জন্ম- ১৯৬৭, বরানগর।
বর্তমানে দার্জিলিং জেলার মিরিক মহকুমার উপশাসক ও উপসমাহর্তা পদে আসীন।
চাকরীসূত্রে ও দৈনন্দিন কাজের অভিজ্ঞতায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের সমস্যা সমাধানে তাঁর লেখনী সোচ্চার।
বাঙালির কিসসা – ১
বাংলার মধ্যবিত্ত শিক্ষিত ভদ্রলোকদের নিয়ে কত যে গল্প মাথার ভেতর কিলবিল করে….
সেই ভদ্রলোক এসেছেন পৈতৃক জমিটি নিজেদের নামে মিউটেশন করাতে। তাঁকে জিজ্ঞাসা করা গেল “আপনাদের কয়টি বোন?”
ভদ্রলোক তো কিছুতে বলবেন না। আসলে পৈতৃক সম্পত্তিতে বোনেদের ভাগ দিতে চান না। আঁতে ঘা দিয়ে বলা গেল, “ইস, আপনার কি দুঃখ, ভাইফোঁটায় খুব খারাপ লাগে নিশ্চয়?” ভদ্রলোকের মাথা মুখ জ্বলতে থাকে। আমি বুঝতে পারি যে বোন আছে। তখন বলি “একটা এফিডেভিট করে দেবেন। সেই এফিডেভিটের উপর আমরা তদন্ত করব।” তদন্তের কথায় ছটফট করে ওঠেন লোকটি। বলেন যে, “বোনেদের বিয়ে দিতে তো খরচা হয়েছে।”
আমি নির্বিকার নিরাসক্ত মুখে বলি, “তা আপনার বোনের বিয়ে আপনি দিয়েছেন, তো লোককে লুচি মণ্ডা খাইয়েছেন, না চিঁড়ের ফলার, তার আমি কি জানি?”
নিরুপায় হয়ে বলেন “বোনেরা একটা সাদা কাগজে নো অবজেকশন লিখে দিলে হবে না?”
তেতো গলায় বলি, “না, হবে না। আইন মতে সম্পত্তি দিতে আর নিতে গেলে, দলিল করতে হয়। আপনি আসতে পারেন।”
মিইয়ে যান মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক। মিনমিন করে বলেন “বোনেরা বাড়ির ভাগ নেবে?”
“না, নেবে না, আপনার মাকে তো কন্যাসন্তান পেট থেকে বিয়োতে হয় নি। গাছ থেকে খসে পড়েছিল।”
তিক্ত রসে শেষ অব্দি কাজ হয়। বোনেদের নাম রেকর্ড করে দিয়ে দুনিয়া কাঁপিয়ে দেবার আনন্দ পাই।
বাঙালির কিসসা – ২
এক যে ছিল মা আর মেয়ে। ভারি গরিব। দিন যেন চলে না। মেয়ের নামটি প্রফুল্ল। মা ভালবেসে বলে পিপি। মা যখন মেয়েকে ডাকে, আর সাড়া পায় না, তখন বলে পিপি, ও পিপি, ও পোড়ার মুখী…
গরিবানা বড় জ্বালা। প্রফুল্লর মা কষ্ট হলেও বড় ঘরে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বিধবা মানুষ। সব দিক সামলে উঠতে পারে নি। বরযাত্রীদের লুচি মণ্ডা হলেও প্রতিবেশীদের খাওন দাওন খুব ভালো হয় নি। চিঁড়া দইতে সারা হয়েছে। তো কুঁদুলে বাঙালি বামুনের দল একা বিধবার সেই অক্ষমতা ও অপারগতাকে অবহেলা বলে ধরে নিয়ে জাতের খোঁটা দিল। জাত নিয়ে সন্দেহ উঠলে কি আর হিঁদুর ঘরে ঠাঁই হয়? শ্বশুরবাড়ির ভাত খাওয়া বন্ধ হল সোমত্ত প্রফুল্লর। বাপের বাড়িতে ভারি অনটন। কোনোদিন নুন ভাত জোটে, কোনোদিন তাও না।
তার পর একদিন নিরুপায় হয়ে মাকে নিয়ে মেয়ে গেল শ্বশুরবাড়ি। নিজের ভাত কাপড়ের অধিকার অর্জন করবে।
শ্বশুরের তরফে বাড়ির ত্যাজ্য বধূকে বলা হল ডাকাতি করে খেতে।
একা মেয়ে পড়ল ডাকাতের খপ্পরে। ভবানী পাঠকের কাছে গ্রাম্য মেয়ে প্রফুল্লর দেবী চৌধুরাণী হয়ে ওঠার গল্প বলেন বঙ্কিমচন্দ্র।
আমি দাঁদড় কাগজে মেয়েদের খোরপোষের অধিকার নিয়ে লিখতে লিখতে ক্যারাটে ভাবি। প্রফুল্ল ও প্রফুল্ল, ক্যারাটে শেখো।
বাঙালির কিসসা – ৩
বিধবা বিবাহ প্রচলন আমার জীবনের সর্বপ্রধান সৎকর্ম।
বলেছেন বিদ্যাসাগর।
নিজের চোখে বাল্যবিধবার উপর আচারের নামে নির্যাতন সেকালে অনেকেই দেখেছেন। নির্জলা একাদশীর উপরে নিত্য নানাবিধ বারব্রত এবং অন্তর্বাসহীন থান কাপড় পরাবার ব্যবস্থা করে আসলে ওই বালিকা, কিশোরী বা তরুণীর চলাফেরা করার অধিকারকে দমন করত সমাজ। আর শুভ অনুষ্ঠানে ব্রাত্য করে রেখে অল্প বয়সী মেয়েদের মনটাকে মেরে ফেলতে চাইত সমাজ।
কিন্তু নিজের ঔরসজাত কন্যা সন্তানকে নির্জলা উপবাসে রেখে শিক্ষিত ভদ্রলোক বাপ দু বেলা নিজের জন্য চর্ব্য চোষ্যের আয়োজন করাচ্ছেন ওই উপবাসী মেয়েকে দিয়ে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় এ কথা পড়ে হাত যেন নিশপিশ করে উঠেছিল। চোখের বালির বিনোদিনী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল বিধবা হলেই একটা সুস্থ সবল বুদ্ধিমান তরুণী মেয়ের স্বাভাবিক শরীরী আকুতি শেষ হয়ে যায় না। চতুরঙ্গের দামিনী দেখিয়ে দিল যুবতী বউটা স্বামীর কাছে নেহাতই একটা সম্পত্তি। দর দালান খাট আলমারির সাথে একটা রক্ত মাংসের বউকেও লীলানন্দ স্বামীর মতো গুরুর ভোগের জন্য উৎসর্গ করে দিয়ে ছিল নিষ্ঠাবান হিন্দু শিবতোষ।
শরৎচন্দ্র এসে দেখিয়ে দিলেন পরিবারের ভিতরে থেকে শুধু ভাত কাপড়ের কষ্টে ভুগত না একটা তরুণী বিধবা। দিনের বেলা যে মেয়েটিকে থান পরিয়ে উপবাসী রেখে বার ব্রত করিয়ে দেবী বানাত সনাতনী হিন্দু সমাজ, রাতে তাকেই শয্যাসঙ্গিনী হিসেবে পেতে চাইত পরিবারের সমর্থ পুরুষেরা।
মেয়েদের শরীর যে ভোগের বস্তু , সনাতনী হিন্দু পুরুষ তা মুখে স্বীকার না করলেও ঘরের ঘেরাটোপে তা করে দেখাতে অভ্যস্ত ছিল। সেই যৌনমিলনে বাড়ির সমর্থ বিধবা গর্ভবতী হয়ে পড়লে গর্ভপাতের ব্যবস্থা করতে হত। লুকিয়ে চুরিয়ে অশিক্ষিত দাইয়ের হাতে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে গর্ভপাত করাতে গিয়ে মারা পড়ত অনেক হিন্দু বিধবা। অথবা ভয়াবহ সংক্রমণ হয়ে সারা জীবন কষ্ট পেত। শরৎ সাহিত্য খুঁটিয়ে পড়লে টের পেয়েছি।
অনেক পরে জানলাম বিদ্যাসাগর মহাশয়ের তারুণ্যের দিনগুলিতে সনাতনী হিন্দু ভদ্রলোকের বাড়িতে যৌনশোষণ, যৌন নির্যাতনের ঘটনা এড়াতে অনেক তরুণী যুবতী বিধবা মেয়ে গৃহত্যাগ করে যৌনকর্মীর জীবন বেছে নিত। বিদ্যাসাগর মশায় সার্ভে করে দেখিয়ে দিলেন শুধুমাত্র কলকাতা শহরেই যৌনপল্লীতে আশ্রয় নিয়েছিল সাড়ে বারো হাজার হিন্দু বিধবা।
সার্ভে। ক্ষেত্র সমীক্ষা। ঘরে ঘরে গিয়ে সংগ্রহ করে আনা তথ্য। বাস্তববাদী, বিজ্ঞানমনস্ক ব্রিটিশ সরকার তরুণ পণ্ডিতের সার্ভে জাত তথ্যকে অগ্রাহ্য করতে সাহস করে নি।
বিধবার বিবাহ দেওয়াই ছিল হিন্দু ভদ্রলোকের যৌনপল্লীতে গিয়ে যৌনতা কেনার অ্যান্টিডোট। সেটা বাস্তবমনস্ক ব্রিটিশ সরকারের কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। শ্লোক নয়, সার্ভে। যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক বিদ্যাসাগর সার্ভের ফলাফল দেখিয়ে সরকারকে আইন প্রণয়নে বাধ্য করেন।
বিদ্যাসাগরকে নিয়ে রচনা লেখার দিনগুলিতে মাস্টারেরা এ কথা কোনো দিন বলে নি।
মাস্টারেরা আজো বলে কি?
বাঙালির কিসসা – ৪
আপনি হিন্দু ?
সাদামাটা চেহারার লোকটি এক নিমেষে বলল – হ্যাঁ, আমি হিন্দু।
আমি ভূমি দপ্তরে রেকর্ড তৈরির কাজ করছিলাম। চূড়ান্ত রেকর্ড তৈরির ঠিক আগের ধাপ। লোকের কাছে তিন ধারা।
হিন্দু শুনে বললাম, ভাই বোনে পৈতৃক সম্পত্তিতে সমান ভাগ পাবেন। জিজ্ঞাসা করলাম – ক’টি বোন ?
উত্তর এল – তিনটি।
বিয়ে হয়ে গিয়েছে ?
উত্তর এল – হ্যাঁ।
বললাম – বরেদের নাম ঠিকানা বলুন।
একটি নাম কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে বেরোলো। আর জেলার নাম। গ্রামের নাম জানা নাই।
গলা উঁচু করে বললাম – অন্য বোনদের বরের নাম ঠিকানা কি ?
লোকটি বলল – সে তো জানি না। ওই একজনেই তো তিন বোনকে নিয়ে গেল।
রাগ হচ্ছিল। বললাম – বিয়ের পর বোনদের একবারও দেখতে যান নি? লোকটি বলল – ন্না ।
আমি গর্জে উঠে বললাম – আপনি হিন্দু ?
সে সব দশবছর আগের কথা। তখন বসিরহাটের ন্যাজাটে আমি রেভিনিউ অফিসার।
বাঙালির কিসসা – ৫
আমি যে পরিমণ্ডলে বড়ো হচ্ছিলাম, সেখানে বয়স্করা অনেকেই দীক্ষা নিতেন । তাদের গুরু থাকতেন। কখনো গুরুমা , গুরুপুত্রও । একই গুরুর শিষ্যগণ পরস্পরকে গুরুভ্রাতা বলে সম্বোধন করতেন । মানে গুরুসূত্রে একটা বড়ো পরিবার গড়ে উঠত । গুরু গত হলে সাধারণতঃ গুরুর উপযুক্ত পুত্র গুরুর আসন অলংকৃত করতেন।
গুরুসূত্রে ব্যবসায়ীদের নিজেদের মধ্যে বিবাদ বিসংবাদ অনেক সময় মিটিয়ে নেবার সুযোগ হত। গুরুরা মধ্যস্থতাও করতেন । গুরুসঙ্গে ব্যবসা বাড়তো পরিচিতির বৃত্ত বাড়ার সুযোগে। গুরুরা কখনো কখনো শিষ্যবাড়ি যেতেন এবং বেশ ভাল দক্ষিণা পেতেন ।
এসব মোটের ওপর বড়ো হবার সাথে সাথে জেনে যাচ্ছিলাম। কিন্তু মহা লেখক নীরদ সি চৌধুরী পড়তে গিয়ে জেনে ফেললাম যে গুরুরা আরো অনেক কিছু করতেন । শিষ্যবাড়িতে বিবাহ অনুষ্ঠানে গুরু হতেন বিশিষ্ট অভ্যাগত । নববধূকে গুরু আশীর্বাদ করতেন। সে আশীর্বাদী অনুষ্ঠান গুরু শুধুমাত্র নবোঢ়াটিকে অর্গলবদ্ধ দরজার ভিতরে থেকে নরম নতুন শয্যার উপর করতেন । লেখক নীরদ সি চৌধুরী নিজের বিবাহের সময় এই ধরণের আশীর্বাদী অনুষ্ঠানে নিজের খাটের নিচে গোপন থেকে মোক্ষম সময়ে গুরুটিকে হাতে নাতে ধরেন ও যার পর নাই অপমান করেন বলে পড়েছিলাম। তখন আমি সিলেবাসের বাইরে খুশি মতো পড়ার নেশা ধরেছি ।
বাঙালির কিসসা – ৬
দুর্গোৎসবের কয়েকদিন আগে এসডিও মিটিং ডাকলেন । রইলেন পুলিশ প্রশাসন আর বিডিওরা। আর বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিরা। একটা গোষ্ঠী দাবি করলো এলাকায় গরু জবাই চলবে না । অন্য গোষ্ঠী বললো যার যেটা খাদ্য সে সেটা খাবে । মাংসটা স্বাস্থ্যসম্মত কিনা সেটা পরীক্ষার ব্যবস্থা থাক । একটি ধর্মের প্রতিনিধিরা কোনোমতেই গরু জবাই করতে দিতে রাজি নন । এক বিডিও আর থাকতে পারলো না। উঠে দাঁড়িয়ে বললো – “গরু একটা জন্তু । খাবার জন্যে আর পাঁচটা গবাদি পশুর একটা। তা ছাড়া ধর্মের অনুষঙ্গ টেনে আনলে বলতে হবে বৈদিক যজ্ঞে মুনি ঋষিরা গো বধ করতেন। ওঁরা গোমাংস খুব পছন্দ করতেন বলে মুনি ঋষিদের গোঘ্ন বলা হতো।”
রে রে করে উঠলেন একটি ধর্মের প্রতিনিধিরা । এসডিও থামিয়ে দিলেন তাদের। মাফ চাওয়ার ভঙ্গীতে বললেন – “না, না, ঐ বিডিও কিচ্ছু জানে না। আপনারাই ঠিক । ”
তার পরেও একটি ধর্মের প্রতিনিধিরা দাবি করলো কোন শাস্ত্র পড়ে মহামূর্খ বিডিওটি “বৈদিক যজ্ঞে মুনি ঋষিরা গো বধ করতেন” বললো – এখুনি জানাতে হবে ।”
এসডিও বললেন – “না জেনে, না বুঝে বলে ফেলেছে, ওসব ভুলে যান।”
মিটিং এ স্থির হল দুর্গোৎসবের আগে এলাকায় গরু জবাই বন্ধ ।
মিটিং শেষে এসডিও’র ঘরে গিয়ে বিডিও সবিনয়ে বললেন – বৈদিক যজ্ঞে মুনি ঋষিরা গো বধ করতেন। ওঁরা গোমাংস খুব পছন্দ করতেন – এমন তথ্য ইতিহাসের স্নাতক স্তরের মান্য পাঠ্যপুস্তকে পেয়েছেন । লেখকের নামটিও উচ্চারণ করলেন ।
চোখের পাতা না কাঁপিয়ে এসডিও বললেন, হ্যাঁ , জানি তো । আমিও ডবলু বি সি এস পরীক্ষায় ওই বইটিই পড়েছি। আপনি তো ঠিক বলেছেন।
বিডিও হাঁ হয়ে গেল।
বাঙালির কিসসা – ৭
মোবাইলে অনেকেরই বাংলা হরফ নেই। আবার অনেকেই বাংলা হরফে কম্পিউটার বা মোবাইলে সিদ্ধহস্ত নন। তাঁরা রোমান বর্ণমালা ব্যবহার করে বাংলা লেখেন। কিন্তু বাংলা লেখাটার সাথে অকারণে ইংরেজি শব্দ ভেজাল দেন কেন? যে শব্দের চালু সহজবোধ্য বাংলা প্রতিশব্দ আছে, তাকে দূরছাই করে ইংরেজি কেন? যাঁরা বিজ্ঞানের ছাত্র, তাঁরা কেউ কেউ বলেন, আমরা বিজ্ঞানের ছাত্র বলে বাংলা ঠিকঠাক লিখতে পারি না। বেশ বুঝতে পারি, ওটা অক্ষমের অজুহাত। বিজ্ঞানের তুখোড় ছাত্ররা নিজের মাতৃভাষা বাংলা হলে তাতে দক্ষ হবেন না কেন?
জগদীশ বসু, প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, রাজশেখর বসু, সত্যেন বসুকে সাক্ষী মানছি। আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। মানিক বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলেন।
বাঙালির কিসসা – ৮
বাংলা কবিতা পড়তে পড়তে যারা বড়ো হতে চেয়েছি, তারা বিদ্যাপতিকে আপন জানি। মনের মধ্যে বাদল ঝরলে তিনি উঁকি দিয়ে যান । আমরা জয়দেবকেও নিজের করে চিনেছি। ওঁদেরকে মৈথিলী ভাষা ও সংস্কৃত ভাষার কবি বলে না চিনে বাঙালি কবি ভেবেছি। লুইপাদ, ভুসুকুপাদ, কাহ্নপাদ, কুক্কুরপাদ, প্রমুখ আচার্যগণ যে চর্যা লিখেছেন, তার ভাষা কাঠামোর বহিরঙ্গটুকু সর্বস্ব না ভেবে, অন্তরঙ্গে বাংলার স্বাদ নিয়েছি। ওড়িয়া ও অসমিয়াভাষী যদি চর্যাপদের সাথে আত্মীয়তা খোঁজেন, তাহলে শিক্ষিত বাঙালি বাঁশ নিয়ে ছুটে যাবেন না আশা করি। সত্যি বলতে কি ওড়িয়া, অসমিয়া ও বাংলা এক অভিন্ন উৎস থেকে বিকশিত হয়েছে।
বাংলা ভাষার আধুনিক কবিরা অনেকেই ইংরেজি ভাষার প্রথিতযশা অধ্যাপক ছিলেন। আমি এই মুহূর্তে জীবনানন্দ দাশ , বুদ্ধদেব বসু ও বিষ্ণু দে’র নাম মনে করতে পারছি। আমি সমর সেন এর ফ্রন্টিয়ার কাগজ পড়তে পড়তে আমার শেষ কৈশোর ও সদ্যতারুণ্য কাটিয়েছি। আর পড়েছি প্রীতীশ নন্দীর ইলাস্ট্রেটেড উইকলি। আমার পল্লীর বাংলা ভালবাসা ইংরেজির মাস্টারমশায় আমাকে এইসব নেশায় অভ্যস্ত করেছিলেন বলে আমি আজ সুখবোধ করি।
“ক্যাপটিভ লেডি” লিখলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। আর বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন “রাজমোহন’স ওয়াইফ” । ইংরেজি ভাষার রীতিমতো চর্চা না থাকলে আজকের ঝরঝরে তরতরে বাংলা ভাষা কি পেতাম? আমার খুব সন্দেহ আছে।
সত্যিকারের বাঙালি, অথচ কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা বেশ কটি মুখস্থ করেন নি, এ আমি ভাবতে পারি না। ছোটো শিশুদের “কাঠ বেড়ালি” ও “লিচু চোর” স্মৃতি থেকে আজো পুরো বলতে পারি। আর দেখেছি তারা ওই দুটি কবিতা শুনে প্রীত হয়।
আমার ছোটবেলায় বন্দে আলি মিঞা, জসিম উদ্দিন তাঁদের কবিসত্ত্বা নিয়েই উজ্জ্বল ছিলেন। আমার তারুণ্যে শামসুর রহমান চিন্তায় বারুদ যোগাতেন । মুজতবা আলির লেখা পড়ে ইংরেজি “উইট” শব্দটিকে চোখে দেখতে পেতাম।
সত্যিকারের বাঙালি বিদ্যাপতি জয়দেবকে পর ভাবতে পারে না। যথার্থ বাঙালি ইংরেজি কাব্য জগতের প্রতি বিরক্তি অনুভব করেন না। কবিতা ভালবাসলে হিন্দু না মুসলিম এই বিচার করতে, তফাত করতে, বিশ্বাস করুন, ঘৃণা বোধ হয়।
বাংলা কবিতার জগত এক মুক্ত স্বচ্ছ জগত।
বাঙালির কিসসা – ৯
আধুনিক বাংলা গদ্য ও কবিতার কিছু মাত্র না জানলেও এই বাংলায় বাংলা পড়ানোর ক্লাস পেতে দেখেছি। নেহাত ক্রীড়া কোটায় ঢুকে পড়া কদর্য হস্তলিপি ওয়ালা ও বানান না জানা শিক্ষক বাংলা পড়াচ্ছেন – এ আমি নিজের চোখে দেখেছি এ রাজ্যের একটি মহকুমা সদরে । এ গ্লানি ভুলতে পারি নি। কালে কালে হয় তো পিওন স্তরের মানুষকেও বাংলা পড়াতে দেওয়া হবে। মনে করো শেষের সেদিন কী ভয়ঙ্কর!
নিতান্ত নিচু শ্রেণীর মদ্যকে বাংলা বলে। দেশি মদও বলে। নেশা তাতে হয়। কিন্তু সুরসিকের তা কাম্য নয়। আমাদের বাংলা ভাষা শিক্ষা দক্ষ ও পরিশীলিত লোকের হাতে না হলে মুশকিল। কবিতা নিয়ে আজেবাজে লোকে যা তা লেখেন । সুকুমার রায় লিখেছেন “মনে করি লিখিতেছি ভয়ানক পদ্য” ! তবু সুধীজন কেউ কেউ কবিতা কর্মশালার কথা ভাবেন। গাঁটগচ্চা দিয়ে গুণী লোককে ডেকে এনে কবিতা নিয়ে ক্লাশ করান। গরিবের ছেলেমেয়েদের স্কুলে বাংলা শেখাবেন যিনি, তিনি বাধ্যতামূলক ভাবে নিয়মিত নিজেকে দক্ষ ও কুশলী করে তুলুন এই প্রার্থনা ।
কোনো মহকুমা শহরে গিয়ে তরুণ কবিদের মুখে চালু ঠাট্টা শুনেছি যে সেই শহরে সাড়ে চারশ জন ” রেজিস্টার্ড ” কবি। আর কেউ না হোক বাংলার কবিরাও যদি যত্ন করে বাংলা পড়তেন, বিয়ে আর জন্মদিনে বাংলা বই উপহার দিতে এককাট্টা হতেন, তাহলে অনেক ভাল বাংলা বইয়ের সংস্করণ হতো সহজে।
আম বাঙালি যদি গভীর আগ্রহ নিয়ে ধ্রুপদী বাংলা সাহিত্য পড়তে উদ্যমী হত, তাহলে অন্য ভাষার চাপে বাংলা “গেল গেল” রব উঠত না। বাঙালির ঘরে ঘরে বিভূতিভূষণ মানিক তারাশঙ্কর সতীনাথ অমিয়ভূষণের সাহিত্য পাঠ হলে অতো ভাবনার কি আছে? রবিবারে পাঁঠার মাংসের দোকানে যে উৎসাহে আম বাঙালি লাইন দিই, পুরুষেরা যে আগ্রহের সাথে গিন্নিকে সরিয়ে রবিবারের মাংসটা রাঁধি , সে রকম আবেগের সাথে স্ত্রী বা বউদি বা মাকে বাংলা গল্প উপন্যাসের অংশ পড়ে শুনিয়েছি কখনো ?
বাঙালির কিসসা – ১০
বাংলা ভাষার প্রথম উপন্যাস?
হানা ক্যাথারিন মুল্যান্স এর “ফুলমণি ও করুণার বিবরণ”
বাংলাভাষার প্রথম নাটক ?
গেরাসিম লিয়েবেদেফ এর “কাল্পনিক সংবদল”
বাংলা ভাষার সংবাদপত্ৰ?
ওয়াল্টার হিকি সাহেবের বেঙ্গল গেজেট।
বাংলা প্রথম ব্যাকরণ?
রোমান অক্ষরে মানোএল দা আসসুম্পসাঁও। বাংলায় নাথানিয়েল ব্রাসি হালেদ, দোম আন্তোনিও।
বাংলা পুস্তক মুদ্রণের উদ্যোগ?
উইলিয়ম কেরী, মার্শম্যান, শ্রীরামপুর মিশন।
বাংলায় মুদ্রণযোগ্য হরফের বিন্যাস বা ডিজাইন?
চার্লস উইলকিনস।
বাংলাভাষা প্রথম থেকেই আন্তর্জাতিক।
বাংলার নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য বেথুন সাহেবের কথা স্মরণ করি। অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যাপারে আলেকজান্ডার ডাফ ও ডেভিড হেয়ারের কথাও মনে রাখি।
বাঙালির কিসসা – ১১
বাঙালি তো ভুলতে পারবে না ছাপার অক্ষরে বই বের করল কারা। হাতে লেখা পুঁথি আর কজনের হাতেই বা যেতো! শ্রীরামপুর মিশন আর উইলিয়াম কেরী আর মার্শম্যানকে বাঙালি ভুলবে কি করে? লোহা কেটে হরফ ও অক্ষর বানিয়েছিলেন পঞ্চানন কর্মকার, আর তাঁর জামাই মনোহর কর্মকার। কিন্তু বিস্তর পুঁথি ঘেঁটে পুঁথির হস্তলিপি বিশ্লেষণ করে, বাংলালিপির মান্য চেহারা কে দাঁড় করিয়েছিলেন? বাংলা লিপির তিন তলা অস্তিত্ব কে বুঝেছিলেন? একদিকে ই-কার ঈ – কার, ঐ কার, ঔ কার, রেফ, এবং অন্যদিকে উ কার, ঊ কার, ঋ কার ইত্যাদি সম্বলিত জটিল বাংলা লিপিকে কে হরফ তৈরিতে প্রয়োগ করলেন? চার্লস উইলকিনস সাহেবকে বাঙালি ভুলবে কেন?
বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে ভাবতে গেলে নাথানিয়েল ব্রাসি হালেদ সাহেবকে ভুলি কি করে? তার আগে রোমান অক্ষরে বাংলা ব্যাকরণ লিখেছিলেন মানোএল দা আসসুম্পসাঁও। দোম আন্তনিও কেও ভোলা যাবে না।
নাটক পাগল বাঙালি কি করে ভুলবে গেরাসিম লেবেদেফ নামের সেই রাশিয়ান মানুষটিকে? উপন্যাসের পাতায় চোখ সেঁটে থাকা বাঙালি ভুলতে পারবে না হানা ক্যাথারিন মুল্যান্স কে। যাঁরা দুচারজন বন্ধু একত্র হয়ে চায়ের কাপে তুফান তুলে কাগজ করার কথা ভাবেন, তাঁরা কি করে ভুলবেন ওয়াল্টার হিকি সাহেব কে?
আর বাংলায় আধুনিক যুগে মহাকাব্য লিখবেন যিনি, বাংলায় লেখার আগে তিনি লিখবেন “ক্যাপটিভ লেডি”। গল্প কাঠামোর উৎস কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের। বাংলার প্রথম সার্থক উপন্যাসকার বাংলায় উপন্যাস লেখার আগে লিখবেন রাজমোহন’স ওয়াইফ। বাঙালির মেয়ে তরু দত্ত আর অরু দত্ত ইংরেজিতে কবিতা লিখবেন। বাংলার সেরা আধুনিক কবিরা জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে, সুধীন দত্ত ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। সমর সেন ইংরেজি ভাষায় “ফ্রন্টিয়ার” নামে জবরদস্ত কাগজ বের করতেন।
ভারততত্ত্ব নিয়ে চর্চা করবেন, আর এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা উইলিয়াম জোন্সকে ভুলে যাবেন, তা তো হতে দেওয়া যাবে না। লেখার মধ্যে রাজনীতি আনবেন আর স্কট সিভিলিয়ান অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমকে ভুলে যাবেন, তা হবে না।
শিক্ষিত বাঙালি অনুভব করে, তার সংস্কৃতির নব রূপায়ণে বিদেশি বন্ধুর অবদান বড় কম ছিল না। সাহিত্য সংস্কৃতির দেশ বিদেশ নেই।