দৈনিক ধারাবাহিক উপন্যাসে মৃদুল শ্রীমানী (পর্ব – ১৮৮)

পর্ব – ১৮৮

প্রিন্সিপাল ম‍্যাডামের অফিসঘরে যে লোকটা ফাই ফরমাশ খাটে, সে ক্লাসের দরজার কাছে এসে উঁকি মেরে দেখল শ‍্যামলী আছে কিনা। তারপর কাছে এসে বলল, ম‍্যাডাম তোমাকে ডাকতেছেন।
খুব রোগা মেয়েটা বলল, শ‍্যামলী, তোকে প্রিন্সিপাল আবার ডেকে পাঠায় কেন রে? কোনো তর্কে যাবি না কিন্তু। যা বলেন, চুপটি করে শুনবি। বোবার শত্রু নেই।
শ‍্যামলী হেসে বলল, বোবার বন্ধুও নেই। যে নিজের ভিতরের কথাটা না বলে উঠতে পারল, সে যে নিজেও নিজের বন্ধু হয়ে উঠতে পারে না। গুছিয়ে যে লোক মনের কথাটি বলতে না পারল, তার মতো অভাগা আর কটা আছে রে!
অন‍্য মেয়েরা তবু তাকে ধমকে বলল, প্রিন্সিপাল অন‍্য কোনো কারণে তোর ওপর চটে আছেন। বুঝে চলিস। পরীক্ষার আগে কলেজ থেকে তাড়িয়ে না দেয়!
শ‍্যামলী বলল, আচ্ছা যাই, দেখে আসি আমায় কেন নিমন্ত্রণ করছেন!
মেয়েরা তার সাহস দেখে স্তব্ধ হয়ে র‌ইল।
 প্রিন্সিপাল ম‍্যাডাম তাকে বসতে না বলা সত্ত্বেও তাঁর টেবিলের  সামনে অভ‍্যাগতদের জন‍্য রাখা চেয়ারে গুছিয়ে বসে পড়ল। তার মনে ছিল, আগের দিন প্রিন্সিপাল তাকে বসতে বলেন নি।
জিজ্ঞাসু মুখে তাকিয়ে র‌ইল মেয়ে। হাতের কাজ সারতে সারতে প্রিন্সিপাল বললেন, তোদের ক্লাস সাসপেণ্ড করে দিয়েছি, তবুও ক্লাসে বসেছিলি কেন?
শ‍্যামলী বলল, হ‍্যাঁ, আপনি বলেছিলেন, ক্লাস সাসপেণ্ড করে দিলাম।
প্রিন্সিপাল বললেন, শুনেছিলি, তবুও বসে র‌ইলি, তোর কি মনে হয় না, এটা আমার নির্দেশকে উপেক্ষা করা?
 শ‍্যামলীর মনে পড়ল সহপাঠিনীরা বারবার করে বলে দিয়েছে, কোনো বিতর্কে জড়াবি না। প্রিন্সিপাল ম‍্যাম তোকে কলেজ থেকে তাড়ানোর ছুতো খুঁজছেন।
শ‍্যামলী বলল, কয়েকটা মেয়ে হাহুতাশ করছিল, পরীক্ষা এসে গেছে, সিলেবাস শেষ হয়নি। এমন সময় ক্লাস সাসপেণ্ড হয়ে গেল!
 প্রিন্সিপাল বললেন, ও, তাই জন‍্যে তুই আমার বিরুদ্ধে ঘোঁট পাকাচ্ছিলি?
শ‍্যামলী বলল, আজ্ঞে না, আমি অঙ্কগুলো দেখিয়ে দিচ্ছিলাম।
প্রিন্সিপাল তাকে ভেঙিয়ে বললেন, দেখিয়ে দিচ্ছিলাম! কেন, তুই দেখিয়ে দেবার কে? তুই যে ভুল দেখাচ্ছিস না, তার কি গ‍্যারান্টি আছে? একবার ভুল শিখে গেলে সে ভুলের খেসারত দিতে পারবি তুই?
বন্ধুদের সতর্কবার্তা মনে করে শ‍্যামলী নিজেকে শান্ত রাখতে চেষ্টা করে।
প্রিন্সিপাল বললেন, আজকাল কয়েকজন টিচার তোকে লাই দিয়ে মাথায় তুলে দিয়েছে। রোজ ক্লাসে তুই সিলেবাসের বাইরের  কিছু না কিছু একটা বিষয় আনিস্, এসব চলবে না বুঝলি? তুই কলেজে বসে কাউকে জ্ঞান দিবি না। সেজন‍্যে ডিগ্রিধারী লোক আছে।
 শ‍্যামলী বলল, ম‍্যাম, আমি নিজের থেকে ক্লাসে পড়ার বাইরে কিছু বলি না। তবে শিক্ষকেরা বার বার বললে, অমান‍্য করতে পারি নি।
প্রিন্সিপাল বললেন, জানি তো, তোকে মাথায় তোলার দুয়েকজন আছেন। তুই বোকা, তাই কেউ মাথায় তুললে নিজেকে বিশাল বোদ্ধা ভাবছিস। তার উপর স্টেটসম‍্যান কাগজে ছবি বেরিয়ে গিয়ে তুমি ধরাকে সরা জ্ঞান করেছ।
তারপর প্রিন্সিপাল গলা নামিয়ে বললেন, তুই যে হোস্টেলে থাকতে চাইছিলি, সেটা আমি অ্যালাও করে দেব ভাবছি। তবে, তোর বাবাকে আমার কাছে এসে লিখিত বক্তব্য দিতে হবে।
শ‍্যামলী বলল, বাবা অসুস্থ। বাড়ি থেকে বেরোনোর নিষেধ আছে।
প্রিন্সিপাল গলা একটু নরম করে বললেন, তাহলে তোর বাবার থেকে লিখে আনবি যে তাঁর মেয়ে এখানে থাকছে, তাতে তাঁর পূর্ণ সম্মতি আছে।
 শ‍্যামলী বলল, না, বাবার কাছ থেকে অনুমতি চাইব না। কেননা, আমি প্রাপ্তবয়স্ক। আর নিজের দায়িত্ব নিজে নেবার মতো আইনসিদ্ধ সামর্থ্য আমার হয়েছে।
 প্রিন্সিপাল বললেন, না , বাবাই তোমার অভিভাবক।
শ‍্যামলী বলল, আমি কয়েকদিন আগে একুশ পার করেছি। আমি ভোটাধিকার অর্জনের বয়সে পৌঁছে গিয়েছি। নিজের রুটিরোজগার করার জন‍্য কোথাও কাজ নিতে পারি। আর দরকার মনে করলে  নিজের মনোমত লোককে বিয়েও করতে পারি। আইনতঃ আমি প্রাপ্তবয়স্ক।
প্রিন্সিপাল আরো গলা নামিয়ে বললেন, বাড়িতে বাবার সঙ্গে কোনো গোলমাল হয়েছে বলে অভিমান করে বাড়ি ছাড়ছিস?
শ‍্যামলী বন্ধুদের সতর্কবার্তাটি আবার স্মরণ করল। বলল, আঠারো পেরিয়ে গিয়েছি, নিজের পায়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে করছে।
প্রিন্সিপাল চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, কলেজের হোস্টেলে থাকার ব‍্যাপারটা শখ শৌখিনতার পর্যায়ে এখনো নেমে আসেনি। শেষ কথা বলে দিলাম, তোর বাবা এসে লিখিতভাবে অনুরোধ করলে ভেবে দেখব।
শ‍্যামলী বলল, বাবাকে আসতে বা কিছু লিখে দিতে, কোনোটাই বলতে পারব না।
প্রিন্সিপাল বললেন, তাহলে আর হল না।
শ‍্যামলী বলল, ম‍্যাডাম, আমি তাহলে আসতে পারি?
প্রিন্সিপাল বললেন, ঠিক আছে, যাও। কিন্তু পড়াশুনাটা দয়া করে মনোযোগ দিয়ে করো। আর বিয়ের আগে রোজ রোজ বরের বাড়ি যাওয়া মোটেও ভালো নয়।
শ‍্যামলী অবাক হয়ে গেল। ভদ্র মহিলা অবিবাহিত। যথেষ্ট বয়স‌ও হয়েছে। তবু তিনি একটি ছাত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এত আগ্রহী কেন, সে ভেবে পেল না।
মনের ভিতর রোগা মেয়েটা তাকে কাকুতি মিনতি করতে লাগল, ওরে বোবার শত্রু নেই। তার জন‍্য স্মিত হাসল শ‍্যামলী। সাধু চন্দ্রধর কিভাবে বেহুলার আর্তিতে সাড়া দিয়ে বাম হাতে হলেও মনসাকে অর্ঘ্য দিয়েছিলেন, সেই কথা মনে পড়ল তার। তর্ক করলে সত‍্যিই কি তাকে কলেজ থেকে বের করে দিতে পারেন ম‍্যাডাম? শ‍্যামলী মাথা নিচু করে বলল, আপনার নির্দেশ মনে রাখব।
প্রিন্সিপালের চেম্বার থেকে বেরোতেই সে দেখল কিছু দূরে কয়েকটি মেয়ে যেন তার জন‍্য‌ই দাঁড়িয়ে আছে। সে বেরিয়েছে দেখে ওরা হাতছানি দিয়ে ডাকল। শ‍্যামলী কাছে গেলে ফিসফিস করে জানতে চাইল, হ‍্যাঁ রে, ম‍্যাম কি বলছিল রে?
শ‍্যামলী বলল, সে ভারি গোপন কথা।
মেয়েরা উল্লসিত হয়ে বলল, শুনব বলেই তো ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। বল্ বল্ কি বলল বুড়িটা!
শ‍্যামলী বলল, বিয়ের আগে বরের বাড়ি রোজ রোজ যেতে নিষেধ করেছেন। আর..
আর কি?  মেয়েদের উৎসাহ দ‍্যাখে কে?
শ‍্যামলী বলল, আর বললেন, চুমু টুমু একদম খাবে না।
 মেয়েরা উল্লাসে ফেটে পড়ল।
খুব রোগা মেয়েটা কানে কানে বলল, তুই না বড্ড মিথ‍্যুক।
কলেজের বাইরে পা দিতেই দেখল গোবিন্দচন্দ্র দাঁড়িয়ে আছে। বলল, কখন ছুটি হয়ে গেছে। তোমার আর বেরোনোর সময় হয় না।
গাড়িতে উঠে শ‍্যামলী ভাবতে বসল, কেন সে বন্ধুদের কাছে পুরোপুরি সহজ হতে পারে না?
কেন আমি এমন একাকী?

ক্রমশ…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!