সাপ্তাহিক ধারাবাহিক প্রবন্ধে মানস চক্রবর্তী – ১৫

|| ১৫ ||

শিক্ষক যখন বিশ্বনাথ দত্ত

অনেকে বলেন “লাইক ফাদার লাইক সান” এই কথাটি স্বামীজির ক্ষেত্রে খুব খাটে | কথাটা বুঝতে হলে বিশ্বনাথ দত্তের চরিত্রটা খুব ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার | কিন্তু এই প্রবন্ধে সেই বিস্তারিত বিশ্লেষণ বিশেষ কারণে সম্ভব নয় | এখানে শুধু উল্লেখ করব সন্তান পালনে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তি ও হৃদয়বৃত্তির পরিচয় | সঙ্গে জাগ্রত আত্মসম্মান বোধ |
বালক নরেন্দ্রনাথ একবার খুব রেগে গিয়ে মায়ের প্রতি অপশব্দ প্রয়োগ করেছিল | বাবা বিশ্বনাথ দত্ত তা জানতে পেরে পুত্রকে কোনোরূপ ভৎর্সনা না করে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করলেন | যে ঘরে নরেন্দ্রনাথ বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে গল্প-আলাপাদি করত সেই ঘরের দরজার উপর লিখে রাখলেন , “নরেনবাবু আজ তাঁর মাকে এইসব বলেছেন |” ১ তাঁর উচ্চারিত অপশব্দগুলোর উল্লেখ সেখানে থাকত | উদ্দেশ্য নরেনের বন্ধুরা ইহা জানুক | ওষুধ কাজে দিল – বন্ধুরা জানায় নরেন লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে ঐরূপ অপশব্দ প্রয়োগ বন্ধ করে |
বিশ্বনাথ দত্ত যেমন উপার্জন করতেন ব্যয়ও করতেন তেমন | বিশ্বনাথ দাতা বিশ্বনাথ হয়ে যে অর্থ দান খয়রাতি করতেন অনেকে তার অপব্যবহার করতেন | একবার নরেন্দ্রনাথ জানতে পারে তাঁর পিতার পয়সায় অনেক আত্মীয় মদ্যপান করে | তিনি পিতাকে ঐ বিষয়ে জানালে পিতার উত্তর ছিল : “জীবনটা যে কত দুঃখের তা তুই এখন কি বুঝবি ? যখন বুঝতে পারবি , তখন এ দুঃখের হাত থেকে ক্ষণিক নিস্তার লাভের জন্য যারা নেশাভাঙ করে তাদের পর্যন্ত দয়ার চোখে দেখবি |” ২
এহেন বিশ্বনাথ নিজের সন্তানদের জন্য কোনোরূপ সঞ্চয় রাখতেন না বা রাখার প্রয়োজনও বোধ করতেন না | তাঁর যুক্তি : “ছোটো ছেলেকে ভালো করে খাওয়াতে হয় , তাহলে তার মাথায় বুদ্ধি খোলে | কিন্তু ছেলেবেলায় তেজস্কর জিনিস না খাওয়ালে ছেলের মাথা ভালো হয় না | ছেলেদের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার দরকার নেই | ভালো খাওয়াও আর লেখাপড়া শেখাও তাহলে ছেলেরা করে নেবে | আর টাকা রেখে গেলে ছেলেরা মুখ্যু হয়ে উড়িয়ে দেবে |” ৩ একদিন নরেন্দ্রনাথ তাঁর পিতাকে প্রশ্ন করলেন , “আপনি আমার জন্য কী করেছেন ?” পিতাও সঙ্গে সঙ্গে বললেন , “যা আরশিতে নিজের চেহারাটা একবার দেখ গে , তাহলেই বুঝবি |” ৪
বিশ্বনাথ দত্ত আর একটি কথা বলতেন , “ছেলেকে নীচ সঙ্গে বেড়াতে দেবে না | বাড়িতে যা দুষ্টুমি করে করুক , কিন্তু রাস্তায় না যায় আর নীচ সঙ্গে না মেশে , এই দুটো জিনিস লক্ষ্য রাখতে হবে |” ৫
বিশ্বনাথ দত্ত তাঁর ছেলেকে সর্বদা আত্মসম্মান রক্ষা করার শিক্ষা দিতেন | তিনি তখন কার্যসূত্রে রায়পুরে অবস্থান করছিলেন | কিন্তু সেখানে কোনো উপযুক্ত স্কুল ছিল না | তাই পুত্রের শিক্ষার ভার তাঁকেই নিতে হলো | গতানুগতিক শিক্ষার বাইরেও চলত ইতিহাস , দর্শন ও সাহিত্যের পাঠ্যাভ্যাস | পুত্রের বুদ্ধির উৎকর্ষ সাধনের জন্য তিনি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পুত্রের সঙ্গে তর্ক জুড়ে দিতেন এবং ক্ষেত্র বিশেষে পরাজয় স্বীকার করে নিতেও পশ্চাৎপদ হতেন না | রায়পুরের বাড়িতে তখন অনেক বিদ্বান ও পণ্ডিত মানুষের সমাগম হতো এবং আলোচনা -সমালোচনার ঝড় উঠত | পিতার অনুমতিক্রমে নরেন্দ্রনাথও আমন্ত্রিত হতেন | নরেন্দ্রনাথ সে সব আলোচনা নিবিষ্ট মনে শুনতেন এবং বিশেষ ক্ষেত্রে নিজের মন্তব্য প্রকাশ করতেন | তাঁর বুদ্ধির প্রখরতায় ও জ্ঞানের প্রাচুর্যে তাঁকে কেউ বালক জ্ঞানে অবহেলা করতে সাহস দেখাতেন না |
একবার এক বিপরীত ঘটনা ঘটল | এক পিতৃবন্ধু নরেন্দ্রনাথকে তুচ্ছ জ্ঞান করলে নরেন্দ্রনাথ ভাবল, “কি আশ্চর্য ! আমার পিতাও আমাকে এত তুচ্ছ মনে করেন না , আর ইনি কিনা তাই ভাবেন |” আহত সর্পের মতো সোজা উঠে দাঁড়িয়ে বলেন , “আপনার মতো অনেকে আছেন , যাঁরা মনে করেন , ছেলে মানুষ হলেই বুদ্ধি বিবেচনা থাকে না | এ ধারণা কিন্তু নিতান্ত ভুল |” ৬
নরেন্দ্রনাথ অত্যন্ত চটে গেছেন দেখে সেই ভদ্রলোক নিজ ত্রুটি স্বীকার করে নেন | নরেন্দ্রনাথের এই আত্মশ্রদ্ধা কঠোপনিষদের বালক নচিকেতার সঙ্গে তুলনীয় | “বহূনামেমি প্রথমো বহূনামেমি মধ্যমঃ |” অনেকের মধ্যে আমি প্রথম শ্রেণির বা অনেকের মধ্যে আমি মধ্যম শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত | কিন্তু অধম আমি কখনই নই | নরেন্দ্রনাথের এই আত্মশ্রদ্ধা তাঁর পিতারই দান |
১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে নরেন্দ্র যেবার প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয় সেবার পিতার কাছ থেকে একটি সুন্দর রূপার ঘড়ি উপহার পেয়েছিল | এই ঘটনা থেকে আমরা অনুমান করতে পারি যে , বিশ্বনাথ দত্ত সাফল্যের জন্য ছেলেদিগকে পুরস্কৃত করতেন |
নরেন্দ্রনাথের প্রথম সঙ্গীত শিক্ষক পিতা বিশ্বনাথ দত্তই | তিনি পশ্চিমাঞ্চলে বাসকালে ঠুংরী , টপ্পা , গজল ইত্যাদি যা কিছু শিখেছিলেন , অবসর সময়ে পুত্রকে ঐসব শেখাতে উৎসাহী হয়েছিলেন – এমন তথ্যই আমাদেরকে জানিয়েছেন ‘যুগনায়ক বিবেকানন্দ’ র লেখক পূজ্য স্বামী গম্ভীরানন্দ মহারাজজী |
বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন মুক্তচিন্তক ও উদার মানসিকভাব সম্পন্ন | পুত্রের মধ্যে তা সঞ্চারণে তাঁর পূর্ণ সম্মতি ছিল | বিশ্বনাথের ইরানি এক মক্কেলের কোলে চেপে নরেন্দ্রনাথ যখন ইরান , আফগানিস্তান , কাবুলের গল্প শুনত আর মিষ্টি খেত তখন একান্নবর্তী গোঁড়া হিন্দু পরিবারটিতে গণ্ডগোলের সৃষ্টি হতো | কিন্তু বিশ্বনাথ দত্ত হাসিমুখে ছেলের পক্ষই নিতেন | নিষেধ করতেন না ছোট্ট নরেনের ঐ আচরণকে |
স্বামীজি নিজে যেমন ভোজন রসিক ছিলেন তেমনি উঁচু দরের রন্ধনশিল্পীও ছিলেন | রসগোল্লা খুব ভালো বানাতেন | মাঝে মাঝে শিষ্য , বন্ধু ও বিভিন্ন অপরিচিত জনকেও বহুবিধ ব্যঞ্জন তৈরি করে খাওয়াতেন | এই দুইটিই তাঁর পিতার দান | নরেন্দ্রনাথ রায়পুরে থাকাকালীন তাঁর পিতার কাছ থেকেই রন্ধনের কৌশল আয়ত্ত করেছিলেন |
স্বামীজির পড়াশোনার পরিধি আমাদেরকে হতবাক করে | কিন্তু পরোক্ষে একী তাঁর পিতা বিশ্বনাথ দত্তের দান নয় ? স্বামীজির পিতা কলকাতা হাইকোর্টের এ্যাটর্নী ছিলেন | সেই সুবাধে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন | তিনি সংস্কারমুক্ত ও উদারচিত্ত হওয়ার জন্য অন্যান্য ধর্মের সংস্কৃতি , লোকজন ও বিশেষ করে সাহিত্যের প্রতি পরিচিত হয়ে ওঠেন | তার ছাপ তাঁর খাদ্য , বেশভূষা , অধ্যয়ণ ও জীবনযাপনে পড়েছিল | তাঁর লাইব্রেরিতে খোঁজ নিলে উপরোক্ত কথার যৌক্তিকতা কিছুটা হলেও খুঁজে পাওয়া যায় | “ভূপেন্দ্রনাথ তাঁর পিতার লাইব্রেরি থেকে উদ্ধার করেছিলেন রোমের ইতিহাসের ছবি দেওয়া গ্রন্থ , ক্যাসেলের চামড়া বাঁধানো ‘ইলাসট্রেটেড বাইবেল’ , জুলিয়াস সিজারের জীবনী ও দ্বাদশ চার্লসের জীবনী ইত্যাদি |” ৭
শোনা যায় তিনি কবি হাফিজের কবিতা স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদিকে শুনিয়েছিলেন | পুত্র নরেন্দ্রনাথকে এক কপি বাইবেল উপহার দিয়ে বলেছিলেন , “ধর্মকর্ম যদি কিছু থাকে তাহা কেবলমাত্র ইহারই ভিতর আছে |” ৮
তবে তিনি যে হিন্দু ধর্মের প্রতি উদাসীন ছিলেন তা কিন্তু মোটেই নয় | এই কথার সমর্থনে স্বামী গম্ভীরানন্দের ‘যুগনায়ক বিবেকানন্দ ‘ থেকে কিছুটা উল্লেখ করব | “শ্রীমদ্ভাগবতও তিনি পাঠ করিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয় ; কারণ তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার গ্রন্থাগারের যে সামান্য অংশ রক্ষা পাইয়াছিল , তাহার মধ্যে ‘বরাট’ উপাধিধারী জনৈক গ্রন্থকারের অনূদিত একখানি ‘ভাগবত’ও পাওয়া গিয়াছিল | ” অন্য আর একটি তথ্য এই প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক – “মহেন্দ্রনাথ দত্তের কাছ থেকে আরো জানা যায় যে, যখন উপেন্দ্রচন্দ্র মিত্র ভগবদ্ পুরানের কিছু খণ্ড বার করেছিলেন তখন বিশ্বনাথ তাঁর প্রতিটি খণ্ড কিনেছিলেন আর মন দিয়ে পড়েছিলেন |” ৯
অর্থাৎ আমরা খুব জোর দিয়েই বলতে পারি তিনি অধুনা মনস্ক ছিলেন | এই আধুনিকার প্রতিফলন স্বামীজির চরিত্রে পূর্ণমাত্রায় ঘটেছিল | ভগিনী ক্রিস্টিন আমাদেরকে জানাচ্ছেন , “স্বামীজি বলতেন,’ আমার পিতার কাছে আমি আমার বুদ্ধিবৃত্তি ও হৃদয়বৃত্তি পেয়েছি | ‘ ” ১০
স্বামীজির মধ্যে যে বহুমুখী প্রতিভার স্ফূরণ আমরা দেখেছি , দেখে হতবাক্ হয়েছি , হতবাক্ হয়েছে সারাবিশ্ব | বিশ্রুত হয়েছেন জগৎগুরু রূপে | কিন্তু এই জগৎগুরুর হাতেখড়ি হয়েছিল পিতা বিশ্বনাথ দত্তের হাত ধরেই |
তথ্য প্রাপ্তি:
১| যুগনায়ক বিবেকানন্দ( ১ম খণ্ড ) , স্বামী গম্ভীরানন্দ , উদ্বোধন কার্যালয় , মে১৯৮৪ , পৃ: ২১ | ২| ঐ, পৃ: ২০ | ৩| স্বামীজির মা ও বাবা , চিরশ্রী বন্দোপাধ্যায় , পুনশ্চ, জুন ২০১০, পৃ: ১০৩ | ৪| যুগনায়ক বিবেকানন্দ , পৃ: ২০ | ৫| স্বামীজির মা ও বাবা , পৃ: ১০৩ | ৬| যুগনায়ক বিবেকানন্দ , পৃ: ৪৭. | ৭| স্বামীজির মা ও বাবা , পৃ: ৯৮ | ৮| যুগনায়ক বিবেকানন্দ , পৃ: ১৭ | ৯| স্বামীজির মা ও বাবা , পৃ: ৯৮ | ১০| স্বামীজির মাতৃভক্তি , স্বামী তথাগতানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয় , ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১২ , পৃ: ৭ |

 চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।