সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৩৯)

কেল্লা নিজামতের পথে
মুর্শিদাবাদের রাস্তাঘাটে আজ ছাপোসা শহরতলির ছাপ। কোন ঔজ্জ্বল্য নেই। নেই কোন জাঁকজমক। এ কথা আগেই বলেছি। সিরাজের কার্যকলাপ বাংলার প্রতিটা মানুষের মনে যে ভয়াবহ বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল তা থেকে সমাজের প্রতি স্তরে ছড়িয়ে পড়তে সময় নেয়নি বেশি। এ যেন ছোঁয়াচে রোগের মত। মহামারীর দাপট। মুর্শিদাবাদের মসনদে বসা থেকেই সকলের সাথে দুর্ব্যবহার ও অসভ্যতা শুরু নবাবের। দাদুর নিজের হাতে তৈরি করা জমি ধরে রাখতে গেলে যে পরিমাণ সংযমী ও শান্ত হওয়া প্রয়োজন ছিল তরুণ নবাব সিরাজের, তার সিকিভাগও চিন্তার মধ্যে আনেননি তিনি। নবাব হওয়ার গল্পটাও আশ্চর্যের৷ উত্থানটাও চমকপ্রদ। কথায় বলে আলালের ঘরের দুলাল। বড়লোক বাড়ির দুলালী ব্যাটার মত তাঁর হাবভাব ছেলেবেলা থেকেই। মুর্শিদাবাদের আনাচেকানাচে তাঁকে নিয়ে কানাঘুষোতেই দিন কেটে যায়। আর তার মধ্যেই আলীবর্দীর মৃত্যু। ফলে মাত্র ২৩ বছর বয়সেই তামাম বাংলা বিহার উড়িষ্যার মসনদে চড়ে বসেন সিরাজ। এ বিষয়ে একটা কথা বলে রাখা ভালো। নবাব কখনোই স্বাধীন পদ নয়। মুঘল আমলে দেশীয় রাজনৈতিক পরিকাঠামোয় নবাব হল বাদশা নিয়োজিত একজন সুবার স্থানীয় শাসক মাত্র। আসলে তিনি দিল্লীর বাদশারই একজন উচ্চপদস্থ আমলা। সেক্ষেত্রে ভারতের স্বাধীনতার লড়াইয়ের সময় থেকে প্রচলিত একটি ভীষণ জনপ্রিয় বাক্যবন্ধ হল “শেষ স্বাধীন নবাব” কোনোভাবেই খাটে না বললেই চলে। নবাব স্বাধীন ছিলেন না কখনোই। তাঁদের প্রধান কাজই ছিল বাদশার হয়ে অঞ্চলভিত্তিক রাজস্ব সংগ্রহে অগ্রাধিকার দেওয়া ও শাসনব্যবস্থার সঠিক প্রয়োগ। ঠিক যেভাবে বাংলার নবাব হবার পর মুর্শিদকুলী খাঁ বাদশাকে প্রায় এক কোটি ত্রিশ লক্ষ টাকা রাজস্ব পাঠিয়েছিলেন। নবাব আলীবর্দী নিয়মিত কর পাঠাতেন না ঠিকই। যে কারণেই মূলত বাংলায় বর্গী আক্রমণ। কিন্তু সে যাই হোক, তাঁকেও বরাবরই কাজ করতে হয়েছে দিল্লীর অঙ্গুলহেলনেই। সুতরাং বাদশাই নবাবের অ্যাপয়েন্টিং অথোরিটি। স্থানীয় সুবায় নবাব নির্বাচনের পর দিল্লী থেকে সনদ পাঠাতেন বাদশা। আজ যাকে পোশাকী ভাষায় ইংরাজিতে বলে সার্টিফিকেট। সে যুগেও তা আসতো বাদশার দপ্তর থেকে বাদশার সাক্ষর ও সিল লাগিয়ে। তার ওপর ভিত্তি করেই আপন ক্ষমতাবলে সুবা শাসন করতেন নবাবরা। বাংলাও ছিল ঠিক তেমন একটি সুবা। কিন্তু এক্ষেত্রে উল্লেখ্য হল আলীবর্দী খাঁ নিজের প্রাণপ্রিয় নাতি সিরাজকে নবাব হিসাবে নির্বাচিত করে গেলেও, নবাবকে মসনদে বসানোর ক্ষেত্রে তাঁর পদের কোনো ভূমিকাই থাকবার কথা ছিল না সে যুগের মুঘল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। তাই যতদিন না দিল্লী থেকে সনদ এসে পৌঁছোয়, ততদিন কেউ কোনোভাবেই নিজেকে নবাব হিসাবে ঘোষণা করে দিতে পারেন না। কিন্তু ব্যতিক্রমী সিরাজ বরাবরই স্বাধীনচেতা। তাঁর ইচ্ছের বশবর্তী তিনি। দাদু দেহ রাখার পর নিজেই নিজেকে নবাব ঘোষণা করে উঠে বসলেন মুর্শিদাবাদের তখতে। বাংলার আমজনতা ও স্থানীয় রাজরাজড়াদের ক্ষেত্রে এটাই ছিল প্রথম ধাক্কা। এমনকি তাঁকে নবাব হিসাবে মেনে নিতেও পারেননি রাজন্যবর্গের অনেকেই। এদিকে বাদশার দপ্তর থেকে বাংলার নবাব হিসাবে সনদ তৈরি হয়ে যায় বিহারের গভর্নর সওকত জংয়ের নামে। বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতিও তখন অস্থির। আলীবর্দীর সময় বাংলা স্থিতিশীল। কিছু বহিরাগত শত্রু আক্রমণ আছড়ে পড়লেও আলীবর্দী ছিলেন শাসক হিসাবে দক্ষ। তাই তাঁর পদে অস্থির, বিশৃঙ্খল ও দামাল যুবক সিরাজউদ্দৌলার অভিষেক অবশ্যই বাংলার রাজনীতিতে এক পালা পরিবর্তনের অধ্যায়। এদিকে বাংলার নবাবী সনদ পাওয়া আসল নবাব সওকত জংও চেষ্টা করে চলেছে রাজমহলের দিক থেকে মুর্শিদাবাদ প্রবেশ করার। সিরাজ তাঁর সম্পর্কে ভাই। নবাব আলীবর্দীর ভ্রাতুষ্পুত্র সৈয়দ আহমেদ খানের পুত্র সওকত সবদিক থেকে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। সিরাজের সাথে এই নবাবী নিয়ে তাঁর তীব্র লড়াই। সওকত জং বরাবরই অসংযমী ও বিশৃঙ্খল। তাঁর আশেপাশে সব চাটুকার ও ধান্দাবাজদের ভিড়। দিল্লীর মসনদে বাদশা তখন দ্বিতীয় আলমগীর। এদিকে আলীবর্দীর মৃত্যুর পর বাংলার মদনদের জন্য লড়াইও অব্যাহত। সেই সময় দিল্লীতে বাদশার উজির গাজিউদ্দিন ইমানুল মুলককে এক কোটি টাকা দিয়ে বাংলার নবাবী সনদ ও ফরমান বের করেন সওকত। বলাই বাহুল্য, সে যুগে বাদশার দরবার থেকে নবাবী ফরমান বের করার জন্য এক ও একমাত্র বিচার্য বিষয় ছিল অর্থ ও নজরানা। নবাবের যোগ্যতা, ক্ষমতা এসবের উর্ধে ছিল টাকা। যে বেশি নজরানা পাঠাতে পারে, তার তত তাড়াতাড়ি ফরমান প্রস্তুত। আজব সেই শাসন ব্যবস্থা। আজকের মত নয়৷ সেখানে তাঁবেদারিই শেষ কথা। আর সেই দিকটায় সওকত অনেক আগেই গুছিয়ে রেখেছিলেন সিরাজের আগে। আলীবর্দী খাঁ দেহ রাখার আগে থেকেই সওকতকে নবাবী পদে মুর্শিদাবাদ থেকে সমর্থন দিতে থাকেন ঘষেটি বেগম ও মীরবক্সি মীরজাফর আলি খান। সেইমতোই দিল্লী থেকে সনদ বেরোয় সওকতের নামে। কিন্তু সিরাজ যে বিষয়টাকে এক কথায় মেনে নেবেন ও নিজে থেকে সওকতকে সিংহাসন ছেড়ে দেবেন এমন কোনোদিনই হবার নয়। তাই লড়াইটা হয়ে উঠেছিল তীব্র৷ বাদশার দপ্তর থেকে সনদ আনাতে জগত শেঠকে দায়িত্ব দেন সিরাজ৷ কিন্তু জগত শেঠ মহাতপ চাঁদও একেবারেই পছন্দ করতেন না দামাল সিরাজকে। স্বভাবতই সনদ আদায়ে খুব একটা সচেষ্ট তিনি কোনোদিনই হননি।
এতো উচ্চপদস্থ আমলা ও মন্ত্রীদের বিরোধিতা নিয়ে একজন শাসক কিভাবে রাজ্য শাসন করতে পারেন? তা হয়ওনি। সিংহাসনে বসার দিন থেকেই শুরু হয় সিরাজ বিরোধিতা। ধীরে ধীরে সেটাই যেন বটগাছের রূপ নেয়৷ বিশ্বাস নামক অনুভূতিটাই নবাব সিরাজের কাছে প্রহসন হয়ে দাঁড়ায়৷ এভাবেই চরম প্রতিকূল পরিবেশে দিন শুরু হয় নবাব সিরাজউদ্দৌলার৷ সেই বিরোধ চলেছিল তাঁর মৃত্যুর দিন পর্যন্ত। অনেক অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। আশপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে পুরো পৃথিবীটাই৷ একজন ২৩ বছরের তরুণের সেই চাপ নিয়ে রাজত্ব সামলানো এককথায় অসম্ভবই হয়ে উঠছিল৷ তার ওপর প্রবল ভাবে ইংরেজ বনিকদের রাজনৈতিক বিরোধিতা তো ছিলই। সব মিলে তখন নবাব সিরাজের নাভিশ্বাস ওঠবার জোগাড়।