দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৯১)

পর্ব – ১৯১

হাসিমুখে ওসি বললেন, মনে পড়ে গেল আজি বুঝি বন্ধুরে, ডাকিলে আবার কবেকার চেনা সুরে, বাজাইলে কিঙ্কিণী….
শ‍্যামলী ওসি’র সামনে দাঁড়িয়ে বলল, না, মাঝে মধ্যে মনে করি। সত‍্যি বলছি।
ওসি হেসে বললেন, কাল রাতে কি হয়েছিল?
 শ‍্যামলী বলল, কত কী হয়েছিল। তবে একটা জিনিস বলার মতো। কাল সারারাত আড্ডা দিয়েছি।
ওসি বললেন, সেটা বাবাকে বলে করলে কেমন হত?
শ‍্যামলী বলল, ভেবেছিলাম একবার। তবে কারো বাড়ি গিয়ে তাঁর ফোন ব‍্যবহার করতে বড়ো সংকোচ হয়।
ওসি বললেন, কাল রাতে আপনার বাবা ফোন করে বললেন, মেয়েটা সেই সকালে না খেয়ে কলেজ যাচ্ছি বলে বাড়ি থেকে চলে গেছে। এখনো আসেনি। কি করব বলুন তো?
শ‍্যামলী লজ্জা পেয়ে বলল, ইশশ, দেখুন তো, আমি অনসূয়া দিকে বলেছিলাম, বাড়ি চলে যাই। একথা সেকথা বলে আমাকে আটকে দিয়েছেন।
তারপর বলল, আমি সত‍্যি সত‍্যি লজ্জিত। আপনি ব‍্যস্ত মানুষ।
ওসি বললেন, বলুন তো দেখি, আপনার বাবাকে আমি কি বললাম!
শ‍্যামলী বলল, কি জানি কি বললেন!
ওসি বললেন, আপনার বাবাকে বললাম, কলেজে যাবার আগে আপনার সাথে ওর কি নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছিল?
শ‍্যামলী বলল, আপনি কি করে জানলেন, কথা কাটাকাটি হয়েছিল?
আপনার বাবা বলেছেন, আমার শরীর খারাপ হবার দিন থেকে একটা দিনের জন্যও আমার মেয়ে কোনো বন্ধুর বাড়ি বেড়াতে যায় নি, কোনো সিনেমায় পর্যন্ত না। কারখানাটাকে আবার চালু করে দিয়ে আমাদের মুখের গ্রাস যোগাড় করে দিত ও।
শ‍্যামলী লজ্জা পায়। বলে বাবা সব বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলেন। আমি কারো কাছে কোনো উপকার নিতে লজ্জা পাই। তাই অনসূয়াদির বাড়ি থেকে ফোন করি নি।
ওসি বললেন, আপনার বাবাকে বললাম, আত্মীয় স্বজনের কাছে আগে ফোন করে দেখুন। শ‍্যামলী শক্ত মনের মানুষ। চট করে আবেগের বশে ভুল কাজ করে ফেলবে না।
আপনার বাবা বললেন, আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে ও প্রায় যায় না। নিজের দিদির বিয়ে হয়েছে আজ তিন বছরের বেশি হল, তার বাড়িতেও একবারের জন‍্য‌ও যায় নি। বললেন, আজ ও ওর জামাইবাবুর সঙ্গে দেখা করে তার হাতে ওর কাছে থাকা একমাত্র গহনাটা দিয়ে চলে গেছে।
তবুও আমি বললাম, খুব ক্লোজ কারো বাড়িতে গিয়ে আদরের ঠেলায় আটকে গিয়েছে। তারপর জানলাম আপনার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আপনি এই অবস্থায় বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন জানলে হবু শ্বশুরবাড়িতে আপনার নাম খারাপ হবে।
 শ‍্যামলী বলল, একটা মেয়ের সুনাম জিনিসটা কি সাংঘাতিক রকম ভঙ্গুর, তাই না?
ওসি বললেন, আপনার বাবাকে বললাম, এমন কোনো মহিলা আছেন, যিনি আপনার মেয়েকে খুব ভালবাসেন? তখন অনসূয়া চ‍্যাটার্জির কথা বললেন। তাঁর ফোন নম্বর দিয়ে কথা বলতে বললাম। বলে দিলাম, এরপরও না পেলে তখন জানাবেন।
শ‍্যামলী বলল, আন্দাজ করলেন কেমন করে? আপনার ইনটুইশন কিন্তু চমৎকার।
ওসি বললেন, আজ্ঞা না ম‍্যাডাম। ইনটুইশন নয়। ক‍্যালকুলেশন।
শ‍্যামলী বলল, ক‍্যালকুলেশন?
ওসি বললেন, হ‍্যাঁ, যে মেয়ে বাবা অসুস্থ বলে একদিনের জন‍্য‌ও দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে নি, সে যখন ফোন করে না, তখন একটা গভীর অভিমানের ঘটনা ঘটেছে বোঝা যায়। তার উপর গয়না গচ্ছিত রেখে যাওয়াটাও একটা অভিমানের ইঙ্গিত। তখন এমন কারো কাছে গেছে, যেখানে একটু স্নেহ পাবে।
 শ‍্যামলী বলল, স‍্যর, আমি একটা থাকার জায়গা খুঁজছি।
ওসি বললেন, কালকের ওই ঘটনার পর এখনো অবধি আপনি বাড়িতে যান নি। সারাদিন ধরে একটা থাকার আশ্রয় খুঁজছেন, অথচ পাচ্ছেন না।
শ‍্যামলী বলল, না, অনসূয়াদি বলেই দিয়েছেন, তার বাড়িতে থাকতে খেতে কোনো সমস‍্যা নেই। কিন্তু আমি সেখানে থাকব না। কোনো  উপকার নিতে আমার লজ্জা লাগে।
ওসি বললেন, বরকে কি পছন্দ হচ্ছে না?
শ‍্যামলী বলল, না না, ভদ্রলোক খুবই ভাল। সহজ সরল মানুষ।
ওসি বললেন, তা বিয়ে করে ফেললে তো মিটে যায়, কারো গেস্ট হয়ে থেকে উপকার নিতে হয় না।
 শ‍্যামলী বলল, কিন্তু আমি বিয়ে করতে চাইছি না।
ওসি বললেন, কেন? ছেলেটা যদি ভাল হয়, তাহলে বিয়ে করতে সমস্যা কিসের?
 শ‍্যামলী বলল, লোকটাকে নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। বিয়ে জিনিসটা নিয়ে সমস‍্যা।
ওসি মজা পেলেন। এ সেই যেমন বেণী তেমনি রবে, চুল ভিজাব না।
শ‍্যামলী বলল, নতুন ফসল ফিল্মের গান। প্রতিমা মুখোপাধ্যায় গেয়ে খুব নাম করেছেন।
 ওসি বললেন জানেন, আপনি আরেকটা সাংঘাতিক কাণ্ড করেছেন?
 শ‍্যামলী বলল, বাবা আপনাকে গতকাল ফোন করে ব‍্যতিব‍্যস্ত করেছেন, তাতে আমি সত্যিই লজ্জিত। কিন্তু আমি আর কি করলাম?
ওসি বললেন, আপনি অঘটনঘটনপটীয়সী। নিষ্ঠুরা মনোহরা।
শ‍্যামলী অবাক হয়ে চেয়ে র‌ইল।
ওসি বললেন, বন্ধুত্ব কাকে বলে, একটা উদাহরণ দিন তো?
শ‍্যামলী বলল, বাস্তব জগতে বন্ধুত্ব বড়ো দুর্লভ, কিন্তু সংখ‍্যার জগতে ভাল বন্ধুত্ব জুটি গোটা চারেক আছে।
ওসি নড়েচড়ে বসে বললেন, সংখ‍্যার জগতে বন্ধুত্ব?
শ‍্যামলী বলল, ২২০র সাথে ২৮৪র বন্ধুত্ব।
ওসি বললেন, ২২০ আর ২৮৪ বুঝলাম, কিন্তু ওদের মধ্যে বন্ধুত্ব কিসের?
শ‍্যামলী বলল, অসাধারণ বন্ধুত্ব। ২২০ র যে গুণনীয়ক গুলি তার থেকে ছোট, সেগুলো যোগ রলে ২৮৪ হয়। আর ২৮৪র যে গুণনীয়কগুলি তার থেকে ছোট, তাদের যোগ করলে ২২০হয়।
ওসি বললেন, আশ্চর্য সম্পর্ক তো! এমন জুড়ি সংখ‍্যা গোটাচারেক আছে বলছেন?
শ‍্যামলী বলল, হ‍্যাঁ। ১১৮৪ আর ১২১০, এই একটা জুটি‌। ১৭২৯৬ আর ১৮৪১৬ এটা আরেকটি। আর এইরকম আরেকটি জুটি হল, ৯৩৬৩৫৮৪ এবং ৯৪৩৭০৫৬।
ওসি বললেন, বাঃ, আপনি জানলেন কি করে?
শ‍্যামলী বলল, ষোল বছর বয়সী ইটালিয়ান কিশোর নিকোলো প‍্যাগানিনি আবিষ্কার করেছিলেন।
ওসি বললেন, শুনুন, এগুলোকে অ্যামিকেবল নাম্বার বলে। কম্পিউটারের দ্বারা যাচাই করলে বিস্তর এমন সংখ্যা পাওয়া যাবে। সংখ‍্যাটা লাখ ছাড়ালে আশ্চর্য হব না।
শ‍্যামলী বলল, আপনি কি করে আন্দাজ করলেন?
ওসি বললেন, আন্দাজ নয়, ক‍্যালকুলেশন। বলেই হেসে ফেললেন। বললেন, মানুষের জগতে বন্ধুত্ব অতো সোজা নয়। তা আপনি করে দেখিয়ে দিয়েছেন।
শ‍্যামলী বলল, কি রকম? আজ ভোরে রাম নারায়ণ মিশ্র আমায় ফোন করে বললেন যে, স‍্যর আমি আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করতে চাই।  আমি প্রথমে ভাবলাম স্বপ্ন দেখছি নাকি? তারপর বুঝতে পারলাম সত‍্যি সত‍্যি রামনারায়ণ মিশ্র সারেন্ডার করতে চাইছেন।
শ‍্যামলী বলল, ওঁর এগেইনস্টে কি কোনো কেস ছিল?
ওসি বললেন, ছিল। অনেক গুলো কগনিজেবল কেস। আমি চেম্বারে এসে বসতে আজ সকালে স্নান করে এসে উনি আত্মসমর্পণ করলেন। বললেন শ‍্যামলীর সাথে মিশে রবীন্দ্রনাথ আর কথামৃত পড়তে শুরু করি। তারপর মনে হল, আত্মসমর্পণ করা দরকার।
শ‍্যামলী, আপনি রত্নাকরের থেকে বাল্মীকিকে বের করে এনেছেন।
শ‍্যামলী বলল, না, রত্নাকর তীব্রভাবে বাল্মীকি হতে চেয়েছেন, তাই হতে পেরেছেন। ভিতরের তীব্র চেষ্টা ছাড়া কোনোকিছু হয় না।
শ‍্যামলী আর ওসি দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে বসে র‌ইলেন।

ক্রমশ…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!