সাপ্তাহিক রম্য সাহিত্যে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ১৪)

দাশুর ঠাকুর দেখা
নবমী নিশি এসে গেল| আমার জানলার পাশে শিউলি গাছটায় ঝাপরিয়ে ফুল এসেছে| সারা বাড়ী শিউলির সৌরভে ভরে আছে| নবমী নিশিকে মা দুগগা যেন , জোছনার রূপোর গয়নায়, হরশৃঙগারে, শিউলির সুরভীতে ঢেলে সাজিয়েছেন নিজে হাতে | দুহাতে তাকে আটকাতে যাই, তবে সে কি আর মানা মানে| একটু একটু করে আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে পালায় নিজের খেয়ালে| জানলার পাশে এসে দাড়াঁই, দেখি দাশু আর দামিনী হেঁটে হেঁটে চলেছে, চাঁদের আলোর সিড়িঁ বেয়ে| আলমারি খুলে শাড়ী বার করে রাখি পরদিন পরার| পরের দিন পুজো শেষ| শেষদিন সবটা খুশি কুঁড়িয়ে আঁচলে বাঁধি| পরদিন বিজয়া|
পরদিন দাশু আর তাঁর সাগরেদের সাথে দেখা হল সকালবেলা| আমরা তখন চা খাওয়ার জায়গা খুঁজে পেয়ে বেশ জাকিয়ে বসেছি|
এ বছর বুর্জ খালিফার চূড়ো থেকে করোনা কেমন ছানাপোনা নিয়ে গড়িয়ে নামবে পুজোর পর সেই নিয়ে বিশেষ আলোচনা চলছিল । দাশুদের তো বেজায় মজা, কারন দাশুকে আর তাঁর বন্ধুদের ভাইরাস দেখতেই পায় না, দাশুকে আমি ছাড়া কেউ দেখতে পায় না । দাশু তাই চাঁদের আলো বেয়ে, বুর্জ খালিফা দেখতে গিয়েছিল সল্টলেকের কাছে। বঁাশ দিয়ে বুর্জ খালিফা বানানো কি চাট্টিখানি কথা নাকি । সে গিয়ে চেপে বসেছিল বুর্জ খালিফার টঙে, দাশুর বুর্জ খালিফার মাথায় চড়ে লম্ফ, ঝম্প লাগিয়েছিল, দুই বিমানচালক তাই কিঞ্চিত বিপদে পড়েছিল বলে শুনেছি । এই বুর্জ খালিফা দেখার চক্করে দাশু তাঁর বৌকে ফেলে উড়ে গিয়েছিল । এ খবর অবশ্য দাশু তাঁর বন্ধুদের কাছেও চেপে গেছে । শুধু আমি জেনে গিয়েছিলাম কারন আমি ছাদে দাঁড়িয়েছিলাম সেদিন রাতে, আর জোনাকিরা ঝঁাক বেঁধে এসে আমায় বলে গিয়েছিল যে দাশু বুর্জ খালিফার মাথায় ঝুলছে ।
এরপর বাড়ী ফেরার গাড়ী ধরতেই, দাশু গাড়ীর দরজা খুলে উঠে বসল, দুই সাগরেদকে বগলদাবা করে| আমি বললাম ‘ঝেড়ে কাশ এবার, সেদিন কি হয়েছিল?’শুনে দাশু আরেক চোট দমফাটা হাসি হেসে বললে ‘আরে বৌগুলো নতুন জুতো পরে হাটতে পারছিল না| ফুচকা খেতে গিয়ে খোশ গপপ জুড়েছিল| আমি নবীন আর মোহনকে বলেছিলাম আমরা এগোই, ওরা আসুক| তারপর ঠাকুর দেখতে গিয়ে ,এগিয়ে গেছি| বৌরা আর খুঁজে পায় নি আমাদের| নিজেরা বাড়ী চলে এসেছে| ‘
বুর্জ খালিফার মাথায় ওঠার ব্যাপারটা কিন্ত ব্যাটা বেমালুম চেপে গেল, ভিড়ে বৌকে এবং বন্ধুদের ভড়কি দিয়ে সে ওখানে গিয়ে গোলমালটি পাকিয়ে এসেছে । আমি বেশ বুঝতে পারলাম বুর্জ খালিফা দর্শন বন্ধ হবার পেছনে দাশুর হাত আছে, আর তাই সে বাক্যটি বার করছে না নিজের মুখ থেকে ।
নবীন বললে ‘তুই যে বললি পা চালিয়ে হাঁটতে, যাতে ওরা ধরতে না পারে| আর আমরা তিনজন ঠাকুর দেখব ঝাড়া হাত পায়ে , তুই ভোরবেলা জিলিপি খাওয়াবি,ফোন করে তো বৌকে বললাম বাড়ী ফিরে যেতে|’
আমি বললাম ‘জিলিপি জুটেছিল?’ নবীন বললে ‘ছাই জুটেছিল, দাশু বললে মহারানীর দোকানে খেয়ে আসতে|’
আমি বললাম ‘দাশুর কথায় নাচলে ,এরমই হয়’| শুনে মোহন,নবীন দুজনেই রে রে করে উঠে বললে ‘আহ দাশুকে আমরা ভালবাসি যে’| মনে হল তিনটেকেই ঠেলে নামিয়ে দি গাড়ী থেকে| দাশু সুযোগ বুঝে দুটোকে গাড়ী থেকে নামিয়ে নিয়ে পালালে|
আমি সেই থেকে ভেবে চলেছি দাশু পাগল ,না মিচকে ? না কি জাদু জানে ভালবাসার?
এখনোও ভেবে উঠতে পারি নি||