সাপ্তাহিক রম্য সাহিত্যে ইন্দ্রাণী ঘোষ (পর্ব – ১৮)

মৎসপুরাণ

মাছ যারা ভালবাসেন তাঁরা এক ধরনের রসিক হন । মাছের রকমফের বুঝে, কখনো দড়াদড়ি করে কানকো টিপে মাছ কেনাতে তাদের এক নেশা আছে । ভোরবেলা মাছের বাজার যাওয়া এক বিলাসিতা তাদের কাছে। তাঁরা বাজারে না পৌঁছলে মাছগুলো নাকি ওই বিশাল ট্যাঙ্কি থেকে লম্ফ দিয়ে আবার গঙ্গায় ফিরে যাবে এমন একটা ধারনা লালন করে, সকাল, সকাল বাজার ছোটেন ।
ভালো ভেটকি কি করে চিনতে হয়, ভালো পাবদা কেমন করে বুঝতে হয় এই নিয়ে দুই বন্ধু একবার লম্বা ফিরিস্তি দিয়েছিল । আমি যথারীতি ভুলে মেরে দিয়েছি । তবে হ্যাঁ, শুনতে মন্দ লাগে নি । ভুত এবং চোরের সাথে মাছের গপ্পও কিন্তু বেজায় সমাদৃত । আমাদের ইস্কুলের ছেলে বন্ধুরা বেশ কয়েকবার জমিয়ে প্ল্যান কষে হরিদেবপুরের কাছে কবরডাঙা মাছের আড়তে ভোরবেলা তিনটের সময় মাছ কিনতে গিয়েছিল । চিংড়ি, লোটে, ইলিশ, পাবদা প্রচুর পরিমানে কিনে তাদের মাথাপিছু আড়াইশো টাকা করে দাম পড়েছিল । আমি সেকথা শুনে প্রচন্ড উৎসাহ নিয়ে বলেছিলাম ‘আমাকেও নিয়ে চল, আমিও যাব ।’ তারা বললে ‘দাঁড়া শীতকাল আসুক যাব’ । বন্ধুরা বলল তখনি নাকি বোয়াল, আড়ের দেহে মাখনের মত তেল জমে । একেবারে ‘মাক্ষন’ । শীতকালে নামী কস্মেটিক্স কোম্পানির বানানো বডি বাটারের মত, যা গায়ে মাখলেই খসখসে চামড়া থেকে রেহাই আর এই মাছ মুখে দিলেই মাখনের মত গলে জিভের ডগা থেকে পায়ের নখ অবধি মাখনের ফিলিং হবে, একেবারে চুড়ান্ত ইন্দ্রিয় সুখ।
মাছ কেনার রসিক না হলেও আমি বোয়াল এবং আড়ের গা মাখা রসেবসে রান্নাটি করতে এবং খেতে জমিয়ে ভালবাসি । বুজুরি ট্যাংরা, বড় ট্যাংড়াও বড্ড প্রিয়। তা এই ট্যাংরা, বোয়াল এবং আড়ের তৈলাক্ত, রসময় অভিজানের জন্য ইস্কুলেরই আরেক বান্ধবীকে বললাম ‘চল মাছ কিনতে যাব’ । তা সেই সুন্দরী বান্ধবী বললে ‘ ওই বাজার আমার বাড়ীর কাছে, তুই আমার বাড়ীতে থাক, তারপর ভোররাতে চলে যাস মাছের বাজার ছেলেগুলোর সাথে ।’ বুঝলাম আমার সুন্দরী বান্ধবীটি বডি বাটার মেখে চকচকে চামড়া বানালেও , মাছের বডি বাটারের রসায় সে একেবারই উৎসাহী নয় । এরপরই এল অতিমারী আর অভিযানও উঠে গেল শিকেয় ।
লীলা মজুমদারের লেখায় পড়ি, রায় পরিবারে তাঁর জ্যাঠামশাইদের মাছ ধরার গল্প । সারাদিন ধরে মাছ ধরতে গিয়ে, মাছ না পেয়ে ফিরে এলেও মুখে চোখে এক পরম পরিতৃপ্তি । ট্রেনের কম্পার্টমেন্টে হঠাৎ মাছের চারের গন্ধ পেয়ে বাবা, জ্যাঠামশাইদের জন্য মনখারাপ করে উঠেছিল লেখিকার । এমনি অমোঘ সে ঘ্রাণ। হালের রান্নাঘরের লেখার জাদুকরি সাবিনা ইয়াস্মিনের লেখায় কত অজানা মাছ আর অনামী মাছের বাজারের কথা উঠে আসে । পাতাশি, ন্যাদস, খলসে, তোড়া, গুতুম, উলকো, তালুই, কাকোলে, ফলুই, কাঠকই, পায়রাতলি এসব মাছ নাকি অনামা বাজারে পাওয়া যায় । অচেনা রেললাইনের পাশে গ্রামের মানুষেরা এসব মাছ নিয়ে বসেন । একেবারে টাটকা, মাছের ট্যাঙ্কিগুলোতে খলবল করে । এইসব মাছ বেগুন, আলু, ঝিরিঝিরি করে কেটে, আদা, জিরে বাটা দিয়ে দুর্দান্ত রান্না করেন সাবিনা । বেশি করে পেয়াজ বাটা দিয়ে, কড়কড়ে করে ভেজে ভুনা করেন গরম ভাতে খাওয়ার জন্য । সাবিনার জীবনে আপসোস পৃথিবীর কত বাজার তাঁর অদেখা রয়ে গেল । অথচ বাজারের ঠিকানা এই ভদ্রমহিলার মগজে যা ঠাসা আছে, গুগুল বলে বলে দশ গোল খাবে।
মাছ খাওয়ানো বাঙালি পরিবারে প্রেম নিবেদনের আবার মানসিক অত্যাচারের পন্থাও বটে । এক ভদ্রমহিলার কাছে শুনেছিলাম, তাঁর শাশুড়ি মা তাঁকে মাছ খেতে দিতেন না । ছেলের আর নাতির জন্য পাবদা মাছের ল্যাজা মুড়ো রেখে দিতেন, নিজে আর তাঁর স্বামীর পাতে গোটা মাছ তুলে নিতেন । বৌমাকে বলতেন নাতনির জন্য ডিম সেদ্ধ দিয়ে দিতে, বৌমা নিজে যেন ডাল, ভাত খেয়ে নেন । খেতে বসে শাশুড়ি মায়ের ছেলে নিজের মাছের থেকে অর্ধেকটা বৌয়ের পাতে তুলে দিতেন ।
এখনকার মেয়েরা অবশ্য এসব পরোয়া করেন না, বাঁচা গেছে ।
আমাদের বাড়ীতে একবার এক মাছের ভয়াল, ভয়ংকর নাটক অনুষ্ঠিত হয়েছিল । আমি বাড়ীর গেট দিয়ে ঢুকতে ঢুকতে দেখি এক প্রতিবেশী ভদ্রমহিলা বঁটি হাতে রে রে করে তেড়ে আসছে । আমি তাকে ডজ করতে গিয়ে, ফুলের টব উল্টে পড়ে যেতে যেতে বুঝলাম আমার পায়ের কাছে ঠান্ডা ঠান্ডা কি যেন বিদ্যুত গতিতে সরে যাচ্ছে, একটা ধারালো কিছু আমার পায়ে পায় ফুটি ফুটি করেও ফুটল না। ভদ্রমহিলার বঁটিরূপী খাড়া প্রায় আমার পায়ের উপর পড়ে পড়ে । আমি হড়কে সরে যেতে যেতে বুঝলাম ওনার রান্নাঘর থেকে সিঙ্গী মাছ পালিয়েছে এবং উনি করাল মূর্তি নিয়ে তাঁকে ধাওয়া করছেন । সিঙ্গী মাছটি কাঁটা ফোটাতে চেষ্টা করেছিল আমার পায়ে, আমি হড়কে গেছি ।
সবশেষে এক বিয়ে বাড়ীর গল্প বলে এই মৎসপুরাণ শেষ করব । আমরা তখন বেহালাতে থাকি । বেহালাতে তখনো ফ্ল্যাটবাড়ীর রাজ্যপাট হয় নি । আমরা বিশাল বাগান দেওয়া, পেছনে ইয়াব্বড় পুকুরওয়ালা বাড়ীতে ভাড়া থাকতাম । সে পুকুরের জলে মস্ত কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুলের ছায়া পড়ত । তা সে যাই হোক, সেই বাড়ীতেই আমাদের পরিবারের এক কন্যের বিয়ে ঠিক হল । সেটা আশির দশক । তখনো ক্যাটারিং, বুফে ইত্যাদি শুরু হয় নি । ঠাকুর এসে রান্না করতেন, ভিয়েন এসে মিষ্টি বানাতেন । আমাদের বাড়ীওয়ালা এবং প্রতিবেশীরা পরমানন্দে তাদের ঘরদুয়ার আমাদের বিয়ে বাড়ীর জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন । তা সেই বিয়ের বাসি বিয়ের দিন (পূর্ব বঙ্গের নিয়ম) আমরা ছোটরা নতুন বরের পিছন, পিছন ছাদে উঠে গেছি । বরটিকে আমরা ছোটরা বেজায় ভালবেসে ফেলেছিলাম কোন অজ্ঞাত কারনে । তা বর বাবাজী গেছেন সুখটানের মৌতাত নিতে । আমরা ছোটরা ছাদ থেকে ঝুকে দেখছি বিশাল এক মৎসরাজ কলপাড়ে শুয়ে আছেন । নতুন বর আমাদের বললেন ‘আরে আসল মাছ তো আমি ধরেছি রে’ ।
আমরা হাঁ করে তাকিয়ে আছি ।
‘মাছের নানারকম খাবার হয়, তাদের অনেক নাম হয় জানিস’ ।
আমাদের হাঁ আরও বড় হল । তা সে কি সব নাম? ‘আহ গলে লাগ যা’, ‘না যা কহি অব না যা । দিল কে সিভা ‘ । এসব সুরের খাবার দিয়ে মাছকে নাকি নিজের করে নিতে হয় । তখন আমরা উত্তম, সুপ্রিয়ার অভিনীত বিখ্যাত গান ‘দেখুক পাড়া পড়শীতে কেমন মাছ গেঁথেছি বড়শিতে’ দেখি, শুনি নি । কিছুই বুঝি নি বরের কথার মরমার্থ । আজ বুঝি সেদিন নতুন বর কি বলেছিল আর কেনই বা একটু পরে নতুন কনে ছাদে উঠে এসেই আমাদের সবাইকে বরের সাথে দেখে লাজে রাঙা হয়ে উঠেছিল ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।