সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নীলম সামন্ত (পর্ব – ২৪)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (উলুপি)

দেখতে দেখতে বেশ অনেকগুলোই চরিত্র নিয়ে আলোচনা করে ফেললাম। একদম শুরুর দিকে পরাশরমুণির কথা বলেছিলাম আর সেখানে এ উল্লেখ করেছিলাম সত্যবতীর কাছ থেকে একটি পুত্র সন্তান কামনা করার কারণ। এই পর্বে উলুপি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পরাশরমুণির কথা তুললাম তার একটি বিশেষ কারণ হলো পরাশর সংহিতা৷ আমরা সকলেই জানি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় পরাশর সংহিতায় উল্লিখিত সেই বিশেষ আইন তথা বিধবা বিবাহ আইন-এর হাত ধরেই এ যুগের বিধবা বিবাহ আইন চালু করতে পেরেছিলেন। সে যুগে বেদব্যাসের হাত ধরে পরাশর সংহিতা সমাজে প্রচলিত হয়েছিল। কিন্তু সেই যুগে যে বিধবাদের বিবাহ হতো সেরকম বিশেষ একটা উল্লেখ আমরা এতক্ষণ পর্যন্ত পাইনি। একমাত্র উলুপি এমন চরিত্র যিনি প্রমাণ করেন সেই যুগে অর্থাৎ পরাশর সংহিতা যে সময় সমাজের আইন শাস্ত্র, বিধবা বিবাহ সত্যি সত্যিই চালু ছিল। উলুপি চরিত্রটা নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করলেই বোঝা যায় মহাভারতের আরেকটি উপেক্ষিত চরিত্র হল উলুপি।
একটি মেয়ে যেমন অনেকগুলো পরিচয় থাকে তেমনি উলুপিরও অনেক পরিচয়। প্রথম পরিচয় হিসেবে অবশ্যই তার পিতৃপরিচয় উল্লেখযোগ্য। নাগা প্রধান এরাবথ কৌরব্যের কন্যা ছিলেন উলুপি। হ্যাঁ উলুপি ছিলেন নাগ কন্যা। সাধারণ মেয়ে মানুষের মত তার অবয়ব ছিল না। কোমর থেকে মাথা পর্যন্ত নারীর আকার এবং থেকে নিচ পর্যন্ত খানিকটা সাপের মতো বা মাছের মত বলা চলে। আমরা মারমেড বলি সেরকম ধরণের। নাগারা সেই সময় বনাঞ্চলে বাস করত খুব স্বাধীনভাবেই। বাসুকি, তক্ষক কৌরব্য ইত্যাদি নাগা প্রধানদের নেতৃত্বে দলে দলে ভাগ হয়ে তাদের বাস ছিল। কৌরব্যের নাগলোক ছিল ভাগীরথী নদীর নিচে। মারমেডের কথা বললাম বলেই মনে হলো একটা কথা জানিয়ে রাখি, ভাগীরথী নদীর নিচে কৌরব্যের নাগলোকে নাগদের বসবাস কিন্তু মারমেড ফেয়ারী টেলের মত রূপকথার ছিল না। তাদের যথেষ্ট কষ্ট করেই জীবন যাপন করতে হতো। এমত অবস্থাতেই এরাবথ তার কন্যার বিবাহ দিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু খুব কম দিনের মধ্যেই উলুপির স্বামী গরুর এর হাতে নিহত হয়ে গিয়েছিলেন। এই সময় সে কিন্তু নিঃসন্তান ছিল। না ছিল কোন পুত্র না ছিল কোন কন্যা। এমত অবস্থায় উলুপি তার বাবার কাছে গিয়েই থাকতো ভাই বোন সবার সাথে। তবে মাঝেমধ্যেই উলুপির বাবা অনুরোধ করতেন উপযুক্ত স্বামী খুঁজে দ্বিতীয় বিবাহ করার জন্য। কারণ নাগালোকে সেই সময়ে অনেক নাগা সুপুরুষ ছিলেন বিবাহযোগ্য। হয়তো উলুপি একবার বললেই রাজি হয়ে যেত কিন্তু সেরকম তা হয়নি।

উলুপির জীবনের এইটুকু বর্ণনা থেকে বলা যায়, সে যুগে বিধবাদের বিবাহ নিয়ে খুব একটা নাক উঁচু কিছু গল্প ছিল না। আমাদের বর্তমান সমাজে সেরকম না থাকলেও খুব সহজে যে বিধবা কোন মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় তা কিন্তু না। এমনকি স্বামী নেই সে পাঁচটা অন্য কোন ছেলের সাথে কথা বললে সমাজ তার দিকে অন্যরকম আঙুল তোলে এবং নানান কটূ কথা বলতে থাকে খুব সহজেই। বাবা মায়েরাও এতটা উদারতা দেখাতে পারে না যে সহজেই অন্য একটি ছেলে দেখে তার মেয়ের বিয়ে দিতে পারে। কিন্তু সেই যুগে নাগালকে কৌরব্য এরাবথ খুব সহজেই মানসিক বাঁধা বাধ্যকতাকে উপেক্ষা করতে পেরেছিলেন। হয়তো সে সময় এ ধরনের কোন বাঁধা ছিলই না। স্বামী না থাকলে সেই মেয়ের যে আরেকবার বিয়ে হতে পারে এটা হয়তো খুব স্বাভাবিক একটা বিষয় ছিল। তাই ওলোপির বাবার মধ্যে কোনরকম সামাজিক সংকোচ দেখতে পাই না।

উলুপি কিন্তু সাধারন নাগকন্যা ছিল না। তার মধ্যে বিশেষ গুণাবলী হিসেবে উল্লেখযোগ্য ছিল, জলের নিচে এসে অতি সহজেই আগুন জ্বালতে পারতো এবং মৃতদেহে প্রাণ সঞ্চার করতে পারত। এত সুন্দর গুন নিয়ে তার জীবন কিন্তু খুব সাধারণ ছিল না তাকে অনেক কষ্ট করেই বাঁচতে হয়েছে। এবং সব সময়ই নিঃস্বার্থভাবে কোন প্রতিদান ছাড়াই মানুষের পাশে থেকেছে। অর্জুনের পাশেও থেকেছে। ওই অর্জুনের জন্যই হয়তো উলুপি চরিত্রটির বিশেষ প্রয়োজন হয়েছিল। কারণ মহাভারতের নানান চরিত্র পড়তে গিয়ে এবং জানতে গিয়ে আমি বুঝেছি সবকিছুই ওই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ কেন্দ্রিক এবং পঞ্চপান্ডবদের দ্বারা ধর্মস্থাপনকে সামনে রেখে আখেরে পঞ্চপান্ডবদের পাশে সমস্ত ধরনের শক্তিকে রাজনীতি কিংবা ধর্মনীতি কিংবা সমাজনীতিকে অবলম্বন করে নিয়ে এসে একটি সাপোর্ট সিস্টেম তৈরি করা। এমন কথা কেন বললাম সেটি নিচে বিস্তারিত আলোচনা করব।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।