সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ১০)

কেল্লা নিজামতের পথে
পলাশীর যুদ্ধের পর ভাগ হয়ে গেছে হীরাঝিল। আর তার সাথে সাথেই ভাগ হয়ে গেছে মুর্শিদাবাদও। আমার ফিরে দেখাটা সময়ের কাল ধরে নয়। এই ফিরে দেখায় বারবার উঠে আসে আজ মুর্শিদাবাদের বুকে জমে যাওয়া কান্নাটুকু। খেতে না পাওয়া ছেলেগুলো যখন আকাশের দিকে মুখ করে পকেট ধরে টানাটানি করে, তখন মনে পড়ে এই মুর্শিদাবাদ আমরা কেউ চাইনি। এক সময় যে মুর্শিদাবাদ ব্রিটিশ ক্যাপিটাল লন্ডনের সঙ্গে তুলনায় বারবার উঠে এসেছিল ভিনদেশী সাহেবদের কলমে, সেই নবাবী মুর্শিদাবাদ আর আজকের এক সাধারণ শহরতলী মুর্শিদাবাদ কখনোই এক হতে পারে না। ভৌগলিক জমিটুকু ছাড়া বাকি কোন অংশেই এতটুকু আর সাযুজ্য নেই। নবাব আলীবর্দী খাঁ, এবং সিরাজউদ্দৌলার সময়ের কিছুই প্রায় অবশিষ্ট নেই এই শহরে। যেটুকু আছে তা কষ্ট করে খুঁজতে হয়। শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা হাজারদুয়ারি থেকে ভাগীরথী তীরে ওয়াসিফ মঞ্জিল, অথবা কাঠগোলা বাগানবাড়ি, কোনোটিই নবাব মুর্শিদকুলি, আলীবর্দী বা সিরাজের তৈরি নয়। যে আশাটুকু বুকে নিয়ে মুর্শিদকুলির ঢাকা থেকে মুখসুদাবাদে ছুটে আসা এবং সুবেদার আজিমুশ্বানের নজরের বাইরে গিয়ে এক স্বতন্ত্র সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা, তা কতটা ফলপ্রসু হয়েছিল, তা নিয়ে আলোচনার যেন শেষ নেই। মুর্শিদকুলীর পর সুজাউদ্দিন, এবং তারপরে তরুণ নবাব সরফরাজ, নাসিরি রাজবংশের এই ধারাটুকু যদি এখানেই শেষ না হত, তবে হয়তো অন্য মুর্শিদাবাদ সাক্ষী দিয়ে যেত ইতিহাসের। নাসিরির পরে আফসার রাজবংশের আগমন। বারবার রাজবংশের পরিবর্তন হয়েছে মুর্শিদাবাদে। নবাব সরফরাজ খাঁকে গিরিয়ার প্রান্তরে একরকম পর্যুদস্ত করে নবাবী সিংহাসন আদায় করেন আলীবর্দী খাঁ। প্রাসঙ্গিক হলেও সে এক আলাদা প্রসঙ্গ। কিন্তু সেক্ষেত্রেও যে কথাটি উঠে আসে, তা হলো বিশ্বাসঘাতকতা। কেন? সে নাহয় পরে বলা যাবে। কিন্তু মুর্শিদাবাদ পলাশীর সময়েই প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা দেখেছেন এমনটি কখনোই নয়। সেকালে ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্বাসঘাতকতারই৷ তাই পথ চলতে চলতে মুর্শিদাবাদের দিকে তাকিয়ে বারবার সেই বিশ্বাসঘাতকতার কথাই বারবার ঠোক্কর দিয়ে যায়। যে বিশ্বাসঘাতকতা প্রাণ কেড়ে নেয় তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলার, তা অনেক আগেই প্রত্যক্ষ করেছে মুর্শিদাবাদ। বাংলার আকবর আলীবর্দীও কি কখনো ভেবেছিলেন, যে যার নুন খেয়ে বেঁচে থাকা, তারই ছেলেকে আকস্মিক আক্রমণে হত্যা করে ফেলার ফল আর কিছু বছর পরেই যেন হাতেনাতে ফিরে আসবে তারই প্রিয় নাতি সিরাজউদ্দৌলা তথা আফসার রাজবংশের ওপর? এ প্রশ্ন কেন বারে বারে তাড়া করে বেড়ায় মুর্শিদাবাদকে? এসব ভাবতে ভাবতেই খিদে তীব্র হয়ে উঠেছে পেটে। সকাল থেকে তেমন খাওয়াও হয়নি কিছু। অরুণদার সঙ্গে এসব গল্প করতে করতে তাঁরই বাইকের পেছনে বসে বেশ ছুটে চলছিলাম এপার থেকে ওপার। জিয়াগঞ্জবাসী অরুন ব্যানার্জিও বলছিলেন মুর্শিদাবাদ নিয়ে তার ছেলেবেলা থেকে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা। আর আমিও বহিরাগত হলেও কমবেশি ইতিহাসের জ্ঞান নিয়ে সঙ্গত করছিলাম অরুণদাকে। সেই সব কথা বলতে বলতে দুজনে বাইক দাঁড় করিয়ে হাত ধুয়ে বসে পড়লাম রাস্তার ধারে গরম গরম কচুরির লোভে। অসম্ভব সুস্বাদু। মুর্শিদাবাদ ঘুরতে ঘুরতে বারবারই ভেবেছি এখানকার উদারমনা মানুষগুলোর কথা। নবাব নেই, নবাবীয়ানাও নেই, নেই আর অখণ্ড বাংলার রাজধানী তকমাও। তবু বিভিন্নভাবে লড়াই ও সংকট জীবনের প্রতি স্তরে স্পষ্ট হলেও, আতিথেয়তা ও সু-ব্যবহারে তাদের জুড়ি মেলা ভার। গরম আর বৃষ্টির তাপমাত্রা ছিলই। ঘোরতর বর্ষার সময়। ফলে বনেবাদাড়ে সাপখোপের উপদ্রব যে একদম নেই তা নয়। কিন্তু তার মধ্যেই আমাদের ঘুরে চলা। ফলে আমার মুর্শিদাবাদ ভ্রমণের শুরুতেই প্রাসঙ্গিকভাবে উঠে আসে তাঁর নাম। অরুণ দা সফল ইউটিউবার। প্রচুর মানুষ তাঁর ভিডিও দেখে। আর তিনিও যত্ন করে মানুষের সামনে তুলে আনেন মুর্শিদাবাদকে। ধর্মের গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতা বাদ দিয়ে তিনি ছুটে চলেন ইতিহাস ও সংস্কৃতির টানে। আর আমার ছুটে চলা শিকড়ের দিকে। ধর্মের গোড়ামির বাইরে গিয়ে মুর্শিদাবাদে যে নবাবের কথা প্রথম বলতে হয় তিনি আর কেউ নন, মুর্শিদকুলি খাঁয়ের জামাই এবং নাসিরি বংশের দ্বিতীয় নবাব সুজাউদ্দিন খাঁ। তখন তিনি উড়িষ্যার শাসনকর্তা। বাংলা বিহার এবং উড়িষ্যার রাজধানী হিসেবে নবাবের মসনদ তখন মুর্শিদাবাদে। কিন্তু নবাব দ্বারা মনোনীত প্রতিনিধিরাই আলাদা আলাদা করে দায়িত্বভার গ্রহণ করতেন বিভিন্ন প্রদেশের। ঠিক যেমন নবাব সিরাজের বাবা ছিলেন বিহারের প্রাদেশিক শাসনকর্তা বা নায়েব এ নাজিম। সুজাউদ্দিন সামলাতেন উড়িষ্যা শাসনের দায়িত্ব। বাংলার স্বাধীন নবাবের আওতার মধ্যে থেকে সুজাউদ্দিন একরকম স্বাধীনভাবেই উড়িষ্যায় শাসকের ভূমিকা পালন করতেন। কিন্তু মুর্শিদকুলি মৃত্যুর পর বাংলার মসনদের টানে তার মুর্শিদাবাদে ছুটে আসা। তখন নবাব পদের জন্য একটা ঠান্ডা লড়াই চলছে তারই ছেলে বালক সারফরাজ খাঁয়ের সাথে। সরফরাজ বালক হলেও নবাব হওয়ার দাবিদার। দাদু মুর্শিদকুলীর পদে একরকম তারই আসিন হওয়ার কথা। কিন্তু বয়সটাই বাদ সাধলো। নবাব হলেন সুজাউদ্দিন। কিন্তু তাতে ক্ষতি তো দূর, মুর্শিদাবাদ পেল এক নতুন সকাল। যেখানে মুর্শিদ গুলির মত জোর করে হিন্দু বিদ্বেষ দেখানো নেই। যেখানে জমিদার ও সম্ভ্রান্তদের ওপর কর আদায় ও অন্যান্য কারণে অত্যাচার নেই৷ যেখানে আছে ধর্মনিরপেক্ষতা৷ আছে সুশাসন, সুবিচার, আর সমাজের সব স্তরে প্রজাদের সুন্দর এবং সুস্থভাবে জীবনধারণ করবার অধিকার। মুর্শিদাবাদের ইতিহাসে এ সত্যিই এক উল্লেখযোগ্য ক্ষণ৷ আজ আর মুর্শিদাবাদের হৃদয়ে বেছে নেই নবাব সুজা। কিন্তু ইতিহাস আলো করে তিনি সাড়া দেন এক সুস্থির বাংলার। সুজাউদ্দিন এর সময় জিনিসপত্রের দাম এবং যোগানের দিক থেকে সবথেকে ভালো ছিল বাংলার মানুষ। এই সময়টা এক বাক্যে তুলনা করা যায় বাংলার আর এক নবাব শায়েস্তা খাঁয়ের সময়ের সাথে। মুর্শিদকুলি খাঁ এর মধ্যে নিজেকে ঘোড়া মুসলমান প্রতিপন্ন করার যে তীব্র তাগিদ তারা করে বেড়াত, এবং তার থেকেই তার হিন্দু বিদ্বেষের কথা প্রজাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল, মুর্শিদাবাদ কে তার বাইরে নিয়ে আসেন নবাব সুজাউদ্দিন। এমন ধর্মনিরপেক্ষ নবাব আর কস্মিনকালেও মুর্শিদাবাদ দেখেছে কিনা সন্দেহ। বিচারকের আসনেও তিনি সমান পারদর্শী। ধর্ম সেখানে বাধা সৃষ্টি করে না। সুজাউদ্দিন এর কথা বলতে বলতে যেন শেষই হয়ে ওঠে না। কি ছেড়ে কি বলবো তা বুঝে উঠতেই সময় বয়ে যায়। তখন দাঁড়িয়েছিলাম ছায়া ঘেরা আম বাগানের নিচে সুন্দর সাদা পাঁচিল দিয়ে ঘেরা নবাব সুজার সমাধির পাশে। একপাশে সাদা মসজিদ, যা শোনা যায় স্বয়ং নবাবের হাতেই নির্মিত, আর এক পাশে মৌলবী গুরুর মাজার। মাঝখানে শুয়ে আছেন সুজাউদ্দিন। যেমন বিচিত্র তার শাসন ব্যবস্থা আজও তেমন বিচিত্রই তার সমাধিও। এমন উঁচু এবং বড় মাপের সমাধি মুর্শিদাবাদে আর কোন নবাব এরই দেখা যায় না। সুজা ঘুমিয়ে আছেন তোমার প্রিয় রোশনীবাগের মধ্যে। রোশনীবাগের কথা নিশ্চয় বলব। আর বলব নবাব সুজাউদ্দিনের শখ, বিলাস আর বর্ণাঢ্য জীবনের কথা। কিন্তু আজ তার সমাধির পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, তার সাধের রোশনীবাগ আজ শ্রীহীন। তিনি কি সেকথা জানেন? হয়ত জানেন, কিংবা জানেননা। সে উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই দুদণ্ড বসলাম ঘাসের ওপর।