সাপ্তাহিক রম্য সাহিত্যে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ৫)

নেংটিশ্বরী মা

বৃষ্টি এসেছে বটে এ শহরে. এমনি সময়ে গাছে জল দিয়ে হয়রান হতেন যে সব গাছ প্রেমীরা তাঁরা কিঞ্চিত শ্বাস ফেলেছেন. গাছপালাগুলো তরতর করে বেড়েছে. পাড়ার তেলাকুচো জঙ্গলের বাহার দেখে আমাজন লজ্জা পাবে, পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রেন লিলি, পাতাবাহার, কচূ, ঘেচূ, টগর, শিউলিরা. গর্তগুলোতে জল ঢুকে পড়ে মা নেংটিশ্বরীর সংসার শিফট করেছে তেলাকুচো বনে.
এ হেন অবস্থায় মা নেংটিশ্বরী পড়েছেন বিপদে. সে তেলাকুচোবনের গর্তে খেয়ে পড়ে, খুঁদকুড়ো জোগাড় করে, ছানাদের মুখে দুটি দুধ ভাত তুলে দিয়ে ভালোই ছিল. বাধ সাধল এই বৃষ্টির দাপট. গমের কল থেকে গম, বাইপাসের ধার দিয়ে দৌড়ে ধানের ক্ষেতে নেমে সেখান থেকে ধান, ঘাসের বীজ, মুদির দোকানের গুড়ের হাড়ি থেকে পাটালির টুকরো নিয়ে এসে বাছাদের খাইয়ে বেশ তাগড়াই বানিয়েছিলেন নেংটিশ্বরী মা. আর নিজেও বেশ চকচকে চামড়া, লম্বা ল্যাজবাহার আর পুতির মত চোখ নিয়ে বেশ রাজ্যপাট চালাচ্ছিলেন. নধর গিন্নীটি হয়ে, সংসারের জেল্লা বাড়িয়ে নেংটিশ্বরী মা বেশ গর্ব বোধ করতেন. তা এই ঘোর বর্ষায় তার দুই সদ্য কৈশোরপ্রাপ্ত ছেলে বায়না ধরে বসলে তাদের পিৎসা চাই. সব মানুষগুলোর বাড়ীতে বাচ্চারা আজকাল বর্ষার দিনে খিচূড়ি খায় না তার বদলে বাইকওয়ালারা এসে কাগজের বাক্স করে পিৎসা দিয়ে যাচ্ছে তাঁরা শুনে এসেছে. সব শুনে নেংটিশ্বরীর মাথায় হাত. নেংটিশ্বরীর মাসতুতো সাহেব ভাই জেরী অবিশ্যি চীজ আর পাউরুটি তাদের জন্য নিয়ে এসেছে প্রায়ই, তা বলে পিৎসা নামক বস্তুটির কথা নেংটিশ্বরী মা, ঠাকুমা, বাপ ঠাকুর্দা কারুর কাছে বাপু শোনে নি. নেংটিশ্বরীর কর্তা ধেড়েশ্বর তো সাতে পাঁচে থাকেন না. ঘরের খুঁদখুড়োটি সাঁটিয়ে মনের সুখে আলবোলাতে টান দিচ্ছেন. ছেলেপুলে খেলো কি খেলো না তা নিয়ে তাঁর কিছু আসে যায় না. নেংটিশ্বরী ছেলেদুটোকে দুই থাপ্পড় লাগিয়েছে আজ. ছেলেদুটো পিৎসার বায়না করে মেজাজ বিগড়ে দিয়েছে . মার খেয়ে ছেলেদুটো ঘুমিয়ে পড়েছে. নেংটিশ্বরী ল্যাজ দুলিয়ে পাড়া বেড়াতে বেড়োলেন. নিজের স্ট্রেস নিজেকেই কমাতে হয়. কেই বা কাকে দেখছে আর ব্যাথায় মলম লাগাচ্ছে. সংসারের পাকে পড়ে নেংটি ওসব অনেকদিন ছেড়ে দিয়েছে.
বৃষ্টি যত বাড়ে এ রাস্তায় বাইকের দাপট তত বাড়ে. বাইকওয়ালাদের তাণ্ডব চলে. এই তো একটু আগেই একটা বাইক নেংটিশ্বরীর ঘাড়ে উঠে পড়ছিল. ঊফ এই মিনসে আবার কানে যন্তর ধরে কার সাথে যেন কথা কইছে. ওই একটা মেয়ে নেমেছে. মেয়েটার হাতে একটা প্যাকেট ধরাল ছেলেটা. মেয়েটা প্যাকেট নিয়ে গান গাইতে গাইতে উঠছে সিঁড়ি দিয়ে. বেশ গায় তো. কেমন খোশবাই আসছে প্যাকেটটা থেকে, গন্ধটা যেন নেংটির নাক ছুঁয়ে, মাথা ছুঁয়ে, সর্বাঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছে. গন্ধটাকে অনুসরণ করে পাইপ বেঁয়ে তরতর করে উঠে যায় নেংটিশ্বরী. এই তো মেয়েটার রান্নাঘর. ওই যে প্যাকেটটা. মেয়েটা কিছু বার করল প্যাকেট থেকে, তারপর প্লেটে রাখল, ওই যে ছুড়ি দিয়ে কাটছে তিনকোনা করে. পুতির মত চোখ দিয়ে পুরোটা দেখে নেংটিশ্বরী মা. আহা ছেলেদুটো মার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে. তাদের খাবারে এমন খোশবাই কোথায় জোটাতে পেরেছে সে. না: এ বাড়ীর সবাই ঘুমোলে কাগজের বাক্সটাকে একবার ভালো করে স্টাডি করবে সে. রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডারের পিছনে ঘাপটি মেরে বসে থাকে সে. ওই আলো নিভল. তড়িৎগতিতে বাক্সের ভিতরে ঝাঁপ দেয় নেংটিশ্বরী. এই তো বেশ পাউরুটি আর চিজ গোত্রের কিছু আছে মনে হচ্ছে. টুকরো, টাকরা যা পড়ে আছে ছেলেদুটোর জন্য যথেষ্ট. নতুন রকম চীজ, পাউরুটি গোছের জিনিষটি মুখে করে নিয়ে, রান্নাঘরের জানলা দিয়ে পালাতে যাবে, ঠিক তখনি আলো জ্বলে উঠল. মাথাটা কেমন টলে গেল. টাল খেয়ে নেংটিশ্বরী জলের সিঙ্কের ভিতর পড়ল. আর তাঁর কিছু মনে নেই.
যখন জ্ঞান ফিরল, তখন দেখল সে তেলাকুচো বনে শুয়ে রয়েছে, ধেড়েশ্বর তাঁর মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে তাঁকে দেখছে. পাড়ার সব নেংটি, ধেড়েরা তাদের দেখছে. ছেলেদুটো ভ্যেবলে গিয়ে তাকিয়ে রয়েছে. চেষ্টা করে উঠে বসে নেংটিশ্বরী. পাড়ার নেংটি ঠাকুমা ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে. ‘হ্যা গো বাছা এই ঝড়, জলের রাতে তুমি কোথায় গেছিলে?’
‘ওই খাবার আনতে গো ঠাকুমা’.
‘তা একটু দেখেশুনে যাবে তো মা, দেখ দেখি কি অঘটনটাই ঘটালে. নেহাত মেয়েটার মনটা ভালো তাই সিঙ্ক থেকে তুলে বাক্সে করে এখানে তোমায় দিয়ে গেল’.
‘আপনি কি করে দেখলেন ঠাকুমা?’
‘আমি যে ওইদিক পানেই যাচ্ছিলুম, গনশা মিটিং ডেকছিলো যে, তাঁর পুজো আসছে. স্বর্গ থেকে ঝপাং করে ছাদে নেমে জলের পাইপ বেয়ে নামছিলুম, দেখলুম তুমি পা হড়কে সিঙ্কে পড়লে. তা যাক গে তুমি বিশ্রাম নাও. সামনে গনশার পুজো আসছে, আমাদের সবার মেলা কাজ. পরের মিটিং এ কলা বৌ তোমাদের সবাইকে যেতে বলেছে ‘.
এই বলে নেংটি ঠাকুমা পাড়ার সব মেয়ে বৌদের নিয়ে চলে গেল.
ধেড়েশ্বর শুতে গেলেন. বাচ্চাদের কাগজের বাক্সের থেকে খাবার দিয়ে, নেংটিশ্বরী স্নানে গেল.
আরও রাতে বাচ্চারা শুতে এসে বলল’ মা তুমি যেটা এনেছিলে সেটা পিৎসা ছিল, তুমি কি করে জানলে মা ওটাই চাইছিলাম? ‘ নেংটিশ্বরী বললে’ মায়েরা সব জানে’, বলে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লে.
অনেক রাতে মেঘের আড়াল থেকে চাঁদ বেড়িয়ে এসে নেংটিশ্বরীকে একটা লম্বা সেলাম ঠুকলে.
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!