সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ৪)

সুন্দরী মাকড়সা

শহরতলির এ দিকটা এখনও পর্যন্ত অনেকটাই উপেক্ষিত। এখনও কোথাও কোথাও আবাদি জমিতে তরিতরকারি, শাকসবজির চাষ হয়। আর শহর জনসংখ্যার চাপ সহ্য করতে না পেরে নিম্ন আয়ের মানুষদের এদিকটায় ঠেলে দেয়। ফলে আবাদি জমিগুলোর বুকে গড়ে উঠছে জনপদ। অপ্রশস্ত রাস্তার দুপাশে ঝোপঝড়ের মাঝে মাথা তুলছে টিন টালি আর বাঁশের বেড়ার ঘরবাড়ি। ঋষি যে বাড়িটা ভাড়া নিয়েছে, সেটা এ অঞ্চলের প্রাচীন বাড়ি। বর্ধমানের গুশকরা থেকে কোনো একজন রেল কোম্পানির টিকিট পরিক্ষক এসে বাড়িটা বানিয়েছিলেন। শেষে একটা দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ায় বাড়িটা স্থানীয় একজন স্কুল মাস্টারকে দেখাশোনা করার দায়িত্ব দিয়ে ফের গুশকরায় ফিরে যান। এ ঘটনাটা প্রায় তিরিশ চল্লিশ বছর আগেকার। কালেক্রমে সেই মাষ্টারমশাইয়েরও অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটায়, ওর পরিবার এ বাড়ি ছেড়ে টালিনালার ওপারে একটা ভাড়া বাড়িতে চলে যান, সেই থেকে তারা এ বাড়িটাকে মেস হিসেবে ভাড়া দিতে শুরু করেন। ঋষি সেই মেসবাড়ির পাঁচজন ভাড়াটিয়ার একজন।
এদিকটায় এখনও রাতের বেলা শেয়াল, ভাম বেড়ালেরা ছোটখাটো শিকার ধরে বেড়ায়। এবাড়ির মুরগিটা ও বাড়ির ছাগল বা বাছুরটার রক্তাক্ত শরীর মাঝেমধ্যেই অর্ধভুক্ত অবস্থায় এদিকওদিক পড়ে থাকে। হয়তো সেরকমই কোন অভাগা আজ ঝোপের আড়ালে প্রাণ দিলো।
বৃষ্টিটা হয়ে যাওয়ায় একটু যেন শীতশীত ভাব। ঋষি এসিটাকে কুড়ি থেকে চব্বিশে দিয়ে নবকল্লোলের পূজাবার্ষিকীটাকে টেনে নিয়ে গায়ের ওপর একটা হালকা চাঁদর টেনে দিয়ে বইটাকে চোখের সামনে মেলে ধরতেই একটা পুরোনো ছেঁড়া খাতার পাতার টুকরো ওর বুকের ওপর ঝরে পড়লো।
কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে শরীরটাকে আধাশোয়া করে, বিবর্ণ, হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজের টুকরোটাকে বিছানার চাদরের ওপর মেলে ধরলো ঋষি। প্রায় মুছে যাওয়া হাল্কা নীল রঙের কালিতে কাগজটার গায়ে একটা লাইন লেখা রয়েছে। অনেক কষ্ট করে লেখাটাকে উদ্ধার করলো ঋষি।
–” তুমি ভেবো না, আমার সংসারকে… ”
ব্যাস, এটুকুই লেখা রয়েছে ছোট্ট টুকরোটাতে। কাগজটাকে মেঝেতে ফেলে দিলো ঋষি। কিন্তু সাথে সাথেই ওর মনে হলো — এতো পুরোনো একটা কাগজের টুকরো হঠাৎ ওর নতুন কেনা শারদীয়ায় এলো কীভাবে? ফের কাগজটাকে মেঝে থেকে হাত বাড়িয়ে কুড়িয়ে নিলো ঋষি।

ক্রমশ…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!