দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ২১৮)

পর্ব – ২১৮

টয়লেটে বড়ো আয়নার ভিতর থেকে প্রতিচ্ছবি জিজ্ঞাসা করল, বিপ্লব তাহলে নভেম্বরের সাত তারিখের ভোরেই শেষ হয়ে গেল? নিজেকে ডিক্লাসড করার লড়াইটা তাহলে আর লড়লে না?
শ‍্যামলী বলল, আমি কি করব, যার দোকান, সে যদি থাকতে দিতে আপত্তি করে তো আমি কোথায় যাব?
প্রতিচ্ছবি বলল, কেন, তখন বড়ো মুখ করে যে বললে, আমি গাছতলায় থাকব, খেটে খাব। অনসূয়াদিকে দেখে বিপ্লব গুটিয়ে গেল?
শ‍্যামলী বলল, অনসূয়াদির পয়েন্টটা ভেবে দ‍্যাখো, আমি দেশের মানুষের দেওয়া খাজনার টাকায় স্কলারশিপ পেয়েছি। দিনের পর দিন দুপুরের খাবার খেয়েছি রিডিং রুমের কুপন দিয়ে। আমি পড়াশুনা করে দেশের মানুষের কাছে তার প্রতিদান দেব।
প্রতিচ্ছবি বলল, কেন, ওই যে বারুখ স্পিনোজা কাচ ঘসে চশমা বানাতেন, মাইকেল ফ‍্যারাডে ব‌ই বাঁধাতেন, উ‌ইলিয়াম ফেরেল প্রতিবেশীদের জমিতে খাটতেন, এদের কথা তো তুমিই বড়ো মুখ করে বলতে। আজ সে সব দরকার মতো বেশ ভুলে গেলে?
শ‍্যামলী বলল, জড় ন‌ই, মৃত ন‌ই, ন‌ই অন্ধকারের খনিজ, আমি তো জীবন্ত প্রাণ, আমি এক অঙ্কুরিত বীজ। আমি ঠিক বড়ো হব, আর দেশকে অনেক বেশি ফিরিয়ে দেব। দেখে নিও।
প্রতিচ্ছবি হাসতে হাসতে মিলিয়ে গেল।
বাথরুম থেকে ভেসে আসছে দামি সাবানের সুগন্ধি। অরিন্দম বললেন ল‍্যাভেণ্ডারের গন্ধটা আমার বেশ লাগে। অনসূয়া বললেন, জুঁইফুলের গন্ধও তো বেশ ভাল। জানিস্ তো “মেশিনগানের সম্মুখে গাই জুঁই ফুলের এই গান”, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন একটা কথা লিখতে পেরেছিলেন। বল্ দেখি, তার পরের লাইনটা?
অরিন্দমের মনে পড়ল। তখন দুই শৈশবের বন্ধু একসাথে বলে উঠলেন, বহুদিন মনে ছিল আশা, ধরণীর এক কোণে বাঁধিব আপনমনে ধন নয়, মান নয় একটুকু বাসা..
অরিন্দম আবদার করার গলায় বললেন,
 হ‍্যাঁ রে অনু, আর এক কাপ চা হয় না?
অনসূয়া কাজের সহায়িকাকে নির্দেশ দিলেন একটু গরমজল টি পটে দিয়ে যেতে।
অরিন্দম যেন একটা ঘোরের মধ‍্যে আছেন। বললেন, জানিস্ অনু, দেশভাগ আর বাস্তু থেকে উৎখাত হ‌ওয়া মানুষের যন্ত্রণার কথা মনে পড়লে আমার মনের মধ্যে নীতা আর্তনাদ করতে থাকে, “দাদা, আমি বাঁচতে চাই”। সুপ্রিয়া চৌধুরীকে নীতা হয়ে চিৎকার করতে বলেন ঋত্বিক ঘটক।
রবীন্দ্রনাথ সুর হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছেন, গাইছেন, যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙলো ঝড়ে। ভারতে ১৯৬০ সালে ১৪ এপ্রিল মুক্তি পেয়েছিল মেঘে ঢাকা তারা।
ঠিক তখনই শ‍্যামলী গাইছে, বাথরুম থেকে ভেসে আসছে শ‍্যামলীর কণ্ঠ,
          যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে
          জানি নাই তো তুমি এলে আমার ঘরে ॥
অনসূয়া হাসলেন। কি অদ্ভুত মিল! এক‌ই সময়ে তোদের দুজনের এক‌ই গান মনে পড়ল।
অরিন্দম বললেন, ‘গ্রেট মেন থিঙ্ক অ্যালাইক’ বলা যাবে না। ক্লিশে শোনাবে। আমাদের মধ‍্যে যদি গ্রেট কেউ হয় তবে তা তুই। অনসূয়া বললেন হয়েছে হয়েছে, মেঘে ঢাকা তারা ফিল্মের কথা কি বলছিলি, বল?
অরিন্দম বললেন, শক্তিপদ রাজগুরুর মূল কাহিনী অবলম্বনে চিত্রনাট্য লিখে দিয়েছিলেন মৃণাল সেন। সুপ্রিয়া চৌধুরীর সঙ্গে অভিনয়ে ছিলেন অনিল চট্টোপাধ্যায়, গীতা ঘটক, বিজন ভট্টাচার্য, নিরঞ্জন রায়, গীতা দে, জ্ঞানেশ মুখার্জি। সুর করেছিলেন বাহাদুর খান আর জ‍্যোতিরিন্দ্র মৈত্র। ক‍্যামেরায় দীনেন গুপ্ত ধরেছিলেন ১৩৪ মিনিটের ছবিটি। পূর্ববঙ্গ থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসা পরিবারের শংকর, নীতা, গীতা, মন্টুর গল্প ফিল্মে কয়ে যেতে থাকেন ঋত্বিক ঘটক। প্রেম, ভালবাসা, বিশ্বাসহীনতা, স্বপ্নভঙ্গের গল্প বলতে বলতে তিনি নীতার জীবনটা দেখাতে থাকেন। নীতার যক্ষ্মা হয়েছিল। একটা অতলান্ত খাদের ধারে দাঁড়িয়ে তার বাঁচতে চাওয়ার হাহাকার শুনি।
বাথরুম থেকে ভেসে আসছে শ‍্যামলীর কণ্ঠ,
সব যে হয়ে গেল কালো,   নিবে গেল দীপের আলো,
          আকাশ-পানে হাত বাড়ালেম কাহার তরে?।
          অন্ধকারে রইনু পড়ে স্বপন মানি।
          ঝড় যে তোমার জয়ধ্বজা তাই কি জানি!
কাপ প্লেট তুলে সরিয়ে নিয়ে যেতে এসে কাজের সহায়িকা অনসূয়াকে বলল শ‍্যামলী ধোয়া কাপড় না নিয়েই স্নানে চলে গিয়েছে। কি পরে বেরোবে?
অনসূয়া বললেন, মেয়েটা ওই রকম। হুটপাট করে অনেক সময় কাজ করে বসে। ধোয়া কাপড় না নিয়ে টয়লেটে গেছেই বা কেন?
 সহায়িকা বলল, তাড়াহুড়ো করে চলে গেছে, খেয়াল করে নি।
অনসূয়া হেসে বলল, তাহলে ইউরেকা বলে বেরিয়ে পড়তে বলো?
সহায়িকা ইউরেকা কি জিনিস বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকে।
অরিন্দম হেসে বলেন, ওকে বলো, আমি চোখ বুজে থাকব, ভয় নেই।
অনসূয়া বললেন, খুব মজা না? ফ্রিতে অ্যাডাল্ট সিনেমা?
অনসূয়া গলা তুলে শ‍্যামলীর উদ্দেশে বললেন, আলমারিতে বাথরোব আছে। ওইটা পরে বেরোবি। ময়লা জামা কাপড় সব বালতিতে ভিজিয়ে দিস্।
অরিন্দম বললেন, আমি কি লাইব্রেরি ঘরে চলে যাব? আমার সামনে ওর যদি অস্বস্তি লাগে?
অনসূয়া হেসে বললেন, না বাথরোবে হাঁটু অবধি ঢাকা পড়বে। তোর ফূর্তি বা  দুশ্চিন্তা, কোনোটার‌ই কোনো কারণ নেই।
শ‍্যামলীর গলা ভেসে আসছে,
সকালবেলা চেয়ে দেখি,   দাঁড়িয়ে আছ তুমি এ কি,
          ঘর-ভরা মোর শূন্যতারই বুকের ‘পরে ॥
অনসূয়া বললেন, আজ থেকে সত্তর বছর আগে মার্চ মাসে লেখা গান। তখন ফাল্গুন মাস।
অরিন্দম বললেন, এই ফাগুনের বুকের ভিতর আগুন আছে। চৈতালি ঘূর্ণি আর কালবৈশাখী।
 হলোকস্টের কথা মনে পড়ে আমার। ১৫ এপ্রিল ১৯৪৫ সালে বারগেন বেলসেন কনসেনট্রেশন ক‍্যাম্প থেকে মুক্তি পেয়েছিল নেদারল্যান্ডসের কিছু মানুষ। পায় নি একটা মেয়ে। কেননা টাইফয়েডে মারা গিয়েছিল সে। বারোই জুন, ১৯৪২, আনা ফ্রাঙ্কের তেরোতম জন্মদিন ছিল। সে একটা অটোগ্রাফের খাতা উপহার পেয়েছিল সেই জন্মদিনে। বাবা অটো ফ্রাঙ্ক, মা এডিথ, দিদি মার্গটকে নিয়ে সুখের সংসার। বাবার ব‍্যবসা পেকটিন নিয়ে। ওই যে জিনিসটা জ‍্যাম জেলি বানাতে লাগে।
অনসূয়া বললেন কি সাংঘাতিক কাণ্ড একটা হয়েছিল না? হিটলার লোকটা কি জঘন্য ভাবে ইহুদী দের উপর অত‍্যাচার করল! পারল কি করে? কত মানুষ কে যে ঘরছাড়া করল, আপনজনদের থেকে বিচ্ছিন্ন করল, ভাবলে শিউরে উঠতে হয়।
অরিন্দম বললেন, অ্যাডলফ হিটলার আর তাঁর নাৎসি বাহিনী যে সমস্ত দেশের মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছিল, নেদারল্যান্ডস তার একটা। আনা ফ্রাঙ্কের দিদি একটা নোটিশ পেয়েছিল। তারপরই আত্মগোপন করতে বাধ‍্য হয় পরিবারটা। অটোগ্রাফের খাতায় সেই জীবনকে এঁকে চলেছিল সদ‍্যোকিশোরী আনা ফ্রাঙ্ক। মৃত্যুর পর সেই বছর ষোলোর কিশোরীর ডায়েরি উদ্ধার হয়। তার বাবার হাতে পৌঁছায়। ডাচ ভাষায় হেট আখটারহুইশ হয়ে ১৯৪৭এর জুনে প্রকাশ পায় আনা ফ্রাঙ্কের সেই ডায়েরি। ১৯৫২তে ইংরেজি ভাষায় ‘দ‍্য ডায়েরি অফ আ ইয়াং গার্ল’।
কিটিকে লিখে লিখে মনের কথা বলেছেন আনা। কিটি কে? কবি বলবেন, কে গো অন্তরতর সে?
শ‍্যামলী গাইছে,
আমার  হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে  দেখতে আমি পাই নি।
তােমায় দেখতে আমি পাই নি।
বাহির-পানে চোখ মেলেছি,  আমার  হৃদয়-পানে চাই নি ।
পরস্পরের দিকে তাকিয়ে আছেন শৈশবের বন্ধুদুটি। শ‍্যামলীর গানের সঙ্গে তাঁরা গলা মিলিয়ে দিলেন
আমার সকল ভালােবাসায়  সকল আঘাত সকল আশায়
তুমি ছিলে আমার কাছে তােমার কাছে যাই নি।
তুমি মাের আনন্দ হয়ে  ছিলে আমার খেলায়—
আনন্দে তাই ভুলেছিলেম, কেটেছে দিন হেলায়।
গােপন রহি গভীর প্রাণে  আমার দুঃখসুখের গানে
সুর দিয়েছ তুমি, আমি  তােমার গান তাে গাই নি।
বাথরোব জড়িয়ে পোশাক বদলাবার ঘরে যেতে যেতে তন্ময় হয়ে গান গাইতে থাকা তার দুই আপনজনকে দেখে শ‍্যামলী অবাক হয়ে গেল।

ক্রমশ…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!