অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ২)

আরণ‍্যক বসুর রোমান্টিক ও সবুজে সবুজ ধারাবাহিক উপন‍্যাস

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

পাগলা বলে ডাকি তোকে
ক্ষ‍্যাপা’ রে তোর গানে —
অঘ্রাণে ধান উঠবে হেসে
খেজুর রসের টানে

অমলেন্দু বিন্দাসকে বললো — এবার তোমার গানটা হোক । আরো দু’কাপ চা খাইয়ে দেবো। বিন্দাসকে আর বলতে হলো না । ও এবার হাত-পায়ের খিল ছাড়িয়ে , সটান দাঁড়িয়ে উঠে ধরলো —
হায়রে , শিমুলের তুলা যেমন বাতাসে ওড়ে গো , তুমি তেমনি উড়াও আমার প্রাণ , কইন বা দ‍্যাশে রইলা রে ও দয়াল, দয়াল তোমার লাগিয়া যোগিনী সাজিব , আমি সঁইপা দিব গো এ পরাণ …

আরও এক কাপ চা খেয়ে ,
ক্ষ্যাপা বিন্দাস সমবেত জনতাকে বললো– আরেকটা গান ধরি ? বলেই কারও সম্মতির তোয়াক্কা না করে , পাগল করা সুরে গেয়ে উঠলো –যদি বন্ধুর যাওয়ার চাও , ঘাড়ের গামছা থুইয়া যাও রে , ও বন্ধু কাজল ভ্রমরারে…
কোন দিন আসিবেন বন্ধু, কইয়া যাও , কইয়া যাও রে….
প্রাণ ঢেলে গান গাইছে ক্ষ‍্যাপা বিন্দাস , আর ভাবছে স্যারের পকেট থেকে দশ বিশ টাকা উঠে আসবে ঠিক । এরকম গোটা কতক ঠেক আছে , তাতেই , আর ফসলের মাসে কলাটা মূলোটা এলেই , একার সংসার ঠিক চলে যায় ।
হঠাৎ স্মার্ট ফোনটা বেজে উঠলো । অমলেন্দু এই সময়টা কারোর ফোন ধরে না , কাজের ফোন ছাড়া । কিন্তু আজকে স্ক্রিনে যখন ভেসে উঠলো কলকাতার সাংবাদিক , প্রিয় বন্ধু মেঘলার অবয়ব , তখন অ্যাভয়েড করতে পারলো না । বরং বেশ গুছিয়ে বসলো অমলেন্দু । ও প্রান্ত থেকে মেঘলা বলছে– এটা কাজের সময় জানি ,তবু তোকে এই সময় ফোন করতে ইচ্ছে করলো রে । সামনের মাস মানে ডিসেম্বরের প্রথম রোববার , ঝাড়গ্রামে আসতে পারবি ? আগের থেকে সব কাজ গুছিয়ে রাখ । সেদিনটা কিন্তু রাতে আমাকে ওখানেই থাকতে হবে । অনেক নতুন ছেলেমেয়ে আসবে বেলপাহাড়ি, ফুলকুশমা , মেলেডা,আরও নানা জায়গা থেকে। দারুণ ব্যাপার ! তুই কবিতার নির্মিতি ও কবিতা বলার প্রয়োগের ওপরে , একটা ছোটোখাটো ওয়ার্কশপ নিবি । তারপর কবি সম্মেলন। শেষে আমাদের আড্ডা । অমলেন্দুর সেই এক স্বভাব…বলে দিতে পারতো যে , যাবো না। কিন্তু সেটা পারলো না। বল তুই কখন ফ্রি আছিস ? রাতের দিকে ?
ও প্রান্ত থেকে ভেসে এলো– রাতের বেলা তোর গলার আওয়াজ শুনলে আমার পাগল মন পুরোনো টেলিফোনের মতো ঝনঝন করে ওঠে , সংসার ত্যাগ করে চলে যেতে ইচ্ছে করে…
এই , কে এক ব‍্যাটা উদার গলায় এত সুন্দর গানটা গাইছে রে ? একটু কাছে ডাক তো। বিন্দাস গেয়ে চলেছে ..বটবৃক্ষের ছায়া যেমন রে , মোর বন্ধুর মায়া তেমন রে , ও বন্ধু কাজল ভ্রমরারে… কোন দিন আসিবেন বন্ধু কইয়া যাও , কইয়া যাও রে …
গানটা শুনতে শুনতে দারুণ উত্তেজিত গলায় মেঘলা চিৎকার করে উঠলো– একবার দে তো গায়ককে একটু ফোনটা।ফোনটা এগিয়ে দিতেই , সে কী লজ্জা ক্ষ্যাপা বিন্দাসের। যেন কনে দেখা আলোতে , কালো মেয়েটা এলোচুলে চুপ করে বসে আছে । অথচ , বরপক্ষ তাকে পছন্দ করে নিয়েছে । মেঘলা কোনো ভূমিকা না করে বিন্দাসকে বললো– শোনো , তোমার দাদা , বন্ধু যাই বলো ,তার সাথে একবার তোমাকে সামনের মাসের প্রথম রোববার ঝাড়গ্রামে আসতেই হবে। সারাদিন হইচই পিকনিক। তোমার গান শুনবো । তুমি কি শুধু কষ্টের গান গাও ? আনন্দের গান গাও না ? বিন্দাস এবার পুরো খাপখোলা তলোয়ার হয়ে গেলো।
বললো — সেদিন শোনাবো। যদি নিয়ে যায় , তবে অনেক গান শোনাবো। এই গানটা শুনেছো দিদি ? বলেই লাফিয়ে উঠে ফোনটা অমলেন্দুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঘুরে ঘুরে গাইতে লাগলো — নাগর আমার কাঁচা পিরিত পাকতে দিলো না , গা-গতরে সোনার সোহাগ মাখতে দিলো না , নাগর আমার কাঁচা পিরিত পাকতে দিলো না । দু’বন্ধু ফোনের দুপ্রান্তে হেসে কুটোপাটি খাচ্ছে । তারই মধ্যে মেঘলা বললো , দে তো আবার …কিন্তু ক্ষ্যাপা বিন্দাস কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে , বলে উঠলো– কেমনধারা বন্ধু গো তোমরা দিদিভাই ? নিজেরা সংসার করছো আর এই বেচারা , পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে শুধু বুড়ো কাত্তিক হয়ে রয়েছে । কি করে ? না , হাতির খবর নেন । আহা ! সারাদিন জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় স্কুটি নিয়ে ,আর হাতির নাদ দেখে , দাঁড়িয়ে পড়ে । ছ‍্যাঃ , এটা একটা জীবন ? মেঘলা বললো– আমি তো দূরে থাকি ভাই , ঠিক আছে , ঝাড়গ্রাম গিয়ে ওর একটা ব্যবস্থা করা যাবে। তোমারও ব্যবস্থা করবো। ক্ষ্যাপা বিন্দাস হো হো করে হেসে উঠলো — ও দিদিভাই , আমার সাধন সঙ্গীর অভাব নেই গো। বনদেবতা কাউকে না কাউকে জুটিয়ে দেন। এখন তো ধীরে ধীরে শাল জঙ্গলের পাতা ঝরে যাবে । মাসের শেষে লালনের উৎসব । সেখানে কিন্তু তোমাদের আসতে হবে ।
সেই নদীয়ার আসাননগরে। তোমরা দুই যুগল মূর্তিতে যাবে , কেমন ?
মেঘলা উত্তর দিলো — তুমি তোমার দাদাকে বোলো , আমি আবার রাতে ফোন করবো। পাগলা বিন্দাস হইহই করে আরেকটা গান ধরলো–
লাল নীল সবুজের মেলা বসেছে , লাল নীল সবুজের মেলা রে…
আয় আয় আয়রে ছুটে খেলবি যদি আয় , নতুন সে এক খেলা রে…

ক্রমশ

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!