সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ১৪)

কেল্লা নিজামতের পথে
মুর্শিদাবাদের গল্প বলতে শুরু করলে শেষ হয় না। যে নগরের ছত্রে ছত্রে ইতিহাস, আর অলিতে গলিতে আজও ভাঙা ইট, ঘর বাড়ি। এখানে চলতে ফিরতে গেলে কানে ভেসে আসে ইতিহাসের পদধ্বনি। একদম শূন্য থেকে একটা শহরের গড়ে ওঠা, তারপর আবার সময়ের সাথে সাথে ধ্বসে যাওয়া। এই হলো মুর্শিদাবাদ। কিন্তু যে মানুষগুলো উন্নয়ন ও সংরক্ষণের দাবী নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে পর্যটকদের দিকে, তাদের চোখগুলো যেন অন্বেষণ করে হারিয়ে যাওয়া একটা মুর্শিদাবাদকে। সামান্য কিছু সময়ের মুর্শিদাবাদ সফরে পৌছে গেছিলাম হীরাঝিল প্রাসাদের জমিতে৷ যাওয়ার পথে ঘুরে গেলাম খোশবাগ। আমার সফরগুলো সাধারণত ঝটিকারই হয়। আর সেইটুকু সময়ে হাতে থাকে প্রচুর কর্মসূচি। অর্থাৎ মুর্শিদাবাদ গিয়ে শুধু হীরাঝিল নয়, সামান্য কয়েক ঘন্টায় পৌঁছতে হয় মুর্শিদকুলি খাঁ থেকে একেবারে নবাবী ত্যাগ দেখান বাহাদুর ফেরাদুন যা পর্যন্ত। এবার মুর্শিদাবাদ সফরে আলাপ হলো একজন মানুষের সঙ্গে। তিনি মীরজাফর রক্ত। মুর্শিদাবাদে আজকের ছোটে নবাব সৈয়দ রেজা আলি মির্জা। ছোটখাটো চেহারা, আকর্ষণীয় মানুষ। খুব সহজে মিশে যেতে পারেন সকলের সাথে। নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও হত্যার পিছনে একটা স্বার্থান্বেষীর দল যে ভীষণভাবে জড়িয়ে ছিল মুর্শিদাবাদের মাটিতে তা আমরা জানি। জগত শেঠ থেকে শুরু করে ঘসেটি বেগম, ঢাকার রাজা রাজবল্লভ, ব্যবসায়ী উমিচাঁদ, ইয়ার লতিফ খান, মীরজাফর ও তার ছেলে মীরণ আরো কত কে। কিন্তু এই মীরজাফর বংশের রক্ত যখন নবাব সিরাজউদ্দৌলার স্মৃতি রক্ষার্থে তৈরি উদ্যানের ফিতে কাটতে আসেন তখন একটা নতুন মুর্শিদাবাদ মানুষের সামনে উন্মোচিত হয় বৈকি। এই মুর্শিদাবাদে নবাব নেই, কিন্তু নবাবী রক্তটুকু বয়ে যায় শিরায় শিরায়। যে ইংরেজদের ষড়যন্ত্রে মুর্শিদাবাদের এই দৈন্যদশা, তারাও আর নেই এদেশের মাটিতে। কিন্তু ইতিহাস যে বদলায় না। আর নতুন করে গড়েও ওঠেনা ধ্বসে যাওয়া প্রাসাদের দালান, বারান্দা, খিলান অথবা মুখ্য দরজা।
মুর্শিদাবাদে প্রত্যেক নবাবের আলাদা আলাদা গড় বানানোর প্রথাটা বড় অবাক করে। এর আগে মুর্শিদকুলির চেহেল সেতুন বা সিরাজউদ্দৌলার হীরাঝিল নিয়ে বললেও বলা হয়নি সরফরাজের নাগিনাবাদের কথা। দাদুর বানানো চেহেল সেতুন থেকে সরফরাজ তখন তৈরি করেছেন নাগিনাবাদ প্রাসাদ। আজ মুর্শিদাবাদ স্টেশনের কাছাকাছি সরফরাজের কবরখানা টিকে থাকলেও নাগিনাবাদে তার প্রাসাদ বা রাজবাড়ীর কোন অংশই আর অক্ষত নেই। এর আগেও মুর্শিদাবাদের সমস্ত প্রাসাদ একাধারে ভেঙ্গে যাওয়ার কথা বলেছি। নবাবী আমলে চুল সুড়কির কাজ ও স্থাপত্যের ধরন কোন প্রাসাদকেই বেশিদিন টিকে থাকতে দেয়নি। অথচ ইংরেজ কোম্পানির সমসাময়িক বানানো প্রায় সমস্ত প্রাসাদই এখনো বহাল ছবি আছে টিকে আছে। আসলে নবাবী স্থাপত্য ও ইংরেজ স্থাপত্যের মধ্যে আকাশ পাতাল ফারাক। একটা সময় তৎকালীন পূর্ব বাংলা থেকে যে চুল সুড়কির সরবরাহ আসতো, তাতেও বিভিন্ন সময়ে অসুবিধার সৃষ্টি হতো। এই কারণে নবাবদের বানানো কোন প্রাসাদই সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে পারেনি বেশিদিন। আর তারপরে রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা এবং প্রথম দিকে নবাবদের স্মৃতি মুছে ফেলার একটা চেষ্টা তো তার সঙ্গে ছিলই। সব মিলিয়ে আজ নাগিনাবাদ সত্যিই ভীষণ অচেনা। আর চেহেল সেতুনের ওপর তৈরি হয়ে আছে চক মসজিদের একটি বড় অংশ। শোনা যায় চক মসজিদের জায়গাটি বিশাল প্রাসাদ চেহেল সেতুনের রাজকীয় দরবার গৃহ। একবার ভেবে দেখুন তো। আজ যেখানে বাজার এলাকায় ঘিঞ্জি জনবসতীর ভেতর মীরজাফরের দ্বিতীয় স্ত্রী বিখ্যাত মুন্নি বেগমের হাতে বানানো চক মসজিদ অবস্থিত, এক সময় সেটাই ছিল মুর্শিদকুলি এবং সুজাউদ্দিনের প্রিয় চেহেল সেতুনের দরবার গৃহ৷ আর আজকের নাগিনাবাদে তো তিল ধারনের জায়গা নেই। শুধু সারফরাজের কবর টা দেখলেই একখণ্ড নাগিনাবাদকে উপলব্ধি করা যায়। মুর্শিদাবাদের নবাবদের মধ্যে তারপর ওদের কীর্তি সব থেকে কম। আসলে বাবা সুজাউদ্দিনের যখন মৃত্যু হয় তখন নবাব হওয়ার সুযোগ আসে সরফরাজের সামনে। এরপর মাত্র ১১ মাসের নবাবী জীবন তাঁর। গিরিয়ায় তার ওপর হঠাৎ আক্রমণ করে বসা আলীবর্দী খাঁয়ের কাছে পরাজয় ও মৃত্যুবরণ। তাই সরফরাজকে আর যাই হোক, দক্ষ প্রশাসকের ভুমিকায় কোনোদিনই দেখা যায়নি মুর্শিদাবাদে।
মুর্শিদাবাদে দেখবার জায়গার শেষ নেই। একটা বাড়ি শেষ হয় তো আরেক বাড়ি। সব জায়গাতেই ভাঙাচোরা ইটের টুকরো। ঘুরতে ঘুরতে মানস দাকে প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা মুর্শিদাবাদের সমস্ত নবাবী প্রাসাদ গুলো না হয় ভেঙে গেল তা মানলাম। কিন্তু সেই ভগ্নাবশেষ, তার অবশিষ্ট অংশ সেগুলো কোথায় গেল? আচ্ছা কথায় কথায় বলা হয়নি মানসদার পরিচয়। মুর্শিদাবাদে রীতিমত জনপ্রিয় ইউটিউবার এবং ইতিহাস গবেষক হিসেবে পরিচিত এক উজ্জ্বল নাম মানস সিনহা। তুমুল জনপ্রিয় নিজস্ব চ্যানেল থেকে শুরু করে, ইতিহাসের জন্য পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ানো এই মানুষটার সাথে যবে থেকে কথা শুরু হয়েছে শুধু অবাকই হয়েছি। মুর্শিদাবাদ তাঁর কণ্ঠস্থ। কথা বলতে শুরু করলে কোথা দিয়ে যে সময় চলে যায় বোঝার জো নেই। ঘুরেফিরে আসে নবাবদের অন্দরমহলের কথা। যাই হোক, আমার প্রশ্নের সাপেক্ষে মানস দার উত্তর রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো এলো। প্রাসাদের ইট খুলে সময়ে সময়ে তৈরি হয়ে গেছে স্থানীয়দের বাড়িঘর। সেখানে কারও বাড়িতে লাগানো রয়েছে চেহেল সেতুনের ইট, তো কারও বারান্দায় পলেস্তারা খসে দেখা যাচ্ছে নাগিনাবাদ প্রাসাদের পাথর। দুর্বল কন্সট্রাকশন এবং লোভের তাড়নায় ভেতরে তুমুল অন্তর্দন্দ একেবারে গুঁড়িয়ে দেয় সমস্ত প্রাসাদ তথা আস্ত শহরটাকেই। আর ভেঙে পড়া সমস্ত প্রাসাদের অংশ নয় ব্যবহার করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, অন্যথায় বয়ে নিয়ে গিয়ে বাড়ির অংশে ব্যবহার করে স্থানীয় মানুষ। মানসদার সামনেই একটু অবাক হলাম বৈকি। মুর্শিদাবাদ ঘুরে লক্ষ্য করলাম শুধুমাত্র নবাবদের প্রতিষ্ঠিত ধর্মস্থানগুলি বাদে আর কোনো প্রাসাদের অংশই অবশিষ্ট নেই শহরে। ধর্মস্থান বলতে আজও নবাবী ইতিহাস বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুর্শিদকুলির কাটরা মসজিদ, সরফরাজের ফৌতি মসজিদ, আলিবর্দির তৈরি করা খোশবাগ সমাধিক্ষেত্র ও মসজিদ, মীরজাফরের সমাধিক্ষেত্র, সরফরাজের মা অর্থাৎ মুর্শিদকুলির মেয়ে আজিমুন্নিসা বেগমের সমাধি, রোশনি বাগে সুজাউদ্দিনের মসজিদ এবং সমাধি। এভাবেই টিকে আছে মুর্শিদাবাদ এবং তার নবাবী অস্তিত্ব। বাকিটুকু বুকে নিয়ে তৈরি হয়ে গেছে আর একটা মহানগরী। মুর্শিদাবাদের ভাঙা খাঁচায় সদর্পে গড়ে উঠেছে আজকের কলকাতা।