শ্রীরামপুরের কথা
প্রতিযুগেই কর্মবীরদের জন্ম হয়। ছোট্ট সময়কালের একটি জীবনে তাঁরা সম্পন্ন করে যান মনে রাখবার মত অসামান্য সব কাজ। রেভারেন্ড ডাঃ উইলিয়াম কেরী তেমনই একজন ভারতীয় কর্মবীর। হ্যাঁ, ভারতীয়ই। কারণ বিলেতে জন্মেও তিনি ছিলেন আদ্যোপান্ত বাঙালী। ৭৩ বছরের জীবনকালে তাঁর করে যাওয়া সমস্ত কাজের সুফল আজও অনুভব করে চলেছে বাংলা। ভারতে আসবার জন্য জাহাজে ওঠবার আগে যে ব্যক্তি সদ্য প্রতিষ্ঠিত মিশন থেকে ৬০০ পাউন্ড হাতে পান, এদেশে পৌঁছে মালদায় নীলকর হিসাবে ১৬২৫ পাউন্ড ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে ৪৫০০০ পাউন্ড উপার্জন করেন, সেই ব্যক্তিকে শেষ জীবনে ছোটছেলে জাবেজকেরীর জন্য রেখে যেতে হয় শূন্যহাত। মৃত্যুর পর নিজের শখের লাইব্রেরী বিক্রি করে সেই টাকা পুত্র জাবেজকেরীকে দেবার ইচ্ছে প্রকাশ করা ছাড়া আর কোনও উপায় থাকে না তাঁর হাতে। কারণ মানুষের জন্য করতে করতেই তিনি হন কপর্দকশূন্য। ঠিক মৃত্যুর কয়েকদিন আগে একটি উইল চিঠি লেখেন তিনি। নিজের সমস্ত ইচ্ছেগুলোকে একটানে লিপিবদ্ধ করে ফেলেন কাগজে। শ্রীরামপুরে নিজহাতে তিল তিল করে গড়ে তোলা কলেজ ও মিশনের সমস্ত সম্পত্তির ওপর থেকে সরিয়ে নেন নিজের স্বত্ব আর অধিকারকে। কলেজের মিউজিয়ামে একটু একটু করে রাখা দুস্প্রাপ্য সব উদ্ভিদ, শাঁখ, প্রবাল, কীটপতঙ্গ জড়ো করা ছিল তাঁর শখ। চিঠিতে স্পষ্ট করে উল্লেখ করেন সেই সমস্ত কিছুর ওপর কেবলমাত্র কলেজ ও ছাত্রদের স্বত্বের কথা। কলেজ প্রতিষ্ঠার পিছনে আর একজন পৃষ্ঠপোষকের নাম না করলেই নয়। তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংস। একথা অস্বীকার করবার উপায় নেই যে শ্রীরামপুরের ড্যানিশ গভর্নর কর্নেল ক্রিফটিং আর হাজার দোষ থাকলেও কলকাতার ওয়ারেন হেস্টিংস কেরীসাহেবের কলেজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে সুগম করে দেন। দুই প্রশাসনিক প্রধানকেই প্রথমে কলেজ কাউন্সিলের গুরুত্বপূর্ণ সভ্য হিসাবে যুক্ত করা হয়। হেস্টিংসের থেকেও কিছু মূল্যবান ব্যক্তিগত বইয়ের স্বত্বত্যাগের কথাও কেরী উল্লেখ করেন তাঁর সেই চরমপত্রে। তিনি লেখেন –
‘লর্ড হেস্টিংস আমাকে যে উদ্ভিজ্জতত্ত্বের পুস্তক উপহার প্রদান করিয়াছিলেন তাহা ও টেলরের লিখিত হিব্রূ ভাষার পুস্তক এবং মদ্ সংগৃহীত বিদেশীয় ভাষার বাইবেল গ্রন্থসমূহ ও ইটালী জর্ম্মান প্রভৃতি ভাষার পুস্তকাবলী যাহা আছে, তাহা আমি অত্র পত্র দ্বারা শ্রীরামপুর কলেজকে নিঃস্বার্থভাবে অর্পণ করিলাম’। এর পরেপরেই কলেজভবনের মধ্যে নিজের ঘরে অসুস্থ হয়ে পড়েন বাংলার নবজাগরণে অন্যতম পথিকৃৎ দেশবরেণ্য কেরীসাহেব। খবর পৌঁছে যায় দিকে দিকে। খবর যায় কলকাতাতেও। বেশ কয়েকদিন অসুস্থ থাকবার পরে কথা বলতে পর্যন্ত অসমর্থ হয়ে পড়েন তিনি। তখন তাঁর পাশে নিয়মিত হাজির হতেন নিত্যসঙ্গী মার্শম্যান সাহেব। একসময়ে সারা বাংলা দাপিয়ে বেড়ানো বাঙালীদরদী রেভারেন্ড ডঃ উইলিয়াম কেরীর এই শারীরিক অক্ষমতা ও অসহ্য কষ্ট চোখের সামনে দেখার উপযোগী রইল না নিকটজনেদের। যীশুর কাছে তাঁর জন্য প্রার্থনা করা ছাড়া আর কিছুই করবার নেই কারো। শেষদিনটি অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করবার পর শ্রীরামপুর তথা সমস্ত বাংলাকে শোকে ডুবিয়ে ১৮৩৪ সালের ৯ই জুন সমস্তকিছুর মায়া ত্যাগ করে পরলোকে যাত্রা করেন তিনি। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী একেবারে আড়ম্বড়হীন ভাবে তাঁর সমাধি নির্মাণ করা হয় মিশনারীদের জন্য ধার্য করা সমাধিক্ষেত্রে। শহরের সমস্ত মানুষের চোখের জলে শেষ হয়ে যায় শ্রীরামপুরের একটি উজ্জ্বল আর প্রাণবন্ত অধ্যায়ের।
তাঁর মৃত্যুর পর ট্রাস্টিবোর্ডের সদস্যরা তাঁর ইচ্ছা অনুসারে লাইব্রেরীটি ১৮৭ পাউন্ড ১০ শিলিং মূল্যে বিক্রি করে সেই অর্থ পুত্র জাবেজ কেরীকে দান করেন।
কেরীসাহেবের মৃত্যুর বহু আগেই তাঁর প্রধান সহযোগী পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কার ইহলোকের মায়া ত্যাগ করেছিলেন। রামমোহনের আগে বিখ্যাত বাঙালীদের নিয়ে বলতে গেলে এই স্কলারের অবদান ভোলবার নয়। তিনি ১৭৬৩ সালে মেদিনীপুরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সংস্কৃত শিক্ষায় শিক্ষিত এই অসামান্য পণ্ডিত প্রায় সমস্ত জীবন শ্রীরামপুরের মিশনারীদের জন্য ব্যয় করে গেছেন। কেরীসাহেবের অনুরোধে মিশন প্রেস থেকেই লিখেছেন রাজাবলি, প্রবোধচন্দ্রিকার মতো একাধিক বই। প্রথম দিকে কলকাতায় সুপ্রীম কোর্টে অনুবাদকের কাজে বহাল হলেও পরে ওয়েলেসলী প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগে অধ্যাপনা করেন তিনি। সেখানেই প্রথম পরিচয় কেরীসাহেবের সাথে। তারপর তাঁর কলকাতা থেকে শ্রীরামপুরে আসা। তখন হিন্দুসমাজ আজকের মতো উদার ভাবাপন্ন ছিল না। সনাতন প্রচলিত ভাবধারার এদিক থেকে ওদিক হলেই বসে যেত শালিসিসভা। একপাশে সমাজের মাথা ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা, আর অন্যপাশে সাধারণ জনগণ। এমনকি খ্রীষ্টান মিশনারী কতৃক ছাপা বই কেউ ছুঁয়ে ফেললেও গঙ্গাস্নানের বিধানের কথা আগেই বলেছি। তৎকালীন বাংলার অন্যতম পণ্ডিত হয়েও উদার মনের মৃত্যুঞ্জয়কে এহেন গোঁড়া সমাজের সমাজপতি ব্রাহ্মণরা যে ভালো ভাবে নেবেন না, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। হতোও তাই। মিশনারীদের পক্ষ নিয়ে সবসময় কথা বলার জন্য বারবার হিন্দুসমাজের আক্রোশের মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। তবুও কেরীসাহেবের হাত ধরে সতীদাহ বা গঙ্গায় শিশু বিসর্জনের মতো নৃশংস প্রথার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে দুবার ভাবেন নি তিনি। বাংলা গদ্যসাহিত্যে তাঁর কথ্যভাষায় লেখা রচনাগুলো আজও সম্পদ। রাজাবলি গ্রন্থে কলিযুগের প্রথম থেকে ইংরেজ আসার আগে পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য রাজাদের কাহিনী সহজ গদ্যভাষায় লিপিবদ্ধ করেন তিনি। এছাড়াও হিতোপদেশ ও বত্রিশ সিংহাসন বাংলায় অনুবাদ করা তাঁর কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম। মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কার, রামরাম বসুরাই কর্মবীর কেরীর আসল স্তম্ভ। শ্রীরামপুরের প্রতিটি পুরনো ইট আজও এঁদের পবিত্র স্মৃতিকে যত্ন করে বুকে ধরে রেখেছে।