– একটু বোরোলাম
– এখন বেরোলে? কোথায়?
– ফাঁকা হাইওয়ে ধরে হাঁটছি
– মাথাটা ঠিক আছে নাকি পুরোটাই গেছে? এখন রাত ১.১৭।এখন মানুষের হাইওয়েতে কোনও দরকার থাকতে পারে না। এক্ষুণি তুমি বাড়ি যাবে।
– আমার দরকার আছে.. নিজের সাথে দরকার। তুমি আমার জন্য এতো ভাবো কেন সেই উত্তরটা জানার দরকার আমার।
‘তুমি আমার জন্য এতো কেন ভাবো’ এই ছিল সেদিন হিন্দোলা’র প্রশ্ন। উত্তর নেই নিসর্গ’র কাছে। সেই মুহূর্তে হয়তো-হয়তো করে ভাবার স্বপক্ষে কয়েকটা কারন হিন্দোলাকে দর্শালেও নিশ্চিত কোনও কারন উপস্থাপন করে উত্তর দিতে পারে নি। তবে নিশ্চিত উত্তর মায়াবিনী চাই-ই চাই।
উত্তর ছিলো, আর তা হলো অখন্ড আবেশ, বিস্ময়, মায়া, অপার মুগ্ধতা আর অনুভূতির মিছিল। কিন্তু কি করে বলবে এসব একথা ওকে? হিন্দোলা’র সামনে দাঁড়ালে কেমন থমকে যায় নিসর্গ। ওর গভীর সমুদ্রের মতো টলমলে দুটো চোখে নিজের অস্তিত্বের অন্বেষণে বুঁদ হয়ে নির্বাক হয়ে যায়। প্রথম দেখায় ওই ঠোঁটের কোণের তিল আর মায়া চোখের বশে যতটা না বশীভূত হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশী আন্দোলিত হয়েছিল যেদিন হিন্দোলা তার অতীতের কথা বলতে গিয়ে বলেছিল
– আজ নদীর চর, শুকনো ঘাষ আর বুনোগন্ধ আমাকে ফেলে আসা স্মৃতির অনুরণন দিলো। পাঁচটা বছর পরেও অমলিন তার মুখ, স্মৃতির পাতায় সতত রক্তক্ষরণ। আমি নিজেকে অতিক্রম করতে চাই তবে একবার শুধু জানতে সাধ হয় সে কেমন আছে…
ওর এই আকুলতা অনুভব করেই বিস্মিত হয়ে সেদিন হিন্দোলা’র প্রতি একটা অন্যরকম অনুভূতি জন্মেছিল নিসর্গ’র। বিবর্তনের পৃথিবীতে এখনও এমন অবিবর্তনীয় মানুষের অস্তিত্ব আছে যারা যাপনের রামধনু দিয়ে আজও অন্তরের গোপনে তাজমহল গড়ে; এটা উপলব্ধি করেই বিস্ময়..এক গভীর অনুভূতির সূচনা হয়।
কিন্তু এসব উত্তর কি করে বলবে হিন্দোলাকে? আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বলা অনুশীলন করতে থাকে। কিন্তু এই পদ্ধতিটা বড্ড ঠুংকো আর মেকি মনে হয় নিসর্গ’র। যদি আবার নিজের অস্তিত্বের সামনে দাঁড়িয়ে কথা হারিয়ে ফেলে? তারচেয়ে বরং লিখুক কাগজের উপর। লিখল। তবে শুধু ওই অতীত বিষয়টা বাদে। অতীত যত্নে বাঁচুক হিন্দোলা’র মনে ঘরে। সে ঘরে কখনও নিসর্গ’র যাওয়া-আসা থাকবে না।
পরের দিন সাদা জামার বুক পকেটে চিঠিটা লুকিয়ে কাছের এক বন্ধুর জন্মদিন কাটিয়ে বিকেলে গেল উত্তরপত্র জমা দেওয়ার দপ্তরে। মধুমাসের পলাশ রঙে সেদিন অপূর্ব সুন্দর মানিয়েছিল হিন্দোলাকে।
-একটু দেরি হয়ে গেল আসতে..
-অপেক্ষাটা painful হলেও কোথাও একটা ভালোলাগা কাজ করছিল। সবমিলিয়ে গোটা’টাকে Cheerful pain বলা চলে।
বলেই কিছু একটা চাওয়ার ভঙ্গিমায় ডানহাতটা বাড়িয়ে দেয় নিসর্গের দিকে। হিন্দোলা যেন অন্তরযামী, কিছু বলার আগেই বোঝে নিসর্গ’কে.. সব কেমন যেন পূর্ব নির্ধারিত। হয়তো বুঝেছিল নিসর্গ’র ব্যক্ত করার অপারকতা। যন্ত্রের মতো বুক পকেট থেকে পরিপাটি করে ভাঁজ করা কাগজখানা বার করে হিন্দোলা’র হাতে দিল। মাথাটা একটু নিচু করে চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করল। সামনের চেয়ারটায় বসা নিসর্গ’র অপলক দৃষ্টিতে প্রতিভাত হতে লাগল খোলা দেবদারু চুলের ফাঁকে শিশির ভেজা পদ্ম ফুলের মতো ওই দুটো চোখ। পড়া শেষ হতেই হিন্দোলা চোখ তুলে সেই চাউনিটাই দিল যে চাউনিতে প্রথমবার নিসর্গের মনের শুকনো গাছে বর্ণময় সুগন্ধি ফুল ফুটেছিল। তারপর চিঠিটা নাকের কাছে নিয়ে যেন প্রাণভরে তার গন্ধ শুকলো আর বলল তোমার গন্ধটা একদম আমার বাবার মতো শান্তিনিকেতনের গন্ধ মেশানো। নিসর্গ হেসে বলল
– শান্তিনিকেতনের গন্ধ!? সে আবার কেমন?
– প্রতিটা জিনিসের একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। সেদ্ধ মুসুরডালের গন্ধ কখনও শুকেছো? ওই গন্ধটা আমার মায়ের গন্ধের মতো।
– মুসুরডালের গন্ধ বুঝি তোমার প্রিয়?
– আমার তো চন্দনের আতরের গন্ধ প্রিয়
বলেই একটা ছোট্ট কাচের শিশি থেকে সুগন্ধি তরল নিসর্গের কানের পিছনে আর ঘাড়ের কাছে লাগিয়ে দেয় হিন্দোলা। তারপর চিঠিটা ওই সুগন্ধি স্থানে বুলিয়ে নিজের কাছে রেখে দেয় আর অপলকে চেয়ে থাকে । এই স্পর্শে, এই দৃষ্টিতে একটা স্নেহ, একরকম মমতা আর অনুপেক্ষিত একটা গভীর আকর্ষণ আছে।
-ওভাবে দেখার কী আছে? ওটা তো আমার বিষয়।
– যারা দেখে মোহিত হয় তারা বিভিন্ন উপাচারে পুজো করে। আর যারা অনুভবে মোহিত হয় তারা আবিষ্ট হয়ে নিজেকেই সমর্পন করে।
থ্যালাসোফাইল নিসর্গ’র অন্তঃপুর তখন হাজার সমুদ্রের কল্লোলে মুখরিত।কথা নেই মুখে। কিছু মুহূর্ত হয়তো এমন হয় যার প্রতিক্রিয়া ব্যাঞ্জনায় ব্যক্ত করা যায় না। এর কয়েকদিন পরেই একটা নীলখাম এল নিসর্গের ঠিকানায়। ভেতরে চেনা গন্ধমাখানো একটা সাদা কাগজে লেখা, এই প্রথম কোনও অনুভূতি আমাকে ভরা বসন্তেও ভেজায়, শুকনো নদীর চরে একা বসেও ওই কনিষ্ঠাঙ্গুলের নান্দনিকতাকে উপলব্ধি করায়। তুমি পার্থিব নাকি মায়া জানিনা। শুধু জানি তুমি এলে আমার গাত্রবীণায় বাগেত্রী বাজে.. তুমি তাকালে আনন্দি কল্যাণের আশীর্ব্বাদ ঝরে আর তোমায় স্পর্শ করলে আলি আকবর সাহেবের ভৈরবী বাজে মনে। এর চেয়ে আর কিছু প্রাপ্তি হতে পারে না। তোমাকে আপন করেছি নিঃশর্তভাবে।
হিন্দোলা আর নিসর্গ’র মধ্যে সত্যিই কোনও শর্ত নেই। শর্ত নেই সত্যগোপনের, শর্ত নেই কোনও নিয়মের, জীবন চরিতের বাঁকে সকল কাজের দায় বলার কোনও শর্ত নেই। ভালোবাসি বলার বাহুল্যতা নেই। শর্ত নেই বলেই ওরা দিনের শেষে নক্ষত্রের চাদরের নীচে অনুভবে নিয়ত সহবাস করে। স্বর্ণচাঁপার গন্ধে স্বপ্ন আঁকে। সম্পৃক্ত হওয়ার অঙ্গীকারে সেদিনের সন্ধ্যার অকাল বর্ষনে অপসৃয়মান বসন্ত বাঁধা পড়ে চির বসন্তের আবেশে।আর আজও প্রতিক্ষণে দাম্পত্যের নিষ্প্রভতা স্বপ্রভ হয় অনুভবের ঢেউয়ে।