ছোটগল্পে মিঠুন মুখার্জী

উত্তর 24 পরগনা জেলার গোবরডাঙাতে নিবাস। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় প্রথম মাস্টার ডিগ্রি এবং পরবর্তীতে নেতাজী সুভাষ ওপেন ইউনিভার্সিটি থেকে সেকেন্ড বার বাংলায় মাস্টার ডিগ্রি।লেখালেখি, গান শোনা এবং গান করা পছন্দ করি। বিশেষ করে রবীন্দ্র সংগীত ও আধুনিক। নেতাজী সুভাষ ওপেন ইউনিভার্সিটির বেঙ্গল পার্টিশন বিষয়ক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত আছি ।বাড়িতে প্রাইভেট পড়ানো হয় ,সঙ্গে একটি এনজিওতে সমাজসেবামূলক কাজ কর্মের সঙ্গে যুক্ত আছি। বাস্তব সমস্যাকে লেখার মধ্যে বেশি ফুটিয়ে তুলতে পছন্দ করি। আনন্দলোক পত্রিকায় দশটার অধিক ক্যাপশন প্রকাশিত হয়েছে।

ভাগ্যচক্র

রাধারাণী গোস্বামী নামে এক বৈষ্ণবীকে আমি মায়াপুরে দেখেছিলাম, যিনি বিগত এক দশক ধরে মায়াপুরে আছেন। অপরূপ সুন্দরী এই বৈষ্ণবীকে দেখে আমার মন কেমন উতলা হয়ে উঠেছিল। ভেবেছিলাম আমিও মায়াপুরে বৈষ্ণব হয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিই। কিন্তু পারলাম না। সংসারের বন্ধন ও ছেলে-মেয়ের টান বৈষ্ণব হতে দিল না আমাকে। কিন্তু এই বৈষ্ণবীকে দেখে আমার মনটা কেন এত উতলা হয়, তা আমি বুঝিনা। একদিন আমার মনে তার ফেলে আসা জীবন সম্পর্কে জানার ঔৎসুক্য প্রকাশিত হয়। আমি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করবো কি করবো না, ভাবতে লাগলাম। হঠাৎ মনে সাহস যুগিয়ে নিয়ে বৈষ্ণবীর কাছে গিয়ে তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেই প্রথমে তিনি অবাক হয়ে যান, কিন্তু পরক্ষনে দুঃখ ভরা জীবনের কথা আমার সামনে ব্যক্ত করতে লাগলেন।
রাধারানী আমাকে বলেছিলেন– “আমার মত দীন দুঃখী মানুষের জীবনের কথা শুনে আপনার কি লাভ বলুন তো? কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন–“আমার প্রকৃত নাম চন্দ্রাবলী গোস্বামী।মায়াপুরে এসে বৈষ্ণবধর্ম নেওয়ার পর নাম হয় রাধারাণী গোস্বামী। আমার বাড়ি গঙ্গার ওপার নবদ্বীপে। পিতা অন্যের বাড়িতে কাজ করে কোনমতে সংসার চালিয়ে আমাদের পাঁচ বোনকে মানুষ করেছিলেন। প্রথম তিন বোনের কপাল ভালো , তাই অর্থপূর্ণ পরিবারে সুখে জীবন কাটাচ্ছেন। কিন্তু আমার ও আমার ছোট বোনের জীবনটা একেবারে নরক হয়ে উঠেছিল। নবদ্বীপে একই পরিবারের দুই ছেলের সঙ্গে আমাদের যমজ দুই বোনের বিয়ে হয়েছিল। প্রথম দুমাস ভালোই ছিলাম। পরে জানতে পারি আমাদের দুই বোনের স্বামীরা মাতাল এবং আমাদের বিয়ে করেছিল বিক্রি করে দেওয়ার জন্য। এরকম আগেও নাকি অনেককে বিয়ে করে বিক্রি করে দিয়েছে। আমরা অন্য পুরুষের সেবা করতে রাজি ছিলাম না বলে আমাদের প্রায়ই মারতো। আমার চোখের সামনে একদিন বোনকে বিক্রি করে দিল দিল্লির এক বাবুর কাছে। আমি প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলাম। কান্নাকাটি করতাম। একদিন বাড়ির সকলে অনুষ্ঠান বাড়ি গিয়েছিল আমায় বাড়ির মধ্যে একলা বন্ধ করে। সেই সুযোগে আমি দরজা ভেঙে শ্বশুর বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে উঠেছিলাম এই মায়াপুরে। তারপর বৈষ্ণবী হয়ে ছদ্মবেশে জীবনের দশটি বসন্ত পার করেছি। এখানেও কত শকুনের চোখ পড়েছে আমার উপর। তবু লড়াই করে বেঁচে আছি। মেয়েদের জীবনটা যেন একটা লড়াই। লড়াই দিতে না পারলে সে বেশিদিন টিকবে না।
রাধারানীর অতীত দিনের কথা শুনে আমার মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল। আমি তার ছোট বোনের নাম জিজ্ঞাসা করতেই সে জানায়– আজ্ঞে রত্নাবলী। নামটা আমার খুব পরিচিত লাগলো। আমার অনেক ভেবেচিন্তে মনে পড়েছিল, এই নামের একটি মেয়ের সাথে অনেকদিন আগে তার পরিচয় হয়েছিল নবদ্বীপে। প্রথম দেখাতেই আমি তার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। যে কদিন নবদ্বীপে ছিলাম প্রতিদিন রত্নাবলীর সাথে দেখা হয়েছে। আমি তাকে প্রেম নিবেদন করেছিলাম। সেও আমাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। একদিন ও আমাকে নবদ্বীপের মন্দিরগুলি ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছিল। আমি দুটি আংটি কিনে একটি ওকে পড়িয়ে দিয়েছিলাম, আর একটি ও আমাকে। তখন আমার বিয়ে হয়নি। আজ থেকে এগারো-বারো বছর আগের কথা। তারপর এক সপ্তাহ পরে আমি ওর সাথে দেখা করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হই। ওর চোখের বারিধারা আমার মনকে ভিজিয়ে দিয়েছিল। তারপর বাড়ি ফেরার পর বাবার ব্যবসার কাজে বিহারে যেতে হয়েছিল। আর যোগাযোগ হয়ে ওঠেনি। তারপর বছর দুয়েক পর, বাড়ি ফেরার পর ভেবেছিলাম নবদ্বীপে আসবো। কিন্তু খুব সত্বর বাবা মেয়ে দেখে আমার ও দাদার বিয়ে একই লগ্নে একই বাড়ির দুই মেয়ের সঙ্গে দিয়ে দিলেন। তারপর কয়েক বার মায়াপুরে ও নবদ্বীপে কখনও পরিবার, কখনো বন্ধুদের সঙ্গে আসা হয়েছে। কিন্তু রত্নাবলীর দেখা পাইনি।
রাধারানীর মুখ আমার কাছে এত পরিচিত কেন মনে হতো আজ তা বুঝতে পারলাম। যমজ বোন হওয়ায় রত্নাবলীর মুখ চন্দ্রাবলীর মধ্যে দেখতে পেয়েছিলাম। রাধারানীর মুখে রত্নাবলীর এই দুঃখজনক ঘটনা শুনে আমি দুঃখিত হয়েছিলাম। চন্দ্রাবলীকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম– “আপনি কখনো পিতা-মাতা ও বোনদের খোঁজ নেন নি?” তিনি আমাকে বলেছিলেন– “নিয়েছি। পিতা গত হয়েছেন তিন বছর হয়েছে। মাকে বড় বোন নিজের কাছে নিয়ে গেছেন। শুনেছি ছোট বোন দিল্লিতে যাবার পথে ট্রেন থেকে লক্ষনৌ নেমে পড়ে বাবুদের চোখে ধুলো দিয়ে। পরিচিত একজন বলছিলেন, লক্ষ্নৌতেই বাইজিদের সঙ্গে সে নাকি যোগ দিয়েছে।” রত্নাবলীর জীবনের কথা চিন্তা করে মনে হয়েছিল, তার এই অবস্থার জন্য সে নিজেও কিছুটা দায়ী। যাকে জীবনের স্বপ্ন দেখিয়েছিলাম একসাথে চলার, আমারই নীরব থাকার কারণে আজ হয়ত তার এমন অবস্থা। সেদিন যদি ব্যবসার কাজে বাধা না পড়তেন, তাহলে হয়তো নিজের চলার পথের সঙ্গী করতে পারতেন রত্নাবলীকে। আজ বউ ছেলে-মেয়ে নিয়ে একপ্রকার সুখেই আছে সে। কিন্তু যাকে সুখে রাখার সংকল্প করে একদিন আংটি পড়িয়েছিলেন, তার কথা মনে করে চোখে জল আসে তার। ভাবেন– “আমরা যা চাই তা পাই না, যা পাই তা ভুল করিয়া পাই।” সেইদিন মায়াপুর থেকে বাড়ি ফেরার পথে মনে মনে সংকল্প করেন আর কখনো রাধারানীর সঙ্গে সে সাক্ষাৎ করবে না। অতীতের স্মৃতি তার মনকে ভারাক্রান্ত করে দেয়। তাই ঈশ্বরের পরিচালিত জীবনকেই সে মেনে নেয়।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!