“এই শ্রাবণে আষাঢ়ে গপ্পো” বিশেষ সংখ্যায় সুব্রত বসু

রহস্য জালে নতুন বাড়ি

(১)
শর্মি তার শরীরের পুরোভার অর্ণবের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। চোখের সামনে এতগুলো ঘটনার আকস্মিকতায় অর্ণবের পা’দুটোও থর থর করে কাঁপছিল, বেশীক্ষণ এভাবে শর্মিকে ধরে রাখতে পারবে না বুঝতে পেরে শর্মির কাঁধ দুটো ধরে সোজা করার চেষ্টা করল।
“শর্মি, এ্যাই শর্মি”- দুবার ঝাঁকানি দিয়ে অর্ণব ওর চেতনা ফি্রিয়ে  আনতে চাইছিল। কিন্তু অর্ণবের নিজের কন্ঠস্বরও যেন নিয়ন্ত্রণে নেই, গোটা মস্তিষ্ক আতঙ্কে আচ্ছন্ন। অর্ণবের ঝাঁকানিতে লুপ্তপ্রায় চেতনা যেন কিছুটা ফিরে এসেছে, একটা অস্ফুট শব্দ উচ্চারণ করল শর্মি- “বীরুমামা”?
নীচে নেমে যাওয়া অন্ধকার সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে অর্ণবের এছাড়া আর কোন উত্তর ছিল না-“ জানি না”।
কয়েক মিনিট আগেই মাথায় রিভালবার ঠেকিয়ে বীরুমামাকে টানতে টানতে এই সিঁড়ি দিয়েই নামিয়ে নিয়ে গেছে তিনজন যারা পরিচয় দিয়েছিল সি আই ডি বলে। শর্মিকে কাছে টেনে নিল অর্ণব- “ চলো নীচে যাই, পুলিশে খবর দিতে হবে ডেডবডি’টা পড়ে আছে”। কথা মনে হতেই শর্মি অর্ণবের বুকে মুখ লুকালো ভয়ে, কারণ তার পায়ের থেকে সামান্য দূরে পড়ে রয়েছে  সুলতানের রক্তমাখা লাশ।
(২)
এখনো বছর খানেক হয়নি, শর্মি’র বিয়ে হয়েছে, তাও দুই  বাড়ির অমতে। মফস্বল মহকুমা শহরগুলো যেরকম হয় আর কি। অর্ণব এতদিন কলকাতায় ছিল, ওদের কোম্পানীর নতুন  প্রজেক্টের দায়িত্ব দিয়ে ওকে এখানে পাঠানো হয়েছে। শহরের একটা ছোট ভাড়া বাড়িতে ওদের নতুন সংসার মন্দ চলছিল না। বিশেষ করে বাড়িওয়ালার স্ত্রী সোনা কাকিমা এতই সহৃদয়, মেয়ের মত ভালবাসতেন শর্মিকে। যখনই উনি শর্মিদের ঘরে আসতেন ওনার  মাথার একঢাল চুল থেকে ভেসে আসত লক্ষ্মীবিলাস তেলের গন্ধ।  সেই সোনা কাকীমা হঠাৎই হার্ট এ্যাটাকে চিকিৎসার সুযোগ না দিয়েই চলে গেলেন। শর্মি সেই শোক ভুলতে পারেনি। সবচেয়ে মুস্কিল হত অর্ণব বেরিয়ে যাবার পর শর্মি সারাক্ষণই যেন লক্ষ্মীবিলাস তেলের গন্ধ পেত। অর্ণবকে বলেছিল, – “ আমি আর এখানে থাকতে পারব না যে করেই হোক তুমি অন্য বাড়ির ব্যবস্থা করো”। ব্যবস্থা বললেই তো আর ব্যবস্থা হয় না, অর্ণব অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু লাভ হয়নি। ইতিমধ্যে এক দালালের মাধ্যমে এই বাড়ির খবর পায়। তবে বাড়ির মালিক ভাড়া দিতে চায় না,  বিক্রী করতে চায়। দামও অবিশ্বাস্য রকমের কম, দালাল বুঝিয়ে ছিল, ভদ্রলোক বিদেশে চলে যাচ্ছেন স্থায়ীভাবে, এই বাড়িতে বাসও করেন’নি একদিনও। তৈরী হবার পর বছর পাঁচেক এমনি পড়ে আছে। বাড়ি’টা দেখেও অর্ণবের পছন্দ হয়, তবে শহর থেকে মানে ওর অফিস থেকেও বেশ দূরে। বাড়ির মালিক ই এম আই’এ রাজি আছেন তবে ফিফটি পারসেন্ট টাকা প্রথমেই ক্যাস ডাউন করতে হবে। শর্মি তো শুনে এককথায় রাজি, – “ তুমি চিন্তা করো না, টাকা আমি দেব, আগে যেখানে চাকরী করতাম, তখন বেশ কিছু টাকা জমিয়েছিলাম। ফিক্সড ডিপোজিটই আছে গোটা পাঁচেক, তুমি একটা লোনের দরখাস্ত করে দাও”।
“কিন্তু শহর থেকে অনেকটাই দূরে”।
“তোমার তো বাইক আছে, তাছাড়া কলকাতা একঘণ্টার পথ, যেভাবে ইন্ডাষ্টি গড়ে উঠছে, এই দামে জমিই পাবে না, তখন হাত কামড়াতে হবে”।
কিন্তু এই নতুন বাড়িতে এসে অবধি নানান সমস্যা, বাড়ির সামনের গাছতলায় কিছু অসামাজিক লোক আড্ডা দেয়, তাস খেলে । অর্ণবের টেনসন হয় শর্মি একলা থাকে বলে । কাছাকাছির মধ্যে দু’একটা টালির বাড়ির আছে বটে, তার কেউই অর্ণবদের সমগোত্রীয় নয়। তাদের সঙ্গে কোন পরিচয় হয়নি। তার মানে বিপদে আপদে কেউ পাশে এসে দাঁড়াবে এমন কেউ নেই।  ইতিমধ্যে নিজেকে ভরত  নামে পরিচয় দিয়ে একটা লোক দুপুরের দিকে ওদের বাড়িতে আসে, শর্মি দরজা খোলেনি, জানলা দিয়ে কথা বলেছে। সে নাকি জানিয়েছে, এই বাড়িতে ভূত আছে, শর্মিরা এই  বাড়িতে থাকতে পারবে না , আগেকার মালিক ওইজন্যেই বাড়ি বিক্রী করে দিয়েছে”।
অর্ণব বাড়ি ফিরলে শর্মি সব কথা বলে, আবার এও বলে –“ জানো  ভরত  বলে লোকটাকে গাছতলায় ওই লোকগুলোর সঙ্গে বসে আড্ডা দিতে দেখেছি”।
“ও আর কি বলল?”
“বলল যে ও রাজমিস্ত্রী, বাড়িটা ওই তৈরী করেছে, বাড়ীটা নাকি ভাল নয়, আমরাও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই বাড়ি ছেড়ে যেন  চলে যাই”। সত্যি কথা বলতে কি ভরতের  কথা কিন্তু  মিথ্যে বলে মনে হচ্ছে না শর্মীর। মাঝরাতে ছাদে ধুপধাপ আওয়াজ, কে যেন কি গড়াচ্ছে। সাহস করে অর্ণব একদিন রাতে টর্চ নিয়ে দেখতে গিয়েছিল। কিন্তু কিছুই দেখতে পায়নি। দিনে দিনে ভয়ে সিটিয়ে থাকছে শর্মি। অর্ণবেরও  অফিস গিয়ে স্বস্তিতে নেই।
দিন দুয়েক আগে অর্ণব সবে অফিস থেকে ফিরেছে, তখনই  কলিং বেজে উঠল। এখানে পরিচিত কেউ নেই, কেই’বা আসবে। অর্ণবই গিয়ে দরজা খুলেছে। প্রায় ছ’ফুট লম্বা একটি মাঝ বয়সী লোক, ভাল স্বাস্থ্য, পিঠে রুকস্যাক বাঁধা। অর্ণব অবাক হয়ে তাকাতেই ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা বললেন-“ তুমি আমায় চিনবে না শর্মি কোথায়?” হতবাক অর্ণবের জবাব দেবার আগেই ভদ্রলোক ঘরে ঢুকে এসেছে। শর্মি এসেই আনন্দে দু’ হাত বুকের কাছে জড়ো করে চীৎকার করে উঠল- “ বীরুমামা, তুমি?
“হ্যাঁরে , কেমন আছিস? এই বুঝি তোর কর্তা? অর্ণব তাড়াতাড়ি প্রণাম করতে গেলে বীরুমামা অর্ণব কে বুকে টেনে নিলেন।
“ আমরা এখানে আছি সে খবর পেলে কোথা থেকে”।
“ তোর বাড়ি থেকেই খবর পেলাম তুই  পালিয়ে গিয়ে  বিয়ে করেছিস, এখন পীরপুরে আছিস, এটা তো আমার পুরানো ঠেক,  জানিস না বোধহয়।  তোদের খবর যোগাড় করতে অসুবিধে  হয়নি,যখন শুনলাম জামাই বাবাজীবন ইঞ্জিনিয়ার আর এখানে ইন্ডাষ্ট্রি বলতে তো একটাই আপাতত, রুংটা সেরামিক, আমার চেনা লোকজন আছে, ফোনে ফোনেই খবর পেয়ে গেলাম।  যাক জামাইকে দেখে ভালই লাগছে, তোদের এখানেই কদিনের জন্যে  আস্তানা গাড়ব”।
“ তুমি না বললেও আমিই বলতাম কদিন থেকে যাবার জন্যে, নতুন বাড়িতে আসার পর থেকে খুব বিপদে আছি, ছাদের ওপর ভূতের উপদ্রব, অসামাজিক লোক ঘোরাফেরা করছে। বাড়ি ছেড়ে দিতে বলছে কেউ কেউ ”। শর্মির কথা শেষ না হতেই অর্ণব বলল- “হ্যাঁ মামা, অফিস গিয়ে সারাক্ষণ টেনসনে থাকি, আপনি এসেছেন খুব ভাল হয়েছে”।
“ কোন সমস্যা থাকবে না, পীরপুর আমার পুরানো জায়গা। বীরেন মুখসুদ্দির ভাগনী এখানে থাকে,   এরা তো  জানে না। ভূত প্রেত সব ঢিট যাবে।  তুমি নিশ্চিন্ত থাকো কোনো চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে ’।
বীরুমামার পরিচয় অর্ণব আগে শর্মির কাছ থেকে কখনো  শোনেনি, আসার পর যেটুকু জানলো উনি মুম্বাই শেয়ার মার্কেটে দালালি করেন, বিয়ে থাও করেন’নি। সম্পর্কের সুত্র ঠিক জানা নেই শর্মির, সম্ভবতঃ মায়ের দূর সম্পর্কের ভাই,   দু’ পাঁচ বছর অন্তর অন্তর  একবার দেখা করতে আসেন। যাই হোক বীরুমামা চলে আসায় ওরা খুব খুশি, গল্পগুজবের মাঝে বীরুমামাকে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে ল্যাপটপে শেয়ারের দামের  ওঠা নামার পর্যবেক্ষণে।
পরদিন বীরুমামা নিজেই  বেরিয়ে বাজার করে নিয়ে এলেন, মাছ মাংস ইত্যাদি, বললেন “ জমিয়ে রান্না কর, কতদিন ভাল করে ঘরোয়া  রান্না খাওয়া হয়নি”। নিশ্চিন্ত শর্মি সারাক্ষণই বীরুমামার দেখভাল করতে ব্যস্ত।
সেদিনটা ভালভাবে কেটে গেলেও ঘটনা ঘটল পরদিন সন্ধ্যায়। বীরুমামা ঘরে বসে ল্যাপটপে কাজ করছিলেন, হঠাৎই ছাদে ধুপধাপ শব্দ, শর্মি ঘরের বাইরে থেকে বীরুমামাকে শুনিয়েই বলল।
“ওই শুরু হল”। বীরুমামা তাঁর ব্যাগ থেকে রিভালবার আর টর্চ বার করে ছুটলেন ছাদে। সেই সময়ই  কলিং বেল বাজল, শর্মি বীরুমামার পিছন পিছন ছাদে যাবে ভেবেছিল, কিন্তু তার আগে দরজা খুলতে গেল, যাক অর্ণব অফিস থেকে ফিরেছে। ইতিমধ্যে ছাদে বীরুমামার চিৎকার শোনা গেল। শর্মি বুঝতে পারল কোন গুরুতর ঘটনা ঘটতে চলেছে। অর্ণবের উদ্দেশ্যে শুধু এইটুকু কথা শর্মির, “ শিগগিরি ওপরে এসো”। দুজনেই ছুটল ছাদে, সদর দরজা কিন্তু বন্ধ করা হল না।
ছাদের গিয়ে যা দেখল তা কল্পনাতীত, বীরুমামার সঙ্গে একটা লোকের ধস্তাধস্তি হচ্ছে, বীরুমামার টর্চটা জলন্ত অবস্থায় পড়ে আছে ছাদে, বীরুমামা চীৎকার করে চলেছেন, “ সুলতান তোর এত বড় সাহস বাঘের ডেরায় হানা দিয়েছিস”। লোকটা অকস্মাৎ বীরুমামার চোয়াল লক্ষ্য করে ঘুসি মারতেই বীরুমামা ছিটকে সামান্য সরে এল, সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল রিভালবার, সুলতান নামের লোকটা গোড়াকাটা কলাগাছের মতন ধড়াস করে পড়ে গেল। এর মধ্যে কখন যে   তিনটে যন্ডামার্কা লোক  সিঁড়ি বেয়ে উঠে এসেছে কেউ টের পায়’নি। চোক্ষের নিমেষে  তারা বীরুমামাকে জাপটে ধরে রিভালবারটা কেড়ে নিয়ে বীরুমামার রগে চেপে ধরে টানতে টানতে সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অর্ণব ছুটে বাধা দিতে গেল , তিনটে লোকের মধ্যে একজন অর্ণব এক ধাক্কা মারল। “খবরদার আমরা সি আই ডির লোক, বাধা দিলে ফল ভাল হবে না, এখানে একটা খুন হয়ে গেছে, খুনীকে থানায় নিয়ে  যাচ্ছি, সরকারী কাজে বাধা দেবেন না”।  তখনই শর্মি শরীরের পুরো ভারটা অর্ণবের ওপর ছেড়ে দিয়েছে।
(৩)
“ কি বললেন, সি আই ডি ! সি আই ডি এসে আপনাদের বীরুমামাকে ধরে নিয়ে গেছে”। থানার ওসির গলায় ব্যঙ্গের সুর। “ তাও আবার তারই রিভালবার কেড়ে নিয়ে ,   তা আপনাদের এই বীরুমামাটি কে বলুন তো, আপনাদের ফোন পাবার পর এসপি সাহেবকে ঘটনাটা জানাতে চমকে উঠলেন তিনি, আবার  সি আই ডি এসে ধরে নিয়ে গেছে, আপনাদের যে কে ধরে নিয়ে যাবে সেটাই দেখুন এবার।   অনেক দূর অবধি নাড়া দিয়েছেন আপনারা”।
থানায় খবর দেওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যে ওসি ফোর্স অফিসার নিয়ে চলে এসেছেন। অর্ণব বোঝাবার চেষ্টা করে। “ দেখুন যা ঘটেছে তাই আপনাকে বলেছি ,  আমার স্ত্রীর দূরসম্পর্কের মামা উনি, এখানে থাকেন না, গত পরশু দিন উনি  মুম্বাই থেকে এসেছেন”।
“থামুন” ওসি ধমকে ওঠেন,  “ছাদের ওপর খুন হওয়া লাশ পড়ে রয়েছে, ভেবেছেন দুনিয়ার আষাঢ়ে গল্প ফাঁদলেই রেহাই পেয়ে যাবেন , নিন তৈরী হয়ে নিন, আপনাকে থানায় যেতে হবে”।
ধপাস করে অর্ণব সোফার ওপর বসে পড়ে। হাউ হাউ কেঁদে উঠল শর্মি। “ না না আমি এখানে একলা থাকতে পারব না”।
“বেশ তো আপনিও থানায় যাবেন,  বাড়ীটা আমরা সিল করে দিয়ে যাব যতক্ষণ না ডেড বডি রিমুভ হচ্ছে,  আমাদের ফোর্স পাহারায় থাকবে”। ঠিক সেই সময়েই ওসি মোবাইল ফোন বেজে উঠল-
“ নমস্কার স্যার মিলন, না স্যার আইডেন্টিফাই হয়নি, তবে এনারা বলছেন লোকটার নাম নাকি সুলতান, ওনাদের রিলেটিভের মুখে শোনা, তারই গুলিতে মারা গেছে। স্যার…স্যার …হ্যাঁ স্যার আমারও তাই মনে হয়, সুলতানের এ্যাসোসিয়েটরাই সি আই ডি পরিচয় দিয়ে ধরে নিয়ে গেছে”। আপনি আসছেন স্যার, ওঃ! ঠিক আছে স্যার, নমষ্কার স্যার”।
“ যাক আপনাদের কপাল ভাল, এখুনি থানায় যেতে হচ্ছে না, বড় সাহেব নিজে  আসছেন, এস এস সি আই ডি কলকাতা থেকে রওনা  দিয়েছেন খবর শুনে  , বড়সাহেবের  ব্যাচ মেট। যাক সি আই ডি,  সি আই ডি করছিলেন না, মেঘ না চাইতেই জল, স্বয়ং কর্তাই এসে হাজির হচ্ছেন”। নিজের রসিকতায় নিজেই হেসে উঠলেন ওসি।
(৪)
“ হ্যালো, মিঃ সহায়, এস এস সি আই ডি স্পিকিং,  র ন বী  র ঘো ষা ল, জাস্ট এ মিনিট,” নিজের ডায়রীতে নোট নিলেন, রণবীর ঘোষাল নামটা শুনে অর্ণব তার চিন্তার খেই হারিয়ে ফেলল, কোথায় যেন শোনা নামটা। এস এস সি আই ডি ফোনে কথা বলেছেন “ ইয়েস স্যার, সিওর স্যার, আই ক্লিয়ারলি রিমেম্বার ইট…… ইয়েস স্যার,  “দ্য ডেথ চেম্বার”, ফেমাস পেন্টিং অফ এ্যাডলফ স্টাইনার, মিসিং ফ্রম এয়ার কার্গো, অন ওয়ে টু টোকিও। ও কে স্যার,  থাঙ্কু স্যার”। ফোন বন্ধ করে ঘাড় নাড়লেন বিবেক রে, “ ইস্‌ আমার প্রথমেই বোঝা উচিত ছিল”।
“ কি হল কি?” এস পি’র কথার উত্তর না দিয়ে বললেন “ অজয় আর দেরী করলে চলবে না ডি সি ডিডি’কে  বলো ওনার পুরো টিম নিয়ে নেমে পড়তে, প্রত্যেকটা থানাকে এ্যালার্ট করতে, বিশেষ করে গাডেনরিচ ও খিদিরপুর এরিয়া, জয়েন্ট ডিরেকটর সি’বি’আই মিঃ সহায় বললেন ওই দিকেই সুলতানের ডেরা। কিডন্যাপ করে ওইদিকেই নিয়ে যাবার সম্ভবনা বেশী”।
“ আচ্ছা এই বীরুমামা সঙ্গে আপনাদের কি সম্পর্ক বলুন তো?”
“ আমার নয় শর্মি দূরসম্পর্কের মামা”। এস’এস’ সি আই ডি’র প্রশ্নে ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল অর্ণব। শর্মিকে জিজ্ঞাসা করতে হল না,- “মায়ের কিরকম ভাই আমি জানি না পাঁচ ছ’ বছর অন্তর একবার আধবার আসতেন, মুম্বাই’এর বান্দ্রায় থাকেন, শেয়ার মার্কেটের দালালি করেন, গতকাল এসেছেন, বেশীর ভাগ সময় ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছিলেন”।
“ল্যাপটপ? সেটা কোথায়?
“ঘরেই আছে”। ওটা এনে দিতেই এস এস সি আই ডি চেষ্টা করলেন খোলার। কিন্তু হল না পাস ওয়ার্ড ম্যাচ না করায়।
“ না নীতিনকে ছাড়া হবে না, মিসেস,,   কি যেন”?
“দত্ত”।
“একটু চা খাওয়ানো যায়,  তো ভেরী ক্রুসিয়াল কেস”  । শর্মি লজ্জায় জিভ কেটে  ছুটল রান্না ঘরের দিকে।
“ তোমার হয়ত জানা থাকবে না অজয়, বিখ্যাত পেন্টিং স্টাইনারের  ডেথ চেম্বার, দিল্লী থেকে টোকিও যাবার পথে প্লেন থেকেই মিসিং হয়, পরে জানা যায় চুরি, দিল্লী পুলিশ একটা কেস করে। সেই কেসে সাসপেক্ট হিসাবে যার নাম উঠে আসে, তিনি কৃষ্ণের মত অষ্টোত্তর শত নামে বিখ্যাত। তিনি রণবীর ঘোষাল, শঙ্কর সেন, জামাল মিঞা, মির্জা গালিব, সুরিন্দার সিং এট সেটরা। যদি আমার অনুমান ভুল না হয় লাস্ট নেম ইজ বীরুমামা”। অর্ণব মন দিয়ে শুনছিল কথাগুলো, রণবীর ঘোষাল নামটা কেন বার বার তার চেনা  মনে হচ্ছে ।
“ এত ডিটেলস না জানলেও খবরের কাগজে পড়েছিলাম, আমি তো কলকাতা পুলিশ ডিসি ডিডি’ কে জানিয়ে দিয়েছি, এখন ধরা পড়া খুব জরুরী, বীরুমামাই যে ওই লোক সেটা বুঝছ কি করে।
“ সুলতান নামটা শোনার পরই আমার সন্দেহ হয়, এরা আগে একই গ্রুপে  ছিল, যা হয় আর কি হিস্যা নিয়ে গন্ডগোল, এখন রণবীর ঘোষালের ক্লোজ রাইভ্যাল হচ্ছে সুলতান। তাকে সরাবার চেষ্টা হবেই।  যখন শুনলাম এনাদের মামার গুলিতে সুলতান মারা গেছে, তখন থেকেই মনে হচ্ছে, বীরুমামা ইজ নট আনাদার পারসেন।  অর্ণব ও শর্মি চা বিস্কুট নিয়ে এল।
“ বসুন মিস্টার দত্ত, কি নাম যেন আপনার?”
“ আপনার এই বাড়িতে কবে এসেছেন ? দুজনের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অর্ণব একটু থতিয়ে গেল।
“ আজ্ঞে অর্ণব, তা  মাসখানেকও হয়নি স্যার, আগে ভাড়া থাকতাম, সেইবাড়ির বাড়িওয়ালার স্ত্রী হঠাৎ মারা যান, শর্মি’ কে খুব ভালবাসতেন, তারপর  থেকেই ও বাড়ি পাল্টানোর জন্যে জোরাজুরি করছিল, তখন এক দালালের মাধ্যমে এই বাড়ির সন্ধান পাই, ভাড়া না দিয়ে কিনে নেবার অফার দেন। মাত্র আড়াই লাখ টাকা দাম দেন, এক লাখ পঁচিশ দিতেই পজেশন দিয়ে দেন, বাকি টাকা ইস্টলমেন্টে দেব ঠিক ছিল”।
“ মালিক’কে দেখেছিলেন, কি নাম তার”।
“ নামটা কি যেন, লোকটা বয়স্ক, মাথায় সাদা চুল, একটা চোখ কালো পটি দিয়ে ঢাকা, মনে হয় চোখটা ডিফেক্টিভ,  যা কিছু কথা ওই দালালের সঙ্গেই হয়েছিল । তবে টাকাটা উনি ক্যাসে নিয়েছেন রেজিস্ট্রেশনের দিন।  শর্মি দলিলটা দেখো  তো কি নাম যেন ভদ্রলোকের’।
“ তারপর”?
“তারপর তো এই বাড়িতে আসার পরই নানান  ভৌতিক উপদ্রব। যে বাড়িটা তৈরী করেছে,  ভরত মিস্ত্রী এসে বলে আপনার এই বাড়িতে থাকতে পারবেন না, যত শিগ্‌গিরি পারেন বাড়িটা ছেড়ে দিন”।
“আপনাদের বীরুমামা জানলেন কি করে আপনারা এখানে আছেন?”
“ বললেন বাড়ি থেকে জেনেছেন”।
“বেশ,  কিন্তু এই ক’দিনে আপনাদের  বাড়ির লোকজন  তো কেউ আসেনি, সটান এই বাড়িতে চলে এলেন কি করে”?
“এই পীরপুর বীরুমামার পুরানো ডেরা, অনেকেই চেনা, তাদের মাধ্যনেই খবর নিয়েছেন।  দু’ এক দিন থাকলে ওই সব ভৌতিক উপদ্রব বন্ধ হয়ে যাবে বলে আমাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন।  তার মধ্যেই এই ঘটনা”। শর্মি দলিলটা নিয়ে ঘরে ঢুকল-“ এই যে ওনার নাম রণবীর ঘোষাল”। সঙ্গে সঙ্গে এস এস সি আই ডি টেবিলে একটা প্রচন্ড চাপড় মারলেন।  চায়ের কাপ উলটে পড়ল,কি ভাগ্যি চা    খাওয়া হয়ে গিয়েছিল তাই।
“ কি অজয় মিলেছে, দুয়ে দুয়ে চার”।
“তাই রণবীর ঘোষাল নামটা চেনা চেনা লাগছিল”। অর্ণবের কথার উত্তরে এস এস সি আই ডি বললেন –
“ এবার বুঝতে পেরেছেন বাড়িটা আপনারা কার  কাছ থেকে কিনেছেন, সেইজন্যেই বীরুমামা সরাসরি এখানে চলে এলেন। বাড়ী কেনার আগে  সার্চ করিয়েছিলেন।
“হ্যাঁ সে রিপোর্ট ঠিকই ছিল”।
অনেকক্ষণ এসপি সাহেব চুপ করে ছিলেন, “ ব্যাপারটা অনেকটাই পরিস্কার হয়ে গেল, এই বাড়িতেই নিশ্চয় কোথায় কিছু লুকানো আছে, বাড়ি বিক্রী করে আপনাদের বীরুমামা আপনাদেরই   পাহারায় রাখতে চেয়েছেন, যাতে অন্য কেউ দখল না নিতে পারে।  অন্যদিকে  সুলতানের গ্রুপ আপনাদের  বাড়ি ছাড়া করতে চাইছিল ।ওই মিস্ত্রীটার কি নাম যেন যে বাড়ি তৈরী করেছে, সুলতান তাকে কব্জা করেছে বাড়ির কোন গুপ্ত স্থান আছে কিনা জানার জন্যে”।
“ ঠিকই বলেছ অজয়, সব জেনে বুঝেই করা হয়েছে, রণবীর ঘোষাল নামে আপনারা যাকে দেখেছেন রেজিস্ট্রেশনের দিন, তিনি আর কেউ নন ছদ্মবেশে  বীরুমামা, একটা চোখ ঢেকে রাখলে সেইদিকেই নজর থাকবে, চেনা লোককে অচেনা লাগবে। বীরুমামা এখানে এসেছিলেন সুলতানের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া করতে, যাতে এখানে পরবর্তীকালে কোন ঝামেলা না হয়। চোরাই মালের ডিল এখনো পাকা হয়নি বলেই আমার ধারণা। এক কাজ করো,  তোমার ওসিকে বলো তো  ঐ মিস্ত্রীটার খোঁজ করতে”। সেই সময় বাইরে দুম দাম করে বোমের শব্দ। ওসিকে দেখতে  বলার আগেই দাঁত বার করে বললেন “ নিউ ইয়ার সেলিব্রেশন হচ্ছে স্যার, বারোটা বাজল”।
“ওঃ আই সি, যাক মিসেস দত্ত , নতুন বছরে আমাদের অন্ততঃ  একটু কফি খাওয়ান। মিলন ,  তুমি ওই ভরত নামে মিস্ত্রীটার খোঁজ করো”। ওসি চলে গেলে  এস’পি বললেন –  “এখন রণবীর ঘোষালকে রেসকিঊ করা খুব জরুরী, মেরে না ফেলে”।
“ না এখুনি মারবে না, সুলতান মরে গেছে, ওর এ্যাসোসিয়েট’রা চাইবে, রণবীরকে চাপ দিয়ে মোটা দাও মারতে, কলকাতা থেকে তো  কোন খবর এল না”। বাইরে দুম দাম করে বোম ফেটে চলেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে কফি আর সল্টেড কাজু প্লেটে সাজিয়ে নিয়ে অর্ণব আর শর্মি ঢুকল।
“ থ্যাঙ্কু বোথ অফ ইউ”। থানার ওসি ফিরে এসে জানালো মিস্ত্রীটাকে পাওয়া যায়নি, ওর বাড়িটা পাশেই ,দুটো টালির বাড়ির পরেই।
“ওর বাড়িতে কি বলল?”
“ও কল্যাণীতে একটা বাড়ি তৈরীর কাজ করছে, লোকেশনটা বাড়ির লোক বলতে পারল না। তবে একটা ছোট ডায়রী পেয়েছি, যাতে কিছু টাকার হিসেব, কল্যাণীর বি ব্লকের একটা ঠিকানা”।
“ইমিডিয়েটলি আই সি কল্যাণীর ঐ ঠিকানায় রেড করতে বলো, আই এ্যাম গেটিং সাম স্মেল । এসপি উঠে গিয়ে ফোনে কথা বলতে লাগলেন।  কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে এস এস সি আই ডি বললেন_  বললেন “ বুঝলে অজয়,  এসপিদের নিয়ে অপারেশনে গেলে সুবিধে আছে, পুরো কো-অপারেশন পাওয়া যায়,  এস এস সি আই ডি’র  নাম শুনলে স্যার স্যার করতেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে থানার লোকেরা,  কাজের কাজ  তো কিছু হয়  না, উলটে পন্ড হয় ”।
“ এ ক্ষেত্রে সে সম্ভবনা নেই, আই সি নিজে  নিউ ইয়ার ইভ বলে ফোর্স নিয়ে রাস্তাতেই পেট্রলে আছে , ঠিকানাটা  টাউনের ওপরেই খুব দূর নয়”।
“ না মিসেস দত্ত, কফি কিন্তু চমৎকার বানিয়েছেন, আচ্ছা একটা কথা বলুন তো এই বীরুমামকে ছোট থেকে দেখছেন, আপনার মা’ও কি কখনো কিছু বলেন’নি”। এসপি সাহেবের কথার উত্তরে শর্মি জানালো-“দেখছি মানে বেশ কয়েক বছর অন্তর আসতেন, টফি, কে্ক, মিষ্টি এই সব নিয়ে। ,আমাদের খুব আনন্দ হত যখনই আসতেন,।  কেউই সঠিক জানত না উনি কি করেন, এখন তো এসব শুনে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি”।
“যখন আপনাদের বাড়িতে আসতেন, কোন লোক দেখা সাক্ষাৎ করতে আসত না”। এস এস সি আই ডি একটা সিগারেট ধরালেন।
“ ঠিক মনে নেই, তবে এবার বীরুমামা আসতে খুব ভরসা পেয়েছিলাম, ও অফিস চলে গেলে খুব ভয় করত, নির্জন জায়গা, ……” এসপি সাহেব হাত তুলে শর্মি’কে থামিয়ে দিলেন।
“আই সি কল্যানী’ র ফোন হ্যাঁ হ্যাঁ বলো …… পাওয়া গেছে, কোথায়?……ওঃ যে বাড়িটা তৈরী হচ্ছে তার ভেতর,……   সঙ্গে আর একজন ছিল…… পাহারায়, কি নাম তার? …… ভরত,  ঠিক আছে, ওকেই খোঁজা হচ্ছিল। মোটর বাইক… ওটা সিজ করে থানায় রেখে  দাও……তুমি থানায় চলে এসো, ওখান থেকে ডিরেকশন পেয়ে যাবে”।  ফোন রেখে “গ্র্যান্ড সাকসেস”।
“ আমার প্রথমেই মনে হয়েছিল কলকাতা যেতে হলে অনেকটা রাস্তা পার হতে হবে, রিস্‌ক থেকে যাবে , তাই অন্য কোথাও নিয়ে যাবার সম্ভবনা বেশি, যখন শুনলাম এই বাড়ির রাজমিস্ত্রী মিসেস দত্ত’কে বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেছিল, তখনই মনে হল ও সুলতানের লোক, ওকে হাত করেছিল সম্ভবতঃ পয়সার লোভ দেখিয়ে। বাড়ি ফাঁকা পেলে ওর সাহায্যে খুঁজে দেখবে”। এস এস সি আই ডি সিগারেটের ছাই ঝাড়লেন।
(৫)
পরাজিত  সৈনিকের গ্লানি মাখা মুখে বীরুমামা দেখিয়ে দিলেন সিঁড়ির নীচে ছোট্ট বোতামের মত একটা সুইচ, সেটা টিপতেন স্লাইডিং ডোর খুলে গেল, তার সঙ্গে একটা  সিঁড়ি নেমে গেছে বেসমেন্টে, সেখান থেকেই উদ্ধার হল গ্যাসচেম্বারে মৃত্যুমুখী ইহুদিদের ভয়ার্ত ছবি “ দ্য ডেথ চেম্বার” কয়েকটা পাথর ও অষ্ট ধাতুর মূর্তি কিছু দুষ্প্রাপ্য পূথি, বেশ কিছু মার্কিণ ডলার ছাড়াও  কিছু দেশের কারেন্সী। শুধু পাওয়া গেল না রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাইজ, যেটা অর্ণব শর্মি খুব আশা করেছিল। কোথায় গেল বীরুমামার সেই জৌলুশ, পুলিশের গাড়ি করে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তাকে দেখে শর্মি’র সত্যিই মায়া হল।
 আজ টিভি’র বিভিন্ন চ্যানেলে বার বার দেখানো হচ্ছে অর্নবদের নতুন বাড়ির ছবি। সন্ধ্যেবেলা সোফায় বসে দেখছে ওদের বাইট দেবার দৃশ্য । কয়েকদিন আগে অর্ণব একটা হুইস্কি কিনে এনেছিল, সেটাই খোলা হয়েছে নতুন বছর সেলিব্রেট করার জন্যে।
সামান্য চুমুক দিয়ে একটা কাজু মুখে ফেলে শর্মি বলল-“ পাচ্ছ না?”
আশ্চর্য অর্ণব বলল-“ কি? কি পাব?”
“গন্ধ। লক্ষ্মীবিলাস তেলের”।
শ্বাস টেনে অর্ণব বলল-“ তাই তো, তুমি ঠিক বলেছ, তার মানে সোনা কাকীমা এখানেও এসে গেছেন তোমাকে পাহারা দিতে।  আর কোন ভয়ের কারণ নেই”।  মোবাইলে টিং শব্দে ম্যাসেজ ঢুকল- “ হ্যাপি নিউ ইয়ার”।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!