সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ১৩)

গ্যাস চেম্বার

পর্ব – ১৩

কথাটা এমন জায়গায় বিঁধল আমি আর কিছু বলতে পারলাম না । দু’দিনের জন্য বাড়ি চলে গেলাম । রণজ্য গিয়ে প্রতিমাকে আবার কাজের মেযের জায়গায় নামিয়ে দিয়ে আসার পর থেকে ও একটু নম্র হযেই ছিল। আমাকে দেখে মাঝেমাঝে ফোঁস করলেও বাড়াবাড়ি করল না । আমি দেখলাম, বাবা আরাে বুড়াে হয়ে গেছে । ছবি আঁকা বলতে মাঝে মাঝে শুধু পেনসিলে স্কেচ করে । তবে আমার খবরটা শুনে খুব খুশি হল ।
কিন্তু আমি নিজে কি খবরটায় খুশি এখন? আমার পেটের ভেতর যে বেড়ে উঠছে সে যে আমায় রােজ জিজ্ঞেস করে, কত মৃত্যুর বিনিময়ে আমি এখানে আসছি? বাবার কাছে গিয়ে সেই সমযের ভূপালের কথা বলতে শুরু করলাম, বাবা তােমার মনে আছে কিছু? – হ্যাঁ তাের মা খুব দুশ্চিন্তা করছিল। তখন তাে এইসব ইন্টারনেট, মােবাইল, কিছুই হয়নি। ওই খবরের কাগজে যতটুকু যা পড়তাম । তারপর এস টি ডি’তে ফোন করে তিন-চার দিন অন্তর খবর নিতাম কীরকম আছে তাের মামারা । সে এক সময় গেছে বটে । ওরা তাে তারপর কিছুদিনের জন্য ভূপাল থেকে চলে গিয়েছিল । – কোথায় গিয়েছিল? আমাদের এখানে তাে আসেনি? – না, তাের মামা নিজের শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিল। সে অনেক আগের কথা। হঠাৎ কী হল যে এসব জিজ্ঞেস করছিস? বাবাকে কোনাে উত্তর দিলাম না। রাতে খাবার পর বাবার ঘরে গিয়ে জানতে চাইলাম ভাইযের কথা । ভাই নাকি একটা চাকরি পেয়ে জার্মানি যাচ্ছে । আমাকে একবার জানায়নি পর্যন্ত! আমি ফেসবুকেই ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, কী চাকরি করতে যাচ্ছিস জার্মানিতে? জানালি না একবার? ভাই একটা স্মাইলি পাঠিয়ে দিল, তারপর অনলাইন থাকলেও আমার কথার আর উত্তর দিল না । আমি টের পেলাম ভাই আর আমি পরস্পরের কাছে শূন্যস্থান হয়ে গেছি । যা আর ভরাট করা যাবে না। আবার বাবার কাছে ফিরে এসে বললাম, সারাটা জীবনই আমরা সবাই ভীষণ একা, তাই না বাবা? ওই যে লােকগুলাে মারা যাচ্ছিল ভূপালে; স্টেশনে, রাস্তায়, পশুর মতাে পড়ে থাকছিল; তারা সবাই একসঙ্গে মরছিল, আবার তারা তাে সবাই একাও, বলাে?
– না, একা নয়! কারণতাদের মধ্যে যারা বেঁচে ছিল তারা তাে পরে আবার লড়েছে। কমপেনসেশন পাওয়ার জন্য একসঙ্গে ফাইট করেছে। বাবা তাকাল আমার দিকে।
– তবু যে ধ্বংসটা সেদিন এল, সেই ধ্বংসকে তাে প্রত্যেকে একাই ফেস করেছে। যে মা তার সন্তানকে সৃষ্টি করে, সেই মা কি সন্তানের দমবন্ধ হয়ে মরার কষ্টটা নিতে পারে? – আমার কি মনে হয় জানিস, এতটা বয়স পেরিয়ে এসে, ধ্বংস আর সৃষ্টি বােধহয় একসঙ্গে চলতে থাকে । তুই ধ্বংসটাকে অস্বীকার করতে পারবি না, সৃষ্টিটাকেও নয়। বলতে বলতে বাবা আমার পেটে একবার হাত রাখল। আমি বাবার চোখে একফোঁটা জল দেখতে পেলাম। বাবা কি বলতে চাইল বুঝলাম না। বাবার ঘর থেকে চলে এলাম । পরদিন রণজয় আমাকে নিতে চলে এল । আমি চুপচাপ ওর সঙ্গে বেরিয়ে এলাম ।
ফেরার পথে রেস্টুরেন্টে ঢুকে অনেক কিছু অর্ডার করল রণজ্য । আমি প্রায় কিছুই খাচ্ছিলাম না । রণজয় আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কী হল বল তাে? আমরা তাে গুছিয়ে নিয়েছিলাম সব কিছু। এখন তাে আমাদের ভালাে থাকার পালা । কিন্তু তুই এরকম মুড অফ করে থাকলে বাচ্চাটার ক্ষতি হবে না?
– কত বাচ্চার যে ক্ষতি হয়ে গেছে?
– তারা তাে আমাদের কেউ না । – আমরা নিজেরাই কি আমাদের কেউ? হলে পরে এত অমানবিক হই কীভাবে! যদি সত্যি মানুষ হতাম, তাহলে তাে নিজেরা নিজেদের কাছে ভালাে হওয়ার চেষ্টা করতাম । রণজয় চুপ করে থাকল কিছুক্ষণ । বাইরে গেল একটা সিগারেট খেতে। সিগারেটটা শেষ করে এসে বলল, আমরা বেসিক্যালি নিজেরাই ভালাে থাকার চেষ্টা করি । তার বাইরে কিছু করা সম্ভব না। তুই যে কোনাে বই পড়বি, সিনেমা দেখবি, ব্যাপার এটাই । এই যে মানুষ কষ্ট পাচ্ছে তাদের কষ্টের কথা আমরা বুঝি, বল তাে? আজকে যে ট্যাক্সিওলা গরমে ঘামছে, ক’টা উপন্যাস লেখা হয় তাকে নিযে? ফুটপাতবাসীরা ঠান্ডায় মরে যাচ্ছে। কে ভাবছে? মানুষের সভ্যতাটাই এরকম যে মানুষ কোথাও তার নিজের জন্য, তার কাছের সারকেলটার জন্যই একজিস্ট করে । তুই বল তার বাইরে কার জন্য আমরা কে কবে কী করতে পেরেছি? – করতে যে পারিনি সেটা তাে অন্যায় । কোন একটা বইয়ে পড়েছিলাম, মানুষ কত বড় বড় চার্চ বানিয়েছে, কত শিল্প করেছে, কিন্তু মানুষ তার প্রতিবেশী অভুক্ত থাকলে তার মুখে খাবার তুলে দিতে পারেনি । – না, পারেনি। অ্যান্ড দ্যাটস দা রিয়েলিটি । মানুষ পারে না। মানুষের উত্থানটা ওপরের দিকে হ্য। আর উঁচুতে উঠতে গেলে তলার লােকগুলােকে ভুলে যেতে হয়।
– ভুলে যেতে হয় মানে মেরে ফেলতে হয়? – তুই প্লিজ ফিলােজফার হয়ে যাস না । আমার দিকে তাকিয়ে রণজ্য হাতজোড় করল । আমি চুপ করে গেলাম । আমার কষ্ট হচ্ছিল। – আমি তাে ইউনিয়ন কারবাইডের কেউ নই । আর আমি ইউনিয়ন কারবাইডকে ওই গ্যাস প্ল্যান্ট বসাতেও বলিনি। যে ট্র্যাজেডিটা হয়েছিল সেটা আমার কথাতেও হয়নি। আমি পাকেচক্রে ইউনিয়ন কারবাইডের শেযার থেকে কিছু টাকা রােজগার করেছি। তাই বলে তাে আমার কাঁধে ওই মৃত্যুর দায়িত্বগুলাে বর্তায় না?
– এই টাকাটা তাে কমপেনসেশন হিসেবে ইউনিয়ন কারবাইড লােকগুলােকে দিতে পারত।
– কমপেনসেশন তাে ওরা দিয়েছে। কোর্ট একটা অ্যামাউন্ট ঠিক করে দিয়েছিল সেটা। যদিও দাবির তুলনায় অনেকটাই কম পেয়েছে ভিকটিমরা, আমি মেনে নিচ্ছি । তবু তার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? শেয়ারগুলাে আমার কাছে ছিল, সেগুলাে বেচে আমি টাকা পেয়েছি । এটা ইউনিয়ন কারবাইডের জায়গায় যে কোনাে কোম্পানি হতে পারত। – কিন্তু মৃত্যু তাে মৃত্যুই। সে তাে আর অন্য কিছু হতে পারত না। পারে না। – মৃত্যুর কথা ছাড় । তুই এখন একটা জীবনকে ধারণ করেছিস। নতুন একটা জীবনে ঢুকতে যাচ্ছিস । আমিও অনেক কষ্ট পেরিযে এই মুহূর্তটায় এসেছি। | তুই প্লিজ এই আনন্দের সময়টাকে নষ্ট করে দিস না । পরে আপশােসের সীমা থাকবে না । রণজয় অনুনয়ের গলায় বলল । পরে রাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে অনেক আদর করতে করতে রণজ্য বলল, চল আর একবার কোথাও থেকে একটু ঘুরে আসি ।
– কোথায় যাব?
– যেখানে তুই বলবি । কোথায় যাবি বল? কুলু-মানালি? বান্ধবগড়? এখন পাহাড়ে যাওয়া ঠিক হবে না তাের, তাই জানতে চাইছি, জঙ্গলে যাবি নাকি সমুদ্রে? আমি বললাম, আমাকে একবার ভূপাল নিয়ে যাবে? ওই নীলচে মৃদু আলােয় আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রণজয় । তারপর পাশ দিরে শুল, একটাও কথা না বলে । ও কথা না বললেও আমার ভেতরের কথাগুলাে বন্ধ হয়ে গেল না । হওয়া সম্ভব ছিল না।
একদিন একটা বইয়ের দোকানে গিয়ে একটা বই আবিষ্কার করলাম । ইঁট ওয়াজ ফাইভ পাস্ট মিডনাইট ইন ভােপাল। বইটার নাম। বইটা কিনে নিয়ে এসে পড়তে থাকলাম একনিশ্বাসে । আমি শুধু জানতাম মৃত্যু। কিন্তু বইটার মধ্যে পাতায় পাতায, লাইনে লাইনে কত জীবন একদিনের একটা হাওয়ায় শেষ হয়ে গেল তার অমােঘ বিবরণ । আমার মাথার মধ্যে প্রতিটা লাইন গেথে যেতে লাগল । আমি বইটা নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানাে শুরু করলাম । একা বিড়বিড় করতে শুরু করলাম, বইটার শব্দের পর শব্দ।
১৯শে ডিসেম্বর
এসপ্ল্যানেডে আচমকা দেখা হয়ে গেল শৌনকের সঙ্গে । শৌনক চমকে চলে যাচ্ছিল, কী ভেবে নিজেই এগিয়ে এসে বলল, কেমন আছ? আমি যেন অনেকক্ষণ পরে চিনতে পারলাম এভাবে বললাম, ভালাে; তুমি?
– আমি তাে আবার বিয়ে করেছি । তুমি খবর পেয়েছ হয়তাে।
কোথাও থেকে শুনেছিলাম কিন্তু আমার জীবনে শৌনক এমন একটা ফেডেড মেমরি এখন যে খেয়াল করিনি আর । বললাম, কনগ্রাচুলেশনস । তােমার নতুন বউ ওষুধ খায় না তাে? শৌনক প্রশ্নটা শুনে একটু থমকে গিয়ে বলল, আমার কি আর সেই কপাল! এই বউটাও পেশেন্ট। হাইপারথাইরয়েডের । অসুখ ছিল বুঝতে পারিনি। কী আর বলব, আমার লাইফটাই হেল হয়ে গেল। মাঝে মাঝে ভাবি তােমাকে ডিভাের্স না করলেই হত। আমি এসপ্ল্যানেডের রাস্তায় দাঁডিয়ে হাে হাে করে হেসে উঠলাম । শৌনককে জিজ্ঞেস করলাম, লস্যি খাবে? শৌনক রাজি হয়ে গেল দেখে, আমিই অর্ডার করলাম । লস্যি খেতে খেতে শৌনকের দিকে তাকিয়ে বললাম, একজনকে বিয়ে করলে সে পাগল, দ্বিতীয়জনের থাইরয়েড যে মেয়েটার সঙ্গে প্রেম করতে সেই প্রতিষ্ঠাও তােমার মুখে থুতু ছিটিযেই ক্ষান্ত হল না, এনআরআই বিয়ে করে বিদেশ চলে গেল! থাকলে একটা ট্রাই নিতে পারতে। তােমার কপালটা সত্যিই খারাপ। কিন্তু থাইরয়েড তাে স্কিজোফ্রেনিয়ার থেকে ভালাে, তাই না? অ্যাট লিস্ট তােমাকে খুন করতে যাবে না! – তুমি এভাবে বােলাে না । আমার তােমার প্রতি একটা ভালবাসা ছিল আর বিশ্বাস করাে বা না করাে, সেটা থাকবেও।
– ভুল বলছ। ওটা ভালবাসা নয় । ওটা একটা আকর্ষণ। আসলে তােমার সবসময় মনে হত এমন একটা কারাে কাছে ফিরব যার মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতে ভালাে লাগবে । যাকে দেখলে মনে হবে যেন পরী হেঁটে বেড়াচ্ছে ঘরের ভেতর । কিন্তু সেই পরী যদি হাতে ছুরি তুলে নেয় তখন? একটা স্ট্যাবের দাম তিন লাখ টাকা, তাই না? শৌনকের হাতে ধরা গ্লাসটা কেঁপে উঠল, টাকার কথা কেন বলছ?
– তুমি নাওনি রনজয়ের থেকে টাকা? কমপেনসেশন হিসেবে? একবারই তাে তােমায় স্ট্যাব করেছিলাম, তুমি সেটাকে দুটো দেখিযে তিনের বদলে ছ’লাখ টাকা নিয়েছ। তারপরে তাে আমায় মিউচুয়াল ডিভাের্সটা দিলে?
– ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। আবার নতুন বিয়ের একটা খরচ । তাছাড়া আমার অফিসেও একটা প্রবলেম চলছিল ।
– ইটস অলরাইট শৌনক । তুমি তাে কমপেনসেশনের হকদার । তাই বলে একটা স্ট্যাবকে দুটো বলে দেখাবে? বলবে, দু’বারই ছুরি মেরেছি আমি? আমি তাে সেন্সে ছিলাম না তাই প্রমাণ করতে পারব না, দুই না এক। কিন্তু তুমি জানাে আর ওই হােটেলে যারা ছিল সেদিন রাতে তারাও সবাই বলবে যে একবারই আমার হাতের ছুরি লেগেছিল তােমার বুকে।
-না, তুমি দ্বিতিয়বার মেরেছিলে, আমার আঙুল কেটে গিয়েছিল…।
-কাম অন শৌনক, আমার হাত মুচড়ে ছুরিটা ফেলে দিতে গিয়ে তােমার হাতে লেগেছিল। আঙুল কেটে গিয়েছিল। ওটাকে স্ট্যাব বলে না।
– তুমি এত ডেফিনিটলি বলছ কী করে? তুমি কী সেন্সে ছিলে তখন? নাকি পরে মন্দারমণিতে গিয়ে ছানবিন করেছ?
-করার দরকার হয়নি। ওই হােটেলের দু’জন এমপ্লয়ি আমায় ফোন করেছিল, কিন্তু ততক্ষণে তােমার টাকা নেওয়া হয়ে গেছে রণজয়ের থেকে।
-ওরা মিথ্যে বলে তােমায় পটাতে চাইছে। তুমি সুন্দরী তাে৷ অতই যদি ধক তাহলে মামলা চলাকালীন এল না কেন? -মামলা চলাকালীন তােমার উকিলও বলেছিল একটাই স্ট্যাব। কিন্তু রণজয়ের সঙ্গে দরদামের সময় সংখ্যাটা বেড়ে গেল… —কিছুই বাড়েনি। —বাড়লে বেড়েছে। বাদ দাও না। কী এসে যায় আর? তুমি জানাে কত লােক কমপেনসেশন পায়নি? ভূপালে গ্যাস ট্র্যাজেডি হয়েছিল, সেখানে হাজার-হাজার লােক মরে গেছে, তারা কি কেউ ঠিকঠাক কমপেনসেশন পেযেছে? মরে ভূত হয়ে গেছে। তাদের পরিবারের কেউও পায়নি । তুমি তাে নিজের কমপেনসেশন নিজে এনজয় করছ । শৌনক অবাক হয়ে গেল । ভূপাল গ্যাস ট্রাজেডি? তার সঙ্গে আমাদের…।
– কোনাে লিঙ্ক নেই । ঘটনাটা ঘটেছিল তাই বললাম । তুমি ভয় পেও না। আমি আজ ওষুধ খেয়েছি, গ্লাস ছুড়ে মারব না তােমায় । শৌনকের লস্যি খাওয়ার শখ মিটে গিয়েছিল । ও গ্লাসটা রেখে বলল, আমি যাই ।
– একটু আগে যে বলছিলে ডিভাের্স না করলেই ভালাে হত! এখন যদি তােমার সঙ্গে তােমাদের বাড়ি যেতে চাই নিয়ে যাবে?
– তুমি আসবে আমার বাড়ি? আসতে পারাে । আমার সেকেন্ড ওয়াইফ তাে একটা স্কুলে পড়ায় । এখন বাড়িতে থাকে না ।
– তাহলে চলাে।

ক্রমশ…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!