া ভালোবাসি। এত্তোটা।
-কাল আসছ তো?
-আগামীর কথা নিশ্চিত ভাবে বলা অসম্ভব। তবে ইচ্ছে রইল। কিন্তু যদি বৃষ্টি হয়?
-তুমিতো বৃষ্টি ভালোবাসো। আমি ফোন করে নেব।
সাতদিন পেরোতে আর একটা দিন বাকি। সৌপ্তিকার সঙ্গে কথা বলে বসকেও ফোনে জানিয়ে দিয়েছে সন্দীপ। বস বাকিটা সামলে নেবে। কিন্তু সন্দীপ সামলাবে কি করে? কাল সৌপ্তিকা সামনে এলেই আবার সেই অস্বস্তিটা শুরু হবে। সৌপ্তিকাকে দেখলেই যেটা হয়। কিসের অস্বস্তি? প্রতারণার? কাকে? সৌপ্তিকাকে নাকি নিজেকে? আগের কেসগুলোতে তো এমন হয়নি। আজ কি অ্যান্টি অ্যাংজাইটি পিলটা খেতে হবে?
৩
-ধুর! আজ দিনটাই খারাপ। আগেও এই পার্কটাতে এসেছি। আজই এরকমভাবে হাতটা কাটতে হলো। এই বৃষ্টিতে কিছু পাবে?
-পেতে তো হবেই। রক্ত বেরোচ্ছে। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। লোহা তো। আমি দেখছি।
-তোমার মাস্কটা ভালো।
-নিজে তৈরি করে দিয়েছো বলে! ট্যাক্সি পেয়ে গেছি। আসছে।
-আমার কিন্তু ইনজেকশন নিতে ভয় করে।
-ভয় কি? আমি আছি তো।
‘আমি আছি তো’ কথাটা নিজের অজান্তেই যেন বেরিয়ে এলো সন্দীপের মুখ থেকে। বলেই ভিতরের অস্বস্তিটা আবার অনুভব করলো সে। ও আছে বলেই তো পার্কের বেঞ্চের হাতলে সযত্নে থেকে যাওয়া পেরেকটা সৌপ্তিকার চামড়া ভেদ করে অনেকটা রক্ত বার করে দিয়েছে। ও আছে বলেই এই বৃষ্টির মধ্যেও বসের পাঠানো ট্যাক্সিটা ছুটে চলেছে সৌপ্তিকাকে নিয়ে ডক্টর মিত্রর নার্সিংহোমের দিকে। বৃষ্টির ঝাপটায় ট্যাক্সির জানালা খোলা যাচ্ছে না। সৌপ্তিকার পারফিউমের গন্ধটা আর ওর নূপুরের আওয়াজ বারবার পাক খেয়ে চলেছে বদ্ধ ট্যাক্সিটার মধ্যে। আক্রমণ করছে সন্দীপের ইন্দ্রিয়গুলোকে। নার্সিংহোমে ওকে পৌঁছে দিয়েই কোন বাহানায় বেরিয়ে আসতে হবে। পুলিশ-টুলিশ ও অন্যান্য বিষয় ডক্টর মিত্র আর ওর অ্যাসিস্ট্যান্টরাই দেখে নেবে। বাকিটা ওরাই সামলায়। সন্দীপের দায়িত্ব এই পর্যন্তই। সৌপ্তিকার নূপুরের আওয়াজটা যেন কোন অসুবিধা না সৃষ্টি করে। যদিও একবার ব্রেন ডেড অবস্থায় পৌঁছে গেলে শুধু নীরবতাই সাক্ষী।
৪
রাতের আকাশ টার দিকে ঠায় তাকিয়ে আছে সন্দীপ। ‘মেঘে ঢাকা তারা’। কিছু একটা চেনা গন্ধ পাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে। বৃষ্টি থেমে গেছে। চারিদিকে অদ্ভুত শান্তি। এতক্ষণে একটা বডি নিশ্চয়ই সৌপ্তিকার বাবা-মার কাছে পৌঁছে গেছে। দলাপাকানো মাংসপিণ্ড। সাজানো অ্যাক্সিডেন্ট। কার না কার বডি। তবে তাতে সত্যিই কি কিছু তফাৎ হয়? মরে গেলে তো সবাই ডেড বডি। সন্দীপের সঙ্গে সম্পর্কটা সৌপ্তিকার বাড়ির লোক জানে না। জানতে দেওয়া হয়না। এটাই ওদের লাইনের স্ট্র্যাটেজি। এতক্ষণে ওদিকে আসল কাজ নিশ্চয়ই শুরু হয়ে গেছে। সৌপ্তিকার ব্লাড গ্রুপ এবি নেগেটিভ। ভীষণ রেয়ার। একটা একটা করে অরগ্যান আলাদা করে নেওয়া হবে। তারপর চড়া দাম। জীবনের মূল্য। আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে অনেকদিন এ কাজ করে চলেছে ওরা। সন্দীপও পোড় খাওয়া এই লাইনে। ভালোবাসার টোপ দিয়ে শরীরের একটা অংশকে দুর্বল করে বাকি অঙ্গগুলো ছিনিয়ে নেওয়া। ভিতরের তপতপে মনের সন্দীপটা কবেই মরে গেছে।
আজ অনেকদিন পর চিলেকোঠার ঘরে এসেছে সন্দীপ। সেই চেনা গন্ধটা নাকে আসছে। অ্যান্টি অ্যাংজাইটি পিলটা যদি একটু ঘুমোতে সাহায্য করে। ধূলোর আস্তরণযুক্ত আয়নাটার দিকে চোখ পড়তেই শিউরে উঠলো সন্দীপ! তার মুখটা এরকম ক্ষতবিক্ষত কেন! একটা চোখের জায়গায় গর্ত। বুকের কাছে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। পেটের কাছে জামাটা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। কি ভয়ানক! এক ঝটকায় কেউ যেন বিছানায় ফেলে দিল সন্দীপকে। চেনা গন্ধটা আরো তীব্র। কিসের গন্ধ এটা! মনে পড়েছে। সৌপ্তিকার পারফিউম। একি! বিছানায় নূপুর এলো কোথা থেকে? নূপুরে লাল রং নাকি রক্ত! গন্ধটা আরো তীব্র হচ্ছে। খুব বমি পাচ্ছে সন্দীপের। ক্ষমতা নেই ওঠার। বিছানাতেই উগরে দিচ্ছে সবকিছু। ভিতরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলো এক একটা করে বেরিয়ে আসছে!