সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৩৬)

কেল্লা নিজামতের পথে
মুর্শিদাবাদে ঘুরে ঘুরে সিরাজ চরিত্র অনুধাবন যেন প্রতি মুহূর্তে খুলে দেয় নতুন নতুন এক একটা জানলা। কত তার রং। কত তার বৈচিত্র। একজন তরুণ যুবরাজ দাদুর ছত্রছায়ায় মানুষ হয়েও কিভাবে সমস্ত অভিজ্ঞ এবং নবাবহিতৈষী মানুষগুলোর কাছে ভিলেনে পরিণত হলেন তা সত্যিই ভাবায় বারবার। দাদুর মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেই তার প্রথম চোখ পড়ে ইংরেজ অধ্যুষিত কলকাতা শহরের দিকে। নতুন শহর কলকাতা। সাধ করে ইংরেজরা একটু একটু করে বানিয়েছে তার সবটাই। ১৬৯০ সাল থেকে জব চার্নকের হাত ধরে এক গণ্ডগ্রাম পরিণত হয়েছে বিশাল নগরীতে। তাই কলকাতার ওপর ইংরেজ কোম্পানির এক স্বাভাবিক প্রবল আসক্তি। কলকাতা থেকেই তাদের ঠিকমতো ব্যবসার সূত্রপাত। আর সেই আলীবর্দী খাঁর আমল থেকেই নবাবের চোখে ধুলো দিয়ে নিজেদের শহরকে নিরাপদ এবং শক্তপোক্ত করে গড়ে তুলতে এতোটুকুও কার্পণ্য করেনি তারা। কিন্তু বিদেশি বণিকদের কোনদিনই ভালো চোখে নেয়নি মুর্শিদাবাদ। আর সেই বিরোধ একেবারে চরমে ওঠে নবাব সিরাজের সিংহাসন লাভের পর। নিজেকে নবাব ঘোষণা করার পর প্রথমেই তিনি চিঠি পাঠান কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের প্রধান ড্রেক সাহেবকে। নবাবের চিঠি নিয়ে ফেরিওয়ালার ছদ্মবেশে কলকাতা শহরে প্রবেশ করেন নবাব দরবারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী রামরাম সিংহ। একসময় তিনি হয়েছিলেন মেদনীপুরের ফৌজদার। কলকাতা পৌঁছে তিনি সাক্ষাৎ করেন ধনী ব্যবসায়ী উমিচাঁদের সাথে। উমিচাঁদ তখন ইংরেজ ঘনিষ্ঠ। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতাতেই রামরাম পৌঁছে যায় ফোর্ট উইলিয়ামের কোতোয়াল ও শাসক হলওয়েল সাহেবের কাছে। তখন নিজের কাজে বারাসাতে ড্রেক সাহেব। ফলে কোম্পানির দ্বিতীয় চিফ ইন কমান্ডার হিসাবে হলওয়েল সাহেব দেখা করলেন নবাবের দূতের সাথে। চিঠির প্রধান বক্তব্য ছিল রাজা রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণবল্লভকে মুর্শিদাবাদের হাতে প্রত্যার্পণের। কারণ নবাবের চোখে ধুলো দিয়ে কৃষ্ণবল্লভ তখন কোম্পানির ছত্রছায়ায় কলকাতায় লুকিয়ে রয়েছেন সপরিবারে। আর বিষয়টাকে প্রথম থেকেই ভালোভাবে দেখেননি তরুণ নবাব। নবাবের চিঠি পেয়েও কৃষ্ণবল্লভকে নবাবের হাতে তুলে দিতে কোনভাবেই রাজি হলেন না হলওয়েল সাহেব। উপরন্তু রামরাম সিংহকে অপমান করে তাড়িয়ে দিলেন দুর্গ থেকে। এই নিয়েই সিরাজ-ইংরেজ দ্বন্দ্বের সূত্রপাত।
যদিও সিংহাসনে বসবার পর মুর্শিদাবাদে নতুন নবাবকে নজরানা ও উপহার পাঠাতে কার্পণ্য করেনি কলকাতার সাহেব কোম্পানি। কিন্তু তাও রামরাম সিংহের বিতাড়ন নবাব নেহাত বাধ্য হয়ে গিলে নেন। তৎক্ষণাৎ কোন বিপত্তি না ঘটিয়ে পরামর্শদাতাদের কথায় শুধুমাত্র চুপ করে যান আশপাশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচার করে। কারণ তখন সবেমাত্র শওকত জঙ্গের সাথে যুদ্ধ শেষ হয়েছে। কিন্তু একেবারে চুপ করে যাওয়ার মানুষ সিরাজউদ্দৌলা নন। ইংরেজ বিরোধীতার যে আগুন তার শরীরে দানা বেঁধেছিল প্রথম থেকেই, তা দাবানলের চেহারা নিতে খুব বেশি সময় লাগেনি তারপর। মুর্শিদাবাদে ঘষেটি বেগমের সাথে একটা ঘরোয়া বিরোধ তো ছিলই। তার ওপর মসনদ লাভের পর ঘষেটিকে মতিঝিল থেকে বন্দি করে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি নিজের কোষাগারে নিয়ে আসতে দুবার ভাবেননি সিরাজ। তার আগ্রাসন এবং অস্থির মস্তিষ্ক তাকে স্থির হতে দেয়নি কোনদিন। তার বিভিন্ন হঠকারী সিদ্ধান্ত ধীরে ধীরে তার কাছের মানুষগুলোকেই এতোটাই দূরে করে দেয় যা পড়ে বুমেরাঙের মত ফিরে আসে তার দিকেই। একদিকে মুর্শিদাবাদের ঘরোয়া বিবাদ আর অন্যদিকে কলকাতায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই, এই জোড়া ফলায় বিদ্ধ হতে হতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে তরুণ নবাব। কিন্তু সিংহাসন যেন তাড়া করে বেড়ায় তাকে।
এদিকে কলকাতায় ড্রেক সাহেব আতঙ্কিত হন নবাবের আচার-আচরণ নিয়ে। কেনই বা হবেন না? সামান্য বিদেশি বণিকের দল দেশের নবাবের আদেশ পালন না করলে তার যে কি ভয়ানক প্রতিআক্রমণ হতে পারে সে ব্যাপারে কোম্পানিও যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। আসলে নবাব কোনোদিনই ইংরেজদের শক্তি আঁচ করতে পারেননি। তাই বারবার অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে সরাসরি ছুটে গেছেন ইংরেজদের পিছনে। যে বণিকদের সাথে দীর্ঘদিন ধরে নিজের তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বুদ্ধি দিয়ে ঠেকিয়ে গেছিলেন নবাব আলীবর্দী খাঁ, তাদের সাথেই মাত্র কয়েক মাস লড়াই করেই চারপাশ থেকে প্রায় হাঁপিয়ে ওঠেন সিরাজ। পলাশীর যুদ্ধ তো মাত্র কয়েক ঘন্টার বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু এই যুদ্ধের পিছনে যে বিশাল রাজনৈতিক পটভূমি ধীরে ধীরে তৈরি হয়, তা সবার আগে বিচার্য। নবাবের এক একটি সিদ্ধান্ত ইংরেজরা কখনোই ভালো চোখে নেয়নি। তারাও নিজেদের প্রস্তুত করেছে ধীরে ধীরে। কলকাতা থেকে তাদের জহুরীর চোখ সরেছে দেশের অন্যদিকে। কিন্তু সবকিছুর আগে যে প্রয়োজন মুর্শিদাবাদের পতন তা তারাও বেশ ভালো করে ঠাওর করতে পারছিল। নবাবকে বশে না আনতে পারলে দেশে রাজদণ্ড বিস্তার কোনদিনই সম্ভব নয় তা তারা জানে। আর তার শুরুটা করা প্রয়োজন বাংলার মসনদ দিয়েই। কারণ তখন মুঘল সাম্রাজ্যের পরিস্থিতি যথেষ্ট টালমাটাল। মারাঠারা অনেকটা দূরে নিজেদের মত ব্যস্ত রয়েছে নিজেদের পরিসরে। এই রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুবিধা তুলতে না পারলে কোনদিনই যে দেশের কর্তৃত্ব হাতে আনা সম্ভব নয় তা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিলক্ষণ বুঝতো। যদিও তাদের পরিচালনা করা হত লন্ডনের প্রধান অফিস থেকে। নিয়ামক সংস্থা সেখানেই। কিন্তু স্থানীয় সিদ্ধান্তে তারা খুব একটা নাক গলাতো না। এদেশে আসার পর অনেক লড়াই করতে হয়েছে ইংরেজদের। তখনো নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখবার জন্য এই বাংলায় প্রকৃতি, পরিবেশ, মানুষজন, ভাষা সবকিছুর সাথেই তাদের লড়াই অব্যাহত। তার মধ্যেই নবাবের সঙ্গে নিত্য দ্বন্দ্ব। সবকিছু মিলেমিশে কোম্পানির পরিস্থিতিও মসৃণ নয় কখনোই। তাই নবাবের মত শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এক একটি পদক্ষেপ যে কিভাবে নিজেদের দিকে ফিরে আসতে পারে তা তাদের কাছেও অজানা নয়। তার মধ্যে ফরাসীদের সঙ্গে যুদ্ধ তো আছেই। ইউরোপে ইঙ্গ ফরাসি যুদ্ধের প্রভাব তখন বাংলার মাটিতেও স্পষ্ট। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফরাসিদের রুখতে আলাদা করে সৈন্যও চেয়ে রেখেছে লন্ডনের কাছে। সবকিছু মিলে এখানে তাদের লড়াইও অনেক। তার মধ্যে বিলেত থেকে অফিসার ও কর্মচারীরা নিত্য আসেন এদেশে, এবং এখানকার পরিবেশের সঙ্গে লড়তে লড়তে কলেরা, ম্যালেরিয়ার মত রোগের প্রকোপে অল্পদিনেই ঠাঁই নেন গোরস্থানে। হালে পানি না পেলেও তবু তারা নাছোড়। হয়ত ব্রিটিশ জাত বলেই। নবাবের বিরুদ্ধে একরকম তারাও নেমেছে কোমর বেঁধে। বিনা লড়াইয়ে কলকাতার মাটি ছেড়ে দিতে তারা কখনোই রাজি নয়। ফলে নবাবের সব আদেশ মেনে নেওয়ার আগে তারা সবসময় দুবার ভাবে। কোন উপায়ে মুর্শিদাবাদকে বিপাকে ফেলা যায় সেটাই তখন তাদের প্রধান চিন্তার বিষয়।