দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ২২৯)

পর্ব – ২২৯

শ‍্যামলী বলল, ওই যে আমি রমানাথবাবুর মায়ের কাছে ওইরকম বিশ্রি ব‍্যবহার পেয়ে বেরিয়ে এলাম, তারপর অদ্ভুত একটা জার্ণির মধ‍্যে আমি ছিলাম। দেখলাম  চারপাশের সমস্ত বাঁধন সমস্ত কেটে গিয়েছে। আমি আমার একান্ত সত্ত্বাটা নিয়ে খোলা আকাশের নিচে।
 অনসূয়া বললেন, তোর তো রমানাথের বাড়ি যাওয়াটাই উচিত হয় নি।
 অরিন্দম বললেন, বাড়িতে থাকতে সমস্যা হলে আমরা তো ছিলাম।
অনসূয়া বললেন, আমি অনেকদিন আগেই ওকে বলেছিলাম, চ আমার কাছে থাকবি। আমার ড্রাইভারের সামনে ওর দাদা ওকে মেরেছিল। শুনে আমি খুব রেগে গিয়েছিলাম।
 অরিন্দম বললেন, শ‍্যামলী, তুমি বাড়ির সবাইকে চটিয়ে ফেলেছিলে। কোণঠাসা হয়ে গিয়েছিলে। মাথা নিচু করে ভাত নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে শ‍্যামলী।
অরিন্দম বললেন, রমানাথবাবু যে বুদ্ধি খাটিয়ে আমাকে ব‍্যাপারটা জানিয়েছিলেন, সেটাই কাজে দিল।  অনসূয়ার দিকে তাকিয়ে বললেন, আমি তো জানি বেশি রাতে তুই ফোন নিস না।
অনসূয়া বললেন, আমাকে পড়তে হয়। সব ফোন অ্যাটেণ্ড করলে মনোযোগ দিয়ে পড়ব কখন?
অরিন্দম বললেন, তোমার বাবার শরীর খারাপের একটা ভাল ফল আমি পেয়েছি।
অনসূয়া বললেন, যথা?
অরিন্দম বললেন, শ‍্যামলীকে আমি চিনতাম অনেক দিন থেকে।
অনসূয়া হেসে বললেন, তোমার সে গুণটির খবর আমি একটু বেশিই জানি।
অরিন্দম বললেন, না, শ‍্যামলী পাল নামটা খুব শোনা যেত। আবৃত্তি, গান, নাচ, বিতর্ক, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা, সব কিছুতে একটা মেয়ে ফার্স্ট কি করে হয়?
অনসূয়া বললেন, অমনি প্রেমপত্র দিতে শুরু করে দিলি। তাই তো?
শ‍্যামলী বলল, উনি চিঠিগুলো খুব ভাল লিখতেন। প্রবালবাবুও। প্রবালবাবু এখনো চিঠি দেন।
অনসূয়া হেসে বললেন, তো শ‍্যামলীর বাবার শরীর খারাপ হতে আপনার উপকার হল এই যে শ‍্যামলীর কাছাকাছি চলে আসা গেল।
শ‍্যামলী লজ্জা পেয়ে বলল, না না, আমিই ওঁকে আসতে অনুরোধ করেছিলাম। আমি দেখলাম, আমার ভাই আর দাদা খেলতে গিয়েছে। দিদি বলছে, তার বাড়িতে গেস্ট এসেছে। আমি একা সবটা সামলাতে পারব ভরসা হল না। তাই আপনাদের দুজনকে ফোন করেছিলাম। আপনাদের দুজনের চিঠিই আমার খুব ভাল লাগত।
অরিন্দম বললেন, না না, আলাপের সুযোগ তো হল‌ই। কিন্তু আবৃত্তি ভাল করা, বিতর্কে পুরস্কার পাওয়া একটা সুন্দরী মেয়ে, এই ইমেজের চাইতে অনেক অন‍্যরকম ভাল একটা শ‍্যামলীকে আমি আবিষ্কার করলাম। বলা ভাল, আমরা, মানে আমি আর প্রবাল দুজনে মিলে করলাম। কিছুদিন হল, প্রবাল চলে গেল নেদারল্যান্ডসে।
অনসূয়া বললেন, কিন্তু সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল রমানাথ, তাইতো তোমার বক্তব্য?
 না, তা নয়, ওই যে শ‍্যামলী একটা বন্ধ কারখানা নতুন করে চালু করতে পারে, পলিটিক্যাল লোকজনকে সামলাতে পারে, আর মতান্তর হলেও মনান্তর হতে দেয় না, এইসব জিনিসগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ হল।
অনসূয়া বললেন, আর ওর বাবার শরীর খারাপের সময় সাথে থাকায়, ওর বাড়ি যখন ইচ্ছে যাবার পাশপোর্ট ভিসা সব হস্তগত হয়েছিল! কিন্তু রমানাথ এসে সেই আশায় দিল জল ঢেলে।
অরিন্দম হেসে বললেন, না রমানাথ বেশ ভদ্রলোক। আর কিছু ভাল গুণ আছে। গত একত্রিশে অক্টোবর, ইন্দিরা গান্ধীর মারা যাওয়ার দিনে, শ‍্যামলী সন্ধ্যার পর ফেরে নি খবর পেয়ে আমি ওদের বাড়ি গিয়েছি। দেখি রমানাথবাবুও এসেছেন। শ‍্যামলী গিয়েছিল পঞ্জাবি বন্ধুকে দেখতে। যেই ফিরল, ওমা কথা নেই, বার্তা নেই একটা কিল উঁচিয়ে বোনকে মারতে এল শান্তনু। খপ করে তাকে আটকে দিয়েছিলেন রমানাথবাবু।  দেখলাম গায়ে যথেষ্ট জোর।
অনসূয়া বললেন, তাহলে হাতের লেখা, না হাতের জোর, কোনটার জয় হল?

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।