সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মৌসুমী নন্দী (যাপন চিত্র – ৪৬)

ভালো বাসা


আসলে আমরা পড়ি তা আমরা নিজেরাই ব্যক্তিগত জীবনে প্রয়োগ করি না ৷ বই লেখা তত্ত্বগুলো আমাদের বড়োই আপেক্ষিক মনে হয় ৷ আজ গ্লোবালাইজেসনের প্রভাবে সংসার এখন ছোটো হতে হতে বৃত্তের মধ্যে সীমারেখা টানে ৷ ছোট পরিবার সুখী পরিবার এখনকার স্লোগান ৷ একান্নবর্তী পরিবারের শিক্ষা স্কুল না গেলেও ছোটো থেকে অনেককিছুই শিখিয়ে দিত৷ আজ আমরা নিজেরাই বাচ্চাদের নিজের অজান্তেই স্বার্থপর হতে শেখাচ্ছি ৷
মানুষ হিসেবে যে যেমন,মাতা পিতা হিসেবেও তেমনি তার প্রকাশ হয় ৷ বহু মা তাঁর সন্তানদের স্বার্থপরতার শিক্ষা দেন। বহু পিতা সন্তানদের উপর সারাজীবন খবরদারি করেন।

আমরা বলি কুপুত্র কখনো বা হয়,কুমাতা কখনো নয়। আসলে মা চান তাঁর সন্তানের সুখ। । এই অনুভব খুব জোরালো,তাই সন্তানের প্রতি ভালোবাসাও জোরদার। এর অর্থ এই নয়,কুমাতা কখনো নয়। তবে একজন মা বাবা না থাকলেও সন্তান যেমন করেই হোক মানুষ করেন এবং কিন্তু একজন পুরুষের পক্ষে সামাজিক বা পারিবারিক চাপে অনেক সময় সুষ্ঠভাবে হয়ে ওঠে না ৷

আমরা ছোটো থেকেই এখন স্বার্থপর হতে শেখাই যে মা তার সন্তানকে শেখান বন্ধুকে টিফিনের ভাগ দেওয়ার প্রয়োজন নেই,তিনি সন্তানের প্রতি দয়াময়ী হলেও আসলে কুমাতাই। যে মা বলেন তুই কেন হাত পুড়িয়ে রেঁধে খাচ্ছিস,তোর বৌ সারাদিন কি এমন রাজকার্য করে,তিনি তাঁর সন্তানের জন্য যতই উদ্বিগ্ন হোন না কেন,আসলে তিনি কুমাতাই। যে মা পুত্র সারাদিনের পর কার্যালয় থেকে ফিরলে পুত্রবধূর নামে নালিশ করতে ভোলেন না,তিনি পুত্রের জন্য প্রাণ দিয়ে দিলেও আসলে কুমাতা। যে মা মেয়ের বিয়ের পর ক্রমাগত মেয়ের কানে জামাই আর শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে বিষোদগার করেন,তিনি আপাতদৃষ্টিতে কন্যার ভালো চাইলেও আসলে তাঁকে কুমাতাই বলে।

আমরা বলি পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম। অথচ অনেক ডমিনেটিং পিতার কারণে সন্তান আজীবন হতাশায় ভোগে। ভোগে সেই সন্তানেরা,যাদের পিতা ব্যক্তি হিসেবে খুবই নিম্নরুচির। অনেক পিতাই পিতৃত্ব আসার পর নিজেকে সন্তানের ঈশ্বর বলে ভাবেন। ভাবেন সন্তান আমার প্রপার্টি। পিতার অন্যায় দেখলেও সেই পিতার সন্তানদের কখনো মুখ তুলে কথা বলার অধিকার থাকে না। সেই সব বাবার ছেলেমেয়েরা কখনোই পিতাকে স্বর্গ বা ধর্ম ভাবতে পারে না।

বহু মা বাবা থাকেন যাঁরা ছেলে এবং মেয়েকে সমান চোখে দেখেন না। বহু মা বাবাই দুটি সন্তানের মধ্যে একজনের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করেন। সেই সব ছেলেমেয়েরা পরবর্তী কালে একে অপরের শত্রু হয়ে যায়। ভাইবোনের সুসম্পর্ক না থাকার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই এই মা বাবারা দায়ী থাকেন।

সন্তান জন্মালে প্রতিটি মা বাবারই কর্তব্য সন্তানকে প্রতিপালন করা। তার মধ্যে কোনও নতুনত্ব নেই, কোনও প্রশংসনীয় বিষয় নেই। তা না করলেই বরং অন্যায়। সন্তানকে সুস্থ ও সুন্দর ভাবে বড়ো করার জন্য একজন মা একজন বাবাকে আগে মানুষ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। নইলে শুধু জন্ম দিলেই সে সুমাতা অথবা সুপিতা হয় না,বরং কুসন্তানের মতো কুমাতা এবং কুপিতারাও পৃথিবী জুড়ে রাজত্ব করতে থাকে।

সন্তানেরা যখন মা বাবার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়,আমরা বলি কুসন্তান ,অথচ সেই মনোভাবের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন মা বাবাই এককালে করেছেন কি না, সে খোঁজ কখনো নিই না। তাই এই মুহূর্তে বৃদ্ধাশ্রম ভরে যায় আর তাদের মধ্যে খুবই উচ্চ শিক্ষিত এবং ছোটো পরিবারের লোকজনেরা ই স্বীকার হন ৷ তাই বলছি এখনো সময় আছে আগে সন্তান মানুষ হবার ,মানবিক হবার শিক্ষা দিন তবেই হয়তো দেশের থেকে বৃদ্ধাশ্রম উঠে যাবে ৷ সবাই খুব ভালো থাকবেন ৷

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।