সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নীলম সামন্ত (পর্ব – ১০)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (দুঃশাসন)

বারণাবতে পাণ্ডবদের জতুগৃহে পুড়িয়ে মারবার পরিকল্পনার ঘটনা মনে আছে? বারণাবতের লোক ঠিক করা থেকে লাক্ষাগৃহ তৈরি এমনকি আগুন লাগানোর দিন ঠিক করা পর্যন্ত কোথাও দুঃশাসনকে দেখতে পাওয়া যায় না অথচ তিনি অনুগামী। ষড়যন্ত্রের শুরু দিন থেকেই সহায়। যদি তাকে কাজে লাগানো হয়, কিংবা কোন আজ্ঞা দেন তাঁর দাদা, অথবা দাদার ছায়ায় ঘুরে ঘুরে ওই মহা-আগুনের যথাসম্ভব তাপ পোহানো যায়। চরিত্রটি যত জেনেছি ততই ভেবেছি। একটা মানুষ এরম রোবোটিক আচরণ কিভাবে করতে পারে? কোথাও কোন কাজের বিরোধিতা করে তিনি জ্যেষ্ঠ্য দাদার বিষচক্ষু হতে চাননি। দাদার প্রতি তার অন্ধ ভালোবাসা যেন পদে পদেই ফুটে উঠেছে। আবার বলা যায় প্রভু শিষ্য সম্পর্কে প্রভুর প্রতি স্বচ্ছ নিবেদন স্পষ্ট সর্বত্র।

তবে কি গোটা মহাকাব্য জুড়ে একবারও শব্দ ব্যয় করেননি অকালকুষ্মাণ্ড চরিত্রটি! ইশ অকালকুষ্মাণ্ড! জানিনা, লিখতে লিখতে হঠাৎই বিশেষণটা বেরিয়ে এলো। কেন জানেন? একবার পাশা খেলার কথা ভাবুন৷ যখন যুধিষ্ঠির সর্বস্ব হারিয়ে কৌরবদের দাস হলেন সাথে বাকি চার ভাই, এমনকি দ্রৌপদীকেও বাজী রেখে হেরে গেলেন, তখন দ্রৌপদীকে রাজসভায় আনার জন্য প্রতিকামীকে পাঠানো হল আর সে মানুষ আনার বদলে দ্রৌপদীর নানান প্রশ্ন নিয়ে আসা যাওয়া করছে, দুর্যোধন ধৈর্য্য হারালেন নিযুক্ত করলেন অনুজ দুঃশাসনকে। কারণ তিনি ভালই জানতেন এ কাজ চোখ বন্ধ করে একমাত্র দুঃশাসনই নিমেষে করতে পারবে। ছোট থেকে যে দেখে আসছেন। রন্ধ্রে রন্ধ্রে চিনবেন এটাই তো কাম্য। আদেশ করলেন। বললেন পাণ্ডবরা তো বন্দি তারা কি বা করতে পারে। সাথে সাথেই পালিত কুকুরের মত তার চোখ লাল হয়ে উঠল লোভে। যেন সমস্ত অনুভূতি দুর্যোধন থেকে দুঃশাসনে সংক্রমিত হলো বা বলা যায় সঞ্চারিত হলো। লজ্জা, রুচি, এমনকি মুখের আগল সমস্তই ত্যাগ দিয়ে দ্রৌপদী কে বললেন – তুমি চলো পাঞ্চাল কন্যা আমরা তোমায় জিতে নিয়েছি এখন তুমি নির্দ্বিধায় দুর্যোধনের দিকে তাকাতে পারো। লজ্জার কিছু নেই। দুর্যোধনং পশ্য বিমুক্তলজ্জা।

কোথাও কি একবারও মনে হচ্ছে দুঃশাসন আনাড়ি বা জ্ঞান বোধহীন? আসলে তিনি কিন্তু ভালই জানেন দ্রৌপদীর পাঁচটা স্বামী। পাঁচজনকে খুশি করতে পারলে বাকি একশ’জন গৌরব কে কেন পারবে না? হয়তো চক্ষু লজ্জার খাতিরে শুধু নিজের নামটা বললেন না সমস্ত কৌরবদের কথা ইঙ্গিত করলেন। কুরূন্‌ ভজস্বায়ত-পদ্মনেত্রে/ ধর্মেণ লব্ধাসি সভাং পরৈহি৷ কতটা নির্লজ্জ হলে এমন হতে পারে ভাবুন তো। নারী যেন বাজারের পণ্য এমন ভাব তার মধ্যে। তাঁরা জিতে নিয়েছেন। অথচ এই জেতাতে দুঃশাসনের কিন্তু কোন ভূমিকাই নেই। এই লম্পট প্রস্তাবের পর দ্রৌপদীর বিবর্ণ মুখ দেখে দয়া মায়া হওয়ার কথা ছিল না। যখন দ্রৌপদী অনুনয় বিনয় করে বলল সে রজঃস্বলা। এই অবস্থায় রাজসভায় সে যেতে পারে না। ভয়ে গান্ধারীর ঘরের দিকে ছুটল। কিন্তু তাতে দুঃশাসনের কি যায় আসে? তার মধ্যে মনুষ্যত্ব কোথায় ছিল? সে আশা করাও বুঝি অন্যায়। দ্রৌপদীর চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে ফেললেন রাজ সভায়। উফ ভীষণ লজ্জার। সেই মুহূর্তে তার মুখেও কোন লাগাম ছিল না বারবার ব্যবহারে ও বচনে দ্রৌপদিকে দাসী বানিয়ে ছাড়তে পিছপা হননি। অগ্রজ আদেশ দিয়েছে, একজন নারীর বাধা সে মানবেই বা কেন? যেনতেন প্রকারেন তাকে ওই আদেশ সম্পন্ন করতেই হবে। এবং করলেনও।

দুঃশাসন অর্থাৎ যাকে শাসন করা যায় না, যে শাসনের ঊর্ধ্বে। দ্রৌপদী বোঝেনি তাই বিনয় দেখিয়েছিল নানান প্রশ্নে তার মানবিকতা চেষ্টা করেছিল। সে জানতো না মানুষ এতটাও অসভ্য হতে পারে। কিন্তু জানল। পাঁচ পাঁচটা স্বামী থাকার পরেও অনাথা নারীর মতো লজ্জা আবরণ ত্যাগ করে রাজসভায় এসে পড়তে হয়েছিল। মজার ব্যাপারটা দেখুন, দূর্যোধন কিন্তু একবারও শিখিয়ে দেননি কিভাবে দ্রৌপদীকে রাজসভায় এনে ফেলা হবে। তিনি শুধু আদেশ দিয়েছিলেন দ্রৌপদী কে নিয়ে। দুঃশাসন তাকে নিয়ে এলেন চুল ধরে টানতে টানতে এবং অনেকটাই বিবস্ত্র অবস্থায়। এ কাজের জন্য তাকে তিরস্কার পেতে হয়নি বরং প্রশংসা পেয়েছিল শকুনির কাছ থেকে, কর্নের কাছ থেকে।

এই দুঃশাসনকেই একদিন যুধিষ্ঠির তথা পাণ্ডব জ্যেষ্ঠ আপন করে নিতে চেয়েছিল। জ্ঞাতি ভাইদের সাথে শত্রুতা ভুলে যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে দুঃশাসন পেয়েছিলেন এক গুরুদায়িত্ব। সমস্ত অতিথিদের প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহের দায়িত্ব। দুঃশাসন তা পালন করেছিলেন যেন না পালন করলেই নয়। মন থেকে কি আর সেই সরলতার উত্তাপ নিজের উপর বর্তাতে পেরেছিলেন? না পারেননি। আর পারিনি বলেই পাশা খেলায় দ্রৌপদীর সাথে এমন আচরণ তিনি খুব সহজেই করে ফেলেছিলেন। ওই যে কথাই বলে না কুকুরের পেটে কি আর ঘি ভাত সহ্য হয়। দুঃশাসন যে খারাপকেই পাকাপাকি ভাবে আত্মস্থ করতে স্বচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ভালো কিছুতে তার চরম অ্যালার্জি। ছোট থেকে শুনে এসেছি সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস। কিন্তু যে মানুষটা অসৎ সঙ্গকেই ধ্যান, জ্ঞান, প্রাণ, মন, জীবন মেনে বসে থাকেন তার কাছে স্বয়ং ভগবান নেমে এলেও কোনরকম আলাদা প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায় না বরং যেন হিংসা, বিদ্বেষ, কুনজর বাড়তেই থাকে। দুঃশাসনকে অনেকটা সেরকমই দেখি।

একই সাথে জন্মে এবং বড় হয়ে বিকর্ণ ও যুযুৎসুর কিভাবে যে ধনাত্মক চরিত্রের মানুষ হলেন – ছিটে ফোটাও কি এরা পায়নি! ছোট থেকে তো একই শিক্ষাগুরু, একই পরিবেশ, একই সান্নিধ্য। কেউ কেউ জন্মায়ই যেন ধর্মের সাথে বিকর্ষণ নিয়ে। দুর্যোধনও এমনই। আর অনুজ তার কপি ক্যাট। একটা শব্দ আছে ব্রেণওয়াশ। খুব ছোট বয়সে শকুনির সঙ্গলাভের কারণে দুজনেই ব্রেণওয়াশড হয়ে গেছিল সেটা স্পষ্ট। তবে দুর্যোধনের নিজস্ব চিন্তাভাবনা ছিল। তিনি কোথাও কোথাও ভালোও ছিলেন যেমন তার স্ত্রীর প্রতি বা প্রজাদের প্রতি কখনোই অন্যায় করেননি৷ কিন্তু দুঃশাসন যেন আগাগোড়াই নির্বোধ চরিত্রের৷ দ্রৌপদীর সাথে অমন নোংরা ব্যবহার করার পর যখন তৃতীয় পাণ্ডব ভীমসেন রাগে তার বুক চিরে রক্ত খাওয়ার প্রতিজ্ঞা করছেন কিংবা ওই রক্তে দ্রৌপদীর চুল ধোয়ার প্রতিজ্ঞা করছেন তখনও পর্যন্ত দুঃশাসন ভয় পায়নি। যেন সে ভয় পেতেই শেখেনি! অবশ্য ভয় পাওয়ার কথাও ছিল না। সেদিনের সভায় দুর্যোধন খুব বেশি কিছু না বললেও কর্ণের উৎসাহদান দেখে বেশ মনে হয়, দ্রৌপদীকে স্বয়ংবর সভায় না পাওয়া ও তার করা অপমানের বদলা নিচ্ছেন। জানেন কি দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় এক বাক্স কিউইর মধ্যে একটি টুসি আম ঢুকে যাবার মতো কেমন অহেতুক ভাবেই দুঃশাসন পৌঁছে গেছিলেন। আর বরমালা না পাওয়ার রাগ, কর্ণের অপমান এমনকি দাদা দুর্যোধনকে প্রত্যাখ্যানের প্রতিহিংসা মনের মধ্যে পুষে ফিরে এসেছিলেন। সেই সব কিছুরই হিসেব যেন কড়ায়গণ্ডায় মিটিয়ে নিচ্ছিলেন পঞ্চপাণ্ডব ভার্যার বস্ত্রহরণ করে। এভাবেও যেন তার কামের তৃপ্তি ঘটছিল।

.
.
চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।