সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ২৮)

কেল্লা নিজামতের পথে

বর্গীদের নিয়ে একরকম নাভিশ্বাস ওঠবার জোগাড় হয়েছিল নবাব আলীবর্দী খাঁয়ের। দিন নেই রাত নেই, চারদিকে তখন বর্গী আক্রমণের ঝোঁক। পুরো রাজত্বকাল ছুটে বেড়াতে বেড়াতেই সময় চলে গেছে তাঁর। তারমধ্যে এক দুশ্চিন্তা হল নাতি সিরাজ। ছোট থেকেই বিচিত্র তার সব চিন্তা ভাবনা। দাদুর কাছে অদ্ভুত সব আবদার। কখনো নিজের প্রাসাদ, কখনো পছন্দের অস্ত্র কোন কিছুই আবদারের তালিকা থেকে বাদ নেই। আলীবর্দির ছোট মেয়ে আমিনা বেগমের দুই পুত্র। এক্রামুদ্দৌলা আর সিরাজউদ্দৌলা। এক্রামুদ্দৌলা আমিনার বেটা হলেও ছেলেবেলা থেকেই তার দত্তক নিয়েছে নওয়াজেশ মহম্মদ খাঁ ও ঘষেটি বেগম। তাই ঘষেটির কাছেই মানুষ এক্রামুদ্দৌলা। সিরাজ কে ছেলেবেলা থেকেই না পসন্দ ঘষেটির। পরিবারের মধ্যেই বিভাজন। সিরাজ দাদু আলীবর্দির কাছে খুব প্রিয় পাত্র হলেও ঘষেটির কাছে সে শত্রু। এদিকে নিজের ছেলে এক্রামকেই আলীবর্দী পরে সিংহাসনে দেখতে চায় ঘষেটি৷ সেই অনুযায়ী দাবার ঘুঁটিও সাজিয়েছে নওয়াজেস ও ঘষেটি৷ কিন্তু সব ব্যর্থ করে মাত্র ১২ বছর বয়সেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত বসন্ত রোগে মারা গেল এক্রামদ্দৌলা। তারপর থেকেই দীর্ঘ রোগসজ্জায় পড়লেন নওয়াজেশ। এই পুত্রশোক থেকে তিনি আর বের হতে পারেননি। ফলাফল মৃত্যু। এক্রামদ্দৌলার দেহাবসানের পর নওয়াজেশ আর বিছানা ছাড়েননি। আর নওয়াজেশের চলে যাওয়া ঘসেটি বেগমের জন্য এক বিরাট ধাক্কা। এই ধাক্কা সামলে সিরাজের বিরুদ্ধে দল গুছিয়ে তার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ানো বোধহয় ঘষেটির মত প্রভাবশালী ও ক্ষমতা সম্পন্ন নারীর পক্ষেই সম্ভব। প্রথম থেকেই ঘষেটি ছিলেন আলীবর্দির ডান হাত বাঁ হাত। এর মধ্যে ঘটে গেছে আরো এক ভয়ানক ঘটনা। মুর্শিদাবাদ থেকে বিতাড়িত আফগান সৈন্যরা জড়ো হয়েছিল পাটনায়। সেখানে তখন আলীবর্দির নিয়োজিত শাসক বা নায়েব নাজিম সিরাজের বাবা জৈনুদ্দিন আহমেদ খান। আলীবর্দির রাজ পাটে তিনি তখন বিহার প্রদেশে প্রাদেশিক শাসনকর্তার দায়িত্ব সম্মেলন। আর ঠিক সেই সময়ই মধ্য গগনে থাকা জৈনুদ্দিনকে আকস্মিক আক্রমণে হত্যা করে ফেলে সেইসব বিক্ষুব্ধ আফগান যোদ্ধারা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আফগানদের হাতে প্রাণ চলে যায় জৈনুদ্দিনের। আর এদিকে অন্ধকার নেমে আসে মুর্শিদাবাদের। দিশাহীন নবাব কি করবেন বুঝে ওঠার আগেই ওলটপালট হয়ে যায় তাঁর সম্পূর্ণ রাজপাট। জৈনুদ্দিন শুধু আলীবর্দির জামাইই নয়, তার ভাতুষ্পুত্রও বটে। দাদা হাজি আহমেদের পুত্র জৈনুদ্দিনের মৃত্যু আলীবর্দির কাছে এক প্রবল ধাক্কা। এরপর নাতি সিরাজউদ্দৌলার দায়িত্ব নিজের হাতে নিয়ে তাকে নবাব পদে অভিষেক করবার জন্য সবদিক থেকে উপযুক্ত করে তোলা আলীবর্দির কাছে এক বিরাট গুরুদায়িত্ব হয়ে ফুটে ওঠে। আর সমস্ত যুদ্ধ বিগ্রহের সাথে সাথে সেই দায়িত্ব সামলাতে সামলাতেই আলীবর্দির জীবনের সব কটা দিনই এক এক করে পেরিয়ে যায়। সিরাজকে কোনরকম শিক্ষা দিতে বাকি রাখেননি আলীবর্দী। কিন্তু তাও কতটা শিক্ষিত হয়ে উঠতে পেরেছে সিরাজ? রাজ্যপাট সামলানো থেকে শত্রুদের মোকাবিলা, নাতি সবকিছু ঠিকঠাক সামলাতে পারছে কিনা তা দেখে যাওয়া হয়নি দাদু আলীবর্দির। বরং আদরের নাতির বিভিন্ন আবদার রক্ষা আর বড়লোকের উচ্ছন্নে যাওয়ার ছেলের মত হাতের সামনে সব জুগিয়ে দেওয়া টাই অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায় আলীবর্দীর।
এভাবেই দিন কাটছিল কেল্লা নিজামতের। খোঁজ করতে করতে সিরাজের সমস্ত প্রশ্রয় আর বেয়াদপি গুলো যখন একটা একটা করে আমার চোখের সামনে উঠে আসতে শুরু করলো, তখন অবাক হওয়া ছাড়া কোন উপায় ছিল না। আজ হীরাঝিল নেই, নেই তার মালিক সিরাজও৷ কিন্তু রয়ে গেছে মুর্শিদাবাদ। রয়ে গেছে হিরাঝিলের পাশে বয়ে যাওয়া ভাগীরথী। সিরাজের উপর অন্যায় হয়নি তা একেবারেই নয়। মুর্শিদাবাদের ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে বারবার উঠে এসেছে একাধিক চক্রান্ত এবং বিশ্বাসঘাতকতা। যা তরুণ নবাব সিরাজকে বিভিন্নভাবে বিদ্ধ করেছে প্রতিদিন। সেই ইংরেজদের তরফ থেকেই হোক, অথবা নিজের পরিবারের তরফেই। কিন্তু এসবের ঊর্ধ্বে কতটা ভালো মানুষ ছিলেন সিরাজ? রাজার প্রথম বৈশিষ্ট্য হলো উদার মনষ্কতা এবং উন্নত চরিত্র। বাংলার মধ্যযুগে উল্লেখযোগ্য শাসক সিরাজউদ্দৌলা তার নবাব হয়ে ওঠার দিনগুলোর আগে ঠিক কিভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন বাংলার মসনদের জন্য, তাই একটু নেড়েচেড়ে দেখতে হয় বৈকি। বৈভবশালী মুর্শিদাবাদে আলোর ঝলকানিতে জন্ম সিরাজের। বাংলার একচ্ছত্র নবাব ও শক্তিশালী শাসক আলীবর্দী খাঁয়ের ছত্রছায়ায় ও স্নেহে ছেলেবেলার দিনগুলো কেটেছে তার। যতবার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে মুর্শিদাবাদে, আলীবর্দী তার আঁচ যেতে দেননি সিরাজের ওপর। সে বর্গী আক্রমণ হোক, অথবা বিদেশি শত্রু থেকে আসা কোনো হানাদারি। নিজে কৈশোরে পৌঁছে যুক্ত হন মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে। আর তখন রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হলেও বর্গী, আফগান বা ইংরেজদের থেকে আসা বহিরাগত চাপে অতিষ্ঠ হয়ে আছেন আলীবর্দী। তারমধ্যে মুর্শিদাবাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তো আছেই। সেখানে জড়িয়ে আছে ঘষেটি বেগম, ঢাকার রাজা রাজবল্লভ, ইয়ার লতিফ খান, কলকাতার ব্যবসায়ী উমিচাঁদ, এবং সর্বোপরি মীরবক্সি মীরজাফর ও তাঁর দুর্ধর্ষ পুত্র মীরণের নাম। মুর্শিদাবাদের চক্রান্তের শেষ নেই। যে শহরের ইতিহাসের সঙ্গে আবশ্যিকভাবে জড়িয়ে যায় ঢাকা কলকাতা অথবা রাজমহল শহরের নামও, সেই শহরের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো ধারে ও ভারে যে সারা বাংলায় রাজনৈতিকভাবে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সিরাজ চলেছিল তার গতিতে। বাংলার মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ বা তাদের ভালো মন্দের খবর রাখার দিকে সেযুগের নবাবদের কারোরই খুব একটা হেলদোল ছিল না। সকলেই ছিলেন উনিশ আর বিশ। নিজের শাসন-ক্ষমতা প্রমাণ করবার জন্য যে ন্যুনতম সময়ের প্রয়োজন, সিরাজ তা হাতে পাননি। কিন্তু নবাব হওয়ার আগে তাঁর একাধিক কার্যকলাপ বাংলার জনমানসে যে বিরূপ প্রভাব তৈরি করেছিল, তা নিয়েই সিরাজকে বসতে হয় সিংহাসনে। দাদুর মৃত্যু ও তারপর মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সিরাজের হাতে এনে দেয় নবাব হওয়ার সুযোগ৷ দাদুরও পছন্দ ছিলেন তিনি। তাই বিভিন্ন স্তরে বহু আপত্তি থাকলেও বাংলার মসনদে চড়ে বসতে খুব একটা সমস্যা হয়নি তরুণ ছটফটে নবাব সিরাজউদ্দৌলার।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।