|| কালির আঁচড় পাতা ভরে কালী মেয়ে এলো ঘরে || T3 বিশেষ সংখ্যায় ইন্দ্রজিৎ সেনগুপ্ত

ওরে পাগল, মা কি তোর একার?


কালীঘাটে মা কালীকে ষোড়শোপচারে পূজা দিয়েছিলেন ইংরেজরা। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বাসনায় সুরাবর্দী কালীঘাটে মানত করেছিলেন। নিবেদিতা বই লিখলেন ‘কালী দ্য মাদার’। গান বেঁধেছেন তানসেন, এন্টনী ফিরিঙ্গি থেকে বিদ্রোহী কবি নজরুল।
জাতপাতের প্রকোপ অবলুপ্ত না লুক্কায়িত, এসব বিষয়ে যতই তর্কের লড়াই থাকুক না কেন, মা কালীর আরাধনায় কিংবা শ্যামাসঙ্গীত রচনায় বা পরিবেশনায় তা কখনও বাধা হয়ে উঠতে পারেনি। সেখানে হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান সবাই ‘মা’ ‘মা’ বলে ডেকে তাদের গানের মধ্যে দিয়ে তাদের আরাধনায় মধ্যে দিয়ে মা-র কোলে ঠাঁই চেয়েছেন।
এই তো সেদিন ইংরেজরা কালীঘাটের মন্দিরে পূজো দিয়ে পলাশীর যুদ্ধে গিয়েছিলেন। কালীঘাটের কালীর প্রতি শুধু যে বাঙালি বা হিন্দুরাই ভক্তি বা বিশ্বাস পোষণ করতেন, এমন কিন্তু নয়। শোনা যায়, পাঞ্জাব আর বার্মা দখল করবার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরফে কালীঘাটে ষোড়শোপচারে পূজো পাঠানো হয়েছিল। মার্শম্যানের বিবরণেও এর সমর্থন মেলে। পাদরি ওয়ার্ড কালীঘাট সহ বিভিন্ন কালীমন্দিরে অহিন্দু ভক্তদের আনাগোনার কথা লিখেছেন। তিনি জানাচ্ছেন, “শুধু হিন্দুরাই যে এই কালো পাথরের দেবীমুর্তির পূজা করে, এমন কিন্তু নয়। আমি জানতে পেরেছি, অনেক ইয়োরোপীয় বা তাদের এ-দেশীয় স্ত্রীরা কালী মন্দিরে যায় ও দেবীর আরাধনায় হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে। আমি যে-ব্রাহ্মণের সাহায্য নিয়ে এই বিবরণ প্রস্তুত করেছি, তিনি বলেছেন, বহুবার সাহেব-মেমদের কালী মন্দিরে পূজো দিতে পালকি করে আসতে দেখেছেন। তাঁকে মন্দিরের কর্তৃপক্ষ সুনিশ্চিত ভাবে জানিয়েছেন, কোনো প্রার্থনা নিয়ে কালীর কাছে ইয়োরোপীয়রা প্রায়ই এসে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক বিশিষ্ট কর্মচারী সম্প্রতি মামলা জিতে কালীদেবীকে দু’ তিন হাজার টাকা দামের টাকা মূল্যের নানা সামগ্রী দান করেছেন।”
পবিত্রকুমার ঘোষ জানিয়েছেন, “একসময় অবিভক্ত বাংলার, পরে পূর্ব পাকিস্তানের জননেতা শহিদ সুরাওয়ার্দি নাকি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবার বাসনায় কালীঘাটে মানত করেছিলেন ও কলকাতায় দু’জন লোক পাঠিয়ে তাঁর হিন্দু বন্ধুদের মারফৎ ‘বিরাট ডালা সাজিয়ে’ কালীঘাটে পূজো দেবার ব্যবস্থা করেছিলেন”।
এই নাটমন্দিরেই ১৮৯৯ সালে কালী সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতা দিয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দের বিদেশিনী শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা। ২৮শে মে শ্রোতায় ঠাসা সেই সভায় কালী আরাধনার বলিপ্রথা, মূর্তিপূজা ও মূর্তির তথাকথিত কুৎসিত রূপ ইত্যাদি অভিযোগের জবাব দিয়েছিলেন। অবশ্য এর আগে কলকাতার ‘অ্যালবার্ট হল’-এ নিবেদিতা কালী সম্বন্ধে আর একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন (১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৮৯৯)। ‘কালী অ্যান্ড হার ওয়রশিপ’, ‘কালী ওয়রশিপ’, ‘কালী দ্য মাদার’ এমন লেখাগুলিতে নিবেদিতার অনুপম ভাষা-শৈলীতে যেন প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠেন তাঁর মনোময়ী মা। পরে তাঁর এই বক্তৃতা পুস্তিকাকারে প্রকাশ করেন মন্দির কর্তৃপক্ষ।
আজকাল মানুষ নাকি ধর্মনিরপেক্ষতা কী সেটা বোঝে না। বোঝাতে চাইলেও বুঝতে চায়না। কেউ আছে টুপি নিয়ে ব্যস্ত, কেউ আছে টিকি নিয়ে। অথচ এই কবি সেই উনবিংশ শতকেই পরিষ্কার ধারণা দিয়ে গেছেন ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে কী বোঝায়। এন্টনি ফিরিঙ্গির সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে কি আমরা প্রস্তুত? একদিন কবিগানের আসরে যখন কবিয়াল ভোলা ময়রা এন্টনী ফিরিঙ্গীকে সুরেলা-গাল পেড়েছিলেন
তুই জাত ফিরিঙ্গি জবরজঙ্গী,
তোকে পারবে না মা তরাতে
তখন তার প্রত্যুত্তর দিয়েছিলেন মায়ের এক পর্তুগীজ, খৃষ্টান ফিরিঙ্গী সন্তান, – নাম হ্যান্সম্যান এন্টনি। যিনি প্রথম ইউরোপীয় বাংলা ভাষার কবিয়াল। তিনি কবিগানের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর বাবা ছিলো পর্তুগীজ, আর মা বাঙালি। ১৯শতকের প্রথম দিকে বাংলাতে আসেন এবং পশ্চিমবঙ্গের ফরাসডাঙ্গা নামক এলাকায় বসবাস শুরু করেন। তিনি গাইলেন, –
“সত্য বটে সত্য বটে!
আমি জেতেতে ফিরিঙ্গি
ঐহ্যিকে লোক ভিন্ন ভিন্ন
অন্তিমে সব একাঙ্গী”।
অপমানে অপমানে জর্জরিত হয়ে এন্টনীর দুচোখ দিয়ে ভিজে ওঠে। অশ্রুবিগলিত নয়নে প্রতিমার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে চেয়ে আনন্দাশ্রু ফেলে আর অন্তর অনুভূতির কাঁপনে কেঁপে ওঠে। এন্টনী মুদ্রিত নয়নে দরদ ভরা কন্ঠে আত্মনিবেদন করতে থাকে, –
‘ভজন পুজন জানিনে মা জেতেতে ফিরিঙ্গি
যদি দয়া করে তারো মোরে এ ভবে মাতঙ্গী।’
পরিচিত অপরিচিতজন বাইরে বিস্ময়ে হতবাক হলেও এন্টনীর আকুলতা তাদেরকেও অন্তরমুখী করে তোলে। তবুও অপমানের মাত্রা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। হোক না সে কবিগান। ভোলা ময়রা গাইতে থাকে, –
“শোনরে ভ্রষ্ট, বলি স্পষ্ট, তুই রে নষ্ট, মহাদুষ্ট,
তোর কি ইষ্ট, কালীকেষ্ট, ভজগে যা তুই যীশুখৃষ্ট।
শ্রীরামপুরের গীর্জেতে” –
এন্টনী করজোড়ে মাথা ঝুঁকিয়ে মহারাজ ও অন্যান্য উপস্থিত শ্রোতাদের প্রীতি নমস্কার জানিয়ে দরদ ভরা কন্ঠে মা কে বলতে থাকে, –
“জয় যোগেন্দ্র জায়া মহামায়া,
মহিমা অসীম তোমার,
একবার দুর্গা বলে যে ডাকে মা তোমায়,
তুমি করো তায় ভবসিন্ধু পার”।
শেষে কবিয়াল রাম বসু যখন এন্টনীকে তাচ্ছিল্য করে বলেছিলো, –
“সাহেব, মিথ্যা তুই কৃষ্ণপদে মাথা মোড়ালি,
(ও তোর) পাদরী সাহেব শুনতে পেলে গালে দেবে চূণ-কালি”।
সেদিন এন্টনী যা জবাব দিয়েছিল তার তুলনা নেই। যা ভারতবর্ষের ইতিহাসে লেখা হয়ে আছে-
“খৃষ্ট আর কৃষ্টে কিছু ভিন্ন নাইরে ভাই
শুধু নামের ফেরে মানুষ ফেরে এও কোথা শুনি নাই।।
আর এক মুসলিম গায়ক শ্যামাসঙ্গীত গেয়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিলেন। মহম্মদ কাসেম। ১২৯৫ বঙ্গাব্দের ১২ জ্যৈষ্ঠ (১৮৮৮ খ্রি.) বর্ধমান এর কুসুম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মুনশী মুহম্মদ ইসমাইল। তিনি অবশ্য শ্যামাসঙ্গীত গাইতেন, কে মল্লিক ছদ্মনামে। অনায়াসে, অন্তরের মাধুর্য ঢেলে তিনি গেয়েছিলেন, –
“তারা নামে মন মজেছে,আর কি এ মন ঘরে থাকে,
দিবানিশি তারা বলে, বুক ভেসে যায় নয়নজলে”।
কখনও আগমনী গান গেয়েছেন, –
“আনন্দিনী উমা আজো এলো না তার মায়ের কাছে।
হে গিরিরাজ! দেখে এসো কৈলাসে মা কেমন আছে॥
মাতৃসঙ্গীতের আর এক শিল্পী হলেন ভারত-বিখ্যাত টপ্পা-গায়ক উস্তাদ রমজান খান। দীর্ঘ দিন কলকাতায় থেকে বাংলা ভাষা ও বাংলা গান রপ্ত করেছিলেন রমজান খান। বিভিন্ন আসরে তাঁর গান ও সারেঙ্গি বাদন ছিল তখনকার এ শহরের অন্যতম আকর্ষণ। মনে পড়ে একদিন এক আসর বসেছিল এন্টালির জিতেন্দ্রনাথ ঘোষের বাড়িতে। দুর্গাপূজার নবমীর রাত ছিল সে দিন। রমজান যখন সব ক’টি হিন্দুস্থানি গান গেয়েই আসর শেষ করতে যাচ্ছেন, তখন জিতেন্দ্রনাথবাবুর বাবা তাঁকে একটি বাংলা গান গাইতে অনুরোধ করলেন। দুর্গা-নবমীর রাত পেরিয়ে ভোর হতে তখন আর বিশেষ বাকি নেই। ভৈরবীর সুরে রমজান ধরলেন—
‘হায় হায় একি দায়
কেন নিশি পোহাইল
চরণে চন্দন জবা
মঙ্গলঘট শুকাইল’।
এছাড়া মা কালীর আরাধনা রয়েছে সৈয়দ জাফরের শ্যামাসঙ্গীতে: –
কেনেগো ধরেছ নাম দয়াময়ী তায়
আমারে কি দিবে ধন, নিজে তোমার নাই বসন,
সৈয়দ জাফর তরে, কি ধন রেখেছ ঘরে,
সম্পদ দুখানী পদ হরের হৃদয়।
মুন্সী বেলায়েৎ হোসেন থাকতেন কলকাতার শিয়ালদহ এলাকায়। সংস্কৃত শাস্ত্রে তাঁর দারুণ দখল ছিল। তাঁর ভক্তিমূলক গান ও বাংলা পদাবলি রচনায় আপ্লুত তখনকার পণ্ডিতমহল তাঁকে ‘কালীপ্রসন্ন’ উপাধি দিয়েছিল। তিনি গেয়েছিলেন, –
এসেছ একাকী রে মন কারে বলরে আপন।
মায়ার কুহকে পড়ে বৃথা কর আকিঞ্চন॥…
তাঁর ‘বিরহ অনল আসি’ গানটির শেষ দুটি লাইনে শেষের ‘কালি’ রচনাকার নিজে।  
“বিরহ অনল আসি যখন দেহে ঘর করিল
লোম চৰ্ম্ম অস্থি যত সকলই পুড়িয়া গেল।…
কালী কাল বলে কালী, সহায় হইলে কালী,
নাথেরে পাইবে কালি, ঘুচিবে এ বিরহানল” । 
উত্তর ভারতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গীতজ্ঞ তানসেনও করেছেন মাতৃবন্দনা । যদিও তানসেন (৯৫৬-১০০২ খ্রিস্টাব্দ) জন্মসূত্রে ছিলেন হিন্দু, গোয়ালিয়রের গৌড়ীয় ব্রাহ্মণ বংশের মানুষ। আসল নাম রামতনু পাঁড়ে। একসময় তানসেন মুহম্মদ গাওস-এর প্রভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর তাঁর নতুন নাম হয় আতা আলী খাঁ। ৯৭০ সালে আকবরের রাজসভায় যোগ দেওয়ার পর সম্রাট তাঁর সঙ্গীত-দক্ষতা দেখে নাম দেন ‘তানসেন’। তানসেন মানে সুরলহরী দিয়ে যিনি চেতনা ফেরাতে সক্ষম।  সঙ্গীতজ্ঞের কি ধর্ম হয় কোনও? তানসেনের এই গানের বাণী ধারণ করে আছে দেবীস্তুতি-
“দুষ্ট দুর্জন দূর করে দেবি
করো কৃপা শিও শঙ্করী মা
হর আলা পর দার বিরাজে
মন মানে ফল পাঁওয়েরি”
শ্যামা মাকে কাজী নজরুল ইসলাম আত্মসচেতন, নিরহংকারিণী, শুভ-চিন্তার উদ্রেককারিণী, অশুভনাশিনী, আমিত্ববিনাশিনী ইত্যাদি গুণধারিণী হিসেবে দেখিয়েছেন। তাঁর হৃদয়ের গভীরতায় শ্যামা মায়ের জন্য ভক্তি সঞ্চারিত হয়েছে যা তাঁর গানের কথার মধ্যে দিয়েই ধরা পড়ে
”ভক্তি, আমার ধুপের মত,
ঊর্ধ্বে উঠে অবিরত।
শিবলোকের দেব দেউলে,
মা’র শ্রীচরণ পরশিতে”
এছাড়াও শ্যামা মায়ের পরিচয় দিতে গিয়ে কবি লিখেছেন-
আমার হাতে কালি মুখে কালি, মা
আমার কালিমাখা মুখ দেখে মা
পাড়ার লোকে হাসে খালি।।
কিন্তু যতই হোক কালী তো হিন্দু দেবী। তত্‍কালীন মুখপোড়া সমাজ কিন্তু তাঁর শ্যামা-প্রেমকে বাঁকা চোখেই দেখা হত। তাঁকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার তরজা চলত। সেইসময়ে হিন্দুদের একটি অংশ তাঁকে বিজাতি বলে মনে করত। তেমনই মুসলিম সম্প্রদায়ও তাঁকে বিজাতি বলেই ঘোষণা করেছিল! শুধু তাই নয়, কট্টর মুসলিমরা তাঁকে কাফির আখ্যাও দিয়েছিলন। আমার কৈফিয়ত কবিতায় কবি লিখেছিলেন-
“মৌ-লোভী যত মৌলভী আর ‘মোল-লারা’ ক’ন হাত নেড়ে,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে !”
আসলে ধর্মবিশ্বাস, জাতপাত কখনওই শ্যামাসঙ্গীত রচনা বা পরিবেশনের বাধা হয়ে উঠতে পারেনি। শত বাধা সত্বেও, নজরুল লিখলেন, –
বল্‌ রে জবা বল্ —
কোন্ সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণতল।।
কিংবা
কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন।
(তার) রূপ দেখে দেয় বুক পেতে শিব যার হাতে মরণ বাঁচন।।
লিখলেন আগমনি, দুর্গাস্তুতি, পদাবলি, কীর্তনও। গীতিকার, সুরকারের ধর্ম যে ভিন্ন, তা কখনও কেউ খেয়ালও করেনি— এটাই চিরকাল বাঙালির ধর্মীয় সঙ্গীত-জগতের ঐতিহ্য। গৃহী যোগী বরদাচরণ মজুমদারের কাছে তন্ত্রসাধনা করেছিলেন তিনি। নজরুলের কয়েকটি গানে তান্ত্রিক ভাবধারার পরিচয় মেলে। যেমন –
“শ্যামা নামের লাগল আগুন আমার দেহ ধূপ–কাঠিতে।
যত জ্বলি সুবাস তত ছড়িয়ে পড়ে চারিভিতে।।
স্বাধীনতা সংগ্রামী নজরুলের কাছে শ্যামা মা হয়ে উঠেছিলেন স্বয়ং দেশমাতৃকা। শক্তি আরাধনার প্রভাব তাঁর কবিতাতেও পড়েছে। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় ‘আনন্দময়ীর আগমন’ কবিতায় লিখেছিলেন,
“আর কতকাল রইবি বেটি, মাটির ঢেলার মূর্তি-আড়াল?
স্বর্গকে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাঁড়াল।
এটি লেখার জন্য ব্রিটিশ সরকার তাঁকে কারাবন্দি করে। স্বদেশী গানে দেশকে ‘মা’, ‘মাতা’ সম্বোধন করে তত্কালে বহুগান রচিত হয়েছে, নজরুলের শ্যামাসংগীত মূলতঃ সেখান থেকেই শুরু। সর্বোপরি তিনি শ্যামাকে তাঁর অসংখ্য গানে বিভিন্ন রূপ ও চরিত্রে, ভাবে ও প্রেমে দাঁড় করিয়েছেন। কালীকে বিভিন্নরূপে তিনি দেখছেনে :
‘আজই না হয় কালই তোরে কালী কালী বলবে লোকে।
(তুই) কালি দিয়ে লিখলি হিসাব কেতাব পুঁথি, শিখলি পড়া,
তোর মাঠে ফসল ফুল ফোটালো কালো মেঘের কালি-ঝরা।
একদিকে যেমন তিনি লোলরসনা রণরঙ্গিনী মূর্তিতে আহবান করেছেন, অন্যদিকে তাঁকেই কখনো স্নেহময়ী জননী আবার কখনও বা দুরন্ত উচ্ছলা কন্যারূপে কল্পনা করেছেন।
“আমার কালো মেয়ে রাগ করেছে, তারে কে দিয়েছে গালি?
রাগ করে সে সারা মুখে মেখেছে আজ কালি।।”
কবি নজরুল কালী আর রাসবিহারী কৃষ্ণে কোনো তফাৎ দেখেননি। রাম-রহিমকে একভাবে দেখা সমদর্শী এই সাধক যে শ্যাম আর শ্যামার মধ্যে ভেদ করবেন না তা বলাই বাহুল্য।
“শ্যামা মায়ের কোলে চড়ে জপি আমি শ্যামের নাম।
মা হলেন মোর মন্ত্রগুরু, ঠাকুর হলেন রাধা-শ্যাম।।
কিন্তু শ্মশানকালী প্রসঙ্গে এত সুন্দর তাৎপর্য অথচ সরল করে কোন তান্ত্রিক, যোগী, সাধক বা কবি লিখে গেছেন বলে আমার জানা নেই, নজরুল সহজ-ভঙ্গীতে বললেন-
“শ্মশানে জাগিছে শ্যামা
অন্তিমে সন্তানে নিতে কোলে।
জননী শান্তিময়ী বসিয়া আছে ঐ
চিতার আগুন ঢেকে স্নেহ-আঁচলে।।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!