সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৩৩)

আমার মেয়েবেলা

কলেজ

জীবনের কোন একটা সময় অজান্তেই কোন না কোন ভুল হয়ে যায়। না বুঝে না জেনে কিভাবে যেন সেই মারাত্মক একটা ভুল আজীবন তাড়া করে বেড়ায়। আঙুল তুলে অস্বস্তিতে ফেলে দেয় কোন এক একলা জেগে থাকা রাতে। কিংবা মনখারাপের সর্বসান্ত হয়ে যাওয়া ভেজা ভেজা দুপুরে! সেখানেও কী পরিস্কার থাকা যায়? একটা আপাদমস্তক মনখারাপে মোড়া একটা অপরাধ বোধ বুকের ভেতরটা কেমন খচখচ করে না?

                         কার না হয়? আমাদের সবারই প্রায় হয়। কেউ বোঝে কেউ কেউ আবার না বোঝার ভান করে ভোলার চেষ্টা করে। কিন্তু ভোলা কী যায়? না জেনেই আমরা ছোট থেকে বড়ো বেলা পর্যন্ত কোন না কোন ভুল করেই থাকি। সে যতই মেপেজুপে চলি না কেন। ভুল আমাদের হয়েই যায়। 
                         আজ সে রকমই একটা ভুলের কথা বলব। আমার জীবনেও এমন একটা ভুল আছে। আর তার জন্যও আমার নিজের কাছে নিজেকে বড্ড ছোট লাগে। মনে হয় এখন এত সাহস দেখাচ্ছি। তখন যদি একটু বুঝতে পারতাম,,,

যাক্ গে । আজ সে কথাই বলব।
কিন্তু সত্যিই আমার সেভাবে কোন দোষই ছিল না। দোষ ছিল। কিন্তু আমি যে অন্যায় করছি সেটা বোঝার মতো সেই ম্যাচুইরিটিটা আমার তখন আসেনি। সেভাবে দেখলে কলেজ গার্ল হিসেবে আমি তখন বেশ ছোটই ছিলাম।
না আমি নিজেকে জাস্টিফাই করছি না। অন্যায় তো আমার হয়েই ছিল। কিন্তু তখন আমি এতটাই ছোট ছিলাম যে সেই অন্যায় কাজটা আমার অন্যায় বলে মনেই হয় নি। আমি মাত্র ষোল বছর ছ মাস বয়েসে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করি।
#####
আমি তখন কলেজে পড়ি। পড়ি মানে সবে ঢুকেছি।
ঠাকুমার বাড়ি থেকেই পড়ছি। ফরাক্কায় তো কলেজ নেই। তাই বাবা অন্য কোথাও না পাঠিয়ে জঙ্গীপুর কলেজেই ভর্তি করে দিল। মেয়ে মা বাবার কাছে থাকবে। দাদা ভাই বোন বৌদি দের তত্ত্বাবধানে থাকবে, জবরদস্ত শাসনেও থাকবে।
চিরকাল আমি অসম্ভব শাসনে থেকেছি। তাই আমার কাছে শাসনের মধ্যে থাকাটা এমন কিছু আলাদা মনে হয় নি। আমাদের বাড়ির তখন খুব নাম ডাক। (এখনও আছে)আমি জানতাম আমি কতটা পর্যন্ত ছাড়্ পাবো। বা কতটা এগোলে আমার বাড়ির মান সম্মান বজায় থাকবে। তাই সেভাবে আর এমন কোন কাজ করিনি যে আমার জন্য কারোর মাথা হেঁট হয়ে যায়।
সেই সময় আমার জ্যেঠা কাকাদের খুব প্রতিপত্তি। এক ডাকে সবাই চেনে। কলেজ থেকে সিনেমা দেখতে গেলে অর্ধেক সিনেমা দেখতে না দেখতেই বাড়িতে খবর চলে যেত। একদল মহিলা পুরুষ ছিলেন যাদের বাইরের খবরে বেশি কৌতূহল ছিল। অবশ্য এখনও আছে। যাইহোক বাড়িতে খবর আসলে সেটা ঠাকুমা দাদুর কাছে চলে যেত। তারপর সেই খবর হাত ঘুরে বাবার কাছে এবং শেষে মায়ের কাছে এসে তবে শান্তি পেত। আমি হয়তো তখন সবে হল থেকে বেড়োচ্ছি। ফোন ছিল না। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে খবরটা কি করে যেত বুঝতে পারতাম না।
যখন মাধ্যমিক পরীক্ষা দেব তখনই বাবা সারা মাসের একটা টিকিট কেটে এনেছিল। অঙ্ক করে করে তার মেয়েটার যদি মাথা খারাপ হয়ে যায় তার দায়িত্ব কে নেবে?
তখন আমার খুব চাপ যে করেই হোক অঙ্কে আমায় পাশ করতেই হবে। পাশ না করি অন্তত কুড়ি পেলেও চলবে বাকিটা ভৌত বিজ্ঞান আর জীবন বিজ্ঞানে ম্যানেজ করে নেব। আমাদের সময় গ্রুপে পাশ করলেই হল। কিন্তু সব সাবজেক্টেই মিনিমাম কুড়ি পেতেই হবে। উফ্ কী যে অসহনীয় দিন গেছে আমার! আমি প্রি টেস্টে পেয়েছিলাম ৯। আর টেস্টে অনেক অঙ্ক করে পেলাম ৭।
পুতুল খেলা বন্ধ, গান বন্ধ, গঙ্গায় ঝাঁপাঝাঁপি তাও বন্ধ। সকালে ফুল তোলা বন্ধ। এই এটাই কিন্তু আমার কাছে খুব কষ্টকর ছিল। ফুল তোলা মানে কি শুধুই ফুল তোলা? তার সঙ্গে পাখির ডাক। বিশেষ করে ঘুঘূ টিয়া ময়না চড়াই আর গরমে কোকিল। ভিজে ঘাসে পা ভেজানো, চারিদিকে কুয়াশায় মোড়া একটা ভালো লাগার আলো আঁধার, ফুলের গন্ধ, গাছেদের মাথা দোলানো আর
গাছের ডালে বসে পা ঝুলিয়ে দোল খাওয়া।
এই দোল খেতে খেতেই কতবার পড়ে গেছি। হাত মট্ হয়েছে। মা পিঠে দুমাদ্দুম কিল মেরে কাঁদতে বসেছে। এত হাত পা ভাঙা মেয়ের বিয়েই হবে না হয়তো।
ঠাণ্ডা মাথার বাবা সাইকেলের সামনে বসিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যেত সাঁই সাঁই করে। বাবার নিঃশ্বাসটা আমার কাঁধে, মাথায় এসে পড়ত। তাড়াতাড়ি নিয়ে যাওয়ার জন্য খুব জোরে সাইকেল চালাতে হত বাবাকে। বাবার কষ্টের কথা ভেবেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতাম। আর বাবা ভাবত আমার হাতে ব্যথা করছে।
কোনদিন বাবাকে বলিনি বাবার কষ্টে আমার কষ্ট। বাবার দুঃখে আমিও দুঃখিত। আবার বাবার সুখেই আমি সুখী। বাবাকে বলাই হয় নি। বলাই হল না। এত তাড়াতাড়ি এত অকস্মাৎ চলে গেলে যে অনেক কথাই বাকি রয়ে যায়। যেগুলো আর কোনদিন কাউকেই বলা হয় না। আসলে বলা যায় না। বাবার মতো অমন কেউ হয় না যে।
যা বলছিলাম,, কোন সময় প্লাস্টার হত কোন সময় হতো না। প্লাস্টার হলো কি হলো না সেটাও একটা বড়ো ব্যাপার ছিল। যেন মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোচ্ছে। আসলে প্লাস্টার মানে বড়ো কিছু হয়েছে। মানে হাতটা ভালোই ভেঙেছে। মা রান্না বন্ধ করে বাইরে হানটান্ করছে। তখন তো ফোন ছিল না। কোয়ার্টারের সামনে বাগানটায় দাঁড়িয়ে থাকত বাগানের গেট ধরে। কোন কাকু সাইকেল করে গেলেই বলত। দাদা মামনি কে নিয়ে ওর বাবা হাসপাতালে গেছে একটা খবর নিয়ে আমাকে বলবেন? আমার মেয়েটার হাতে প্লাস্টার টাস্টার হল কিনা। বড্ড চিন্তা হচ্ছে। তখন কার মানুষ জন ও কেমন আলাদা ছিল। বলত আমি যাচ্ছি বৌদি। চিন্তা করবেন না। খবর নিয়ে আসছি। কোন সময় সেই কাকু নিজে আসত। আবার কোন সময় হয়তো আর একটা কাকুকে বলে দিত। ঐ কাকু তখন হয়তো আমাদের রাস্তার দিকে আসছে। কোন না কোন ভাবে খবর চলেই আসতো। বাবা কোন কোন সময় একা যেত না। পাড়ার কোন কাকু বা বাবার বন্ধুও যেত সঙ্গে। আমাদের সময় কোন বিপদাপদে বাবা মা কেই যে উপস্থিত থাকতে হবে তার কোন মানে নেই। পাড়ার কোন কাকু বা কাকিমা থাকলেই হত। তারাই ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজ উদ্ধার করত। আমরা সেই সময় নিজের পরের হিসেব জানতাম না। সবাই সবাইকে আমরা আত্মীয় সমান ভাবতাম। তাইতো এত বছর পরও কোন কাকিমার কাছে গিয়ে বলতে পারি ভাত দাও তো কী রান্না হয়েছে বাড়িতে? খিদে পেয়েছে খুউব। কাকু কাকিমারাও বলতে পারে মামনি আজ কিন্তু আমার কাছে দুটি খাবি। যা রান্না হয়েছে তাইইই খাবি। আমার ও খেতে অস্বস্তি হয় না তাদের ও খাওয়াতে কোন কার্পণ্য থাকে না।
বলতে বলতে মনে পড়ে গেল এমন ই এক কাকু কাকিমার কথা। আমার থেকে অনেক ছোট রাজীবের বাবা মা, নির্মল কাকু কাকিমার কথা। নির্মল কাকু আমাকে ছ মাস বয়েস থেকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াত। অফিস যাওয়ার আগে পরে আমাকে কোলে নেবেই। আমি বেশ মোটাসোটা গোলগাল ছিলাম। তখন গোয়ালখোরে থাকতাম। বাবা বা কাকু তখন কেউই কোয়ার্টার পায় নি। নির্মল কাকুর তখন বিয়ে হয় নি। বাবা মা’র সঙ্গেই থাকত। মায়ের রান্নাই খেত। তখন সতী কাকু বলে আর এক কাকুও থাকত।
শুনেছি আমি নাকি গোলগাল নাক চেপটা একটা আলুর পুতুলের মতো ছিলাম। আমাকে কোলে না নিয়ে কী পারে? মায়ের কাছে শুনেছিলাম অনেকের হাত ব্যথা হয়ে যেত। এমনই মোটা ছিলাম আমি।
যাক্ সে কথা। যা বলছিলাম এই অঙ্ক অঙ্ক করে আমি একেবারে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। এস আর জি স্যার বলেছিলেন অঙ্কে কম্পার্টমেন্টাল পেলে আরও অঙ্ক করতে হবে। ওরে বাবা তা কী করে সম্ভব?
তাই সব বন্ধ করে শুধু কুড়ি টা নম্বরের জন্য আমি আমার সমস্ত সখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে ছিলাম।
সে সময় ফুল তোলা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বলে তার সঙ্গে সঙ্গে অনেককিছুই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফুলের মালা গেঁথে শিব ঠাকুরের গলায় পরানো হত না। ফুলেদের গায়ে হাত বুলোনো হত না। ঘাসের উপর পড়ে থাকা শিশির বিন্দু হাতের চেটোতে রেখে খুব কাছ থেকে দেখা হত না। সকালে গলা সাধা বন্ধ। ভৈরব রামকেলীরা অপেক্ষা করে কবে আমার পরীক্ষা শেষ হবে। বিকেলে সাইকেল চালানো বন্ধ। হাতটাত ভেঙে গেলে পরীক্ষার সময়। সে এক অসহ্য অসহনীয় অবস্থা আমার। এরই মধ্যে একদিন বাবা নাচতে নাচতে এসে বলল এবার থেকে রোববার তিনটের শো তে সিনেমা যাবি। টিকিট কেটে এনেছি। এত অঙ্ক করলে পাগল হয়ে যাবি তো। আমার একটা মাত্র মেয়ে।
আমরা কোয়ার্টার এ থেকেছি বলেই হয়তো আমাদের মানসিকতাটা অন্যদের থেকে একটু যেন এগিয়ে ছিল। বাবা অত কুসংস্কারাচ্ছন্ন ছিল না। মা ও তাই । খুব এডভান্স ছিল সেদিক থেকে দেখতে গেলে। আমাকে শাসন করা সেটা আলাদা ব্যাপার। বাদবাকি সব দারুন। মা সেই সময় নাটক করত। আমি মাধ্যমিক এবং হায়ার সেকেন্ডারির পর নাটক করেছিলাম ‘আর যুদ্ধ নয়’ আর ‘শ্রীমতী ভয়ঙ্করী’। এই নির্মল কাকুর সঙ্গেই।
কোন অসুবিধা ছিল না। তাই কলেজে সিনেমা দেখাটা আমার বাবা মা সেভাবে দোষ বলে মনেই করেনি। অন্য সব জ্যাঠা কাকার থেকে আমার বাবা অনেক বেশি ব্রড মাইন্ডের ছিল। নিজেও লাভ ম্যারেজ করে ছিল। লাভ মানে আমার মেশো আমার মাকে দেখতে এসে আমার মাসিকে পছন্দ করেছিল। আর আমার বাবা মেশোর সঙ্গে এসেছিল বন্ধু হিসেবে। এসে আমার মাকে পছন্দ করেছিল। এবং সেই সময় আমার বাবা জাতের বিচার না করে নিজে ব্রাহ্মণ হয়েও কায়স্থকে বিয়ে করতেও পিছপা হয় নি। এই নিয়ে অনেক জল ঘোলা হয়েছিল। সে যাক। বাবা তাই আমার বিয়েতেও কোন আপত্তি করেনি। আমার সিংহ মশাই ব্রাহ্মণ না হওয়া স্বত্তেও।
সিনেমা দেখা নিয়ে আমাকে বা আমার ছোট পিসিকে কেউই খুব একটা চাপে রাখতে পারে নি। আমি খুব ছোট থেকেই স্বাধীনচেতা মনোভাবের ছিলাম। আমার একটা স্বাধীন চিন্তা ভাবনা ছিল এবং কারোর দ্বারা কোন ভাবেই খুব একটা প্রভাবিত হতাম না আমি। আলটিমেট নিজের যেটা মনে হত সেটাই করতাম। এই মানসিকতার জন্য আমাকে সেই সময় এবং পরবর্তীতে খুব অসুবিধায় পড়তে হয়েছিল। আসলে মেয়েদের লাই দেওয়া মানে মাথায় চড়িয়ে ফেলা। কোন সমাজে এবং কোন সময়েই সেটা গ্রহণযোগ্য ছিল না। আজ ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর উপস্থিতি টের পেয়ে কষ্ট পাই। দুঃখিত হই। চোখের জল মুছে স্বাধীনতার জন্য লড়ে যাই। এই বয়েসে এসে একটা কথা আমি পরিষ্কার বুঝেছি মেয়েদের স্বাধীনতা দেওয়ার মতো মানসিকতা এখন ও সবার মধ্যে গড়ে ওঠে নি। সে শিক্ষিতই হোক আর অশিক্ষিতই হোক। সেটা কোন ম্যাটারই করে না। সব থেকে বড়ো কথা এটা যেন শিক্ষিত মানুষের মধ্যেই বেশি দেখি। লাই যারা দেয় বাধ্য হয়েই দেয়। মন থেকে নয়।
কারন এখন মেয়েরা স্বাবলম্বী হয়েছে। নিজের টা নিজেই সামলে নিচ্ছে। নিজের জন্য বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনছে। এখন লাই দিতে বাধ্য। জানে স্বাধীনতা না দিলে মেয়েরা আর থাকবে না। বড্ড খারাপ লাগে ভেবে। মেয়েদের এতটা কঠিন পদক্ষেপ কেন নিতে হবে।
যাক্ গে এসব যত ভাববো তত ই কষ্ট পাব। যুগ বদলাচ্ছে। বদলাবে। আর মেয়েরাই পারবে সেটা বদলাতে।
অনেক এদিক ওদিক কথা হল। আমি ফিরে যাই আমার কলেজ জীবনে,,,
ক্রমশঃ

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!