ক্যাফে স্পেশাল (টিচার্স ডে) সংখ্যায় জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়

রসায়ন 

গল্পটা নিছক গল্প নয়।অমর জানা কলেজের পড়া শেষ করে কনিষ্ঠতম শিক্ষক হিসেবে পাণ্ডববর্জিত এই এলাকার হাইস্কুলে জয়েন করেছে।কমবয়েসি ছেলে।গ্রামের স্কুল,সহকর্মী ও ছাত্রছাত্রীদের সে আপন করে নিতে পেরেছে।গণিতের শিক্ষক অমরকে সবাই বলে জানা স্যার বা অমর স্যার।এই জীবন বেশ ভালো লাগে তার।সে ভাবে এর চেয়ে ভালো বৃত্তি আর কীইবা হতে পারে!
নতুন ছাত্রছাত্রী,তাদের রকমভেদ,সরলমন,তাদের জানার আগ্রহ তাকে উৎসাহিত করে।প্রকৃত শিক্ষকের মতোই সে নিজে প্রতিদিন নিয়মিত পড়াশোনা করে,বিভিন্ন বই থেকে প্রশ্ন-উত্তর বুঝে নিজেকে আরো উপযুক্ত করে তোলার চেষ্টা করে। হেডস্যার বলেছেন,ভালো করে না পড়লে ভালো পড়ানো যায় না অমর।তুমি শিক্ষকতায় নতুন এসেছো,এই কাজে অনেককিছু শিখতে হয়।কত রকমের শিক্ষার্থী,বিচিত্র তাদের প্রশ্ন,জানার আগ্রহ।সেগুলোর সমাধান করতে না পারলে তুমি ভালো শিক্ষক হতে পারবে না।এতদিন যা পড়ে এসেছো তা দিয়ে ছেলেমেয়েদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাবে না।আরো নতুন বহু বিষয় জানতে হবে।আর যতক্ষণ না তুমি ছেলেমেয়েদের সন্তুষ্ট করতে পারছো,তুমি তৃপ্তি পাবে না এবং তবেই তুমি একদিন আদর্শ শিক্ষক হতে পারবে।তুমি ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট ছাত্রদের মানুষ করো।পিতৃতুল্য এবং শিক্ষকসমান হেডস্যারের আন্তরিক নির্দেশনায় সে উৎসাহিত হয়।
হেডস্যারের কথা কতটা বাস্তব দু-চারদিন ক্লাস করেই সে বুঝে গ্যাছে।তাই সে আরো যত্নবান হয়।সে ছাত্রদের মন দিয়ে পড়ায়,তাদের প্রশ্নের উত্তর দেয়,পড়া না পারলে বকাবকিও করে।আবার স্কুল ছুটির পর মাঠে ছাত্রদের সঙ্গে ফুটবল খেলায় মেতে ওঠে।
বেশ ভালো কাটে তার শিক্ষকজীবন।বাড়ির জন্য মনকেমন ছাত্রদের পেয়ে সে অনেকটাই ভুলে যায়।সে এখন ছোট্ট স্কুল-হোস্টেলের সুপার।একজন মাসি দুবেলা রান্না করে দিয়ে যায়।এলাকায় পুকুর,নদী,নালা অনেক আছে ভালো মাছ চাষ হয়।ছাত্রদের বাড়ির লোকেরাই মাছ বিক্রেতা,তাই সস্তায় প্রচুর মাছ কেনা যায়।কিন্তু অমর স্যার মাছ পছন্দ করে না,তাই প্রতিদিন তার ভাগের মাছ একজন ছাত্রকে সে পালা করে দিয়ে দেয়।স্যারের ভাগের মাছ পাবার জন্য পাশে বসার হুড়োহুড়ি পড়ে যায়।এতে সে খুব মজা পায়।
কিন্তু শিক্ষকের জীবনে বহু ঘাতপ্রতিঘাত ও সমস্যা আসেই,সেও একটা সমস্যার সম্মুখীন হয়।পরীক্ষায় গার্ড দেওয়া মানে ইনভিজিলেশন ডিউটি দেওয়ায় তার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না।ছেলেদের টুকলি,ওরা বলে,চোথা, ধরার কোনো অভিজ্ঞতা তার ছিল না।হলে বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে গার্ড দিচ্ছে সে,হঠাৎ নায়কোচিত ভঙ্গিতে হলে ঢুকলেন অশোকদা,ফিজিক্যাল এডুকেশনের শিক্ষক,তার খুব প্রিয়জন,একেবারে দাদার মতো,তিনি টুক করে এক ছাত্রের কাছে গেলেন এবং তার টুকলি নিয়ে একখানা বিজয়ীর হাসি দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে চলে গেলেন।
সে পরীক্ষার্থীদের একটা কথাই বললো, ও তোমরা তাহলে টুকলি করো! ছিঃ!ছিঃ!
কিছুক্ষণ পর আবার অশোকদা এলেন এবং শিকার ধরার মতো টুকলি ধরে চলে গেলেন।অমর ভাবে,অশোকদা সব বিষয়ে তার চেয়ে পিছিয়ে থাকেন,কিন্তু এই বিষয়ে সে পুরোপুরি পরাজিত।
সে অশোকদার শরণাপন্ন হয়।
অশোকদা বিজ্ঞের হাসিতে মাথা নেড়ে বলেন,তুমি পড়াশোনায় আমার চেয়ে অনেক ভালো হতে পারো ভাই,কিন্তু শিকার ধরা এত সহজ নয়।
সে ধরলো অশোকদাকে।তিনি অনেক তত্ত্বকথা বললেন,কিন্তু তা পালন করা তার পক্ষে দুঃসাধ্য বলে মনে হলো।কেবল যেটা সে বুঝলো,তা হলো,ভালোভাবে সবাইকে পর্যবেক্ষণে রাখলেই কিস্তিমাত হবে।
অশোকদা এব্যাপারে ওস্তাদ বলে হেডস্যার তাঁকে রানিং গার্ডের দায়িত্ব দিয়েছেন।
পরেরদিন খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেও অমর টুকলি ধরতে ব্যর্থ,মনে বেশ জেদ এসে গেছে। বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আরো ভালো করে সবকিছু সে দেখতে থাকে।একসময় সে নিশ্চিত হলো সিন্টু নামে একটি গোঁয়ার ছেলে টুকলি করছে।সিন্টুকে মৌখিকভাবে সাবধান করে পেল অবজ্ঞা।
সে উত্তেজিত হয়ে সিন্টুকে বলে, এই উঠে দাঁড়া।তুই টুকলি করছিস!
ছাত্র ব্যঙ্গমাখা গলায় উত্তর দেয়,বলছেন কী স্যার,আমি করবো টুকলি?! কখনোই নয়।আপনি ভুল বলছেন।খুঁজে দেখুন।যা খুশি দেখুন!
সে সাধ্যমতো খাতা,জামাপ্যান্টের পকেট,হাতা সব দেখে কিন্তু কোনো টুকলি পায় না।
সিন্টু ব্যঙ্গমাখা বিরক্তির সঙ্গে ফুট কাটে, আমার যে সময় নষ্ট হলো,তার কী হবে স্যার?
সে কিন্তু তখনো নিশ্চিত,সিন্টু চুরি করছে।নিজের ব্যর্থতায় সে লজ্জা পায়,রাগও আসে।তার মুখ চোখ লাল হয়ে গেছে।ছাত্রের অপমান তাকে দগ্ধ করে দিচ্ছে।
বিকেলে মিলন আসে।লাজুক ছেলেটি ক্লাসের ফার্স্ট বয়,পড়াশোনায় খুব ভালো।
লাজুকভাবে সে বলে,স্যার একটা কথা বলতে এসেছি।
— কী বল? — স্যারের গলায় কৌতূহল।
— কাউকে বলবেন না স্যার আমি বলেছি,সিন্টু প্রতিদিন টুকলি করে। — ভয়জড়িত গলায় ছাত্রের উত্তর।
— বলিস কি রে? আমিও তাই ভেবেছি,কিন্তু সার্চ করেও কিছু পেলাম না যে!
— স্যার, ও পরীক্ষা শুরুর আগেই বেঞ্চের তলার দিকে তক্তার ফাঁকে কাগজগুলো লুকিয়ে রাখে।আপনি খুঁজলেই পাবেন।সবাই জানে,কিন্তু ওর মারের ভয়ে কেউ ওকে ঘাঁটায় না,স্যারেরাও ওকে কিছু বলেন না।
চলে যায় মিলন।অমর বোঝে প্রিয় শিক্ষকের অপমান ছাত্রের বুকে খুব বেজেছে।তার গর্ব হয়।
তার পরের দিন ইচ্ছে করেই সিন্টুর হলে ডিউটি নেয় অমর।আজ সে সিন্টুকে ধরবেই।
মিলনের চোখের ইঙ্গিতে সে বোঝে সব ঠিক আছে।ঘণ্টা খানেক পর সে নিশ্চিত হয় সিন্টু কাজে লেগে গেছে।সে এগিয়ে যায় নির্দিষ্ট বেঞ্চের দিকে।উত্তেজনায় তার শরীর গরম হয়ে গেছে,হার্টবিট দ্বিগুণ হয়েছে।
কাছে গিয়ে বলে,কী করছিস সিন্টু!
— স্যার আজ আবার! কাল দেখলেন তো! আপনি কি আমাকে লিখতে দেবেন না?
— তুই উঠে বাইরে বেরিয়ে আয়। — দৃঢ়কণ্ঠে বলে অমর।
অনিচ্ছার সঙ্গে বেরিয়ে আসে ছাত্র।শিক্ষক নির্ভুল হস্তসঞ্চালনায় টেনে আনে একগোছা টুকলি।এখন সে রাগে যেন পাগল হয়ে গেছে,গতকালের অপমান সে ভুলতে পারেনি।সিন্টুকে পাগলের মতো মারতে থাকে সে।ছাত্রটি নরম হয় না,কাঁদে না,ভুল স্বীকারও করে না,গোঁ ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।
পরীক্ষা শেষ হলে সিন্টুকে ডেকে পাঠায় অমরস্যার।সবাই ভাবে,আরো মার হবে।অথচ কেউ জানে না অদ্ভুত রসায়নে স্যারের মনের রাগ গলে ভালোবাসা,আক্ষেপ আর গভীর বেদনায় পরিণত হয়েছে।
ছাত্র সামনে এসে দাঁড়ালে উঠে তার কাছে যায় নবীন শিক্ষক,মাথায় আদরমাখা হাত রেখে বলে,খুব লেগেছে না রে? তুই এমন করলি কেন?
এবার অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে যে ছেলেটা এত মার খেয়েও একটু কাঁদেনি সে এখন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে এবং অনুতপ্ত স্যারও নিজেকে ধরে রাখতে পারছে না।গুরুশিষ্যের দ্বিবিধ কান্নায় বন্যা নেমে আসে।
গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারতো, কিন্তু কৌতূহলী শিক্ষকের মনোবিজ্ঞান পড়া আছে,সে বোঝে ছাত্রটির সমস্যামূলক আচরণের পিছনে তার নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে এবং তারও নিশ্চয় বিশেষ কারণ আছে।সেটা জানার জন্য এক ছুটির বিকেলে সে পৌঁছে যায় ছাত্রের বাড়িতে।দেখেই বুঝলো বাড়িতে পড়ার পরিবেশ নেই।দজ্জাল সৎমায়ের অত্যাচার ছোটোবেলা থেকেই তার জীবনকে একেবারে মরুভূমিতে পরিণত করেছে।প্রতিবেশীদের কাছেও পরিস্থিতির সমর্থন মিললো।তার ধারণা সত্য হওয়ায় সে মনে বেশ তৃপ্তি পেয়েছে।
একটা সিদ্ধান্ত সে তখনই নিয়ে নিল,ছেলেটার জীবন নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।দরদি হেডস্যারকে বলে সিন্টুকে হোস্টেলে রাখতেই হবে আর ওকে ভালোভাবে মাধ্যমিক পাশ করাতেই হবে।
হ্যাঁ হেডস্যার কথা রেখেছিলেন,সব শিক্ষকই খুশি হয়েছিলেন এবং সিন্টুও কথা রেখেছিল — পঁচাশি পারসেন্ট নম্বর পেয়ে ফার্স্ট ডিভিশনে মাধ্যমিক পাশ করেছিল।সে এখন প্রাইমারি স্কুলশিক্ষক।
অমর ভাবে শিক্ষক হিসাবে এটা তার একটা উজ্জ্বল সাফল্য।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।