দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৭৫)

পর্ব – ১৭৫

অনসূয়ার ঘরোয়া কাজের সহায়িকা বলল, খাবার দিচ্ছি, খেয়ে নেবে চলো।
শ‍্যামলী বলল, না না, আমি খাব না। আমায় ফিরতে হবে।
অনসূয়া ছদ্মরাগ দেখিয়ে বললেন, না খাবে না! কোন্ সকালে কলেজ যাবার নাম করে বাড়ির বাইরে পা রেখেছিস, সেই থেকে আর ঘরে ফেরার নামগন্ধ নেই। আবার বলা হচ্ছে খাব না!
 শ‍্যামলী বলল, সে কি করে হয় দিদি, বাড়িতে যে আমি বলে আসি নি! খাবার নষ্ট করা কি ঠিক?
অনসূয়া বললেন, দ‍্যাখ্ শ‍্যামলী, আমাকে রাগাবি না। আজ তুই এখানেই খাচ্ছিস্ আর রাতে এখানেই থাকছিস্। আমি বসে বসে সব ছকে ফেলেছি। কাল কলেজ থেকে বাড়ি যাবার সময় কোর্ট থেকে আমিও যাব। গিয়ে তোর বাবা মায়ের থেকে তোকে আমি চেয়ে নেব। তুই এই বাড়িতে থেকেই পড়াশুনা করে বড় হবি।
শ‍্যামলী শান্ত স্বরে বলল, না দিদি, তা হয় না।
অনসূয়া বললেন, কেন, হয় না কেন শুনি?
শ‍্যামলী বলল, এটা আমার আদর পাবার একটা জায়গা। রোজ রোজ থেকে সেটা আমি মলিন করতে পারব না।
অনসূয়া বললেন, এমন অনেক কথা থাকে, যেটা তোর ভাষায় প্রাইভেসিতে আটকায়, বড় করে ভাবলে সেটা লিবার্টি বা ব‍্যক্তি স্বাধীনতার অঙ্গ। তবু তোকে আমি সহজভাবেই বলছি, এখানে লেখাপড়া করে জীবনে দাঁড়াতে পারলে আমি খুব খুশি হব।
 সহায়িকা মেয়েটি বলল, খেতে খেতে গল্প করলে হত না? গরম গরম খেতে ভাল লাগে।
অনসূয়া বলল, এবেলা কি রেঁধেছ দিদি?
সে বলল, কাবলি ছোলার ঘুগনি, পরোটা, আর রসগোল্লার পায়েস।
শ‍্যামলী বলল, বাসি রসগোল্লা গুলোকে নিয়ে আবার ওই কীর্তি করেছ?
সহায়িকা মেয়েটি বলল, না গো না, ছানার মুড়কি আনিয়েছিলাম। সেটাই ঘনদুধে জ্বাল দিতে দিতে রসগোল্লার পায়েস। আর শোনো, তুমি বাপু হাঁড়িভরতি রসগোল্লা আনা বন্ধ করো। রোজ রোজ কে খেতে পারে অতো রসগোল্লা!
সহায়িকা মেয়েটি শ‍্যামলীকে বলল, চলো গো, হাত ধুয়ে নিন।
অনসূয়া বললেন, শ‍্যামলী তুই ওঘরে গিয়ে কাপড় বদলে নে।
শ‍্যামলী বলল, না না, আমি এবার বাড়ি চলে যাব। আমার বলে আসা হয়নি।
অনসূয়া বললেন, হ‍্যাঁ রে, বাড়িতে কি বলে বেরিয়েছিলি, আমি সারাদিন এখানে ওখানে টং টং করে ঘুরব? তোর বাড়িতে ফোন করে বলে দে, অনসূয়া দিদি খুব চেপে ধরেছে, আজকের রাতটা না থাকলে মনে খুবই দুঃখ পাবে।
শ‍্যামলী ম্লান হাসল। কাজের মেয়েটি বলল, নাও দিদি, ওঘরে তোমার রাতের পোশাক বের করে বিছানার উপর রেখে এসেছি। বদলে নাও গে।
শ‍্যামলী পোশাক বদলে এলে অনসূয়া বললেন, রাতে তুই ওই ঘরেই শুবি। ছোট্ট হলেও ঘরটা গরম। আর ভয় করলে আমার ঘরে আসবি।
শ‍্যামলী বলল, ভয় করবে কেন? আমি তো একলাটি শুই। বলতে গিয়ে তার মনে পড়ে গেল গতরাতে দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যাবার কথা, আর তলপেটে বেদনার কথা।
অনসূয়া শ‍্যামলীর মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, কি হল রে? হঠাৎ মুখটা তোর বদলে গেল কেন?
শ‍্যামলী বলল, ও কিছু নয়।
অনসূয়া কড়া গলায় বললেন, দ‍্যাখ, তোর বয়সটা আমি অনেক দিন আগে পেরিয়ে এসেছি। আমি তোর মুখ দেখে বুঝতে পারছি কি একটা হয়েছে। আমায় তুই নিশ্চিন্তে বল্ কি হয়েছে!
শ‍্যামলী মুখ নিচু করে বলল, কাল রাতে হঠাৎ করেই ঘুম ভেঙে দেখি, তলপেটে খুব ব‍্যথা করছে।
অনসূয়া বললেন, কি রকম ব‍্যথা।
শ‍্যামলী বলল, যেন কেউ খুঁচিয়ে দিচ্ছে।
অনসূয়া বললেন, সে কি রে? আমার মনে হয় তোর ইউটিআই হয়েছে। সারাদিন এখানে সেখানে ঘুরিস। জল খাস্ না, বাথরুম যাস্ না। হ‍্যাঁ রে, আন্ডারওয়্যার রেগুলার কাচিস্ তো?
শ‍্যামলী বলল, না না, সে সব ঠিক আছে।
অনসূয়া বললেন, মাসিক ঠিকঠাক হয়?
শ‍্যামলী একটু লজ্জা পেয়ে বলল, সে নিয়ে সমস্যা নয়।
অনসূয়া বললেন, তাহলে কি সমস‍্যা?
শ‍্যামলী বলল, স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুম ভেঙে দেখি কি তলপেটে খুব ব‍্যথা।
অনসূয়া বললেন, কি স্বপ্ন মনে আছে?
শ‍্যামলী বলল, অ আজার বালথাজার।
অনসূয়া বললেন, এটা তো দস্তয়েভস্কির ইডিয়ট গল্পের ছায়া নিয়ে রবার্ট ব্রেসঁর ফিল্ম। খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফিল্ম! আচ্ছা, বুঝতে পেরেছি। ওই যে মারি চরিত্রটা নিয়ে তুই খুব বেশি রকম ভেবে ফেলেছিলি। মারি যে গেরার্ডের হাতে বিশ্রিভাবে অ্যাবিউজ়ড হয়েছিল!
 শ‍্যামলী মুখ নিচু করে থাকে। তার মনে পড়ে যাজ্ঞবল্ক‍্য ঋষির বোন কংসারি অশ্বত্থ গাছের নিচে সদ‍্যোজাত বাচ্চাটাকে ফেলে লোকলজ্জার ভয়ে কোথায় উধাও হয়ে গেল। অপ্সরী  মেনকা ফেলে গিয়েছেন শকুন্তলাকে, শকুন্ত মানে পাখিরা ডানা দিয়ে পরম যত্ন করে ঢেকে রেখেছিল মেয়েটাকে। তাই শকুন্তলা নাম দিলেন কণ্বমুনি। রাজা জনক যজ্ঞ ভূমি সমতল করতে হলকর্ষণ করছিলেন। লাঙলের ফলায় উঠে এল একটা সদ‍্যোজাত মেয়ে। লাঙলের ফলাকে সীতা বলে, তাই জনক কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ের নাম দিলেন সীতা। দ্রুপদ রাজার যজ্ঞাগ্নি থেকে উঠে এল পূর্ণযৌবনা একটা মেয়ে। কালো মেয়ে। রাজা নাম দিলেন কৃষ্ণা। কংসারি তাঁর বাচ্চাটাকে অশ্বত্থ বা পিপুল গাছের নিচে পরিত্যাগ করে গিয়েছিলেন, তাই বাচ্চাটা পরিচিত হল পিপ্পলাদ নামে। কিন্তু অবিবাহিতা মেয়ের সন্তান হয় কিভাবে? সেকালে কুমারী মেয়েদেরকেও গোপনে গর্ভবতী করে দেবার লোকজন খুব কম ছিল না। তেমন সন্তানকে বলত কানীনপুত্র। সূর্য গর্ভবতী করেছিলেন কুন্তিভোজ রাজার কুমারী মেয়ে কুন্তীকে। ফলে কর্ণের জন্ম। তার অনেকদিন আগে ঋষিপ্রবর পরাশর গর্ভবতী করেছিলেন মৎস্যরাজ কন‍্যা সত‍্যবতীকে। ফলে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব‍্যাসের জন্ম। ফরম‍্যাল বিয়ের তোয়াক্কা না করেই দুষ‍্যন্ত আশ্রমবালিকা শকুন্তলাকে গর্ভবতী করেন। কিন্তু পিপ্পলাদের জন্মের কারণটি নিয়ে উদ্ভট গল্প ফাঁদা হয়েছে। অবিবাহিতা তরুণী কংসারি তাঁর দাদা মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক‍্যের রেতঃপরিপ্লুত বসনখানি গায়ে জড়িয়ে অবগাহন স্নানে গিয়েছিলেন। স্নানের কালে ওই বীর্য তাঁর অভ‍্যন্তরে প্রবেশ করে তাঁকে গর্ভবতী করে দেয়। কংসারির ঘটনাটা দেখে কেউ যদি ভাবে, সেকালে মেয়েরা বাড়ির পুরুষের হাতেও গর্ভবতী হত, যদৃচ্ছা অজাচার চলত, তাহলে কি ভুল বলা হবে?
অনসূয়া বললেন, শ‍্যামলী, তুই তোর ভায়েদের থেকে খুব বিচ্ছিরি কোনো ক্ষতির আশঙ্কা করছিস। তোর ভায়েরা কুসঙ্গ করে, কুঅভ‍্যাসে লিপ্ত। তাই ভেতরে ভেতরে তোকে তোর অবচেতন মন ওইরকম স্বপ্ন দেখিয়ে সতর্ক হতে বলছে।
 শ‍্যামলী বলল, প্রিন্সিপাল ম‍্যামকে কত করে বললাম, হোস্টেলে থাকার একটু ব‍্যবস্থা করে দিন। ভাল করে শুনলেনই না।
অনসূয়া বললেন, তোর ইচ্ছা হয়েছে তুই অনুরোধ করেছিস। অনুরোধ করলেই যে রক্ষা করতে হয়, তার তো কোনো বাধ‍্যবাধকতা নেই।
শ‍্যামলী বলল, দিদি, আমার জন্য কোথাও পেয়িংগেস্ট হয়ে থাকার ব‍্যবস্থা ক‍রে দিন।
অনসূয়া বললেন, ছোটবেলায় তো আমাদের জয়েন্ট ফ‍্যামিলি ছিল, আমরা ভাইবোনেরা ছুটির দিনে ইশকুল ইশকুল খেলতাম।
শ‍্যামলী বলল, ইশকুল ইশকুল খেলা? সে কি রকম?
অনসূয়া বললেন, নকল ইশকুল বসানো।
শ‍্যামলী বলল, সে কি, শিক্ষকদের ভ‍্যাঙানো?
অনসূয়া বললেন, না না, তখনও অতো দুষ্টু বুদ্ধি গজায় নি। স্কুলের প্রেয়ার আমরা বাড়িতে খেলার ছলে করতাম। তো শোন্, আমার একটা দাদা টুলের উপর উঠে গড়গড়িয়ে বলে যেত , এ হানড্রেড টাইমস এভরি ডে আই রিমাইন্ড মাইসেলফ দ‍্যাট মাই ইনার অ্যাণ্ড আউটার লাইফ ডিপেণ্ড অন দি লেবারস অফ আদার মেন, লিভিং অ্যাণ্ড ডেড, অ্যাণ্ড দ‍্যাট আই মাস্ট একজ়ার্ট মাইসেলফ ইন অর্ডার টু গিভ ইন দি সেম মেজ়ার অ্যাজ় আই হ‍্যাভ রিসিভড অ্যাণ্ড অ্যাম স্টিল রিসিভিং। তার থেকে শুনে শুনে তোতাপাখির মতো করে আমিও বলে যেতাম। তখনো নিচুক্লাসে পড়ি। সব শব্দের অর্থ জানি না। জানার দরকারটাও বুঝতাম না। মনে হত এটা একটা ভালো জিনিস। ছেলেমানুষি খেয়ালে বলে যেতেই ভালবাসতাম। একদিন জ‍্যাঠামশাই কাছে ডেকে নিয়ে খুব ধরে ধরে মানেটা বুঝিয়ে দিলেন। এত ভাল ভাবে বোঝালেন যে কিছুতেই ভুলতে পারলাম না। তারপর‌ই অনসূয়া বললেন, ওকি শ‍্যামলী, তুই যে খাবার নিয়ে কেবল নাড়াচাড়া করছিস্! খেতে খেতেই শোন্ না! বুঝলি মেয়ে, আমি তো সমাজ থেকে শিক্ষা দীক্ষা ভাষা সংস্কৃতি মূল‍্যবোধ, কিছু পেয়েছি। আজ যদি কারো কাজে লাগতে পারি, তাহলে ওই যে আমি কিছু পেয়েছি, সেই দেনাটা কিছুটা হলেও শোধ করা যায়।
 শ‍্যামলী যেন গভীর ধ‍্যানের থেকে বলল, ১৯৩১ সালের ফোরাম অ্যাণ্ড সেঞ্চুরি কাগজে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের একটা প্রবন্ধ বেরিয়েছিল। দি ওয়ার্ল্ড অ্যাজ় আই সী ইট। ওখানে এই কথার খানিকটা পর আইনস্টাইন বলছেন, মাই প‍্যাশনেট সেন্স অফ সোশ্যাল জাস্টিস অ্যাণ্ড সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি হ‍্যাজ় অল‌ওয়েজ় কনট্রাসটেড অডলি উইথ মাই প্রোনাউন্সড ল‍্যাক অফ নিড ফর ডিরেক্ট কনট‍্যাক্ট উইথ আদার হিউম্যান বিইংস অ্যাণ্ড হিউম্যান কমিউনিটিজ়। আই অ্যাম ট্রুলি এ ‘লোন ট্রাভেলার’ অ্যাণ্ড হ‍্যাভ নেভার বিলংড টু মাই কান্ট্রি, মাই হোম, মাই ফ্রেণ্ডস, অর ইভন মাই ইমিডিয়েট ফ‍্যামিলি, উইথ মাই হোল হার্ট, ইন দি ফেস অফ অল দিজ় টাইজ়, আই হ‍্যাভ নেভার লস্ট এ সেন্স অফ ডিসট‍্যান্স অ্যাণ্ড এ নিড ফর সলিচিউড।
অনসূয়া সপ্রশংস দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে র‌ইলেন।
এবার শ‍্যামলী তন্ময় হয়ে একটা গান ধরল
কবে আমি বাহির হলেম তােমারি গান গেয়ে—
সে তো আজকে নয় সে আজকে নয়।
ভুলে গেছি কবে থেকে আসছি তােমায় চেয়ে—
সে তো আজকে নয় সে আজকে নয়।
ঝরনা যেমন বাহিরে যায়, জানে না সে কাহারে চায়,
তেমনি করে ধেয়ে এলেম জীবনধারা বেয়ে—
সে তো আজকে নয় সে আজকে নয়।
কতই নামে ডেকেছি যে,  কতই ছবি এঁকেছি যে,
কোন্ আনন্দে চলেছি তার ঠিকানা না পেয়ে—
সে তাে  আজকে নয় সে আজকে নয়।
পুষ্প যেমন আলাের লাগি না জেনে রাত কাটায় জাগি
তেমনি তােমার আশায় আমার হৃদয় আছে ছেয়ে—
সে তো আজকে নয় সে আজকে নয়।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।