গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

আমি মোঃ মজিবর রহমান, বিএলএফ 

লাল মুক্তিবার্তা নম্বর – ০৩১১০১০২২৭, এমআইএস নম্বর – ০১৭৬০০০২১৭১, মোবাইল নম্বর – ০১৭৪২১৫৯৩৬০,

পিতা: ছাদেক আলী শেখ, মাতা: রিজিয়া খাতুন,

স্থায়ী ঠিকানা: লেপুসিপাহী রোড, রাধানগর,  ডাকঘর, উপজেলা ও জেলা: পাবনা।

বর্তমান ঠিকানা: ঐ।

১৯৭১ সালে আমি পাবনা জুবিলী হাই স্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পর সারা বাংলাদেশে আনন্দের জোয়ার বয়ে গেল। এবার বুঝি বাঙালিরা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের সুযোগ পাবে।  কিন্তু নির্বাচনে বিজয়ী দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার কোন খবর নেই। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আহুত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলেন। প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণার সাথে সাথে সারা বাংলাদেশের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়লেন। আমাদের স্কুল বন্ধ হয়ে গেল। সেদিন পাবনা শহরের সকল স্কুল কলেজের ছাত্ররা মিলিত ভাবে বিক্ষোভ মিছিল বের করলেন। আন্দোলনের জোয়ারে আমার পড়াশুনা ভেসে গেল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুকে মোকাবেলার আহবান জানালেন। বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণা যেন পরোক্ষভাবে যুদ্ধ করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার আহবান। বঙ্গবন্ধুর এই আহবানে সাড়া দিয়ে পাবনা জেলা স্কুলে শুরু হলো যুবক ছেলেদের সামরিক প্রশিক্ষণ।

২৫ মার্চ রাতে পাকসেনারা সারা বাংলাদেশের উপর আক্রমণ করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা শুরু করলো। ২৫ মার্চের রাতে রাজশাহী থেকে ১ কোম্পানী পাকসেনা এসে পাবনা শহরের ডাকবাংলো, টেলিফোন ভবন এবং তৎকালীন ইপসিক শিল্প এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করে মানুষ হত্যা শুরু করলো।  হায়েনাদের এই নৃশংসতার বদলা নিতে পাবনা শহরের ছাত্র জনতা ২৭ মার্চ পাকসেনদের টেলিফোন ভবন ক্যাম্পের উপর আক্রমণ শুরু  করে। সেই দিন বিকালের মধ্যেই শহরের সকল শত্রুসেনাদের হত্যা করে শহরকে মুক্ত ঘোষণা করা হয়। তারপর প্রতিরোধযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য পাবনা অস্ত্রাগার থেকে ইচ্ছুক যুবকদের মাঝে অস্ত্র বিতরণ করা হয়। আমি একটি ৩০৩ রাইফেল গ্রহণ করে ১০ এপ্রিল নগরবাড়িঘাটে শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। কিন্তু পাক বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে মেসিনগারেনর গুলিবর্ষণ এবং আরিচা ঘাট থেকে গানবোটে যাত্রা করে শত্রুসেনারা আমাদের অবস্থানের উপর মর্টারের গোলাবর্ষণ করলে আমরা অবস্থান ছেড়ে পিছু চলে আসতে বাধ্য হই। যার ফলে শত্রুসেনারা বিনা বাধায় পাবনা শহরে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।  আমরা তখন শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে পালিয়ে যাই।

কিন্তু গ্রামে এসেও আমরা শান্তিতে থাকতে পারলাম না। একদিকে যেমন পাকসেনদের হত্যাযজ্ঞ অন্যদিকে তেননি নকসাল নামক অতিবিপ্লবী  রাজনীতির নামে মানুষ হত্যার নির্মম খেলা। তাই বাধ্য হয়ে জুন মাসে মুক্তিযুদ্ধে  যোগদানের জন্য দেশ ছেড়ে ভারতের পথে যাত্রা করলাম। তারপর বাংলাদেশের বর্ডার পার হয়ে ভারতের নদীয়া জেলার কেচুয়াডাঙ্গা ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করলাম।  সেখানে প্রায় ৩০ দিন অবস্থান করার পর মুজিব বাহিনীর প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করে মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ভারতীয় বিমান বাহিনীর কাগোর্ বিমান যোগে আমাদের উত্তর প্রদেশের শাহরানপুর বিমান বন্দর হয়ে দেরাদুন জেলার টান্ডুয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়। সেখানে ৩০ দিন প্রশিক্ষণ শেষে আমাদের কলকাতার পাশে ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে নূর হোসেনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটা গ্রুপ গঠন করে আমাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ প্রদান করা হয়। তারপর আমাদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ করা হয়। বাংলাদেশের ভেতরে এসে আমরা ঈশ্বরদী থানার চরকাতরা গ্রামে সেল্টার গ্রহণ করি।

সানিকদিয়ারের যুদ্ধ: বাংলাদেশের ভেতওে প্রবেশ করেই আমরা শুনতে পারলাম নক্সালরা শ্রেণিশত্রু খতমের নামে অবস্থাপন্ন মানুষের বাড়িতে ডাকাতিসহ নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে যাচ্ছে। তখন বাধ্য হয়েই আমাদের নক্সালদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে হলো।  পাবনা পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জায়গাতেই তাদের ক্যাম্প ছিল।  আমাদের সাথে ছোট ছোট কয়েকটি যুদ্ধে পরাজিত হয়ে তারা তখন নক্সাল নেতা টিপু বিশ্বাসের গ্রামের বাড়ি সানিকদিয়াড়ে অবস্থান নিল। নক্সালদের স্বমূলে উৎখাতের জন্য আমরা কয়েক গ্রুপের প্রায় ১০০ মুক্তিযোদ্ধা বকুল ভায়ের নেতৃত্বে একদিন ভোর বেলায় সানিকদিয়াড় আক্রমণ করলাম।  সকাল ১১টার মধ্যে সারা গ্রাম দখল করে আমরা যখন তাদের মূল ঘাঁটি সানিকদিয়াড় প্রাইমারী স্কুলে আক্রমণ করলাম, ঠিখ তখনই ট্রাক ভর্তি পাকসেনারা এসে শত্রুদের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলো। তখন আমরা পিছু হটে আসতে বাধ্য হলাম। তারপর ১৩ ডিসেম্বর আমরা সুজানগর থানা পাকসেনা ক্যাম্পের উপর আক্রমণ পরিচালনা করি। ৩ দিন অবিরাম যুদ্ধ চলার পর ১৬ ডিসেম্বর সুজানগর মুক্ত হওয়ার সাথে সাথে আমরা স্বাধীনতা লাভ করলাম। এই যুদ্ধে আমাদের গ্রুপ লিডার নূর হোসেনসহ আরও বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়। মুক্তিযোদ্ধারা যদি জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ না করতো তাহলে যেমন আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেতাম না, তেমনি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসাবে পাওয়া সুযোগ সুবিধা থেকেও আমরা বঞ্চিত থাকতাম।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!