সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ১১)

কেল্লা নিজামতের পথে
মুর্শিদাবাদের আমবাগান বিখ্যাত। আর ঠিক তেমনি বিখ্যাত সুজাউদ্দিন আর তার রোশনী বাগ৷ ফেরার তাড়া নিয়ে আমি রোশনী বাগ আসবো এ কখনোই ভাবতে পারিনি। কিন্তু যেখানে মীরজাফরের কবর দেখতে ছুটে গেছি জাফরাগঞ্জ, আলীবর্দী খাঁ ও সিরাজউদ্দৌলার জন্য একেবারে সকাল সকাল ছুটে গেছি খোশবাগ। সেখানে একবার সুজাকে দেখব না? এ কেমন করে হয়? ভাগীরথীর পূর্ব দিকে তরুণ নবাব সিরাজের মতোই বছরের পর বছর নিশ্চিন্তে শুয়ে আছেন নবাব সুজাউদ্দিন। মাথায় ছায়া দেবার জন্য আমবাগান। পরিবেশও মনোরম। পৌঁছে দেখলাম মুর্শিদাবাদে স্থিত সমস্ত সমাধির মধ্যে সবচেয়ে বড় সমাধিটা তাঁর। প্রায় একটি প্রমাণ আকারের বাঁধানো বিছানা। মনে পড়ে এমন আকারের বিছানা দেখেছিলাম সম্রাট আকবরের ফতেপুর সিক্রিতে। কিন্তু এতবড় সমাধি আগে চট করে চোখে পড়েনি কোথাও৷ লম্বায় প্রায় ১৩-১৪ ফুট, চওটায় ৫-৬ ফুট। এহেন বিশাল সমাধির নীচে বছরের পর বছর ঘুমিয়ে আছেন বাংলার এই প্রকৃত সুশাসক। অথচ নবাব সিরাজ আর পলাশীর পরাজয় নিয়ে বিগত তিনশ বছর ধরে এতোই ব্যস্ত আমরা, যে তাকিয়ে ওঠা হয়নি সেই নবাবের দিকেই, যাঁর আমলে সবচেয়ে সস্তা হয়েছিল বাংলার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, যাঁর আমলে বিচারব্যবস্থায় এসেছিল এক অভাবনীয় নিরপেক্ষতা। হিন্দু হোক বা মুসলিম, সম্পদশালী হোক বা ফকির, নবাব সুজা সমান শাস্তিপ্রদানে কার্পণ্য করতেন না। এমনিতে নবাবী আমলে ঘুষ ও নজরানা ছাড়া কাজ তো প্রায় হতোই না। কিছু প্রয়োজনীয় কাজ হাসিল করাবার জন্যও নবাব থেকে শুরু করে তাঁর কর্মচারীদেরকেও দিতে হত নজরানা। যেমন মুর্শিদকুলী খাঁয়ের সময় কলকাতায় নিজেদের ট্যাঁকশাল খোলবার আর্জি নিয়ে দিল্লীতে হাজির হয়েছিল সাহেবদের দল। নবাবকে বলে কাজ না হওয়ায় নৌকা ভর্তি উপহার নিয়ে দিল্লী পৌঁছোন তাঁরা। মুর্শিদকুলীর চোখ এড়িয়ে বাদশার থেকে ফরমান আদায় করে আনাই তখন তাঁদের উদ্দেশ্য। দিল্লীর বাদশা তখন ফাররুখশিয়ার। তাঁর জন্য অঢেল উপঢৌকন নিয়ে তবেই ফরমান আনতে ছুটতে হয় ইংরেজ বণিকদলকে। ট্যাঁকশাল খোলার ফরমান আর তাঁরা পেল কিনা সে নাহয় পরে বলব। কিন্তু নবাব বাদশার দরবারে বিচার ও আইন প্রণয়ণে উপঢৌকনের যে একটা বিরাট ভূমিকা, তা এককথায় অনস্বীকার্য। কিন্তু কিছুটা হলেও এর উর্ধ্বে উঠতে চেয়েছিলেন সুজা। তাঁর সময়কাল বাংলার স্বর্ণযুগ। কিন্তু তাও মুর্শিদাবাদ গিয়ে ক’জন পর্যটক খোশবাগে আলিবর্দি ও সিরাজউদ্দৌলার সমাধি দেখে ছুটে যান তার অদূরেই সুজাউদ্দিনের সমাধিক্ষেত্রে? আজ তো এককথায় অবহেলিতই তিনি। শ্বশুর মুর্শিদকুলীর মৃত্যুর পর উড়িষ্যা থেকে মুর্শিদাবাদ এসে হাল ধরেছিলেন বাংলার। তাঁর পুত্র সরফরাজ তখন মুর্শিদকুলীর প্রায় ঘোষিত নবাব। সরফরাজকে নবাব আসনে বসাতে যখন প্রায় সম্পূর্ণ মুর্শিদাবাদও প্রস্তুত, ঠিক তখনই পটভূমিতে এলেন সুজা। পাল্টে গেল মুর্শিদাবাদের গল্পটাও। উড়িষ্যা থেকে বিশাল সেনাদল নিয়ে এসে পৌঁছলেন তিনি। যে দলের প্রধান উপদেষ্টা হলেন দুজন। আলীবর্দি খাঁ আর তার দাদা হাজি আহমেদ। তখন কে জানতো এই আলীবর্দি পরে একটা দীর্ঘ সময় বসবেন বাংলার নবাবী মসনদে। এভাবেই প্রায় আকস্মিক এসে যাওয়া সুযোগে নবাব সুজার সিংহাসন লাভ। বাংলার ইতিহাস এমনই বৈচিত্র্যময়, আর মুর্শিদাবাদ আজও তার মূর্তিমান সাক্ষী।
ডাহাপাড়া ঘাট থেকে রোশনীবাগ খুবই স্বল্প দূরত্ব। এই ডাহাপাড়াও নবাবী সময়ের সাক্ষী নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এতকাল। ভাগীরথীর এক তীর ভাঙে, আর এক তীর গড়ে। এই তো নিয়ম। কিন্তু নিয়মের বাইরেও তো কতকিছু ঘটে যায়। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় না। শুধু সেই ঘটে যাওয়া সময়টা আঁকড়ে থাকে স্থানের নাম আর পরিচয়। মুর্শিদকুলীর মুর্শিদাবাদ আজও দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক তেমন ভাবেই দাঁড়িয়ে আছে রোশনীবাগ, ফর্হাবাদ বা ডাহাপাড়া। কিন্তু ভাঙা গড়ার মধ্যে পাল্টে যায় নির্মাণ। পাল্টে যায় ঘটনাপ্রবাহ। আমার পথ চলায় বারবার তাকিয়ে আছি দেয়াল, ইট আর ভাঙা প্রাসাদগুলোয় দিকে। একদা প্রাসাদনগরী মুর্শিদাবাদ। ভাগীরথীর পূর্ব পাড়কে কেন্দ্র বানিয়ে তার আদ্যোপান্ত সেজে ওঠা। আজও পূর্ব পাড় জমকালো। পুরনো প্রাসাদের ছিটেফোঁটাও খুঁজে না পাওয়া গেলেও জনবসতি বেশ ঘন। আধুনিক মুর্শিদাবাদ তাই পুরনো নয়, তা আজকের মতো। কিন্তু পশ্চিম পাড় কোনো অজানা কারণেই আজও সেজে উঠতে পারেনি। নৌকায় ইচ্ছেগঞ্জ থেকে ডাহাপাড়া পৌঁছে বেশ অবাক হলাম বৈকি। ইচ্ছেগঞ্জ পূর্বপাড়ের ঘাট, আর ডাহাপাড়া পশ্চিমপাড়। এই পশ্চিম পাড়ে শুয়ে আছেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা, নবাব আলীবর্দি আর নবাব সুজাউদ্দিন। অথচ এই দিকটি কত জাঁকজমকহীন। এককথায় বলতে গেলে আজও প্রায় গণ্ডগ্রাম। আশপাশে বড় বাড়ির তো চিহ্নই নেই, নিদেনপক্ষে সকালের ব্রেকফাস্টের দোকান খুঁজে পেতে আধঘন্টা লেগে গেল। তবু আমি আর অরুণদা বাইকে যেতে যেতে খুঁজে পেলাম একটা কচুরির দোকান। বসে একটু জিরোনা৷ কিন্তু চলার যে বিরাম নেই। বিরাম নেবারও জো নেই। কারণ সামনে পড়ে আছে ইতিহাস। আর এপাড়ের এই আঁধার রাজ্যে এক পেলব নিস্তব্ধতায় শায়িত বাংলার ইতিহাসের অন্যতম তিন শাসক ও কাণ্ডারী। সুতরাং খেয়েদেয়েই বেরিয়ে পড়া। কেউ সচরাচর দেখতেও আসে না তাঁদের৷ মুর্শিদাবাদ ঘুরতে আসা পর্যটক পূর্ব পাড়ে ঘুরে বাড়ি ফিরে যান জাফরাগঞ্জে নবাব মীর জাফর ও তাঁর পরিবারের সমাধি দেখে। অদেখা রয়ে যায় পশ্চিম। অদেখা রয়ে যায় সুজার প্রিয় রোশনিবাগ, আলীবর্দির খোশবাগ।