ক্যাফে গল্পে মৃত্যুঞ্জয় রায়

প্রত্যাশা
নিজেকে এত অসহায় কখনও মনে হয়নি প্লাবনের , বারবার মোবাইলের বিল গুলো দেখছে, আপসোস করছে, মনে মনে নিজেই নিজেকে শাসন করছে, ছিঃ ছিঃ করছে নিজেকেই| এরপর কি মুখ নিয়ে দাঁড়াবে প্রত্যাশার কাছে! শেষ সাতদিন ধরে প্রত্যাশার যে ছবি গুলো তাঁর সহকারী লুকিয়ে তুলেছিল একটু আগেই দিয়ে গেল| ছবি যে এত কথা বলে আজ বুঝল প্লাবন | ছবিগুলো একটা একটা করে ছিঁড়ে ফেলছে, উড়িয়ে দিচ্ছে হাওয়ায়| থানা থেকে বেরিয়ে সিগারেট ধরালো প্লাবন| লম্বা শ্বাস নিয়ে শুষে নিলো নিকোটিনের সমস্ত বিষ | সিগারেটের ধোঁয়ায় চোখ জ্বলছে | ছলছল করছে চোখ | নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল প্লাবন | প্রত্যাশা কে ফোন করল,-“হ্যালো [কিছুক্ষণ থেমে ] তোমার জন্য আজ একটা দারুণ সারপ্রাইজ আছে “|
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার এস. পি পদে দায়িত্ব নিয়ে এক সপ্তাহ আগেই জয়েন করেছে প্লাবন চক্রবর্তী | প্লাবন আর প্রত্যাশার বিয়ে হয়েছে বছর তিনেক হলো | এখনও কোনো সন্তান হয়নি | দেখাশুনো করেই বিয়ে | দুজনেই বাবা মায়ের পছন্দনুযায়ী বিয়ে তো করেছিল কিন্তু বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দুজনেই বুঝেছিল তাঁরা দুজন আসলে দুই বিপরীত মেরুর নাগরিক| প্রত্যাশা প্রথম প্রথম প্লাবনের মধ্যে স্বপ্নের পুরুষ কে খুঁজতে চাইলেও প্লাবন তাকে কাছে টেনে নিতে পাচ্ছিল না, কিছু নিয়ে মনের মধ্যে খুঁত খুঁত ছিল | প্রত্যাশা বুঝেছিলো প্লাবন আর তাঁর স্বপ্নের পুরুষের মধ্যে বিস্তর ফারাক আছে | অন্যদিকে সময় যত গড়িয়েছে প্লাবন তত বেশি এড়িয়ে চলেছে,কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর বোঝা গেলেও তাঁর সমাধান ছিল জটিল | আসলে প্লাবন এমনই চরিত্রের একটু গম্ভীর, একটু একা গোছের কিন্তু প্রত্যাশার প্রতি দায়িত্বের কোনো ত্রুটি নেই | শুধু দায়িত্ববোধ দিয়ে তো জীবন চলে না | যদিও প্রত্যাশা সব মেনেই নিয়েছিল| প্রত্যাশার অক্ষমতা একটাই সে প্লাবনের দুর্বলতার কারণ অনুসন্ধান করেনি কখনও | কেন কে জানে! প্রত্যাশার মনে অভিমান থাকলেও প্লাবনের প্রতি তাঁর একটা শ্রদ্ধা ছিল কারণ প্লাবন দূরত্ব রেখে চললেও মানুষ হিসেবে সে সৎ | প্রত্যাশা বিশ্বাস করত তাঁদের কাছে আসার জন্য দুজন দুজনকে আরও সময় দিতে হবে, বুঝতে হবে তাই কোনো এক অদৃশ্য আশীর্বাদে দুজন দুজনের মতন সমান্তরাল পথে চলতে শুরু করলেও পথ হারায়নি কখনও একে অপরকে বোঝা মনে হয় নি |
কখনও শিলিগুড়ি, কখনও বর্ধমান,কখনও মালদা, পরিযায়ী পাখির মতন দুজনের শুধু ঘর বদলেছে সংসার পাতা হয়নি | যদিও সংসার কি সেই বোধ নিয়ে দুজনের কেউ চিন্তিত নয়, একসঙ্গে যে থেকে গেছে তিন বছর এই তো অনেক | সম্পর্কের কাছে কোনো আবদার যেমন নেই তেমন অভিযোগও ছিল না | কিন্তু চিরকাল কি একই সরলরেখায় জীবন চলে? চলে না তো! ওদের জন্য হয়ত ভাগ্যদেবতা অন্যরকম গল্প লিখে রেখেছিলেন | এদিকে এতবার চাকরি সূত্রে বদলি হতে হয়েছে সে নিয়ে প্লাবন অভ্যস্ত হলেও প্রত্যাশার মনে একটু একটু রাগ ছিল আপত্তি ছিল| সে কোথাও মনস্থির করতে পারছিল না, দু- দুবার করে চাকরি ছাড়তে হয় প্লাবনের জন্য | কখনও কখনও প্রত্যাশা ভাবত প্লাবন কে বলবে ‘এতবার এদিক ওদিক না করে নেতা মন্ত্রীদের সঙ্গে একটু আপোস করে চল তাহলে পিং পং বলের মতন এদিক ওদিক করতে হয় না বারবার’ | কিন্তু কোনোদিন মনের কথা প্রকাশ করেনি | আর কেনই বা করবে! সম্পর্কে অধিকার না থাকলেও এটুকু বুঝত প্লাবন অন্যায় কে প্রশ্রয় দিতে শেখেনি| প্লাবনের এই সৎ চরিত্র কখনও কখনও আকর্ষণ করে প্রত্যাশা কে কিন্তু সে সেভাবে প্রেমে জড়িয়ে পড়ে না | হয়ত ইচ্ছেও করে না এখন | চেষ্টাও তো করে না |
কলেজ জীবন থেকেই প্রত্যাশার একটা অভ্যেস ছিল নিজের জীবন কে সুন্দর করে দেখার | স্বপ্নের পুরুষ তাকে নিয়ে বাইকে করে মাঝরাতে ঘুরে বেরাবে, কোনো কারণ ছাড়াই ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করবে, অপ্রস্তুত প্রত্যাশা কে জড়িয়ে ধরে নাচ করবে, আদর করবে, কখনও কখনও ঝগড়া হবে,দুজনের বেশ কিছুদিন মান অভিমান চলবে তারপর কেউ একজন এগিয়ে গিয়ে অভিমান ভাঙাবে, আরও অনেক কিছু কিন্তু প্লাবন যে একটা স্রোত আর সেই স্রোতে কেবল গা ভাসিয়েই থাকা যায় | প্রত্যাশা তাই গা ভাসিয়ে দিয়েছিলো | প্রত্যাশা যেমনভাবে নিজেকে দেখতে চাইত বা অনুভব করত সেটাই লিখে রাখত প্রতিদিনের ডায়েরিতে | এখনও লেখে | নিজের রাগ,ক্ষোভ, প্রেম ডায়েরির পাতায় জমিয়ে রাখতে রাখতে বাস্তবে নতজানু হয়ে বেঁচে থাকার অভ্যেস করে ফেলেছিল সে| প্রত্যেক পুরুষ বা নারীর শুধু মানসিক চাহিদা থাকে না শারীরিক কিছু ইচ্ছেও থাকে, প্রত্যাশার ইচ্ছে হত ভাবত প্লাবনের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে কিন্তু সাহস হত না| মনে মনে ভাবত প্লাবন তাকে তো গ্রহণই করেনি, আবার কখনও কখনও এটাও ভাবাত প্লাবনের কি শারীরিক চাহিদাও নেই? আর থাকলেও সে কিভাবে তৃপ্ত হয়! তাহলে কি সে সমকামী!কিন্তু এমন তাঁর কেউ আছে বলেও তো মনে হয় না | এত ভাবলে নিজেকে উন্মাদ মনে হত বলে ভাবনাই ছেড়ে দিয়েছে |এতসব জটিল প্রশ্নের মধ্যে পড়ে প্রত্যাশার জীবনে হয়ত আর কোনো প্রত্যাশা নেই| আর তিনবছর পর এখন এসব ভাবলে হাসি পায়, তাই নিজেই নিজেকে আরও বেশি সময় দিতে শুরু করল |
সন্দেহ যে একপ্রকার ব্যাধি সেই অনুভূতি যখন হলো প্লাবন তখন আত্মসমর্পন করতে চাইল প্রত্যাশার কাছে | প্রত্যাশা ফিরিয়ে দেয়নি কারণ প্রত্যাশা জানত এই আত্মসমর্পণে জয়টা তাঁদের দুজনের সম্পর্কের| এই সন্দেহের বীজ বোনা হয় মাস দুয়েক আগে, একটা পার্সেল কে ঘিরে| প্লাবনের তখন মালদায় পোস্টিং | চিট ফান্ডের একটা ঘটলা নিয়ে ব্যাস্ত | সে যখন দিনরাত তদন্তে জুড়ে আছে সেই সময় থেকেই প্রত্যাশা নিজেকে নিয়ে আরও ব্যাস্ত হয়ে পড়ে | শিলিগুরি থেকে প্লাবনের ট্রান্সফারের সময় সে তাঁর দ্বিতীয় চাকরি ছেড়ে দেয় , মালদায় এসে সে চাকরি খুঁজতে চায়নি বরং অন্য আরও কিছুতে নিজেকে ব্যাস্ত করে রাখে | প্রত্যাশার কোনোকিছুতেই কখনও কোনো আপত্তি করেনি প্লাবন| আর করাও উচিৎ নয়,প্রত্যেকের জীবন দেখার ভঙ্গি আলাদা আলাদা, প্লাবনের এই বিশ্বাসই যেন প্লাবন কে আলাদা করে ব্যাখ্যা করে গতানুগতিক পুরুষতন্ত্র থেকে|
বেশ কিছুদিন পর হঠাৎ করেই প্রত্যাশার মধ্যে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করে প্লাবন | কিন্তু কেন? সে যদি জীবন কে নতুন করে শুরু করতে চায় তাতে কোনো আপত্তি তো নেই| প্লাবন মনে মনে ভাবত প্রত্যাশা কে হয়ত জোর করে বাড়ি থেকে বিয়ে দিয়েছে, সে প্লাবন কে নিয়ে সুখি নয়, বিয়ের পর পর প্রত্যাশা তেমনভাবে তাঁর কাছে আসেনি দূরত্ব ছিল | আসলে ওরা দুজনেই মনের ভেতর নিজের মতন করে গল্প বেঁধেছিল সেটা কেউই বুঝে উঠতে পারেনি | তাই কোনোদিন প্লাবন প্রত্যেশার কাছে নিজেকে মেলে ধরেনি কখনও জোর করেনি বরং এরিয়ে চলেছে | প্লাবন ভাবত বিয়ের প্রথম প্রথম প্রত্যাশা কাছে আসতে যে চাইত সেটাও হয়ত পারিবারিক চাপে কারণ প্লাবনের মা সারাক্ষণ প্রত্যাশা কে বোঝাতো স্বামী কে কিভাবে হাতে রাখতে হয় | প্লাবন হয়ত বুঝতেই পারেনি ওটা প্রত্যাশার সেই সময় আত্মসমর্পন ছিল | প্লাবন চায়না প্রত্যাশা এমন কোনো কাজ করুক যাতে পরিবারের সম্মানহানি হতে পারে | হয়ত দুজনে আলোচনা করলে একটা পথ ঠিক বেরিয়ে আসবে,কিন্তু কে বলবে সে কথা? ওরা যে কেউ আগে এগিয়ে এসে আলোচনায় বসবে না |
প্রতিদিন প্রত্যাশার নামে পার্সেল আসতে শুরু করে বাড়িতে এমনকি দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় আসার পরেও পার্সেল বন্ধ হয়নি | পার্সেলের ভেতর কখনও ফুল, কখনও কানের দুল, কখনও ফটোফ্রেম, খুব দামি উপহার না হলেও উপহার, যদিও উপহারের দাম কোনো মূল্যেই বিচার করা যায় না! পার্সেল পৌঁছাত প্লাবনের অফিস বেরোনোর ঠিক আগেই| প্রতি পার্সেলে একটা চিঠিও থাকত তাতে এক লাইন লেখা ‘আর পঁচিশ দিন,আর কুড়ি দিন,আর দশ দিন, আর আট দিন’ কি হবে সেই দিনে এই প্রশ্নই বুকের ভেতর খুঁচিয়ে আঘাত করছিলো প্লাবন কে | প্রত্যাশা ইচ্ছে করেই প্লাবনের সামনেই সেই চিঠি পড়ত আর অবাক হওয়ার ভান করত যেন সে জানে না কে পাঠাচ্ছে এমন পার্সেল! আবার খুশি হওয়ার ভাব প্রকাশও করত | প্রত্যাশার জীবনে কি চলছে সেই রহস্য খুঁজতে লুকিয়ে প্রত্যাশার ডায়েরী পড়তে শুরু করে প্লাবন সেই অভ্যেস করেছিল মালদা থেকেই পরে সেটা আরও নিয়মিত হয়ে ওঠে,সেখানেও তেমন কিছু পায়নি| সে বোঝে প্রত্যাশা শিক্ষিত মেয়ে সে কায়দা করে হয়ত অনেক কিছুই এড়িয়ে গেছে | তবে ডায়েরি পড়ে প্রত্যাশা কে নতুন করে আবিষ্কার করছিলো, নিজেকে দেখছিলো প্রত্যাশার চোখে, নিজের গুণ,নিজের ত্রুটি ভেসে উঠছিলো চোখের সামনে, কোথাও কোথাও যেন নিজের অক্ষমতা কাটিয়ে প্রত্যাশার কাছে পৌঁছানোর সূত্র খুঁজে পাচ্ছিলো | কিন্তু প্রত্যাশা তাকে এরিয়ে এরিয়ে চলছে তাঁর কি কারণ!প্লাবনের এটাও মনে হলো প্রত্যাশা কোনো সমস্যায় নেই তো! শুরু হলো তদন্ত | প্রত্যাশার গতিবিধির উপর শুরু হলো নজরদারি | অন্যদিকে চিট ফান্ডের তদন্তে বড় সাফল্যের মুখে যখন দাঁড়িয়ে ঠিক তখনই সরিয়ে দেওয়া হলো দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় | তদন্তে বড় বড় রাজনৈতিক নেতা মন্ত্রীর যোগসূত্র উঠে আসছিল সূতরাং রাষ্ট্র নেতা নেত্রীর সহজ কৌশল, অফিসারের বদলি |
দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় আসার পর থেকে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠল প্রত্যাশার পার্সেল| এখন দুঘন্টায় একটা করে পার্সেল আসতে শুরু করে বাড়িতে, এখন চিঠিতে লেখা থাকে ঘন্টা মিনিট, ওদিকে আবার মাঝে মাঝে কোনো কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ছে প্রত্যাশা | আগে অন্তত ম্যাসেজ করত এখন সেটুকুও করে না, প্লাবন এবার একটু জেদ ধরেই ফেলল, এর শেষ সে দেখবেই | একজন সহকর্মী কে পাঠালো প্রত্যাশার প্রতি মুহূর্তের ছবি ধরে রাখতে | প্লাবনকে যে কোথাও হতাশা গ্রাস করছে সেটা প্লাবন অনুভব করছিলো | চিট ফান্ড তদন্ত থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরই এই হতাশা তৈরী হয় | কিন্তু কোনোভাবেই রাগের বহিঃপ্রকাশ হচ্ছিলো না | তাই ঘুরে ফিরে পুরুষতন্ত্রের চটিতেই পা গলিয়ে ফেললো |
প্রত্যাশা মনে মনে বেশ আনন্দ পাচ্ছিল যেন চোর পুলিশের খেলায় একটা বুদ্ধিমান চোরের কাছে দারোগা বড় অসহায় | কখনও কখনও ইচ্ছে করেই দিনের ডায়রিটা প্লাবনের সামনে রেখে দিত | আড়ালে থেকে দেখত প্লাবন তাঁর ডায়েরী পড়ছে | খেয়াল করত পড়ার পর প্লাবনের মুখ কেমন হয় | আর এটা দেখতে দারুণ মজা লাগছিল তাঁর | ওদিকে সময় গড়াতে গড়াতে সেই দিন উপস্থিত হল সেদিন সকালে কোনো পার্সেল এল না, অদ্ভুত | অবাক হলো প্লাবন | বার বার মোবাইলে খেয়াল করছিলো প্লাবন কারণ প্রত্যাশার অগোচরে সে সি. সি. টি. ভি লাগিয়েছিল বাড়িতে |হয়ত অন্যায়,মন চায়নি কিন্তু কোনো অনিচ্ছা শক্তি বল তাকে এই রহস্যের গিট খুলতে রহস্যের আরও কাছে ঠেলে দেয় | ঠিক দুপুর দিকে পার্সেল আসে | মনের ভেতর খচখচ করে ওঠে | মোবাইল বন্ধ রাখে | রাগে | সহকর্মী কে ডেকে পাঠায় প্রত্যাশার ছবি চেয়ে পাঠায় | ছবি দেখে অবাক হয় সে দেখে প্রত্যাশা একা একাই ঘুরে বেরিয়েছে | কখনও কোথাও বসে থাকলে এমনভাবে বসে থাকে যেন কেউ তাঁর পাশে বসে আছে, সে কথা বলছে একা একা কখনও হাসছে একা একা | চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে প্লাবন, ঝাঁপসা ছবি যেন স্পষ্ট হয়ে উঠছে | প্রত্যাশার ফোনের কল লিস্ট জোগাড় করে দেখতে শুরু করে শুধুই বাবা মা,কখনও প্লাবন, কখনও প্লাবনের মা কে ফোন করেছে | আবার মোবাইলে ভিডিও অন করলে দেখতে পায় খাবার টেবিলে একটা কেক রাখা | সঙ্গে সঙ্গে ফোনেই ক্যালেন্ডার খুলে দেখে আজকের তারিখ| আজ প্রত্যাশার জন্মদিন | এতকিছু নিয়ে ভাবলো, তদন্ত করল কিন্তু তারিখটা দেখে অঙ্ক মেলাতে ব্যর্থ হয়ে গেল এস. পি সাহেব | ছিঃ | প্লাবন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে | আগের বছরও সে প্রত্যাশার জন্মদিন ভুলে গেছিল তাঁর মা তাকে মনে করায়, শুধু জন্মদিন কেন বিয়ের তারিখেও সে কোনো প্ল্যান করে না, প্রথম বছর বাড়ির চাপে করেছিল কিন্তু তারপর আর কিছুই নয় | প্রত্যাশা কিন্তু প্লাবনের প্রতি বছর জন্মদিন পালন করে, বিয়ের তারিখে ছোট কিছু হলেও উপহার আনে | প্লাবনও উপহার দেয় কিন্তু সেটা পরের দিন | আসলে সে এসব নিয়ে তেমন ভাবুক নয়, এই ছোট ছোট জিনিস যে একটা মেয়েকে কত তৃপ্তি দেয় এই বোধ তাঁর নেই | শেষে ছবি গুলো যখন ছিঁড়ে ফেলছে তখন একটা ছবিতে এসে চোখ আটকে যায় | পার্সেল হাতে প্রত্যাশা নিজেই পোস্ট অফিসে ঢুকছে |
প্রত্যাশার স্বপ্নের পুরুষ যেমনভাবে জন্মদিন পালন করবে বলে ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলো প্রত্যাশা ঠিক তেমনভাবেই জন্মদিন পালন করল প্লাবন | দুজন দুজনেরই কাছে এল এই প্রথম | ভালোবেসে | বাইকে করে অনেক রাত পর্যন্ত ঘুরল, বাইপাসের এক ধাবায় গিয়ে বসল দুজন |প্রত্যাশার হাতে হাত রেখে প্লাবন প্রশ্ন করল,”কেন করলে এমন”?
প্রত্যাশা ফ্যাকাসে মুখ করে শয়তানি হাসি নিয়ে বলে ,
-“বাড়িতে সবাই নাতি নাতনির মুখ কবে দেখবে বলে আমাকে অস্থির করে তুলছে, কেউ তোমাকে কিছু বলছে না, আমাদের মধ্যে সেই সম্পর্ক নেই, আমি একা পুড়ছি জ্বালায় | না পারছি ফেলে যেতে না ঠিক মতন থাকতে পারছি,তাই ভাবলাম আমি একা কেন অস্থিরতায় থাকি!আমারও তো অনেক অভিমান আছে,জেদ আছে, অহঙ্কার আছে | তুমি কেবল তোমার পরিচিত স্রোতে বয়ে যাবে আমি শুধুই সেই স্রোতে গা ভাসাবো ভিজবো না এমন তো নয়, তাই এই চোর পুলিশ খেলাটা খেললাম, দেখলাম যদি জীবন কে অন্যরকমভাবে দেখি তাহলে জীবন আমাকে কি ফিরিয়ে দেয়! ”
-“কিছু কি ফিরিয়ে দিলো? ”
-“জানি না ”
“ভুলটা দুজনেরই আসলে আমরা কেউই সম্পর্কটা শুরু করিনি দুজনেই দুজনের থেকে এরিয়ে গেছি”
-“একথা ঠিক, বিয়ের আগে আমাদের দেখা করা উচিৎ ছিল, কিছুদিন মেলামেশা করা উচিৎ ছিল, আমরা দুজন কে চেনার আগেই সব দ্রুত ঘটে গেল, আমরা পর ছিলাম আর তাই থাকলাম আপন হতে পারলাম না, আচ্ছা কোথাও এসে আমরা কি থামতে পারি না? ”
-“পারি তো… খুব পারি… পারতেই হবে”
-“তাহলে আমাদের পরবর্তী ঠিকানা? ”
-“পাহাড় ”
চমকে ওঠে প্রত্যাশা সে মনে প্রাণে চাইত তাঁর স্বপ্নের পুরুষের সঙ্গে একবার পাহাড় ঘুরতে যাবে| দুজনে পাহাড়ে একসঙ্গে চড়বে, হাঁপিয়ে যাবে যখন তখন দুজন পাশাপাশি গা ঘেঁষে বসে দম নেবে তারপর আবার চড়বে পাহাড়ে, একটু একটু করে উঠবে শীর্ষে, প্রত্যাশার বিশ্বাস পাহাড়ই প্রেমের অক্সিজেন | দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে,একে অন্যকে দেখে তারপর দুজনেই হো হো করে হেসে ওঠে |