সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মানস চক্রবর্ত্তী – ২৫

মর্তকায়ার অন্তরালে

||২৫||

এরপর আমরা রবীন্দ্রজীবনের শেষপর্বে শেষের রবির কথা পড়ব | তার পূর্বে আর একটি তথ্য সংযোজন না করলে বলার মধ্যে যথেষ্ট ফাঁক থেকে যায় | সৈয়দ মুজতবা আলী ‘গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন’ প্রবন্ধে লিখছেন : “আমার দৃঢ় বিশ্বাস অন্য যেকোন সাধারণজন এরকম আঘাতের পর আঘাত পেলে কিছুতেই আর সুস্থ জীবনযাপন করতে পারত না | অথচ রবীন্দ্রনাথকে দেখলে কিছুতেই মনে হতো না কতখানি শোক তিনি বুকের মধ্যে বহন করে বেড়াচ্ছেন |’ আর একটু তথ্য এখানে জুড়ে দিই বেলা চলে যাওয়ার দিনও কবি সন্ধ্যায় পূর্ব নির্ধারিত এক সাহিত্য সভায় বক্তব্য রেখেছিলেন|

আমরা ফিরি পূর্ব প্রসঙ্গে | কবির উচ্চতা ছিল ছ’ফুট দুই ইঞ্চি | নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে কবি ‘ছেলেবেলা’ গ্রন্থে লিখছেন : “জ্বরে ভোগা কাকে বলে মনে পড়ে না | ম্যালেরিয়া বলে শব্দট শোনাই ছিল না | ওয়াক ধরানো ওষুধের রাজা ছিল ঐ তেলটা, কিন্তু মনে পড়ে না কুইনিন | গায়ে ফোড়া-কাটা ছুরির আঁচড় পড়ে নি কোনোদিনও | হাম বা জলবসন্ত কাকে বলে আজ পর্যন্ত জানি না | শরীরটা ছিল একগুঁয়ে রকমের ভালো |”

একবার বসন্ত দেখা দিল | অনেকে রোগভয়ে বোলপুর ছাড়লেন | আশ্রমের শচীন ডাক্তার এলেন কবিকে টিকা দিতে | রবীন্দ্রনাথ ডাক্তারকে বললেন : “যাদের ফিরে ফিরে বসন্ত আসে, তাদেরকে টিকা দাওগে যাও | আমার বছরে বছরে বসন্ত আসে না |” রবীন্দ্রনাথ কোনোদিনও মৃত্যুকে ভয় পায়নি | ভয় পায়নি আঘাতকেও | কিন্তু অপঘাত মৃত্যুকে কবি বেশ ভয়ই পেতেন | ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে জয়ন্ত নাথ রায়কে কবি একটি চিঠি লিখেন | সেখানে কবির এ আশঙ্কা ধরা পড়েছে | “শান্তিপূর্ণ মৃত্যুকে বিন্দুমাত্র ভয় করিনে | ভয় করি অপঘাত মৃত্যুকে | যদি মৃত্যুর পূর্বে হাসিমুখে সকলের কাছে বিদায় নিতে পারি, তবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে মুহূর্তের জন্যও দ্বিধা করি না |”

তথ্যসূত্র অনুযায়ী আমরা জানতে পারি কবির মৃত্যুটি বড়ো সুখের ছিল না | ডাক্তার নীলরতন সরকার ও বিধানচন্দ্র রায়ের চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে মনোমালিন্য কবিকে বেশ পীড়িত করেছিল | যাক সে অন্য প্রসঙ্গ |

১৯৩৭সালের ১০সেপ্টেম্বর কবির জীবনে প্রথম বড়োসড়ো অসুখের আবির্ভাব | টানা প্রায় পঞ্চাশ ঘণ্টা রবীন্দ্রনাথ অজ্ঞান হয়ে রইলেন | এই সময়ের অনুভব হেমন্তবালাকে কবি লিখলেন : “কিছুকালের জন্য মৃত্যুদণ্ড এসে আমার ছুটির পাওনা পাকা করে গিয়েছে |”

১৯৪০ এ কবির ৭৯তম জন্মদিনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কবি মজা করে বললেন : “হ্যাঁ, এবার আশি, আর তার মানেই আসি |” ১৯৪১এর ২৫বৈশাখ মর্তকায়ায় এই কবির শেষ জন্মদিন | ১৩ মে লিখলেন, “রক্তের অক্ষরে দেখিলাম/ আপনার রূপ, / চিনিলাম আপনারে |” কবি কি সত্যই বুঝেছিলেন তাঁর সময় হয়ে আসছে ?

শান্তিনিকেতনে কবির স্বাস্থ্য নিয়ে সকলেই উদ্বিগ্ন | অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা চলছে কবির | নেতৃত্বে আছেন দুই সুযোগ্য ডাক্তার | ডা.নীলরতন সরকার ও ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় | এমতাবস্থায় এলেন কবিরাজ বিমলানন্দ তর্কতীর্থ | সবশেষে স্থির হলো সুপ্রাপিউবিক সিস্টোস্টমি নামে এক অপারেশন করা হবে | ইউরিন পাসের জন্য | বিধান রায়ের ডাকে এলেন নামকরা সার্জেন ডা. ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় | সকলেরই মত অপারেশন | কেবল নীলরতন সরকার ভিন্নমত পোষণ করলেন | কারণ কবির কোমল শরীর অপারেশনের ধকল সহ্য করতে পারবে না |

যাইহোক ১৯৪১এর ২৫জুলাই অসুস্থ রবীন্দ্রনাথকে শান্তিনিকেতন থেকে নিয়ে আসা হলো কলকাতায় | যাত্রার পূর্বে কবিকে দেখতে এলেন কবির পরিজনেরা – আদরের মীরা, নন্দিতা, কৃপালিনী( নাতনি) ও তার স্বামী কৃষ্ণ কৃপালিনী | ক্ষিতিশ রায়, বিশ্বরূপ বসু, রানি মহলানবিশ, সুরেন কর আরো অনেকে | শচীন ডাক্তারের হাতদুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে কবি বললেন : “ডাক্তার আমার আশ্রম রইল আর আশ্রমবাসীরা রইলেন, তাঁদের তুমি দেখো |”

ঐদিন বিকেল তিনটে নাগাদ কবি ঢুকলেন জোড়াসাঁকোর বাড়িতে | ২৭জুলাই কবি আরো অসুস্থ হয়ে পড়লেন | নিজে লিখতে পারলেন না | রানি চন্দ্রকে দিয়ে লেখালেন –
“প্রথম দিনের সূর্য
প্রশ্ন করেছিল
সত্তার নূতন আর্বিভাবে-
কে তুমি ?
মেলে নি উত্তর |

বৎসর বৎসর চলে গেল |
দিবসের শেষ সূর্য
শেষ প্রশ্ন উচ্চারিল
পশ্চিমসাগরতীরে
নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়-
কে তুমি ?
পেল না উত্তর || “

জুলাই ৩০ | সকালেই হাজির হলেন ডাক্তার ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় | কবিকে জানালেন – তিনি আজই অপারেশন করতে চান | কবির অপারেশনের ইচ্ছে ছিল না, তবুও রাজী হলেন | বেলা ১১টা২০মিনিটে শুরু হলো অপারেশন | সময় ব্যয় হলো মাত্র ২৫মিনিট | বিকেলে আবার শুরু হলো পেটে যন্ত্রণা | ৩১জুলাই, ১আগস্ট অবস্থার আরো অবনতি হলো | ডাক্তারেরা পরামর্শ করছেন | ২আগস্ট কবির হেঁচকি উঠতে শুরু করল | ৩আগস্ট প্রতিমা দেবী দেখে গেলেন | ৪আগস্ট কিডনির কাজ বন্ধ হলো | ৫আগস্ট অবস্থা হলো আরো সঙ্কটাপন্ন | কারণ কবির শরীর চিকিৎসায় আর সাড়া দিচ্ছে না | এলো অন্তিম দিন | ৭আগস্ট, বাংলা২২শে শ্রাবণ | সকালেই অঞ্জলি দিয়ে গেলেন অমিয়া ঠাকুর | শেষবারের মতো প্রার্থনা করলেন বিধূশেখর শাস্ত্রী ও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় | ‘শান্তম শিবম অদ্বৈতম’ বাণী শোনালেন কানে কানে প্রতিমাদেবী | একটু বেলা হতেই আর পালস্ পাওয়া গেলো না | ৯টা চালু হলো অক্সিজেন দেওয়া | অন্তিম ক্ষণ বেলা ১২টা১০মিনিট | কবি চিরনিদ্রায় ঘুমিয়ে পড়লেন | পড়ে রইল কবির শেষ বাণী –
“তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে হে ছলনাময়ী ……”

ক্রমশ…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!