সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ২)

সুন্দরী মাকড়সা

কলকাতা থেকে বাড়ি ফেরার পথে, জয়নগর নেমে নদীপথে দুটো ঘাটে নৌকো বদল করে ঋষি যখন কৈখালীতে পা দেয়, তখন সেখানে নদী ক্রমে সমুদ্রের চেহারা নিয়েছে। ছেলেবেলায় যখন বাবার সাথে কলকাতার বিরজিতে বেড়াতে আসতো ঋষি, তখন জয়নগরের নদীর আজকের মতো এতোটা ক্ষয়াটে চেহারা ছিলো না। একের পর একটা নদী অন্য নদীর সাথে মিশে মিশে নদীখাতটাকে ক্রমশ চওড়া করে তুলতো। শেষপর্যন্ত যখন মাতলার কোলে ভাসতে থাকা কৈখালীর পাড় জুড়ে সুন্দরী, গরাণ, দেশী শালের মাটির দিকে মুখ তুলে রাখা শ্বাসমূলের সাথে লুকোচুরি খেলতে খেলতে বাড়ির দিকে পা বাড়াতো ঋষি, তখন মাতলার পরপারে সরু ফিতের মতো দিকচক্রবালে সূর্য অস্ত যাচ্ছে।

জয়নগরের ঠাকুরণ নদীর ওপর সেতুটা বানানোর পর পরেই নদীটা কেমন যেন হারিয়ে যেতে লাগলো। অতো চওড়া উচ্ছল নদীটা তার সমস্ত উচ্ছলতা হারিয়ে পলির চরায় ঢেকে ফেলতে লাগলো তার শরীর।

কৈখালিতে জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা ঋষি ভয়ংকর বাঘের সাথে ঘর করে বড়ো হয়েছে। কুমিরছানার লেজ ধরে খেলা করেছে, ভয়ংকর মাতলার বুকে তিনকোণা জাল দিয়ে মীন ধরতে গিয়ে কুমিরের হাঁ করা মুখের ভেতর সেই জালকে ঠুসে ধরে লাফ দিয়ে উঠে এসেছে ডাঙায়। হরিন শাবককে আদর করে ছেড়ে দিয়ে এসেছে মাতলার ওপারে যেখানে ঘন জঙ্গলে সূর্য হারিয়ে যায়।
সেই ঋষি যে কিনা ভয় কাকে বলে জানে না, সে দরজার খিলটাকে ভালোভাবে পরীক্ষা করে যখন বুঝলো যে ওটা বন্ধই আছে, অর্থাৎ দরজা খুলে অন্ততপক্ষে কেউ এসে ঘরে ঢোকেনি, তখন যেন একটু হলেও চিন্তায় পড়লো। কপাল কুঞ্চিত হলো। দুটো ভুরুর মাঝখানের অংশটুকু যেন সামান্য কুচকে গেলো।
তাহলে এয়ারকন্ডিশন মেসিনটাকে বন্ধ করলো কে?
এবারে ঋষি যেন নিজের মনে মনেই একটু হেসে নিলো। আচ্ছা, সে এভাবেই বা ভাবছে কেন? এসিটার তো মেকানিজমেরও সমস্যা থাকতে পারে। কিন্তু মেকানিজমের সমস্যা হলে একদিন না হয় বন্ধ হতে পারে। রোজরোজ এভাবে মাঝরাত্তিরেই বা কেন বন্ধ হবে মেসিনটা!
ঋষি সুইচের ওপর একটু চাপ দিয়ে ফের অন করলো সুইচটাকে। ফের চলতে শুরু করলো মেসিনটা। এবারে শব্দ করেই হেসে উঠলো ঋষি, ওই মাঝরাতে সেই হাসির আওয়াজ দরজা জানালা বন্ধ করা ঘরটার মধ্যে যেন পাক খেতে লাগলো।
ঋষি ঠিক করলো আগামীকাল একজন মিস্ত্রী ডেকে এসিটাকে দেখিয়ে নেবে।

ক্রমশ

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!